ওরাও মানুষ

মাহফুজ আবেদীন

মাহের ঘুম ঘুম চোখে বাইরের দৃশ্যপটটা দেখার চেষ্টা করল। বাইরের ঘুটঘুটে অন্ধকারে কী ঘটছে তা অনুমান করার জন্য জানালার কপাট খুলে দীর্ঘক্ষণ কান খাঁড়া করে রাখল। বেশ খানিকটা দূর থেকে মানুষের জটলা পাকানো হৈহুল্লোর ভেসে আসছে। রাতের নিস্তব্ধতা ছিন্ন করে ক্রমশই সেই আওয়াজ চারপাশ সরগরম করে তুলল।

মাহের মাথা তুলে সময় দেখল। পৌনে দুইটা বাজে। এত রাতে নয়-দশ ডিগ্রি হিমশীতল ঠাণ্ডা মারিয়ে সেখানে যাওয়া ঠিক হবে কিনা ভাবতে লাগল। এলাকাটাও অত একটা ভালো নয়। নিত্যদিন শুধু চারিদিকে হানাহানি আর মারামারির খবর পাওয়া যায়। সেখানে গিয়ে হঠাৎ না সে আবার কোন মসিবতে ফেঁসে যায়। চেঁচামিচির আওয়াজটা উঁচু হতে লাগল ক্রমশ। মাহের সাতপাঁচ ভাবতে ভাবতে ঘর ছেড়ে বেরুল। সাবধানী পা ফেলে এক-পা দু-পা এগুতে লাগল।

ধান খেত ঝোপঝাড় পেরিয়ে তিন রাস্তার মোড়ে এসে দেখল উদাম গায়ে একটি ছেলেকে লোকজন মিলে বেধড়ক পিটাচ্ছে। চতুর্দিক থেকে এলোপাথাড়ি লাথি, ঘুষি আর মারের চোটে এই কনকনে শীতেও ছেলেটা হাঁপাচ্ছে আর পানি পানি বলে কাতরাচ্ছে। চোখের সামনে এমন নির্মম দৃশ্য দেখে মাহের স্তব্ধ হয়ে গেল। লোকদের কথাবার্তা আর নানা মন্তব্য শুনে সে বুঝতে পারল ছেলেটা কিছু একটা চুরি করতে গিয়ে ধরা পড়েছে। সামান্য দূরে চাদর মুড়ি দিয়ে দাঁড়িয়ে থাকা একজন লোককে জিজ্ঞেস করে সে নিশ্চিত হল ছেলেটি সুপারি চুরি করতে গিয়ে আটকা পড়েছে। মাহের ভেবে খুব অবাক হল, সামান্য এই সুপারি চুরির দায়ে একজন মানুষকে মেরে এমন মরণদশা করা যায়?

তার খুব ইচ্ছে হল ছেলেটিকে এই গণপিটুনি থেকে উদ্ধার করতে। কিন্তু মাহেরের ধারণা হল,সে অচেনা ও নবাগত হওয়ায় লোকজন তাকে আবার ভুল বুঝে বসে কিনা! তাই সে তার এই সদিচ্ছাটাকে আপাতত সংবরণ করল। পৃথিবীতে এমন অনেক কাজ আছে যা বিবেকের দৃষ্টিতে করা উচিৎ হলেও সমাজের দৃষ্টিতে তা করা অনুচিত। মাহের সমাজের বিধিকে অনেক ভয় পায়, বড় সমীহ করে চলে। জটলা ভেঙ্গে সে ধীরপায়ে এগিয়ে গেল। ইতোমধ্যে চোরের দেহ নেতিয়ে গেছে। সম্পূর্ণ নিথর হয়ে মাটিতে লুটিয়ে পড়েছে ক্ষতবিক্ষত শরীরটা। ফোঁটা ফোঁটা রক্তবিন্দু ঘামের সাথে মিশে পুরো শরীরটা লালচে বর্ণ ধারণ করেছে। ডাঙ্গায় আটকা মাছের মতো ঠোঁটটা অনবরত নড়ছে, আর গোঙ্গানোর মত আওয়াজে পানি পানি বলে কোঁকাচ্ছে।

ধীরে ধীরে মানুষের জটলা ভাঙতে লাগল। লোকজন যে যার মত ঘরে ফিরে গেল। চোর ধরতে পারায় এবং তাকে ঠিকঠাক উত্তমমধ্যম দিতে পারায় সবাই প্রশান্তির ঢেকুর তুলে বিদায় হল। সকলের প্রস্থানের পর মাহের হাটু গেঁড়ে ছেলেটির সামনে বসল। দুই হাতে নিথর দেহটা টেনে তুলে নিজের শরীরে টেক দিয়ে বসাল। ছেলেটি আবার বিড়বিড় করে পানি চাইল। এই রাতের বেলায় তিন রাস্তার মোড়ে পানি কোথায় পাবে সে! খানিকটা সময় ভাবল, তারপর ছেলেটার নিস্তেজ দেহটাকে কাঁধেচাপা করে বাড়িতে নিয়ে আসল। পানি খাওয়ালো, গামছা ভিজিয়ে রক্তাক্ত শরীর মুছে দিল। পাতিলে থাকা একটু দুধ গরম করে খাওয়ালো। ব্যথানাশক মলম মেখে শুইয়ে দিল।

পরের দিন সকাল বেলা মাহের ঘুম থেকে উঠে দেখল তার ঘরের দরজা সম্পূর্ণরূপে খোলা। ভাবল ছেলেটা হয়ত জেগে গেছে, দরজার বাইরে হাটাহাটি করছে। পরক্ষণই মনে হল যে ছেলেটির ঘরের বাইরে যাওয়া উচিৎ নয়। লোকজন দেখে তাকে চিনে ফেলতে পারে। এমনটা হলে ছেলেটি নিজেও বিপদে পড়বে, মাহেরও খুব অসুবিধায় পড়বে। কারণ এই সমাজে চোরকে আশ্রয় দেয়ার রীতি নেই। তবে এই আইন শুধুমাত্র নিম্নশ্রেণীর চোরদের বেলায়। রাস্ট্রের উঁচু স্তরের চোরদের বেলায় ভিন্ন নীতি। তাদের ক্ষেত্রে চুরি শব্দটাই প্রয়োগ করা নিষেধ। দুর্নীতি, অনিয়ম ইত্যাদি লঘু শব্দ প্রয়োগ করে তাদেরকে, তাদের অপরাধকে আড়াল করে রাখা হয়। যত সমস্যা এই ছিঁচকে চোরদের। এদের জন্য সমাজ আজো সহনশীল কোনো শব্দ খুঁজে পায়নি। তাই সমাজের সর্বশ্রেণীর ঘৃণা, আক্রোশ ও গণধোলাই এদের প্রাপ্য।

মাহের বিছানা ছেড়ে দরজার বাইরে এল। এদিক সেদিক পায়চারী করতে করতে ছেলেটিকে খুঁজতে লাগল। কিন্তু অনেকক্ষণ খোঁজার পরও ছেলেটার কোনো হদিস পাওয়া গেল না। নিজ থেকেই বিপত্তি কেটে পড়েছে ভেবে লম্বা একটা স্বস্তির নিঃশ্বাস ছাড়ল সে। তারপর খোলা বারান্দায় চেয়ার টেনে বসে পড়ল।

বাড়িটাতে মাহের ভাড়ায় থাকে। একাই। বিগত দশ বছর সে যাযাবরের মত এ বাসা ও বাসা করে কাটিয়ে দিল। সরকারি চাকরীর অসংখ্য সুযোগ সুবিধার সাথে অসুবিধে একটাই, স্থির হয়ে কোথাও বসবাসের সুযোগ নেই। অবশ্য নতুন নতুন জায়গায় নিত্যনতুন অভিজ্ঞতার মুখোমুখি হতে মাহেরের খুব একটা মন্দ লাগে না। তারচেয়ে বড় কথা এই ব্যপারটা তার গা সওয়া হয়ে গেছে। অভ্যেস আর রুচির সাথে মানিয়ে নিয়েছে।

আজ শুক্রবার। অফিস নেই। বাজারে গিয়ে টুকটাক খরচাপাতি আনতে হবে। রান্নাঘরে ঢুকল বাজার তালিকা তৈরি করতে। কি আছে কি নেই তা খুব একটা মনে থাকে না তার। তাই প্রতিবার বাজারে যাওয়ার আগে রান্নাঘরে ঢুকে সব উলটে পালটে দেখে নিতে হয়। রান্নাঘরের দরজায় পা রাখতেই তার চোখ ছানাবড়া হয়ে গেল। ছেলেটি কোথাও যায়নি। সে পাতিল থেকে খাবার নামিয়ে গোগ্রাসে খাচ্ছে। মাহের বুঝল, ছেলেটি খুব ক্ষুধার্ত। বোধয় ক্ষুধার তাড়নাতেই গতরাতে চুরি করতে বেরিয়েছিল। মাহের লক্ষ্য করল তাকে দেখে ছেলেটির হাত থেমে গেছে। মাথা নিচু করে বসে আছে। তাই সে তাকে অভয় দিয়ে বলল, ‘খাও, খাও, কোনো ভয় নেই। আমি বাজারে যাচ্ছি, দুপুরে তুমি কী খেতে চাও বল, আমি নিয়ে আসবো।’

ছেলেটি মাথা তুলে করুণ চোখে একবার তাকাল তারপর আবার দৃষ্টি নামিয়ে নিল। হয়ত ভাবছে এভাবে তার চাহিদার কথা কেউ আগে জিজ্ঞেস করেনি। মাহের উত্তরের অপেক্ষা না করে ব্যাগ হাতে বেরিয়ে পড়ল।

ফিরে এসে দেখল ছেলেটি জানালায় দাঁড়িয়ে বাইরের পৃথিবী দেখছে। হয়ত বাইরের সাজানো প্রকৃতির মত তারও একটা জগত ছিল, পরিবার ছিল। আদর সোহাগ এবং ভালোবাসা পাওয়ার মত কিছু আপনজন ছিল। হয়ত আজ সেই মানুষগুলো নেই অথবা থেকেও না থাকার মত। মাহেরের খুব ইচ্ছে হল ছেলেটার অতীতের গল্প শুনতে। বর্তমান অবস্থার পেছনের কারণগুলো জানতে।
দুপুরে খাবার খেতে খেতে মাহের কথায় কথায় ছেলেটির অতীত প্রসঙ্গে ঢুকে পড়ল।

বাবা-মা আর ছোট্ট একটা বোন ছিল তার। উপকূল এলাকায় মফস্বলে বাড়ি। এক রাতের কথা। সন্ধ্যা থেকেই বিদ্যুৎ নেই। বাইরে ঝরো বাতাস। মোমবাতি জালিয়ে খাবার খেতে বসেছে সবাই। হঠাৎ প্রচণ্ড ঝাঁকুনিতে তাদের আধা-পাকা বাড়িটা কেঁপে উঠল। শুরু হল এক বিধ্বংসী ঝড়। গাছপালা কটমট আওয়াজে ভেঙে এলোপাথাড়ি আঘাত হানতে লাগল। মুহুর্তেই সবকিছু তছনছ হয়ে যেতে থাকল। ঝরের তীব্রতাকে পাল্লা দিয়ে ভারী বৃষ্টি শুরু হল। এভাবে চলল অর্ধেক রাত। এতক্ষণে মাথার উপরের টিন শেড অর্ধেকের বেশী উড়ে গেছে। উপর থেকে অঝোর ধারায় বৃষ্টির পানি পড়ছে। বাইরে থেকেও জোয়ারের পানি ঢুকতে শুরু করেছে। ঘরের ভেতরেই কোমর সমান পানি হয়ে গেছে। ধীরে ধীরে বাড়ছে পানি। বাবা তাকে, আর মা ছোট বোনকে কোলে তুলে কোমর সমান পানি মাড়িয়ে আশ্রয়ের আশায় ছুটলেন। কুচকুচে কালো অন্ধকার। এক হাত সামনেও কিছু স্পষ্ট দেখা গেল না। ঝরের প্রকোপ কিছুটা হাল্কা হলেও তীব্র গতিতে পানি ঢুকতে শুরু করেছে চতুর্দিক থেকে। পানির স্রোত ঠেলে এগিয়ে যাচ্ছিল ওরা। হঠাৎ পানির স্রোতের সাথে প্রকাণ্ড একটা গাছ ভেসে আসল। আকস্মিক গাছের আগমন বুঝতে না পাড়ায় গাছের আঘাতে লুটিয়ে পড়ল সবাই। দিকবিদিক বিক্ষিপ্তভাবে বাঁচার চেষ্টা চলে কিছুক্ষণ। দূর থেকে বোনের তীব্র একটা আর্তনাদ কানে ভেসে এল। এরপর আর কিছু মনে নেই তার।

মাহের স্তব্ধ হয়ে শুনছিল। সে ভাবতে লাগল সেই ঝরের রাতে না জানি এমন কত করুণ উপাখ্যান তৈরী হয়েছে। কত মানুষের সাজানো সংসার চিরতরে হারিয়ে গেছে। কত স্বাবলম্বী ও বিত্তশালী মানুষ এক রাতের ব্যবধানে পথের ভিখিরি হয়েছে। আজও কত শিশু পরিবার হারিয়ে, অবলম্বন হারিয়ে এক মুঠো খাবারের জন্য হন্য হয়ে ঘুরে বেড়ায়। দ্বারেদ্বারে ঘুরে হাত পাতে পেটের দায়ে। ক্ষুধার যন্ত্রণা মেটাতে হয়ত চুরিও করে। অতপর আমরা তাদের সেই ক্ষুধার্ত দেহটাকে নির্দ্বিধায় থেতলে দিই। বীরবিক্রমে তাদের দুর্বল শরীর থেকে রক্ত ঝরাই। এরপর দুচারজনের কাছে বুক ফুলিয়ে এই কৃতিত্বের গালগল্পও করি। আমাদের বীরত্ব আর কৃতিত্বের দৌড় এখানেই সীমাবদ্ধ। চোখের সামনে সমাজের, রাষ্ট্রের সমস্ত সম্পদ লুট হয়ে গেলেও আমার কোনো অনুযোগ থাকে না। পদ-পদবীধারী চোরদের বিরুদ্ধে আমার জবান একরত্তি চলে না। আমাদের বিচারবুদ্ধি কত এক তরফা!

মাহের আর ভাবতে পারে না। মাথা তুলে ভালো করে আরেকবার ছেলেটির দিকে তাকাল। বিমর্ষ মনে উঠে দাঁড়াল। ছেলেটির মাথায় হাত রেখে ধরা গলায় বলল, তুমি আজ থেকে আমার কাছেই থাকবে। এক নতুন জীবন শুরু করবে।

মাহফুজ আবেদীন, লালমনিরহাট