করোনাকালে অনলাইনে ধর্মীয় দাওয়াত : কতটা ভূমিকা রাখতে পারছে?

রাকিবুল হাসান :

করোনার কারণে ধর্মীয় দাওয়াত এবং আমেজের কাঠামোগত একটা পরিবর্তন ঘটে গেছে পুরো বিশ্বেই। কোথাও দ্বীনি জলসা নেই, মাহফিলের গমগম আওয়াজ নেই। নেই জুমুআর দিনে ভরা মসজিদে দরাজ কণ্ঠের খুতবা। মানুষ মসজিদে যেতে চাইলেও যেতে পারছে না, জুমুআয় শরীক হতে পারছে না। মাহফিল, দ্বীনি জলসা এবং জুমুআর খুতবার বিকল্প হিসেবে এখন ইসলামি স্কলার, ওয়ায়েজ এবং ইমামগণ বেছে নিয়েছেন অনলাইন মাধ্যম। ফেসবুকে, ইউটিউবে তারা এখন আগের চেয়ে বেশি একটিভ। ধর্মীয় প্রশ্ন, জিজ্ঞাসা, বিশ্লেষণ, সমাধান নিয়ে তারা সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমের স্ক্রিনে হাজির হচ্ছেন প্রতিনিয়ত।

কিন্তু মিম্বরের বাইরে এসে অনলাইনে ধর্মীয় দাওয়াতের মাধ্যমে মানুষের মাঝে কতটুকু প্রভাব ফেলতে পারছেন ইসলামি স্কলার এবং দাঈগণ। এখানে গুরুত্বপূর্ণ একটি বিষয় পয়েন্ট আউট করেছেন উত্তর ক্যালিফোর্নিয়ায় ইসলামিক কমিউনিটির পরিচালনা পর্ষদের সদস্য ওয়াল আলী। তিনি আন্তর্জাতিক গণমাধ্যম আলজাজিরাকে বলেছেন, ‘অনলাইনে ব্যাপকভাবে ধর্মীয় দাওয়াতের এই কাঠামোটা একদমই নতুন এবং আকস্মিক। ইসলামিক স্কলার এবং দাঈদের জন্য চ্যালেঞ্জেরও বটে। কারণ অনেক দাঈ এবং ইমামগণ এইসব সমাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ব্যবহারে অভিজ্ঞ নন। এখানে তাদের কাজ করতে হলে দরকার দীর্ঘ একটি ট্রেনিংয়ের। আকস্মিকতার কারণে সেই সুযোগ এবং সময় কেউ পায়নি।’

তবে এই সীমাবদ্ধতা কাটিয়ে অনেকেই সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে একটিভ। এই রমজানে কেউ হয়তো আসরের পর মসজিদে আলোচনা করতেন, মুসল্লিদের সাওয়ালের জওয়াব দিতেন। তিনি এখন তার প্রশ্নোত্তর পর্বটি সারছেন ফেসবুক লাইভে। কেউ তারাবির আগে তুলে ধরতেন কুরআনের তাফসির; তিনি এখন তাফসির পর্বটি সম্পন্ন করছেন ইউটিউব কিংবা ফেসবুকে। যতটুকুই হচ্ছে, বিষয়টিকে ইতিবাচকভাবেই দেখছেন অধ্যাপক ড. আ ফ ম খালিদ হোসেন। তিনি জানালেন, ‘এই পরিস্থিতি তো সাময়িক। ঘরবন্দী সময়ে অনলাইনে ধর্মীয় দাওয়াত এবং কার্যক্রম ইতিবাচক হিসেবেই দেখছি। যদিও মসজিদের মিম্বরের খুতবায় যে গাম্ভীর্য থাকে, অনলাইন প্লাটফর্মে তা থাকে না।’

কেন তিনি একে ইতিবাচক হিসেবে দেখছেন, জানতে চাইলে তিনি বললেন, ‘মানুষ মসজিদে আসতে পারছে না। মাহফিল-জলসায় যেতে পারছে না। তার ওপর করোনা আতঙ্কে তারা এখন ভীত, আল্লাহমুখী। অখণ্ড অবসরের এই সময়ে যদি তাদের সামনে ধর্মীয় দাওয়াত এবং বক্তব্য তুলে ধরা যায়, তাহলে অল্প হলেও প্রভাব ফেলবে। তাই যতটুকু সম্ভব আমাদের উচিত মিম্বরের সাময়িক বিকল্প হিসেবে অনলাইন মাধ্যমকে গ্রহণ করা।’

অনলাইনে ধর্মীয় দাওয়াতের প্রভাব অস্বীকার করেননি ওয়াল আলীও। তিনি বলেছেন, ‘লকডাউনের আগে ধর্মীয় বক্তব্য শুনতে মানুষকে মসজিদ কিংবা নির্দিষ্ট কোথাও যেতে হতো। ফলে কখনও কখনও দেখা যেতো মসজিদে গিয়ে জায়গা পাচ্ছে না। অথবা কোনো কাজে ব্যস্ত থাকার কারণে শুনতে পারলো না জুমুআর খুতবা। কিন্তু এখন অনলাইনে প্রত্যেক ব্যক্তির কাছেই পৌঁছে যাচ্ছে দাওয়াত, বক্তব্য। মানুষ তার সময়মতো শুনে নিতে পারছে সবকিছু।’

অনলাইনে ধর্মীয় বক্তব্য শুনার একটি সুবিধার কথা উল্লেখ করেছেন  স্নাতক দ্বিতীয় বর্ষের ছাত্র নাদা সারহান। তিনি বলেন, ‘আগের চেয়ে আমি এখন ধর্মীয় লেকচার অনেক বেশি শুনি। কারণ, করোনা ভাইরাস আতঙ্কে আমি আমার নৈতিকতা এবং ধর্মীয় ভাবালুলতায় অনেক বেশি মনোযোগী হয়েছি। এটা ঠিক—ঘরে বসে একনিষ্ঠ মনোযোগ সবসময় দেয়া যায় না। লেকচার শুনছি, বিজ্ঞাপন আসছে। হয়তো দেখা গেলো ছোট ভাই এসে ডিস্টার্ব করছে। কখনো ঘরের কাজে ব্যস্ত থাকছি। কিন্তু অনলাইনের সবচে বড় সুবিধা হলো—নির্ধারিত সময়ে লেকচারটি শুনতে না পারলেও নিজের সময়মতো শুনে নেয়া যায়। তবে মসজিদে গিয়ে সবার সঙ্গে লেকচার শুনার সঙ্গে একাকী লেকচার শুনার কোন তুলনা হয় না।’