কাতার অবরোধের এক বছর, উপসাগরীয় বিরোধ কী ও কেন?

ইফতেখার জামিল 

১) উপসাগরীয় অঞ্চলে যে বিরোধ চলছে, তার এক বছর হয়ে গেলো।  তাতে সবাই একচেটিয়াভাবে কাতারকে সমর্থন করছে। করারই কথা। তবে, যদি মনে করা হয়, কাতার সৌদির মতো পশ্চিমাদের সাথে সম্পর্ক রাখেনা বা সুযোগ-সুবিধা দেয়না তাহলে ভুল হবে। বরং কাতারের মধ্যে পশ্চিমাভাব তুলনামূলক বেশী। কাতারের অধিকাংশ নেতৃত্ব পশ্চিমে শিক্ষা গ্রহণ করেছেন।তবুও কেন পশ্চিম কাতারকে সহ্য করতে পারছেনা এবং উপসাগরীয় রাষ্ট্রগুলো কাতারকে একঘরে করার চেষ্টা করছে? এ আলোচনায় আমরা তিনজন গবেষকের সাহায্য গ্রহণ করেছি। তারা হলেন মুখতার শানকিতি, মোহাম্মদ জাবরুন ও মু’তাজ আল খাতিব।

২) প্রধানত দুটি কারণে।অভ্যন্তরীণভাবে কাতার ইসলামপন্থাকে সমর্থন না করলেও স্বীকৃতি প্রদান করে এবং সমঝোতায় বিশ্বাস করে। অর্থাৎ কাতার ইসলামপন্থাকে ক্ষমতার ভাগ না দিলেও তাদেরকে চিন্তা চর্চার সুযোগ দেয় এবং তাদের চিন্তা যথাসম্ভব নিজেরা প্রতিনিধিত্ব করার চেষ্টা করে। কাতারের সাথে হামাস বা ইখওয়ানের সম্পর্ক ভালো হলেও কাতার নিজের দেশের জনগণের মধ্যে বিস্তারিত ইখওয়ানপন্থা প্রচারের সুযোগ দেয়নি। ইখওয়ানের কাতারি শাখাকে বিলুপ্ত করতে বাধ্য করেছে। একইভাবে কোন জিহাদি সংগঠনকে নিজের দেশে শক্তিশালী হয়ে উঠতে দেয়নি।তাহলে কাতারের সাথে ইসলামপন্থার সম্পর্কটা কেমন?

৩) কাতার মনে করে, ইসলামপন্থা একটা অসুস্থতা। উত্তর উপনিবেশি রাষ্ট্রে শাসকরা জনগণের প্রতিনিধিত্ব করেনি। ফলে, জনগণের প্রতিনিধিত্বকারী সংগঠনের প্রয়োজন হয়েছে। সেই সংগঠনকেই ইসলামপন্থা বলা হয়। যারা ক্ষমতা গ্রহণ করা ছাড়াই প্রতিনিধিত্ব করার চেষ্টা করে। এখানে একটা মারাত্মক সমস্যা দেখা যায়। রাষ্ট্র ইসলামপন্থার বিরোধিতা করতে বাধ্য হয়। ইসলামপন্থা নিরাপত্তা সমস্যার তৈরি করে। ফলে, একটা রাষ্ট্রীয় ও নিরাপত্তাগত অসুস্থতা তৈরি হয়।

তবে, ইসলামপন্থার চিন্তা-ক্ষমতা ও জনপ্রিয়তাকে কাতার কাজে লাগিয়েছে।কিছুটা বুদ্ধিজীবিতা ও পপুলিজমে রুপান্তরিত করতে পেরেছে।এভাবে কাতার ইসলামপন্থার অসুস্থতাকে শক্তিতে রুপান্তরিত করেছে। কাতারেও গণতন্ত্র বা শুরা নেই। সৌদিদের মতোই।তবে, কাতার সমর্থন বা রাজনৈতিক বৈধতার ভিত্তি সৌদির মতো তাআতু উলিল আমরকে বানায়নি বরং আধুনিক ইসলামপন্থার মতো রাষ্ট্রীয় স্বার্থ ও প্রতিনিধিত্বকে বানিয়েছে। অর্থাৎ বৈধতা ধর্মীয় নয়, মানবিক ও নাগরিক( সিভিল) ।

৪) মুশকিল হচ্ছে, কাতার নিজের দেশের ভেতরে যেভাবে ইসলামপন্থা ডিল করেছে,আঞ্চলিক ও আন্তর্জাতিক রাজনীতিতেও সেভাবেই ডিল করার চেষ্টা করেছে। এটা কাতারের ভালো জুয়া বা সবচে বড় ভুল। কাতার খুব ছোট দেশ, ভূগৌলিক অবস্থান দুর্বল, জনসংখ্যা অত্যন্ত কম, দক্ষ জনশক্তির বিপুল অভাব, আমেরিকা ও সৌদির কাছে বাধ্য, সামরিকভাবে দুর্বল।সবমিলে কাতারের প্রভাব বিস্তারের সুযোগ কম। তবুও, কাতার আঞ্চলিক ও আন্তর্জাতিক শক্তিগুলোকে সন্তুষ্ট রেখে প্রভাব বিস্তার চেষ্টা চালিয়ে যায়। তবে, ঠিক উল্টোভাবে।ইসলামপন্থীদের অর্থায়ন ও মিডিয়া সমর্থনের মাধ্যমে। ইসলামপন্থীদের ক্ষমতায় আনার চেষ্টা করে। অন্ততপক্ষে পাবলিকপ্লেসে ইসলামপন্থীদের শক্তিশালী করার মাধ্যমে। আরব বসন্ত শুরু হয়। মোটাদাগে আরব বসন্ত ক্ষমতা লাভে ব্যর্থ হয়। ফলে, দুঃখজনক হলেও সত্য যে, ইসলামপন্থা আবার অসুস্থতা বিস্তার শুরু করে। কাতার ফাদে পড়ে যায়।

ক্ষমতা ছাড়া ইসলামপন্থার বৈধতা নাই।কার্যকারিতা নাই। কাতারের পক্ষেও অর্থায়ন ও মিডিয়া-সমর্থন করে যাওয়া ছাড়া আর কোন পথ নাই। কাতার ইরান বা সৌদি না। তারা নিজেদের প্রকল্পে সরাসরি শরীক হতে পারেনা। অন্যদিকে উপসাগরীয় রাষ্ট্রগুলো ইসলামপন্থার ‘অসুস্থতা’ নিরসন করতে ব্যর্থ হয়ে কাতারের উপর চটে যায়। আঞ্চলিকভাবে কাতারের প্রভাবশালী হয়ে উঠা মানতে পারেনা ও পারিনি। সর্বশেষ ইয়ামানে সৌদি প্রকল্প অনেক বেশী আক্রান্ত হওয়া শুরু করলে পশ্চিমের চাপে ও ইমারাতের প্রস্তাবে দুই ইয়ামানের ( শিয়া ও সুন্নি) প্রস্তাব নিয়ে বিপুল বিতর্ক শুরু হয়। কাতার কোনভাবেই এই প্রস্তাবের পক্ষে ছিলোনা। সৌদি আরব দেখতে পায়, তার প্রকল্পের জন্য কাতারের তুলনায় মিসর ও ইমারাতের সাহায্য বেশী দরকারি। মিসরের আছে বিশাল সেনাবাহিনী। ইমারাতের আদর্শিক কোন উচ্চাকাঙ্ক্ষা বা প্রকল্প নাই। ফলাফল কাতারের সাথে সম্পর্ক বিচ্ছেদ।

৫) এর মীমাংসা হয়ে গেলেও দীর্ঘমেয়াদী বিরোধ থেকেই যাবে। আমরা অবশ্যই কাতারকে ভালো বলি। তবে নিছক ‘ভালো’ এর মাধ্যমে রাজনৈতিক বৈধতা চলেনা। বাস্তবতা তো নয়ই।

বিজ্ঞাপন
আগের সংবাদময়মনসিং হকার্স মার্কেটে আগুন, ৮ ইউনিট মাঠে (ভিডিও)
পরবর্তি সংবাদতুর্কি প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে জরিপে এগিয়ে এরদোগান