কারাগারের দিনলিপি

ইফতেখার জামিল:

ফিরে দেখা

দুই হাজার ষোল―ছয় নভেম্বর। প্রতিদিনের মতো কেরানীগঞ্জ কারা-লাইব্রেরিতে সময় কাটাচ্ছি―পত্রিকা পড়েছি সকালেই। পরে উপন্যাস ও মেশকাত শরীফের একাংশ। পত্রিকায় নতুন কিছু নেই। ট্র্যাম্প-হিলারির দ্বৈরথ, শেখ হাসিনা হাসিমুখে কয়েকজনের হাতে তুলে দিচ্ছেন পুরস্কার, বিএনপি সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে সমাবেশের অনুমতি চাইলেও পুলিশ বলছে তারা আবেদনের চিঠি পায়নি। সম্পাদকীয়তে সরকারকে দ্রব্যমূল্য নিয়ন্ত্রণে আনার আহ্বান জানানো হয়। কোনকিছুই নতুন নয়, এগুলোই তো ঘটে প্রতিদিন, তারিখ পাল্টে দিলেও কেউ ধরতে পারবে না কিছুই।

এখন পত্রিকা মনোযোগ দিয়ে পড়তে পারি না, ধৈর্যচ্যুতি ঘটে, কয়েকটা খবর দেখেই ক্লান্তি চলে আসে। জেলখানায় তিনমাসের মতো হয়ে গেল। সময় আর কাটতে চায় না ; মাঝেমাঝে কারা হাসপাতালে জানালার পাশে বসে মাওয়া সড়কের দিকে তাকিয়ে থাকি। সবকিছু স্বাভাবিক, গাড়ি চলছে নিয়মিত, কোনকিছুই থেমে নেই। শুধু আমাদের জীবনটাই চলছে না। মাওয়া রোডের ওপাশে গাছগাছালিতে ছেয়ে আছে, সবুজের আচ্ছাদনে আটকে যায় চোখ। যদিও এলাকাটা আমার পরিচিত, গাছগাছালির ওপাশে বাঘাইর, শুভাড্ডা, ক্রমশ জিঞ্জিরা। জিঞ্জিরা থেকে নদী পার হলেই আমাদের বাসা। দূরত্ব বড়জোর পাঁচ-সাত কিলোমিটার।

বাঘাইর-শুভাড্ডার মাঝামাঝি ঝিলঝিল, সরকারি আবাসিক প্রকল্প। এখনো নির্মাণ কাজ শেষ হয়নি। আমি মাঝেমাঝেই এখানে ঘুরতে আসি। চারদিকে কাশফুল, পিচঢালা রোড ; অনেকটা উত্তরা দিয়াবাড়ির মতো বা তারচেয়েও সুন্দর। শুক্রবার ছাড়া সাধারণত এখানে কেউ আসে না। অবশ্য বিকেলে কেউ কেউ খেলতে আসে, কেউ বাইক বা সাইকেল চালায়। জায়গাটা ভীষণ নির্জন, তাই আমার খুব পছন্দ। পনের মিনিট হাঁটলেই পথ আটকে দাড়িয়ে আছে বিশাল খাল। এখন অবশ্য সেখানে ব্রিজ বানানোর কাজ চলছে। বর্ষা ছাড়া পানি জমে না, একটু কসরত করলেই খালের ওপারে চলে যাওয়া যায়। সেখানে শ্রমিক-ইঞ্জিনিয়ারদের অস্থায়ী বাসাবাড়ি ; হাঁটতে থাকলে বাঘাইর গ্রামের সীমানায় ঢুকে যাবেন।

লাইব্রেরীতে আসার আগে প্রতিদিন ঘণ্টাখানিক হাঁটি। হাঁটাহাঁটিই ক্লান্তি প্রশমনের একমাত্র উপায়। হাঁটতে হাঁটতে নিজের সাথে নিজের বোঝাপড়া সেরে নেই ; যত প্রশ্ন-জিজ্ঞাসা-স্বপ্ন, নির্বাচিত প্রশ্ন-কল্পনা টুকে রাখি নোটবুকে। সারাদিন মাথায় আর দুশ্চিন্তা ভর করতে দেই না। তুলে রাখি আগামীকালের জন্য। জেলখানার চারপাশে জলাশয়, ধলেশ্বরী নদীর একটি শাখা এখানে এসে মিশেছে। বকুল সেলের বারান্দা থেকে জলাধারটা দেখা যায়। এখন হেমন্ত ঋতু চললেও রাতে প্রচণ্ড ঠাণ্ডা নামে। সকালে কুয়াশায় ছেয়ে থাকে চারদিক।

দুপুরের আগে লাইব্রেরি চত্বরে বসে আবদুল হক ভাইয়ের সাথে কাব্যরস ও জীবনানন্দ দাশ বিষয়ে ‘জটিল’ আলাপ করছিলাম―আবদুল হক ভাইয়ের মতো তুখোড় মেধাবী মানুষটার স্মৃতি লোপ পাচ্ছিল, আবার তিনি একটু শুষ্ক-কঠোর প্রকৃতির―আমি উচ্ছল-চঞ্চল ; আলাপ জমছিল না। হেমন্তের মায়াবী দুপুর, চত্বরে বেশ কয়েকটি শিউলি গাছ―গ্রামীণ লিলুয়া বাতাস। আমার লাইব্রেরি কার্ড ছিল, লাইব্রেরি কেন্দ্রিক ঘুষ দিতে একটুও দ্বিধা করিনি, ভাগ্যও ছিল সহায়―সবমিলিয়ে লাইব্রেরি-কেন্দ্রিক সব সুবিধাই আমি ভোগ করতাম। কার্ড দেখিয়ে পুরো জেলখানাতেই ঘুরতাম। দুই লাইব্রেরিয়ান, তিন কয়েদি মেট―সবাইকে এখনো মনে পড়ে, তাদের প্রতি কৃতজ্ঞতা।

কয়েদিরা জেলখানায় বিভিন্ন দায়িত্ব পালন করে―লাইব্রেরির মূল দায়িত্বে ছিলেন কামরুল ভাই। কথা জড়তাগ্রস্থ, স্ট্রোকের কারণে মুখ বেঁকে গেছে, পারিবারিক ষড়যন্ত্রমূলক মামলায় বছর পনের ধরে জেলে। সাজা বাকি আছে আরও মাসখানেক, পরিবারের সদস্যরা ক্ষমা ও মীমাংসার জন্য এসেছিল―আমি বলতাম, ভাই একদম ক্ষমা করবেন না ; কামরুল ভাই শূন্যের দিকে তাকিয়ে অদ্ভুতভাবে হাসতেন, কী ভাবতেন জানি না―মানুষটার কথা ভাবলেই মায়া লাগে অনেক। সারাদিন লাইব্রেরীর কাজে ব্যস্ত থাকতেন। জেলখানায় সবাইকেই ব্যস্ত থাকতে হয়, কেউ কার্ড খেলে ব্যস্ত থাকে, কেউ করে সারাদিন পায়চারি। ব্যস্ততা না থাকলে মাথায় দুশ্চিন্তা এসে ভর করে, ক্লান্তি নিয়ন্ত্রণ করতে না পারলে অনেকেই হারায় মানসিক সুস্থতা।

আবদুল হক ভাইয়ের সাথে খাপছাড়া আড্ডা শেষ করে আবার লাইব্রেরী-ভবনের দিকে পা বাড়ালাম। আমার চোখের সামনে কামরুল ভাই ভূপাতিত হয়ে পড়ে যাচ্ছিলেন―কাটা গাছ যেন ঠিক ; পড়েই মুখ থেকে রক্ত বের হতে লাগলো, মৃগী রোগীর মতো কোঁকাতে লাগলেন। পাশেই দাড়িয়ে ছিলেন লাইব্রেরিয়ান―আমি দৌড়ে গেলাম কারা-মেডিকেলে, স্ট্রেচার আনতে। জেলখানা গেটেও যেতে হবে, যতদ্রুত সম্ভব হাসপাতালে নিতে হবে। আমি ভাবছি আর ভাবছি। বাকি মাত্র দেড় মাস, হারিয়ে যাওয়া পনের বছর সময়― কামরুল ভাই ভূপাতিত হচ্ছেন আরও অতল গহ্বরে―মুখ থেকে গলগল করে রক্ত বের হয়ে আসছে, বঞ্চিত মানুষটা কি জীবনের কাছে হেরে যাচ্ছেন?

কারা-ফটকে সংবাদ জানিয়ে ফিরছিলাম। ইতিমধ্যে এক কারারক্ষী ডাক দিয়ে বলল, আপনার নাম ইফতেখার জামিল? আপনার জামিন হয়ে গেছে। যদিও আনুষ্ঠানিকতায় আরও কয়েকদিন লেগে যাবে ; তবু, পরীক্ষা শেষে ছুটির মতো, মূল দুশ্চিন্তা উবে গেছে ; আলহামদুলিল্লাহ। কামরুল ভাইকে ধরাধরি করে কারা-মেডিকেলে নিয়ে যাওয়া হচ্ছিল। আমার মনে ছিল সবিশেষ আনন্দ, বেদনাও ছিল, কামরুল ভাইয়ের ভূপাতিত হবার স্মৃতি আমি এখনো ভুলতে পারি না―আর মাত্র দেড়টা মাস।

অল্প বয়সে এমন কঠিন অভিজ্ঞতা―তিন মাসের জেলজীবন আমাকে অনেককিছু শিখিয়েছে। শিখিয়েছে ধৈর্য, চিন্তাক্ষমতা ও মনোযোগ । লাইব্রেরিয়ানের সাথে আমি কারাসংস্কারের কথা বলতাম। সবাই যাতে শিক্ষা পায়―যাতে ব্যস্ততায় কাটে অভিশপ্ত অবসর। কলেজের প্রফেসরের প্রস্তাব ছিল কারাগার ঢেকে যাবে গাছে গাছে ; বন্দীরা অন্তত থাকুক প্রশান্তিতে, শ্বাস-নিঃশ্বাসে বেরিয়ে আসুক বঞ্চনা। আমি ভাবতাম, সবার হাতে বই যাক, তিনগোয়েন্দা, প্রাথমিক ধর্মশিক্ষা। আর মাঝেমাঝে ইসলাহি ওয়াজ মাহফিল। বন্দীরা কাঁদুক, আশ্রয় নিক আল্লাহর কাছে ―মহামহিমের কাছে বলুক অসহায়ত্ব, বঞ্চনা―পাপের ক্ষমা চাক সম্মিলিতভাবে। এছাড়া তাদের মানসিক সমস্যা সমাধানের কোন উপায় নাই―বিস্মৃতি, পাগলামি, ক্রোধ ও আত্মঘাতী চিন্তা : আমাদের রাষ্ট্র কি বুঝে বন্দীদের যন্ত্রণা―মাননীয় রাষ্ট্রব্যবস্থা, আপনি কি জানেন, মানসিকভাবে পঙ্গু-প্রতিবন্ধী বানিয়ে দেওয়া অনেক বড় অপরাধ?

জেলখানা খারাপ জায়গা―আধুনিক স্লেভারি ; দেখুন সেখানে আপনি পরিপূর্ণ মানুষ নন―চৌদ্দ শিকের খাঁচায় বন্দী স্বাধীনতা। যুদ্ধে যেমন মানবতা চেনা যায়, খারাপেই জানা যায় ভালোর মূল্যায়ন―দীর্ঘদিনের কয়েদিরা বিস্মৃতি-পাগলামিতে ভুগতে থাকে। অদ্ভুত তাদের হাসি-ঠাট্টা, সংবেদনশীলতা। রাতেরবেলা মাঝে মাঝে গানের আসর বসে। আমাদের ওয়ার্ডে ধর্ষক পাগলা-লাদেন গলা চড়িয়ে গান গায়―বন্দীরা থালা বাজিয়ে মাথা দোলাতে দোলাতে করে কোরাস।

লাদেনের বাবা শেরপুর জামায়াতের রোকন। কুড়িলে তার ছোট সেলুনের দোকান। দুর্ঘটনার দিন এলাকার হাজি সাহেবের সাথে মাহফিলে যায় লাদেন, মাহফিল থেকে ফিরে সেই হাজি সাহেবের ছেলের সহযোগে ভাসমান এক নারীকে দোকানে ঢুকিয়ে নামিয়ে দেয় শাটার। সকাল দশটার মধ্যে এলাকা ঘিরে ফেলে পুলিশ, ঘণ্টাখানেকের মধ্যেই লাদেন ও তার সহযোগী ধর্ষণের মামলায় গ্রেফতার হয়ে যায়। লাদেনের সাক্ষাৎ এসেছিল কয়েকদিন আগে―ষোড়শী কন্যার সামনে ধর্ষক পিতা দাড়াতে পারেনি, হাওমাউ করে কেঁদেছে দুজনেই। সেই থেকে লাদেনের মাথা গেছে আরও বিগড়ে, কখনো হঠাৎ কেঁদে উঠে, কখনো ফেটে পড়ে অট্টহাসিতে―তবু সে সবটুকু আবেগ ঢেলে গায় উকিল মুনশির গান,

‘আমার গায়ে যত দুঃখ সয়
বন্ধুয়ারে করো তোমার মনে যাহা লয়
বন্ধুয়ারে করো তোমার মনে যাহা লয় ..’

‘পলাইবা কই যাইয়ারে মানুষ পলাইবা কই যাইয়া,
আজরাইল আসিয়া যখন বান্ধিবে কশিয়া রে
জগত-স্বামীর ঘরে যাইতে হবে রে,
ও মানুষ
জগত-স্বামীর ঘরে যাইতে হবে রে।।’

গান থেমে গেলে সবাই ঝিম মেরে বসে থাকে। হাঁটুতে মুখ ঢেকে ফুপিয়ে কান্না করতে থাকে লাদেন। সবাই ওয়ার্ড-মেট বাবু ভাইকে গান গাইতে বলে। বাবু ভাই ছাদের দিকে তাকিয়ে গান গাইতে অস্বীকার করেন। জেলখানায় থাকতে আমি শুরুতে খাতা পাইনি। শুধু ছিল কলম―হলিউড ব্র্যান্ডের সিগরেটের খোলে লেখতাম দিনলিপি, জেলকথা ; ত্রিশপর্ব লেখেছিলাম। ওয়ার্ডের সবাই সিগরেট খেয়ে আমাকে কাগজ দিয়ে যেত, ‘জামিল ভাই, এই যে খোলটা নিতে পারেন।’ দিনলিপিতে অনেক কথাই আছে, কারাস্মৃতিতে সেসবকিছু তুলে ধরতে চাই। আমি চাই তরুণ তালিবে ইলমের মাদরাসায়ে ইউসুফে ইলমি সফরের স্মৃতিগুলো জানুক সবাই।

বিজ্ঞাপন