কাশ্মীরের রবিনহুড বুরহান ওয়ানী

হামমাদ রাগিব

ভারতের জবর দখলে থাকা জম্মু-কাশ্মীরের পুলওয়ামা জেলার অন্তর্গত পাহাড়ঘেঁষা ট্রাল শহরে ১৯৯৪ খ্রিষ্টাব্দে জন্ম অকুতোভয় এই তরুণ সংগ্রামীর। বাবা স্থানীয় একটি স্কুলে শিক্ষকতা করেন, মুজাফফর ওয়ানী। মা মায়মুনা মুজাফফর বিজ্ঞানে স্নাতকোত্তর, গৃহিণী।

জন্মের পর থেকে বুরহান ওয়ানী দেখে আসছেন ভারতীয় দখলদার বাহিনীর নির্মম নিপীড়ন আর নৃশংসতা। পান থেকে চুন খসলে কার্ফু জারি পুরো শহরে, বেরোনো যাবে না। স্থানে স্থানে চেক করা হবে। আর একটু সন্দেহ হলে ক্রসফায়ার।

ছেলেবেলায় খেলাধুলায় খুব আগ্রহী ছিলেন বুরহান, ছিলেন বড্ড জেদিও। চোখের সামনে অন্যায় সহ্য করতে পারতেন না, তাঁর প্রতিবাদী সত্ত্বা জেগে উঠত হইহই করে।

২০০০ খ্রিষ্টাব্দের কথা। বাড়ির পাশে একদিন বুরহান ওয়ানী খেলছিলেন বড়ভাই খালিদ ওয়ানীকে নিয়ে। ৬-৭ বছরের নিতান্ত স্বল্প বয়েসি শিশু তখন দুইভাই। এরই মধ্যে ভারতীয় দখলদার সৈন্যদের আগমন। এখানে খেলা যাবে না—সৈন্যরা হুকুমের সুরে জানাল দুই সহোদরকে। নিজেদের বাড়ির আঙিনায় খেলা করছি, সৈন্যরা এখানে হুকুম দেবার কে? দুই ভাই বচসায় জড়িয়ে পড়লেন সেনাসদস্যদের সঙ্গে। পরিণতি যা হবার, তাই হলো। নির্দয় সৈন্যরা বেধড়ক পেটালো শিশু দুই ভাইকে। খালিদ অপেক্ষাকৃত বড় হওয়ায় সৈন্যদের পিটুনির ধকলটা তাঁর ওপর দিয়ে গেল বেশি মাত্রায়।

খালিদ ব্যথায় কুঁকড়ালেও সেদিন বাড়ি ফিরে বুরহান ওয়ানী রাগ এবং ক্ষোভে গজগজ করছিলেন। সেদিনই শপথ নিয়েছিলেন, এ জুলুমের প্রতিশোধ নিতে হবে। ছয় বছরের শিশু বাচ্চা, কিন্তু তাঁর জেদ, ক্রোধ আর প্রতিশোধের স্পৃহা তখনই ছিল একজন সংগ্রামীর মতো।

শৈশবের বাকি দিনগুলোতে তিনি আর ভুলতে পারলেন না সৈন্যদের সেই অত্যাচার। নিজের পিটুনীটা যতটা না তাঁর মনে পড়ে, তারচেয়ে বেশি চোখে ভাসে বড়ভাই খালিদকে পেটানোর দৃশ্য। খালিদের যন্ত্রণাকাতর আর্তনাদ তাঁকে তাড়িয়ে বেড়ায় প্রতিদিন।

শৈশব পেরিয়ে কৈশোরে পড়লেন বুরহান ওয়ানী। স্কুলে পড়াশোনা করছেন ঠিকটাক, কিন্তু ভেতরে পোষছেন প্রতিশোধের আগুন। মুসলিম ভূখণ্ড থেকে তাড়াতে হবে দখলদার হিন্দু বাহিনীকে। ততদিনে তিনি আরও অনেক কিছু বুঝতে শিখেছেন, ভাই ও নিজের সঙ্গে ঘটে যাওয়া জুলুমের প্রতিশোধের সঙ্গে এখন তাঁর চিন্তায় যুক্ত হয়েছে কাশ্মীরের প্রতিটা মজলুম মুসলমানের আর্তনাদ। যুক্ত হয়েছে ৮৯ খ্রিষ্টাব্দের ইন্তিফাদা থেকে এ অবধি যাঁরা রক্ত দিয়েছেন, তাঁদের তাজা খুনের প্রতিশোধ আর কাশ্মীরের আজাদির স্বপ্ন। ভারতীয় জুলুমবাজ বাহিনীকে তাড়িয়ে স্বাধীনতার পতাকা ওড়াতে হবে ভূস্বর্গখ্যাত এই ভূমিতে।

ঝিলিম নদীর রক্তাক্ত পানি আর বারোমোল্লায় সমাহিত নাম না জানা হাজারও লাশের কবর বুরহান ওয়ানীকে ঘুমোতে দেয় না। তাঁর কৈশোরের দিনগুলো বাহ্যত খুব শান্ত-সমাহিতভাবে কাটলেও ভেতরে ভেতরে তিনি পোষতে থাকেন দ্রোহের আগুন। ততদিনে মেট্রিকোলেশন পরীক্ষা শেষ করে স্কুলে ভালো ফলাফল করেছেন। কৈশোরের চাঞ্চল্য পেরিয়ে পা দিয়েছেন তারুণ্যে।

২০১০-এর ৫ অক্টোবর। মা-বাবা আত্মীয়-স্বজন সকলে খুঁজে হয়রান, বুরহান ওয়ানীকে পাওয়া যাচ্ছে না। স্কুলমাস্টার বাবা কয়েকদিন পর নিশ্চিত হলেন, ছেলে তাঁর নাম লিখিয়েছে মুজাহিদ বাহিনীতে। পিতৃসুলভ দুশ্চিন্তা না ঘুছলেও এখবরে আনন্দিতই হলেন মুজাফফর ওয়ানী। আনন্দিত হলেন মা মায়মুনা মুজাফফরও। অর্ধ শতাব্দীর এ জুলুম আর নির্যাতনের মুকাবেলায় তাঁদের পুত্র নাম লিখিয়েছে, এ তো গর্বের বিষয়।

এর কয়েকদিনের ভেতর আবারও নিখোঁজের সংবাদ ওয়ানী পরিবারে। বুরহানের বড়ভাই খালিদও নাম লিখিয়েছেন মুজাহিদদের তালিকায়।

ভারতীয় বাহিনীর নজর পড়ে এবার ওয়ানী পরিবারের দিকে। মুজাফফর ওয়ানীকে জিজ্ঞাসাবাদ করা হয়, তিনি সাফ বলে দেন, ছেলেরা কোথায় আছে, কীভাবে আছে তিনি জানেন না। ভারতীয় দখলদাররা কড়া নজরদারিতে রাখে মুজাফফর ওয়ানীর বাড়িকে।

বাড়ি থেকে পালিয়ে যাবার কয়েকমাসের মাথায় বুরহান ওয়ানী ত্রাস হয়ে আভির্ভূত হন ভারতীয় দখলদারদের কাছে। দক্ষিণ কাশ্মীরের ত্রাল অঞ্চলের গভীর জঙ্গলে মাত্র ১৭ জন মুজাহিদকে নিয়ে বুরহান ওয়ানী গড়ে তোলেন দুধর্ষ এক গেরিলা বাহিনী। অল্পদিনের ভেতর তাঁর এ বাহিনীতে যোগ দিতে থাকেন আরও অসংখ্য স্বাধীনতাকামী কাশ্মীরি তরুণ।

১৯৮৯ সালে জেগে ওঠা কাশ্মীরিদের স্বাধীনতা-সংগ্রামের ধারাবাহিকতায় ভারতীয় হানাদারদের নানামাত্রিক জুলুম ও নির্যাতনে যে একটা ঝিমিয়ে পড়া ভাব ছিল, তরুণ বুরহান ওয়ানীর গেরিলা বাহিনী সেটাকে আবারও চাঙ্গা করে তোলে।

২০১৪ সালে বুরহান ওয়ানীর বড়ভাই খালিদ ভারতীয় বাহিনীর সঙ্গে এক সংঘর্ষে শাহাদত বরণ করেন। ভাইয়ের প্রতি অতুল শ্রদ্ধা আর ভালোবাসা ছিল বুরহানের, কিন্তু তাঁর শাহাদাতে বুরহান ভেঙে পড়েননি, নতুনভাবে যেন আরও বিপুল উৎসাহ আর ক্রোধ নিয়ে জ্বলে ওঠেন।

এখানেই চিরনিদ্রায় শুয়ে আছেন কাশ্মীরিদের সংগ্রামের প্রতীক শহিদ বুরহান ওয়ানী

কাশ্মীরের স্বাধীনতাকামী সংগ্রামী থেকে নিয়ে সাধারণ তরুণ, সকলের কাছে বুরহান ওয়ানী হয়ে ওঠেন প্রেরণার প্রতীক। যেন কাশ্মীরিদের রবিনহুড তিনি। এদিকে ভারতীয় সেনাবাহিনী ও গণমাধ্যম বুরহানকে মোস্ট ওয়ান্টেড ‘সন্ত্রাসী’ হিসেবে আখ্যা দেয়।

কদিন পরপর অল্পসংখ্যক মুজাহিদ নিয়ে ভারতীয় বাহিনীর চৌকিগুলোতে আক্রমণ চালান বুরহান। কাশ্মীরের দক্ষিণাঞ্চলে ভারতীয় বাহিনীর কাছে বুরহান ওয়ানী হয়ে উঠেছিলেন ভয়ানক এক আতঙ্কের নাম।

বুরহানকে ‘শেষ’ করে দিতে ভারতীয় বাহিনী তখন মরিয়া। যেকোনো মূল্যে এ আতঙ্ককে ‘দূর’ করতে হবে। কিন্তু দুর্ধর্ষ এ সংগ্রামী কোথায় থাকেন, কীভাবে কর্মপরিকল্পনা সাজান, কিছুই জানত না তারা। ২০১০ সালে সেই যে তিনি বাড়ি ছেড়েছিলেন, আর কখনো বাড়িমুখো হননি। ভারতীয় বাহিনী তাঁর বাড়ি ফেরার আশায় সার্বক্ষণিক কড়া নজরদারির ব্যবস্থা রেখেছিল বাড়িতে।

ছয় বছর ধরে হণ্যে হয়ে ওয়ানীকে খুঁজতে থাকে ভারতীয় বাহিনী। অবশেষে ২০১৬ সালের ৮ তারিখে তারা তাদের এ অভিযানে ‘সফল’ হয়। জম্মু-কাশ্মীরের অনন্তনাগ এলাকার জঙ্গলে সেদিন অবস্থান করছিলেন বুরহান ওয়ানী। ভারতীয় বাহিনীর স্পেশাল একটি ফোর্স পুরো জঙ্গল ঘিরে ফেলে। বুরহান ওয়ানীর সঙ্গে তখন অল্প কয়েকজন মুজাহিদ। আত্মসমর্পণের তো প্রশ্নই আসে না, বুরহান ওয়ানী মুকাবেলায় নামলেন ভারি অস্ত্রসস্ত্রে সজ্জিত বিশাল বাহিনীর সাথে। এ মুকাবেলার স্থায়িত্ব যদিও চারমিনিট ছিল, কিন্তু বুরহান ওয়ানী বীরত্বের সঙ্গে লড়াই করে পান করে নিলেন শাহাদাতের অমীয় সুধা।

বুরহান ওয়ানীকে কতটা ভালোবাসত কাশ্মীরের মুসলমান, তাঁর শাহাদাতের পর বিশ্ব আশ্চর্য হয়ে দেখেছে এর নমুনা। বুরহান ওয়ানীর শাহাদাতের খবর ছড়িয়ে পড়লে উত্তপ্ত হয়ে ওঠে তামাম কাশ্মীর। অর্ধ লক্ষেরও বেশি সাধারণ মানুষ বুরহান ওয়ানীর লাশ কাঁধে নিয়ে নেমে আসে রাস্তায়। পরবর্তী মাস খানেক উত্তপ্ত হয়ে থাকে কাশ্মীরের পরিস্থিতি। শাহাদত বরণ করেন আরও অর্ধশতাধিক স্বাধীনতাকামী।

বুরহান ওয়ানী যখন শাহাদত বরণ করেন, তাঁর বয়স ছিল মাত্র ২২। কিন্তু এই ২২ বছর বয়সেই তিনি হয়ে উঠেছিলেন কাশ্মীরের স্বাধীনতা সংগ্রামের অন্যতম কমান্ডার। তাঁর ইন্তেকালের মধ্য দিয়ে নতুন এক প্রেরণা ও প্রতিশোধের জযবা তৈরি হয় কাশ্মীরে। স্বাধীনতাকামী কাশ্মীরি তরুণরা তাঁর শাহাদাতের রক্তপিচ্ছিল পথ মাড়িয়ে কাশ্মীরের আকাশে স্বাধীনতার পতাকা ওড়ানোর স্বপ্ন দেখে। স্বপ্ন দেখে প্রত্যেকেই একেকজন বুরহান ওয়ানী হয়ে উঠবার।

বুরহান ওয়ানীর তৃতীয় শাহাদাতবার্ষিকীতে তাঁর প্রতি অফুরান শ্রদ্ধা এবং সালাম।

তথ্যসূত্র : আল-জাজিরা, আনন্দবাজার পত্রিকা, ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেস