কুমিল্লায় ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানের সন্ধানে

মুনশী নাঈম:

কুমিল্লা জেলায় কতটি কওমি মাদরাসা আছে, তার সুনির্দিষ্ট হিসেব নেই। কুমিল্লার মাদরাসায়ে আশরাফিয়ার প্রতিষ্ঠাতা পরিচালক হাফেজ মাওলানা মুফতী শামছুল ইসলাম জিলানী বলেন, ‘কুমিল্লায় ১৭টি থানা আছে। আমাদের তালিকা অনুযায়ী, প্রত্যেকটি থানাতে ৬০, ৭০টি মাদরাসা আছে। কোনোটিতে একশর বেশি মাদরাসা আছে। আমাদের তালিকার পর আরও কিছু মাদরাসা প্রতিষ্ঠিত হয়েছে।’

কুমিল্লা জেলায় কওমি মাদরাসাগুলো বেফাকুল মাদারিসিল আরাবিয়া বাংলাদেশের অধীনে পরীক্ষায় অংশগ্রহণ করে। জেলার প্রায় প্রতিটি কওমি মাদরাসা বেফাকের অন্তর্ভুক্ত। ‘কুমিল্লা জেলা কওমি মাদরাসা সংগঠন’ এর অধীনে কিছু মাদরাসা পরীক্ষায় অংশ নেয়। চান্দিনা থানাতেও এদের শাখা আছে। এছাড়া ‘আল ইত্তেফাক’ বোর্ডের অধীনে পরীক্ষায় অংশ নেয় হোমনা থানার মাদারাসাগুলো। বোর্ডটির পরীক্ষায় মূলত হোমনা এবং বাঞ্চারামপুরের মাদারাসাগুলো অংশ নেয়।

কয়েকটি প্রাচীন মাদরাসা

এ জেলায় কওমি মাদরাসার ইতিহাসটি প্রাচীন। এখানে শতবর্ষী মাদরাসাও রয়েছে। নিচে কয়েকটি প্রাচীন মাদরাসার নাম তুলে ধরা হলো।

১. জামিয়া ইসলামিয়া মুজাফ্ফারুল উলুম মাদরাসা ও এতিমখানা: মাদরাসার বর্তমান মুহতামিম মুফতি আমজাদ হোসাইন। গত বছর মাদরাসার ১২৮তম ইসলামি মহা সম্মেলন অনুষ্ঠিত হয়েছে। সে হিসেবে মাদরাসার বয়স ১২৮ বছরের বেশি।

২. আল জামিয়াতুল ইসলামিয়া দারুল উলূম বরুড়া মাদরাসা: মাদরাসার বর্তমান মুহতামিম আল্লামা নোমান আহমদ। গত বছর মাদরাসাটির ১১৩ তম বার্ষিক ওয়াজ মাহফিল অনুষ্ঠিত হয়েছে। সে হিসেবে মাদরাসার বয়স ১১৩ বছরের বেশি।

৩. জামিয়া ইসলামিয়া আতিকিয়া বায়নগর: দাউদকান্দির বায়নগরে ১৯৪৬ সালে মাদরাসাটি প্রতিষ্ঠিত হয়। এর প্রতিষ্ঠাতা মাওলানা আতিকুর রহমান সাহেব। প্রতিষ্ঠাকালিন মুহতামিমও তিনি। মাদরাসায় দাওরায়ে হাদিসের হাদিসের দরস শুরু হয়েছে ২০১৮ ইংরেজি শিক্ষাবর্ষে।

৪. জামিয়া আরাবিয়া ইসলামিয়া এমদাদুল উলুম: কুমিল্লা জেলার হোমনা থানার রহমতপুর গ্রামে ১৯৪৮ সনে মারাসাটি প্রতিষ্ঠা করেন আল্লামা আব্দুল উহহাব পীরজী হুজুর রহ.। এর প্রতিষ্ঠাকালিন মুহতামিম আল্লামা আব্দুল জাব্বার রহ.। এখানে ১৯৯৮ সালে দাওরায়ে হাদিস খোলা হয়।

৫. জামিয়া আরাবিয়া কাসেমুল উলূম কুমিল্লা: ১৯৫১ সালে মাদরাসাটি প্রতিষ্ঠা করেন আল্লামা জাফর আহমাদ রহ:।

৬. জামিয়া ইসলামিয়া দারুল উলুম (মাদ্রাসা ও এতিমখানা) স্বল্প পেন্নাই, গৌরীপুর, দাউদকান্দি, কুমিল্লা। চট্টগ্রাম হাইওয়েসংলগ্ন ঐতিহ্যবাহী কুমিল্লা জেলার দাউদকান্দি থানার অন্তর্গত গৌরীপুরে স্বল্প পেন্নাই ( দিঘিরপাড় ) গ্রামে ১ একর ১১ শতাংশ ভূমির উপর মাদ্রাসাটি ১৯৬০ইং সালে প্রতিষ্ঠিত হয়। প্রতিষ্ঠাতা মরহুম শমসের আলী ভূইয়া, আ. জলিল ভূইয়া সহ এলাকাবাসী। প্রতিষ্ঠাকালিন মুহতামিম মাঃ শিহাব উদ্দিন সাহেব।

সরকারি তথ্যমতে, কুমিল্লায় দাখিল মাদ্রাসা রয়েছে ২৩০ টি, আলিম মাদ্রাসা ৭৬ টি, ফাজিল মাদ্রাসা ৬২ টি, কামিল মাদ্রাসা ১১ টি। স্বতন্ত্র ইবতেদায়ী মাদরাসা রয়েছে ৫৬ টি।

কুমিল্লার দুজন কৃতি সন্তান

আল্লামা আশরাফ আলী রহ.

১৯৪০ সালের ১ মার্চ কুমিল্লা জেলার সদর দক্ষিণ উপজেলার রামচন্দ্রপুর গ্রামে এক সম্ভ্রান্ত পরিবারে জন্ম গ্রহণ করেন তিনি। তার পিতার নাম আলহাজ্ব মাওলানা মুফিজুদ্দীন রহ.। শিক্ষার সূচনা পারিবারিক পরিবেশে। প্রাথমিক শিক্ষা পারিবারিকভাবে শেষ করে এলাকার প্রাচীন শিক্ষালয় মাযহারুল উরুম যশপুরে ভর্তি হন। এখানে ৫ বছর লেখা পড়া করে চলে যান কুমিল্লা শহরের ঐতিহ্যবাহী মাদরাসা কাসেমুল উলুমে। সেখানে ২ বছর লেখা পড়া করেন। এরপর ঢাকার অন্যতম বিদ্যাপিঠ হোসাইনিয়া আশরাফুল উলুম বড় কাটারায় ভর্তি হন। এখানেই দাওরায়ে হাদীস সম্পন্ন করেন। উচ্চস্তর হাদীস গবেষনণা এবং ইলমে কুরআনের উপর অধিকতর ব্যুৎপত্তি অর্জনের লক্ষ্যে সেকালের শ্রেষ্ঠতম হাদীস বিশারদ আল্লামা রাসূল খান রহ. এবং আল্লামা ইদ্রীস কান্ধলভী রহ. এর দরসগাহ জামিআ আশরাফিয়া লাহোর পাকিস্তানে চলে যান। সেখানে ধারাবাহিক দুই বছর অধ্যাপনা করেন।

কিশোরগঞ্জের জামিআ এমদাদিয়া মাদরাসায় শিক্ষকতার মাধ্যমে কর্ম জীবন শুরু করেন। সেখানে তিনি মুসলিম শরীফের প্রথম খন্ডের দরস দেন। এখানে তিনি ৯ বছর শিক্ষকতা করেন। এরপর চলে আসেন ঢাকার ফরিদাবাদ মাদরাসায়। এখানে তিনি ৮ বছর শায়খে সানী ও নাযেমে তালিমাতের দায়িত্ব পালন করেন। তিনি বড় কাটারা মাদরাসায়ও শিক্ষকতা করেন এবং তিরমিজী শরীফের দারস প্রদান করেন। আল্লামা আশরাফ আলী তার মায়ের কথায় কুমিল্লা জামিআ কাসেমুল উলুমে চলে আসেন। সেই থেকে মৃত্যু পর্যন্ত জামিআর শায়খুল হাদীস ও সদরুল মুদাররিসীনের দায়িত্ব পালন করেন। ২০১৩ সাল থেকে তিনি ঢাকার মালিবাগ মাদরাসায় হাদীসের দারস দিয়েছেন এবং মুহতামি হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। ঢাকা মতিঝিল এজিবি কলোনীর খতীব ছিলেন দীর্ঘ কয়েক বছর। নিজ এলাকায় জামআি এমদাদিয়া নামে একটি প্রতিষ্ঠান প্রতিষ্ঠা করেন। এছাড়া জামিআ রাহমানিয়া আরাবিয়া ঢাকা, জামিআ ইসলামিয়া আরাবিয়া লালমাটিয়া, দারুল উলুম মিরপুর-৬, জামিয়া ইসলামিয়া বায়তুল ফালাহ ঢাকা, বনানী টি এন্ড টি মাদরাসা ও মিরপুর দারুস সালামসহ দেশের বিভিন্ন মাদরাসায় তিনি বোখারী শরীফের দারস দান করেন। পাশাপাশি তিনি অনেক মাদরাসার মজলিসে শূরার সভাপতি ও সদস্য হিসেবে বহু খেদমত আঞ্জাম দিয়েছেন। তিনি বাংলাদেশ কওমী মাদরাসা শিক্ষা বোর্ড (বেফাক) এর সিনিয়র সহ-সভাপতি, আল হাইয়াতুল উলয়া এর কো চেয়ারম্যানের দায়িত্ব পালন করেন।

কাসেমুল উলুম মাদরাসায় পড়াকালীন সময়ে তিনি আল্লামা আতহার আলী রহ. ডাকে সাড়া দিয়ে নেজামে ইসলাম পার্টির কর্মী হিসেবে কাজ করেন। কর্মজীবনের শুরুতে তিনি নেজাম ইসলাম পার্টির কিশোরগঞ্জ জেলার সাধারণ সম্পাদকের দায়িত্ব গ্রহণের মাধ্যমে জাতীয় রাজনীতির সঙ্গে জড়িয়ে পড়েন। দেশ স্বাধীন হওয়ার পর তিনি নেজামে ইসলাম পার্টিকে সুসংগঠিত করেন ও কেন্দ্রীয় সেক্রেটারী নিযুক্ত হন। হাফেজ্জী হুজুর রহ. এর সম্মিলিত জোটেও যোগদান করেন। সুলুক ও তরিকতের দিকে অধিক ঝুকে পড়ায় তিনি বেশ কিছু সময় রাজনীতি থেকে দূরে ছিলেন। পরবর্তীতে শায়খুল হাদীস আল্লামা আজিজুল হক রহ. তাকে খেলাফত প্রতিষ্ঠার আন্দোলনে শরীক হওয়ার দাওয়াত দিলে তিনি বাংলাদেশ খেলাফত মজলিসে যোগদান করেন এবং এক সময়ে নায়েবে আমীর হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। তিনি মৃত্যুর আগ মুহূর্ত পর্যন্ত বাংলাদেশ খেলাফত মজলিসের অভিভাবক পরিষদের চেয়ারম্যানের দায়িত্ব পালন করে ছিলেন। ১৯৭৯ সালে তিনি জাতীয় সংসদ নির্বাচনে অংশ গ্রহণ করেন।

তিনি বেশ কিছু বই লিখে ও অনুবাদ করে লেখনীর ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখেন। তার লেখা বইয়ের মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলো- কওমী মাদরাসা কি ও কেন, শহীদে কারবালা, গুনাহ থেকে বাঁচার উপায়, শাহ ওয়ালী উল্লাহ রহ. এর চল্লিশ হাদীস ইত্যাদি।

ছাত্রজীবন থেকেই তিনি তাসাউফ চর্চায় আত্মনিমগ্ন। অধ্যয়নকালীন সময়ে আশরাফ আলী থানভী রহ. এর বিশিষ্ট খলিফা আল্লামা রাসূল খান রহ. এর কাছে বাইয়াত গ্রহণ করেন। দেশে চলে আসার পর পাকিস্তান আমলেই তিনি খেলাফত পান। রাসূল খানের ইন্তেকালের পর তিনি আল্লামা শাহ হাকীম আখতার রহ. এর হাতে বায়আত গ্রহণ করেন এবং খেলাফত পান। সর্বশেষ আল্লামা শাহ আহমদ শফী দামাতবারকাতুহুম তাকে খেলাফত দেন। তিনি মানুষের আত্মসংশোধনের জন্য অসংখ্য মানুষকে বায়াত করেন এবং বেশ কয়েকজনকে খেলাফত দান করেন। তার মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলেন শায়খুল হাদীস মাওলানা মামুনুল হক, প্রিন্সিপাল মাওলানা আব্দুস সামাদ।

২০১৯ সালে ৩১ ডিসেম্বর মঙ্গলবার রাত ১.৪০ মিনিটে এ মহান বুযুগ ঢাকা আজগর আলী হাসপাতালে ইহকাল ত্যাগ করে আল্লাহর ডাকে সাড়া দেন। নিজ গ্রাম কুমিল্লা সদর দক্ষিণ অলিবাজার মাদরাসা মাঠে লাখো মানুষের অংশ গ্রহণে জানাজার নামাজ অনুষ্ঠিত হয়। এতে ইমামতি করেন হেফাজতে ইসলামের আমীর আল্লামা শাহ আহমদ শফী রহ.। পারিবারিক কবরস্থানে পিতার পাশেই সমাহিত করা হয়।

আল্লামা নূর হুসাইন কাসেমী রহ.

১৯৪৫ সালের ১০ জানুয়ারী মোতাবেক ১৮ আষাঢ় ১৩৫৩ বঙ্গাব্দ রোজ শুক্রবার বাদ জুমআ কুমিল্লা জেলার মনোহরগঞ্জ থানার চড্ডা নামক গ্রামে তিনি জন্মগ্রহণ করেন তিনি। তিনি বাবা-মায়ের কাছেই প্রাথমিক শিক্ষা-দীক্ষা গ্রহণ করেন। তার বাবা পাড়ার অন্যান্য ছেলেদের সাথে প্রথমে স্কুলে ভর্তি করিয়ে দেন। বাড়ির পাশেই ছিলো স্কুল। চতুর্থ শ্রেণি পর্যন্ত এ স্কুলেই তিনি পড়াশুনা করেন।

তারপর তিনি চড্ডার পাশের গ্রামে কাশিপুর মাদরাসায় ভর্তি হোন। এখানে মুতাওয়াসসিতাহ পর্যন্ত পড়েন। তারপর বরুড়ার ঐতিহ্যবাহী মাদরাসায় ভর্তি হোন। সেখানে হেদায়া পর্যন্ত পড়েন। বর্তমান সময়ের অন্যতম রাহবার আল্লামা তাফাজ্জল হক হবিগঞ্জী সাহেবের কাছে খুসুসীভাবে এ সময় তিনি দরস লাভ করেছেন। (তাঁকে উস্তাদের মর্যাদায় সর্বদা দেখেন তিনি)

বাবার ঐকান্তিক ইচ্ছা ও তাঁর অগাধ প্রতিভার ফলে উচ্চ শিক্ষার জন্য তখন বিশ্ববিখ্যাত বিদ্যাপীঠ দারুল উলুম দেওবন্দে পাড়ি জমান। কিন্তু ভর্তির নির্ধারিত সময়ে পৌঁছাতে না পারায় সাহারানপুর জেলার বেড়ীতাজপুর মাদরাসায় ভর্তি হোন। সেখানে জালালাইন জামাত পড়েন।তারপর দীর্ঘদিনের লালিত স্বপ্ন ও ইলমী পিপাসাকে নিবারণের জন্য ভর্তি হোন দারুল উলুম দেওবন্দ এ। দেওবন্দ মাদরাসায় ভর্তি হওয়ার পর থেকে তাঁর মেধার স্বাক্ষর প্রতিফলিত হতে থাকে। ধারাবাহিক সফলতা তাঁর পদচুম্বন করতে থাকে।

এখানে তৎকালীন সময়ের শ্রেষ্ঠ আলেম আল্লামা ফখরুদ্দীন মুরাদাবাদী রহ. এর কাছে বুখারী শরীফ পড়েন। মুরাদাবাদী রহ. এর অত্যান্ত কাছের ও স্নেহভাজন হিসেবে তিনি সবার কাছে পরিচিতি লাভ করেছিলেন। ফলে অল্প সময়ে সবার দৃষ্টি আকর্ষণ করতে সক্ষম হয়েছিলেন। তাকমীল জামাত পড়ার পর আরো তিন বছর বিভিন্ন বিষয়ের উপর ডিগ্রি অর্জনে ব্যাপৃত থাকেন। এ সময় তাকমীলে আদব, তাকমীলে মাকুলাত, তাকমীলে উলুমে আলিয়া সমাপ্ত করেন।

আল্লামা নূর হোসাইন কাসেমী দা.বা. তার ছাত্র জীবনে তখনকার সময়ের যুগশ্রেষ্ট উস্তাদদের কাছে দরস নেয়ার সৌভাগ্য লাভ করেছেন। তন্মধ্যে প্রসিদ্ধ কয়েকজন হলেন মাওলানা সায়্যিদ ফখরুদ্দীন মুরাদাবাদী, মাওলানা মুফতী মাহমুদ হাসান গাঙ্গুহী, মাওনানা শরীফুল হাসান, মাওলানা নাসির খান, মাওলানা আব্দুল আহাদ, মাওলানা আনজার শাহ, মাওলানা নাঈম সাহেব, মাওলানা সালিম কাসেমী রহ.সহ বিশ্ববরেণ্য ওলামায়ে কেরামের কাছে তিনি দরস লাভ করেন

দীর্ঘ ২৭ বছর যাবৎ অর্জিত জ্ঞানকে প্রচারের নিমিত্তে তার উস্তাদ মাওলানা আব্দুল আহাদ রহ. এর পরামর্শে হুজ্জাতুল ইসলাম কাসেম নানুতুবী রহ. এর প্রতিষ্ঠিত মুজাফফরনগর শহরে অবস্থিত মুরাদিয়া মাদরাসায় অধ্যাপনার কাজ শুরু করেন। মুরাদিয়া মাদরাসায় ১ বছর শিক্ষকতা করার পর মাতৃভূমির টানে ১৯৭৩ সালের শেষ দিকে দেশে প্রত্যাবর্তন করেন।

দেশে এসে সর্বপ্রথম শরীয়তপুর জেলার নড়িয়া থানার নন্দনসার মুহিউস সুন্নাহ মাদরাসায় শায়খুল হাদীস ও মুহতামীম পদে যোগদান করেন। এরপর ১৯৭৮ সালে ঢাকার ফরিদাবাদ মাদরাসায় যোগদান করে চারবছর সুনাম ও সুখ্যাতির সাথে শিক্ষকতা করেন। এ সময় তিনি অনেক মেহনতী, যোগ্যতাসম্পন্ন ও দেশদরদী ছাত্র তৈরি করেছিলেন।

ফরিদাবাদে দীর্ঘদিন পর্যন্ত দারুল ইকামার দায়িত্ব পালন করেন। তারপর ১৯৮২সালে চলে আসেন কাজী মু’তাসিম বিল্লাহ রহ. প্রতিষ্ঠিত জামিয়া শারইয়্যাহ মালিবাগে। এখানে অত্যান্ত দক্ষতার সাথে তিরমিজি শরীফের দরস দান করেন। এখানে ৬ বছর শিক্ষকতা করার পর ১৯৮৮ সাল থেকে অধ্যাবধি পর্যন্ত অত্যান্ত যোগ্যতা ও মেহনতের সাথে ঐতিহ্যবাহী শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান জামিয়া মাদানিয়া বারিধারা এবং ১৯৯৮ সাল থেকে অধ্যাবধি জামিয়া সুবহানিয়ার শায়খুল হাদীস ও মুহতামীমের দায়িত্ব আঞ্জাম দিচ্ছেন।

২০২০ সালের ৩ অক্টোবর তিনি বেফাকুল মাদারিসিল আরাবিয়া বাংলাদেশের সিনিয়র সহ-সভাপতি নির্বাচিত হন। একই সাথে তিনি আল হাইআতুল উলয়ার সহ-সভাপতি ছিলেন। ২০২০ সালের ১৫ নভেম্বর তিনি হেফাজতে ইসলাম বাংলাদেশের মহাসচিব নির্বাচিত হন। এর পূর্বে তিনি হেফাজতের ঢাকা মহানগরীর সভাপতি ছিলেন।

আল্লামা নূর হোসাইন কাসেমী সাহেব কিশোর বয়স থেকেই ইবাদাত প্রিয়। ইসলামী বিধিবিধানের প্রতি তার ঝোঁক বরাবর অবাক করার মতো। এ বৃদ্ধ বয়সে হুইল চেয়ার দিয়ে চলাচলকারী এ মানুষটি যেভাবে ঘন্টার পর ঘন্টা দাঁড়িয়ে থেকে নামাজ আদায় করেন তা যে কাউকে বিস্মিত করে।

তিনি শায়খুল হাদীস যাকারিয়া রহ. এর কাছে প্রথমে বায়আত হোন। তার সাথে রমজানে ইতেকাফ করেন। তখন তিনি মুরাদিয়া মাদরাসায় অধ্যাপনা করাতেন।

তার ইন্তেকালের পর মুফতী মাহমুদ হাসান গাঙ্গুহী রহ. এর হাতে পুনরায় বায়আত হোন। এরপর ১৯৯৫ সালে তিনি বাংলাদেশে আসেন। মালিবাগ জামিয়ায় ইতেকাফ করেন। ইয়ারপোর্ট মাদরাসায় অবস্থান কালে তার কাছ থেকেই ১৯৯৫সালে খেলাফত লাভ করেন।

আল্লামা কাসেমী একজন দেওবন্দী মাসলাকের আলেম। সর্বদা সুন্নাতের অনুসরণ ও আকাবির আসলাফের দেখানো পথে চলেন। সাদাসিধে জীবন তার ঐকান্তিক ব্রত। রাসূলুল্লাহ সা. এর হাদীসের খেদমাত আর সমাজে ইলমে দ্বীন পৌঁছে দেয়ার জন্য সর্বদা মগ্ন থাকেন এ রাহবার। কালক্রমে তিনি এখন বৃদ্ধ বয়সে উপনীত। তার কাছে হজার হাজার মানুষের মুরীদ হওয়ার চাহিদা এবং অনেক পীড়াপীড়ির পরও তিনি বিষয়টিকে এড়িয়ে যান। কাউকে মুরীদ বানাতে আগ্রহী দেখানোতো অনেক দূরের বিষয়। তবে তার কাছে কেউ মুরীদ হতে এলে তিনি মুফতি মাহমুদ হাসান গাঙ্গুহী রহ. এর জানেশ্বীন মুফতি ইব্রাহীম আফ্রিকী দা.বা. এর কাছে পাঠিয়ে দেন।

প্রচারবিমূখ এ আধ্যাত্মিক রাহবার আল্লামা কাসেমী তেমন কাউকে খেলাফত দেননি। তিনি খেলাফত লাভ করেছেন প্রায় ২০ বছর পূর্বে। কিন্তু এ দীর্ঘ সময়ে মাত্র ৩ জন আলেমকে খেলাফত দিয়েছেন। তারা হলেন গাজীপুরের মাওলানা মাসউদুল করীম, সৈয়দপুরের মাওলানা বশির আহমদ ও মানিকনগরের মাওলানা ইছহাক।

রাজনীতির ক্ষেত্রে তিনি আকাবিরদের রেখে যাওয়া সংগঠন জমিয়তে উলামায়ে ইসলামের সাথে যুক্ত। ১৯৭৫ সাল থেকেই তিনি জমিয়তের একনিষ্ঠ সক্রিয় কর্মী। স্বাধীনতা পরবর্তী দীর্ঘকাল জমিয়তের সাধারণ সম্পাদক মরহুম মাওলানা শামসুদ্দীন কাসেমী রহ. এর নেতৃত্বে সকল আন্দোলনে শরীক থাকতেন। জমিয়তে তাঁর মাধ্যমেই যোগদান করেছিলেন। ১৯৯০ সালে জমিয়তের কেন্দ্রীয় নেতৃত্বে চলে আসেন। বর্তমানে কেন্দ্রীয় জমিয়তে উলামায়ে ইসলাম বাংলাদেশের গত ৭ নভেম্বর ২০১৫ ইংরেজী রোজ রবিবার জাতীয় কাউন্সিলের মাধ্যমে মহাসচিবের দায়িত্ব পান। এবং নিজস্ব মেধা, দক্ষতা ও পরামর্শের মাধ্যমে এ দায়িত্ব আঞ্জাম দিয়ে যাচ্ছেন।

১৯৯০ থেকে ২০০০ সাল পর্যন্ত দেশের আলোচিত অরাজনৈতিক সংগঠন খতমে নবুওয়াত আন্দোলনে জোরালো ভূমিকা রাখেন। এবং সাধারণ সম্পাদকের দায়িত্ব পালন করেন।

বর্তমানের আলোচিত অরাজনৈতিক সংগঠন হেফাজতে ইসলাম বাংলাদেশ ঢাকা মহানগরীর সম্মানিত সভাপতির দায়িত্বভার তাঁর উপর ন্যস্ত করা হয়। তিনি অত্যান্ত সূচারুরুপে অতীতের সকল দায়িত্ব আঞ্জাম দিয়ে এসেছেন। বর্তমানেও প্রচুর শ্রম ও মেধা খাটিয়ে জাতীয় ও আন্তর্জাতিক সবগুলো ইস্যুতে চমৎকারভাবে নেতৃত্ব দিয়ে আসছেন। তিনি যেসব বিষয়ে আন্দোলনের ডাক দিয়েছেন। তাতে সফলতা তার পদচুম্বন করেছে।

মাওলানা নূর হোসাইন কাসেমী রহ. পারিবারিক জীবনে ২ ছেলে মাওলানা যুবায়ের হুসাইন ও মাওলানা জাবের কাসেমী এবং দুই মেয়ের জনক ছিলেন।

আল্লামা নূর হোসাইন কাসেমী ১৩ ডিসেম্বর বেলা ১ টার দিকে রাজধানীর ইউনাইটেড হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন। ১৪ ডিসেম্বর জাতীয় মসজিদ বাইতুল মুকাররমে জানাযা শেষে টঙ্গীতে তার প্রতিষ্ঠিত সুবহানিয়া মাদরাসায় তাকে দাফন করা হয়।

তথ্যসূত্র: কওমিপিডিয়া, ভয়েস টাইমস

বিজ্ঞাপন