কেন কমছে গ্রামীণ মাদরাসাগুলোর মান ও ছাত্রসংখ্যা?

রাগিব রব্বানি

বাংলাদেশের গ্রামে গঞ্জে ছড়িয়ে আছে অসংখ্য দীনি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান। আরেকটু নির্দিষ্ট করে বললে কওমি মাদরাসা। বিখ্যাত অখ্যাত অধিকাংশ কওমি মাদরাসা-শিক্ষিতের প্রাথমিক শিক্ষা বা পড়াশোনার হাতেখড়ি এসব প্রতিষ্ঠানেই হয়ে থাকে। গ্রামীণ এ সকল মাদরাসার কোনোটা প্রাথমিক স্তর অবধি সীমাবদ্ধ, কোনোটায় মাধ্যমিক শিক্ষার ব্যবস্থা থাকে, আবার কোনোটায় উচ্চ মাধ্যমিকসহ থাকে কওমি শিক্ষার সর্বোচ্চ স্তর দাওরায়ে হাদিসের ক্লাসও।

বাংলাদেশের গ্রামীণ ঐতিহ্যের সঙ্গে মিশে যাওয়া এ সকল প্রতিষ্ঠানে শিক্ষার মান এবং ছাত্রসংখ্যা তুলনার বিচারে দিন দিন যেন কমতির দিকে পতিত হচ্ছে। কওমি মাদরাসা শিক্ষাবোর্ডগুলোর কেন্দ্রীয় পরীক্ষার ফলাফলের দিকে নজর দিলে পড়ালেখার মানের দিকটা সহজে অনুমান করা যায়। শহর ও রাজধানীর মাদরাসাগুলোতে যেখানে প্রায় প্রতিটি ক্লাসে মেধাতালিকায় স্থান পাওয়াসহ ‘মুমতাজ’ কিংবা ‘জায়্যিদ জিদ্দানে’ উত্তীর্ণ শিক্ষার্থীর সংখ্যা প্রচুর, সেখানে গ্রামীণ মাদরাসাগুলোর অধিকাংশটিতেই ‘জায়্যিদ’ কিংবা ‘মকবুল’ ছাত্রের ছড়াছড়ি থাকে, থাকে উল্লেখযোগ্য পরিমাণে অকৃতকার্য শিক্ষার্থীও।

আর ছাত্রসংখ্যা কমতির ব্যাপারটা ধরা যায় প্রাইভেট ও বিশেষায়িত মডেল শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান অথবা শহরাঞ্চলের মানসম্মত মাদরাসাগুলোর দিকে অভিভাবকদের আগ্রহ ও ঝোঁক দেখে।

কেন কমছে গ্রামীণ মাদরাসাগুলোর মান ও ছাত্রসংখ্যা, এ বিষয়ে কথা বলেছিলাম হবিগঞ্জের গ্রামীণ একটি মাদরাসার অভিজ্ঞ শিক্ষক ও তরুণ আলেম চিন্তক মাওলানা সাবের চৌধুরীর সঙ্গে।

মাওলানা সাবের চৌধুরী মনে করেন, গ্রামীণ মাদরাসাগুলোতে পড়াশোনার মান-বিষয়ক যে সমস্যা, তা নতুন নয়, অনেক পুরনো। এবং বর্তমানে সেই সমস্যাটা বরং কাটিয়ে ওঠার চেষ্টা করে যাচ্ছে অনেক গ্রামীণ মাদরাসা।

মাওলানা সাবের বলেন, ‘মফস্বলের মাদরাসাগুলোর পড়াশোনার মান কমছে বলে আমার মনে হয় না। অতীতের তুলনায় দিন দিন বরং উন্নতি হচ্ছে। অনেক নতুন প্রতিষ্ঠান গড়ে উঠছে, যেগুলো বেশ ভালো করছে। মফস্বলে অনেক নুরানি ও হিফজখানা আছে, যেগুলোর মান বেশ ভালো। পুরনো প্রতিষ্ঠানগুলোর মধ্যেও নতুন উদ্যমে জেগে উঠার একটা প্রবণতা আমি দেখি। বিশেষ করে নিচের দিকে, অর্থাৎ, কাফিয়া পর্যন্ত মফস্বলে অনেক মাদরাসা আছে বেশ ভালো পড়াশোনা হয়। আবার নামমাত্র পড়াশোনা হচ্ছে এমন মাদরাসার সংখ্যাও প্রচুর। গড়পরতা এমন মাদরাসার সংখ্যাই হয়তো বেশি। এ জন্য এককাট্টা মন্তব্য করা আসলে মুশকিল।’

তবে কাফিয়ার ওপরে যে মাদরাসাগুলো আছে মফস্বলে, সেগুলোর প্রশ্নবিদ্ধ মানের ব্যাপারে মোটামুটি ঢালাওভাবে একমত মাওলানা সাবের। তিনি বলেন, ‘ওপরের দিকে, বিশেষ করে শরহে বেকায়া থেকে দাওরায়ো হাদিস পর্যন্ত জামাতগুলোতে পড়ালেখার মান কম। ছাত্রসংখ্যার ব্যাপারটিও এর সাথে জড়িত। আপনি খেয়াল করলে দেখবেন, কাফিয়া জামাত পর্যন্ত মফস্বলের মাদরাসাগুলোতে ছাত্রসংকট নাই। এমনিভাবে নুরানি ও হিফজবিভাগেও ছাত্রসংখ্যা প্রচুর। সমস্যাটা হচ্ছে কাফিয়ার পর থেকে। এ সময় ছাত্ররা বড় মাদরাসাগুলোতে চলে যেতে চায়। বিশেষ করে ঢাকার দিকে তাদের নজর থাকে বেশি।’

এমনটি কেন হচ্ছে জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘মোটা দাগে এখানে দুটো প্রবণতা কাজ করে। এক. বড় মাদরাসাগুলোর প্রতি ছাত্রদের মনে এক ধরনের প্রবল কৌতূহল ও আগ্রহ কাজ করে। বিশেষ করে ঢাকার প্রতি মফস্বলের ছাত্রদের মনে আকর্ষণ প্রবলতর। ঢাকা তাদের কাছে ভিন্ন একটা জগতের মতো। এটা একটা বিষয়। আর, সবাই চায় পড়ালেখা যেমনই হোক, সমাপ্তিটা যেন বড় একটা মাদরাসা থেকে হয়। সামাজিকভাবে এর একটা ভ্যালু আছে। এটা সঠিক না বেঠিক যাই হোক, আছে।

‘দুই. মফস্বলের অনেক মাদরাসায় ছাত্ররা নিজেদের মেধা ও চাহিদা অনুযায়ী খোরাক পায় না। মানে, তূলনামূলক বড় মাদরাসাগুলোর তুলনায় আরকি। অন্যথায় ভরপুর খোরাক পায় এমন মাদরাসার সংখ্যাও তো আসলে বেশি না। এখানে নানা সীমাবদ্ধতা আছে। লম্বা আলোচনার বিষয়। আমাদের শিক্ষাবোর্ডগুলো যদি কেবল পরীক্ষাসর্বস্ব না হয়ে কার্যত সুচারু ও পূর্ণ নিয়ন্ত্রকশক্তি হয়ে উঠতে পারে, তাহলে এ সংকট কাটানো সম্ভব। সে দিকে না গিয়ে আমি বরং ছোট একটা সংকটের কথা বলি।

‘মফস্বলের অনেক ছেলে, যারা অন্যদের চেয়ে ভালো, বিশেষ করে ঢাকার দিকে যেতে চায়, কিন্তু, মাদরাসা কর্তৃপক্ষ তাকে যেভাবেই হোক আটকাতে চায়। একসময় সেটা উস্তাদ-ছাত্রের সম্পর্কের টানাপোড়েনের দিকে চলে যায়। আর, যারা শেষ পর্যন্ত থেকে যায়, তারাও ঠিক স্বস্তি পায় না। আমার মনে হয় এ জায়গাটায় আমাদেরকে উদার থাকা উচিত। এই উদারতারটুকু আমরা নিতে পারলে মাদরাসাগুলো স্বেচ্ছায় একটা চ্যালেঞ্জের মুখে পড়বে। আর চ্যালেঞ্জিং সবসময়ই ভালো ফল বয়ে আনে। এর একটা ভালো ফল এটাও হতে পারে, মফস্বলে প্রচুর পরিমাণে দাওরায়ে হাদিস মাদরাসা না থাকা। একটা জেলায় দাওরায়ে হাদিস পর্যন্ত একটি কি দুটো মাদরাসাই যথেষ্ট। অন্যগুলো মাধ্যমিক পর্যায়ে থাকুক। বর্তমানে আমাদের লোকবল বাড়ছে। যোগ্য লোকও বাড়ছে। ফলে, মাধ্যমিক পর্যায়ে থেকে এই চ্যালেঞ্জে জেতার মতো একটা সক্ষমতাও তৈরি হয়েছে।’