খাইবার কন্যা সাফিয়্যা বিনতে হুয়াই রাদিয়াল্লাহু আনহা

সুমাইয়া মারজান:

খাইবার বিজিত হয়েছে। মুসলমানদের অধিকারে এসেছে  খাইবারে ইহুদিদের দখলে থাকা আটটি দুর্গ। কঠিনতম এ লড়াইয়ে নিহত হয়েছে কামুস দুর্গের অধিপতি খাইবারের ইহুদিনেতা আবুল হাকিকসহ ৯৩জন যোদ্ধা। মুসলিমবাহিনীর ১৯জন সাহাবী শাহাদতবরণ করেছেন। এ যুদ্ধে খাইবারের দুর্গগুলোর সকল নারী ও শিশুদের দাস-দাসী হিসেবে বন্দী করে গনিমতের মালের অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। যুদ্ধলব্ধ গনিমতের মালকে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলায়হি ওয়াসাল্লাম সকলের মাঝে বন্টন করে দিচ্ছিলেন।

যুদ্ধ পরবর্তী অবস্থা তখনও দেখে সহ্য করার মতো নয়। নিহতদের লাশ দুর্গের আশেপাশে ছড়িয়ে ছিটিয়ে পড়ে আছে। মরুর মাটি রক্ত শুষে নিলেও রক্তের দাগ লেগে আছে তার বুকে। দুর্গের ভেতর থেকে মুসলমান যোদ্ধারা বন্দী নারী ও শিশুদের এই অবস্থার মধ্য দিয়েই বের করে আনছিলো। বেলাল রাদিয়াল্লাহু আনহু দুজন মেয়েকে তার আত্মীয়স্বজনদের লাশের সামনে দিয়েই আনছিলেন। মেয়ে দুজন একে অপরের চাচাতো বোন। একজন অধিক শোকে পাথর হয়ে গেছেন যেন। আরেকজন পিতা, চাচাদের লাশ দেখে নিজেকে সামলাতে পারলেন না। বিলাপ করে কাঁদতে শুরু করলেন। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলায়হি ওয়াসাল্লাম একটু দূরেই গনিমতের মাল বন্টন করছিলেন। রাসূলের কানে কান্নার শব্দ গেলে তিনি বেলাল রাদিয়াল্লাহু আনহুকে ধমক দিয়ে বললেন, বেলাল! তুমি এ কী করছো! তোমার দিলে কী রহম বলে কিছু নেই? তুমি এমন স্থান দিয়ে এদের নিয়ে আসছ, যেখানে তাদের আত্মীয়স্বজনের লাশ পড়ে আছে। তারপর রাসূল মেয়ে দুজনকে যুদ্ধের ময়দান থেকে দূরের একটি জায়গায় বসিয়ে দিলেন।

তখন সাহাবি দাহিয়্যা ইবনে খলিফা কলবি রাসূল সাল্লাল্লাহু আলায়হি ওয়াসাল্লামকে বললেন, আমার একজন দাসী প্রয়োজন। হে আল্লাহর রাসূল, আমাকে গনিমতের মাল থেকে একজন দাসীর মালিক বানিয়ে দিন। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাকে যুদ্ধবন্দী নারীদের থেকে একজনকে বেছে নিতে বললেন। দাহিয়্যা কলবি দাসী হিসেবে নির্বাচন করলেন, কুরায়জা ও নজির গোত্রের সম্ভ্রান্ত এক নারীকে। নাম যয়নব বিনতে হুয়াই। তার পিতা হুয়াই বিন আখতাব মদীনার বিখ্যাত কুরায়জা গোত্রের সম্মানিত নেতা।

দাহিয়্যা কলবি যখন যয়নব বিনতে হুয়াইকে দাসী হিসেবে পছন্দ করলেন, তখন ব্যাপারটা একজন সাহাবির নজরে আসলো। তিনি রাসূল সাল্লাল্লাহু আলায়হি ওয়াসাল্লামের নিকট এসে বললেন—হে আল্লাহর রাসুল, দাহিয়্যা কলবি নিজের জন্য এমন একজনকে দাসী হিসেবে নির্বাচন করেছেন যিনি বনী কুরায়জা ও নজিরের সম্মানিত, সম্ভ্রান্ত একজন নারী। সংগত কারণেই এমন সম্মানিত নারী আপনার উপযুক্ত। দাহিয়্যা কলবির জন্য উপযুক্ত নয়। রাসূল এবার বিষয়টির গুরুত্ব অনুধাবন করলেন। বন্দিনীর পরিচয় জানতে পেরে তার দিকে তাকালেন। ছোটখাটো, হালকা গড়নের ফরসা অবয়ব। সদ্য কৈশোর পেরোনো নিটোল তরুণী। বয়েস কত হবে? সতেরো-আঠারো হয়তো। তরুণীর উপর বয়ে যাওয়া মুসিবতের কারণে ফরসা চেহারাটা কেমন শুকিয়ে গেছে। চেহারায় ভয়, উৎকণ্ঠার ছাপ। গোত্রপতির মেয়ে তিনি। এমন দিন দেখতে হবে হয়তো কল্পনায়ও ছিল না। ভয়াবহ বাস্তবতার আঘাতে মুষড়ে পড়েছেন যেন। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলায়হি ওয়াসাল্লাম তার চোখের দিকে তাকিয়ে মনের ব্যথা বুঝতে পারলেন। দাহিয়্যা কলবিকে ডেকে বললেন, তুমি অন্য কোন মেয়েকে দাসী হিসেবে পছন্দ করে নাও।

দুই.

গনিমতের মাল হিসেবে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলায়হি ওয়াসাল্লামের অংশে পড়ায় তার নাম হয়ে যায় সাফিয়্যা। কারণ আরবে বাদশাহের অংশে পড়া গনিমতের মালকে সাফিয়্যা বলা হয়।

রাসুল সাল্লাল্লাহু আলায়হি ওয়া সাল্লাম সাফিয়্যাকে কোমল কণ্ঠে বললেন, তুমি যদি মুসলমান হও, তাহলে এর বিনিময়ে তোমাকে মুক্ত করে দিতে পারি। তুমি ইচ্ছে করলে আমার সাথে বিবাহবন্ধনে আবদ্ধ হতে পারো। আর তুমি যদি তোমার ধর্মে থাকতে চাও, তাহলে আমি তোমাকে মুক্ত করে দেবো। তুমি তোমার গোত্রের সাথে বসবাস করতে পারবে।

সাফিয়্যা রাসূলের কথায় হতবাক হয়ে গেলেন। এ কী কথা শুনছেন তিনি! মহামানবরা কী এমনই হন! তার মনে পড়লো কয়েকদিন আগে দেখা স্বপ্নের কথা।

কয়েকদিন আগে যখন মুসলিমবাহিনী মদিনা থেকে খাইবারের পথে রওয়ানা হয়েছে, তখন তার বিয়ে হয়েছিল কামুস দুর্গের অধিপতির ছেলে কেনানা ইবনে আবুল হাকিকের সাথে। বিয়ের পর একরাতে তিনি স্বপ্নে দেখেন তার কোলে চাঁদ নেমে এসেছে। এ কথা তিনি তার স্বামীকে বলতেই সে তাকে জোরে থাপ্পড় মারে এবং রেগে গিয়ে বলে, আরবের নতুন শাসক মুহাম্মাদের জীবনসঙ্গী হতে চাও তুমি, তাই না?

স্বামীর কথাটা মনের ভেতর গেঁথে গিয়েছিলো তার। এমন কী হতে পারে জীবনে, কিভাবে সম্ভব হবে? তাছাড়া তার মনের ইচ্ছাও এরকম ছিল। আজ রাসূলের কথা শুনে মনে হলো, স্বপ্ন আর ইচ্ছা পূরণ সময় বুঝি এসে গেছে। তাই তিনি রাসূল সাল্লাল্লাহু আলায়হি ওয়াসাল্লামকে সরাসরি বললেন, হে আল্লাহর রাসূল!আপনার সাথে সাক্ষাতের আগেই আমি ইসলামের দাওয়াত পেয়েছি। তখন থেকেই মনে মনে ইসলাম গ্রহণের ইচ্ছা করেছিলাম। আমি সন্তুষ্টচিত্তে আপনার প্রস্তাব গ্রহণ করলাম। এ মুহূর্তে আমি সম্পূর্ণ অসহায়। সব হারানো সদ্য বিধবা হওয়া এক নারী। আপনি যদি মুক্ত করে দেন, তবে আমার গোত্রের অন্যদের কাছে ফিরে যাওয়ার চেয়ে আমি আল্লাহ ও তার রাসূলকেই মনেপ্রাণে গ্রহণ করে নেব। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলায়হি ওয়াসাল্লাম তার এমন প্রজ্ঞাপূর্ণ জবাবে অভিভূত হয়ে গেলেন। খায়বার থেকে মদিনায় ফেরার আগেই বিয়ের পবিত্র  বন্ধনে আবদ্ধ হলেন দুটি অভিজাত প্রাণ। রাসূল সাফিয়্যা রাদিয়াল্লাহু আনহাকে মোহর দিতে চাইলেন। কিন্ত সাফিয়্যা বললেন, তার আজাদীই তার মোহর হবে। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলায়হি ওয়াসাল্লাম তার কথামতো তা-ই করলেন।

রাসুল সাল্লাল্লাহু আলায়হি ওয়াসাল্লাম সে রাতে সাফিয়্যা রাদিয়াল্লাহু আনহার সাথে রাত্রিযাপনের ইচ্ছা করলে— সাফিয়্যা রাদিয়াল্লাহু আনহা হালকা আপত্তি জানিয়ে বললেন, আজ নয়, তার কিছুটা সময় প্রয়োজন। রাসূল নতুন বধূয়ার মনের স্বাচ্ছন্দ্যবোধকে গুরুত্ব দিয়ে তাকে একা থাকতে দিলেন।

পরদিন সকালে সাহাবিদের একত্র করে ওলিমার আয়োজন করলেন। খুবই সাদামাটা আয়োজন ওলিমার। খেজুর, ঘি, আর যবের ছাতু দিয়ে আপ্যায়ন করলেন সকলকে। ওলিমা শেষে মদিনার পথে রওনা হলো কাফেলা। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম সাফিয়্যা রাদিয়াল্লাহু আনহাকে নিজের উটের হাওদায় চড়িয়ে নিজের গায়ের জামা দিয়ে তার ছায়ার ব্যবস্থা করে দিলেন। এক বর্ণনায় আছে, রাসূল সাল্লাল্লাহু আলায়হি ওয়াসাল্লাম সাফিয়্যা রাদিয়াল্লাহু আনহাকে উটে চড়ানোর সময় উটের সামনে সাফিয়্যা রাদিয়াল্লাহু আনহার সিড়ি হিসেবে নিজের হাঁটু পেতে দেন। নববধূর সম্মানের জন্য ও রাসূল সাল্লাল্লাহু আলায়হি ওয়াসাল্লাম তাকে স্ত্রী হিসেবে গ্রহণ করেছেন এ কথা জানানোর জন্য রাসুল এরকমটি করেছিলেন।

খাইবারফেরত মুসলিম বাহিনী যাত্রাবিরতি করেছে। মদিনার দক্ষিণ-পশ্চিমের সাবা নামক স্থানে। রাত নেমেছে মরুর বুকে। কাফেলার একটি তাবুতে বসে আছেন নতুন বধূ সাফিয়্যা রাদিয়াল্লাহু আনহা। সব হারানোর বেদনার ছাপ পড়ে আছে সুন্দর মুখটিতে। চোখ দুটোতে বিষাদের সমুদ্দুর। ভবিষ্যতের ভাবনার অতলান্তে হারিয়ে গেছেন যেন। আর মনে মনে একজনের জন্য প্রতীক্ষা করছেন। যার জন্য একটু আগে তাকে সাজিয়ে দিয়ে গেছেন উম্মে সুলাইম ও রাসূলের আরেকজন স্ত্রী উম্মে সালামা রাদিয়াল্লাহু আনহুমা।

তাবুর দরজায় আওয়াজ দিলো কেউ? হয়তো তিনি আসছেন। সালামের আওয়াজ শোনা গেলো। অনুমান ঠিক। তিনিই আসছেন।

দুদিন আগেই যার সাথে বাঁধা পড়েছেন প্রাণের বন্ধনে। ভালোবাসার ডোরে। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলায়হি ওয়াসাল্লাম পর্দা ফাঁক করে ভেতরে ঢুকলেন। সাফিয়্যা রাদিয়াল্লাহু আনহার দিকে তাকিয়ে মুচকি হাসি দিয়ে বললেন, কেমন আছো সাফিয়্যা? এমন ভালোবাসাপূর্ণ জিজ্ঞাসা! দিল ঠাণ্ডা হয়ে গেলো সাফিয়্যা রাদিয়াল্লাহু আনহার। সুন্দর মুখটি থেকে কেটে গেলো বিষাদের মেঘ। পূর্ণিমার চাঁদ হেসে উঠলো। একটু আগে কী সব দুশ্চিন্তা করছিলাম আমি! মনে মনে ভাবলেন তিনি। এই চাঁদমুখের হাসি দেখলে তো সব হারানোর ব্যথা ভুলে যাওয়া যায়। দাসীর সারি থেকে উদ্ধার করে যিনি তাকে হৃদয়ের এককোণে জায়গা দিয়েছেন, প্রিয়তমা বানিয়েছেন, উম্মুল মুমিনিনের সম্মানিত আসনে সমাসীন করেছেন,  তিনি পাশে থাকা মানে তো নিশ্চিন্ত, নির্ভার জীবন কাটিয়ে যাওয়া। সব হারিয়েও তাকে পেলে সার্থক জনম। রাসূলকে সম্ভাষণ জানালেন সাফিয়্যা রাদিয়াল্লাহু আনহা। তার হাতে সঁপে দিলেন নিজের সত্ত্বা।

রাসূল প্রিয়তমার দিকে তাকালেন। ঠোঁটে সেই চিরাচরিত, ভুবনজয়ী মুচকি হাসি। তার নজরে পড়লো সাফিয়্যা রাদিয়াল্লাহু আনহার গালের দাগ। তোমার গালে কিসের দাগ সাফিয়্যা?

‘ও কিছু না’ বলে সাফিয়্যা রাদিয়াল্লাহু আনহা দাগটি লুকোতে চাইলেন। রাসূল তবু জানতে চাইলেন। সাফিয়্যা রাদিয়াল্লাহু আনহা তার বিয়ের পরে দেখা সেই স্বপ্নের কথা বললেন।

সে রাতে নবিজি একটুও ঘুমালেন না। নতুন বধূর সাথে সারারাত গল্প করলেন। খায়বারের যুদ্ধে তার বাবা, স্বামী-ভাইসহ অনেক আত্মীয়স্বজন নিহত হয়েছিল। নবিজি তাকে সে ব্যথার জন্য সান্ত্বনা দিয়েছেন। তাকে বুঝিয়েছেন কেন যুদ্ধের প্রয়োজন। ইহুদিদের ষড়যন্ত্র ও তাদের দুর্ভাগ্যের কারণ বলেছেন। যুদ্ধ তার মূল মন্ত্র নয়। শান্তি প্রতিষ্ঠার জন্য যুদ্ধের প্রয়োজন হয়।

সেদিন রাতে একজন আরেকজনকে তাদের জীবনের সুখদুঃখের কথা বলেছেন। ভগ্নহৃদয় সাফিয়্যা রাদিয়াল্লাহু আনহার মন থেকে বিষাদের মেঘ দূর করে হাসির রোদ্দুর ছড়িয়ে দিতে। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলায়হি ওয়াসাল্লাম সাফিয়্যা রাদিয়াল্লাহু আনহাকে প্রথম রাতের কথা জিজ্ঞেস করে বললেন, সেদিন কেন খায়বারে তুমি আমার সাথে রাত্রিযাপন করতে না করেছিলে? সাফিয়্যা রাদিয়াল্লাহু আনহা বললেন, আমার গোত্রের অনেক লোক তখনও খায়বারের আশেপাশে ছিল। যদি তারা আপনার উপর আক্রমণ করে বসতো! আপনার নিরাপত্তার কথা ভেবে আমি না করেছিলাম। নববধূর মন জয় করতে করতে কখন ভোর গেলো নবিজি তা টেরই পেলেন না। সাফিয়্যা রাদিয়াল্লাহু আনহা পরে একথা উম্মে সুলাইমকে বললে তিনি অবাক হয়ে গেলেন।

নবিজি সাফিয়্যা রাদিয়াল্লাহু আনহাকে মদিনায় নিয়ে আসার পর খায়বারের বিজয়ের আনন্দের চেয়ে বেশি আলোচনা হতে লাগলো রাসূলের নববধূকে নিয়ে। মেয়েদের মধ্যে সাড়া পড়ে গেলো। সাফিয়্যার সুন্দরী হবার খবর ছড়িয়ে পড়লো বাতাসের মতো। সবাই নতুন বধূকে একনজর দেখার জন্য ছুটে এল হারিস ইবনে নোমানের গৃহে। কারণ রাসূল অভিযান থেকে ফেরার পর সাথে সাথে মসজিদে নববির পাশে হুজরা তৈরি করা সম্ভব হয়নি। তাই সাফিয়্যাকে আনার পর তাকে তুললেন মদিনার ধনবান সাহাবি হারিস বিন নোমান রাদিয়াল্লাহু আনহুর বাড়িতে। অন্য উম্মুল মুমিনিনগণও তার অসাধারণ রূপ লাবণ্যের কথা শুনে তাকে গিয়ে দেখে আসলেন। আয়েশা রাদিয়াল্লাহু আনহা নিজেকে একটি চাদরে ঢেকে সাফিয়্যাকে দেখে আসলেন। নবিজি তাকে জিজ্ঞেস করলেন, আয়েশা! কেমন দেখলে তাকে? আয়েশা রাদিয়াল্লাহু আনহা অন্যসব সাধারণ নারীর মতো সুক্ষ্ম অনুভূতি নিয়ে জবাব দিলেন— সে তো এক ইহুদির মেয়ে!

নবিজি তার জবাব শুনে মনঃক্ষুণ্ন হলেন। তিনি বললেন, আয়েশা! এমন করে বলা ঠিক হয়নি। সে তো ইসলাম গ্রহণ করেছে। আর তার ইসলাম গ্রহণ শুদ্ধতম।

ফাতেমা রাদিয়াল্লাহু আনহা সাফিয়্যা রাদিয়াল্লাহু আনহাকে দেখতে গেলে যখন তিনি জানতে পারলেন, ফাতেমা রাদিআল্লাহু আনহা রাসূলের কলিজার টুকরো, তখন তিনি তাকে তার নিজের কানের দুল খুলে পরিয়ে দিলেন। আরো যারা দেখতে গিয়েছিল সবাইকে নানারকম উপহার দিলেন।

তিন

সাফিয়্যা রাদিয়াল্লাহু আনহা সুন্দরী হলেও তার মনে, চলাফেরায় বিন্দুমাত্র অহংকার ছিল না। খুবই শান্ত ও চাপা স্বভাবের ছিলেন। নিজের মনোবেদনা, দুঃখ কাউকে সহজে বুঝতে দিতেন না। উঁচু আওয়াজে কথা বলা ছিল তার স্বভাববিরুদ্ধ । ইহুদি গোত্রের মেয়ে ছিলেন বলে তাকে অনেকেই বাঁকা চোখে দেখতো। তিনি বুঝতে পেরেও নবিজিকে কখনো এ ব্যাপারে মুখ খুলে কিছু বলেননি। তবে  নবিজি তার এরকম চাপা মনোভাব বুঝতে পারতেন। তাই  সবসময় তার প্রতি বিশেষভাবে খেয়াল রাখতেন। বিদায় হজের সময় রাসূল সাল্লাল্লাহু আলায়হি ওয়াসাল্লামের সাথে উম্মাহাতুল মুমিনিনগণ গিয়েছিলেন। তাওয়াফে ইফাদার সময় সাফিয়্যা রাদিয়াল্লাহু আনহার উটটি দুর্বল থাকায় তার কষ্ট হচ্ছিল। তিনি কাফেলার সবার সাথে তাল মিলিয়ে চলতে পারছিলেন না। উটের পিঠে বসে কাঁদছিলেন। নবিজি ব্যাপারটা খেয়াল করে তার কান্না থামানোর ব্যবস্থা করলেন। যয়নব বিনতে জাহাশ রাদিয়াল্লাহু আনহার একাধিক উট ছিল। রাসূল তার কাছে গিয়ে বললেন, তোমার একটি উট সাফিয়্যাকে দাও। তিনি সাতপাঁচ না ভেবে বলে বসলেন আমি ওই ইহুদি মেয়েকে আমার উট কখনোই দেব না। উম্মাহাতুল মুমিনিন হলেও তারা তো নারীই ছিলেন। আর সাধারণ নারীদের মতো তাদেরও মনের ভেতর সতীনসুলভ সুক্ষ্ম অনুভূতি ছিল। তাছাড়া যয়নব রাদিয়াল্লাহু আনহা কিছু গরম মেজাজের ছিলেন। তার এ কথায় রাসূল সাল্লাল্লাহু আলায়হি ওয়াসাল্লাম এতটাই কষ্ট পান যে পরবর্তী আড়াই মাস পর্যন্ত যয়নবের ঘরেও যাননি, তার সাথে কথাও বলেননি। অবশেষে অনেকবার ক্ষমা চাওয়ার পর নবিজি তাকে ক্ষমা করেন। যয়নব বিনতে জাহাশ রাদিয়াল্লাহু আনহা এ কথা মনে পড়লে বলতেন, আল্লাহর রাসুলের এমন অসন্তুষ্টি আমাকে যেন নিরাশ করে দিয়েছিল। আমি শপথ করেছিলাম জীবনে আর কোনোদিন এমন কথা বলবো না।

একদিন রাসূল সাল্লাল্লাহু আলায়হি ওয়াসাল্লাম সাফিয়্যা রাদিয়াল্লাহু আনহার ঘরে এসে দেখেন তিনি কাঁদছেন। রাসূল কান্নার কারণ জিজ্ঞেস করলে তিনি বলেন, আয়েশা ও হাফসা রাদিয়াল্লাহু আনহুমা একটু আগে আমাদের মজলিসে বলছিলেন, তারা কুরাইশ এবং সম্মানের দিক থেকে অন্য স্ত্রীদের থেকে রাসূলের অধিক নিকটবর্তী। আমি ইহুদি গোত্রের হওয়ায় চুপ করেছিলাম। কারণ ইহুদিদের মদিনায় অনেক ঘৃণা করা হয়। তার কথা শুনে রাসূল বললেন, তুমিও তো সম্মানিত। তুমি কেন তাদেরকে বলে দিলে না—আমার স্বামী শেষ নবী মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলায়হি ওয়াসাল্লাম, বংশীয় পিতা হারুন আলায়হিস সালাম, বংশীয় চাচা মুসা আলায়হিস সালাম। রাসূলের এ কথা শোনার পর সাফিয়্যা রাদিয়াল্লাহু আনহার মনের ভেতর নিজেকে নিয়ে যে সংকোচ ছিল তা দূর হয়ে গেলো। মনের মেঘ কেটে হেসে উঠলো সোনালি রঙা রোদ্দুর।

একদিন আয়েশা রাদিয়াল্লাহু আনহা সাফিয়্যা রাদিয়াল্লাহু আনহার ছোটখাটো গড়নের দিকে ইঙ্গিত করে রাসূলকে বললেন, আপনি তাকে ভরণপোষণের জন্য যা দেন তা-ই যথেষ্ট। রাসূল তার এ কথায় ব্যথিত হলেন। কারণ কথাটা ছিল সাফিয়্যা রাদিয়াল্লাহু আনহার জন্য অপমানসূচক। রাসূল আয়েশাকে তিরস্কার করে বললেন, তোমার এ কথাকে যদি সাগরে নিক্ষেপ করা হতো, তবে সাগরের পানি দূষিত হয়ে যেত। তোমার কথাটা এমনই মন্দ।

আয়েশা নিজের ভুল বুঝতে পারলেন। আসলে তিনি কিছুটা দুষ্টুমি করেই বলেছিলেন। কিন্তু ব্যাপারটা এমন হবে তিনি বুঝতে পারেননি। তিনি সাথে সাথে নিজের ভুল শুধরে বললেন, আমি এমনিই এ কথাটা বলেছি। রাসূল তাকে সংশোধন করার জন্য বললেন, আমাকে যদি পুরো পৃথিবীও দিয়ে দেওয়া হয় তবু আমি এমন কোন কথা বলবো না।

চার.

সাফিয়্যা রাদিয়াল্লাহু আনহা বুদ্ধিমতী ছিলেন। একবার রাসূল সাল্লাল্লাহু আলায়হি ওয়াসাল্লাম তার উপর রাগ করলেন। সামান্য রাগই ছিল। কিন্তু সাফিয়্যা রাদিয়াল্লাহু আনহা যাকে নিজের চেয়েও যাকে বেশি ভালোবেসেছেন, তার সামান্য রাগই কীভাবে সহ্য করবেন। তাই তিনি রাগ ভাঙানোর জন্য অস্থির হয়ে পড়লেন। কিন্তু কী করে রাগ ভাঙাবেন! কোন উপায় খুঁজে পাচ্ছেন না। অনেক ভেবেচিন্তে একটি উপায় বের করলেন। আয়েশা রাদিয়াল্লাহু আনহাকে মধ্যস্থতায় আনতে হবে। তিনি ছাড়া এর সমাধান আর কেউ করতে পারবে না। কারণ রাসূল সাল্লাল্লাহু আলায়হি ওয়াসাল্লাম তাকে সবচেয়ে বেশি ভালোবাসেন। তার কথা নিশ্চয়ই রাসূল ফেলবেন না। আয়েশা রাদিয়াল্লাহু আনহার জন্য অন্যরকম হাদিয়া নিয়ে তার ঘরে গেলেন। আয়েশা রাদিয়াল্লাহু আনহার কাছে সব খুলে বললেন। বললেন তার অস্থিরতার কথা। আল্লাহর রাসূলের সাথে একটি রাত কাটানোর সৌভাগ্য আমি পৃথিবীর কোনোকিছুর বিনিময়ে ছাড়তে রাজি নই। কিন্তু আপনি যদি রাসূলের সাথে আমার মনোমালিন্যের বিষয়টি মিটিয়ে দিতে পারেন, তাহলে আমার এবারের পালার দিনটি আপনাকে দিয়ে দেবো।

আয়েশা রাদিয়াল্লাহু আনহা তো এ প্রস্তাব পেয়ে মহাখুশি। রাসূলকে কাছে পাবার সুযোগ তিনি হাতছাড়া করতে চান না। তাই তিনি এর সমাধান করার চেষ্টা করবেন বলে কথা দিলেন। বিকেলে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলায়হি ওয়াসাল্লাম আয়েশা রাদিয়াল্লাহু আনহার ঘরে এসে দেখলেন, তিনি সেজেগুজে বসে আছেন। রাসূল বললেন, আয়েশা! ব্যাপার কী? আজকে তো তোমার দিন নয়। খুব যে সেজেগুজে বসে আছো! আয়েশা রাদিয়াল্লাহু আনহা রহস্যময় ভঙ্গিতে জবাব দিলেন, সবকিছুই আল্লাহর ইশারায় হয়। তিনি যাকে ইচ্ছা তাকেই তার প্রতিদান দেন। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলায়হি ওয়াসাল্লাম কৌতুহলী হয়ে ঘটনা কী জানতে চাইলে, তিনি সাফিয়্যা রাদিয়াল্লাহু আনহার বিষয়টি খুলে বলেন। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলায়হি ওয়াসাল্লাম সব শুনে সাফিয়্যা রাদিয়াল্লাহু আনহার প্রতি খুশি হয়ে যান।

রাসূল সাল্লাল্লাহু আলায়হি ওয়াসাল্লাম জীবনের অন্তিম মুহূর্তেও এতিম, স্বজনহারা সাফিয়্যা রাদিয়াল্লাহু আনহার জন্য নিজের ভালোবাসা দেখিয়ে গেছেন। যিনি রাসুলকে ভালোবেসে তার হাত ধরে আত্মীয়স্বজন, পিতা-মাতা, সব ছেড়ে মদিনায় এসেছিলেন রাসূল সাল্লাল্লাহু আলায়হি ওয়াসাল্লাম তার ভালোবাসা, নির্ভরতার প্রতি কখনোই অবহেলা করেননি। ভালোবাসার সরোবরে তাকে সবসময় ডুবিয়ে রেখেছেন। তাকে ভুলিয়ে দিয়েছেন সব হারানোর বেদনা। অসহায় সাফিয়্যা রাদিয়াল্লাহু আনহার প্রতি তার সবসময় সজাগদৃষ্টি ছিল।

রাসূল যখন আয়েশা রাদিয়াল্লাহু আনহার ঘরে মৃত্যুশয্যায় কষ্ট পাচ্ছিলেন, তখন অন্য স্ত্রীদের সাথে সাফিয়্যা রাদিয়াল্লাহু আনহাও বসে কাঁদছিলেন। কোমলমতি সাফিয়্যা রাদিয়াল্লাহু আনহা রাসূলের কষ্ট দেখে সহ্য করতে পারছিলেন না। প্রিয়তমের যন্ত্রণা যেন তিনি  অনুভব করছিলেন। কষ্টের কারণে আপনাআপনি তার মুখ দিয়ে বের হয়ে আসলো, হে আল্লাহর রাসূল! আপনি যে কষ্ট ভোগ করছেন, তা যদি আমার হয়ে যেত…..!

এ কথায় অন্য উম্মুল মুমিনিনগণ তার দিকে একটু বাঁকা চোখে তাকালেন যেন। কিছুটা কানাঘুষাও নিজেদের মধ্যে শুরু করে দিলেন। ব্যাপারটা রাসূল সাল্লাল্লাহু আলায়হি ওয়াসাল্লামের চোখে পড়লো। তিনি তাদের বললেন, তোমাদের মুখ পবিত্র করা উচিত।

রাসূলের এমন কথা শুনে সবাই ভয় পেয়ে চমকে গেলেন। জিজ্ঞেস করলেন, কেন, হে আল্লাহর রাসূল!

রাসূল সাল্লাল্লাহু আলায়হি ওয়াসাল্লাম বললেন, তোমরা তোমাদের এক সখীর ব্যাপারে কানাঘুষা করছো। আল্লাহর কসম, তার কথাগুলো তার হৃদয় থেকেই বের হয়েছে।

বড়ো ভালোবাসতেন নবিজি তার এই নিঃস্ব প্রিয়তমাকে। আমৃত্যু তার পাশে থেকেছেন দায়িত্ববান এক বন্ধুর মতো।

পাঁচ.

রাসুলের মৃত্যুর পর চাপা স্বভাবের সাফিয়্যা রাদিয়াল্লাহু আনহা নিজেকে আরও গুটিয়ে নেন। কুরআন তেলাওয়াত করতে খুব ভালোবাসতেন তিনি। দিনের অধিকাংশ সময়ই নিজেকে কুরআন তেলাওয়াতে মগ্ন রাখতেন। নিজেকে আবৃত করেন নেন ইবাদত, বন্দেগির চাদরে। খুব চমৎকার কুরআন তেলাওয়াত করতেন তিনি। তার তেলাওয়াত শোনার জন্য আরবের নারীরা ভীড় করতো তার হুজরায়। বেহিসাব দান করতেন তিনি। রাসূলের পরে খেলাফত থেকে যে ভাতা  পেতেন তার বেশিরভাগই দান করে দিতেন। খায়বারের সম্পত্তির বেশিরভাগ অংশও দান করে দিয়েছিলেন। তিনি ১০টি হাদিস বর্ণনা করেছেন।

৫০ হিজরি সন। মুয়াবিয়া বিন আবু সুফিয়ানের খেলাফতকাল। সাফিয়্যা বিনতে হুয়াই রাদিয়াল্লাহু আনহার বয়স তখন মধ্য ষাটে। সেই সদ্য কৈশোর পেরিয়ে তারুণ্যে পা রাখা বয়েসে, সাফিয়্যা বিনতে হুয়াই রাদিয়াল্লাহু আনহা রাসূল সাল্লাল্লাহু আলায়হি ওয়াসাল্লামের হাত ধরে মদিনায় এসেছিলেন। রাসূলের সাথে তার দাম্পত্যকাল মাত্র ৪ বছর। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলায়হি ওয়াসাল্লামের তিরোধানের পর এতগুলো বছর ৪ বছরের দাম্পত্যের স্মৃতিকে আঁকড়ে ধরেই কাটিয়েছেন। মদিনায় আসার পর কতগুলো বছর কেটে গেছে। জীবনের পড়ন্ত বেলায় এসে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলায়হি ওয়াসাল্লামকে যেন আরও বেশি মনে পড়ে। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলায়হি ওয়াসাল্লামের সাথে দেখা করার জন্য দিলের তড়প যেন দিনে দিনে বাড়ছে। আসলে হয়তো তখনও তিনি বুঝতে পারেননি যে, রাসূল সাল্লাল্লাহু আলায়হি ওয়াসাল্লামের সাথে তার শীঘ্রই দেখা হচ্ছে। ৫০ হিজরিতেই রাসূল সাল্লাল্লাহু আলায়হি ওয়াসাল্লামের ভালোবাসায় ধন্য সাফিয়্যা বিনতে হুয়াই রাদিয়াল্লাহু আনহা আল্লাহর ডাকে সাড়া দিয়ে প্রিয়তমের সাথে মিলিত হলেন।

তথ্যসূত্র :

১.আল বিদায়া ওয়ান নিহায়া।

২.সিরাতে ইবনে হিশাম।

৩.আর রাহিকুল মাখতুম।

৪.সিরাতে মুস্তফা।

৫.যারকানী।

৬.তবাকাতে ইবনে সাদ।

আগের সংবাদশীতল হাওয়ার জীবন
পরবর্তি সংবাদঅচিনপুর