খৃস্টান জঙ্গিবাদ : যেভাবে বসনিয়ায় গণহত্যা সংঘটিত হয়

মুসান্না মেহবুব

আজ ১১ জুলাই। বসনিয়ার মুসলমানদের ওপর খ্রিষ্টান জঙ্গিদের চালানো নৃশংস গণহত্যার চব্বিশ বছর পূর্ণ হলো। ইতিহাসের নৃশসংতম এ হত্যাকাণ্ড জাতিসংঘের গাদ্দারি ও নীরব সর্মথনে পরিচালিত হয়েছিল। উগ্র খ্রিষ্টান সার্বিয়ানরা চালিয়েছিল এ গণহত্যা। শুধুই কি গণহত্যা? নির্মম নির্যাতন, গণহারে ধর্ষণ আর দেশ থেকে বিতাড়নের ভয়াবহতম অভিজ্ঞতার মধ্য দিয়ে যেতে হয়েছিল বসনিয়ার মুসলমানদের। ৪০ হাজার মুসলিম আদিবাসীকে সেদিন উৎখাত করা হয় বসনিয়ার স্রেব্রেনিচা থেকে। জবাই করা হয় আট হাজার মুসলমানকে। হত্যার পর তড়িঘড়ি করে মৃতদের গণকবর দেয়া হয়। হত্যাকাণ্ডের ভয়াবহতা গোপন করতে পরে গণকবর থেকে মৃতদেহগুলো তুলে আলাদা ৭০টি স্থানে পুঁতে ফেলে সার্ব সেনারা।

দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর ইউরোপের বড় রাষ্ট্রগুলো যখন একজোট হয়ে সমৃদ্ধির পথে এগিয়ে যাচ্ছিল, ঠিক তখন ইউরোপের অন্যতম পরাশক্তি যুগোস্লোভিয়াতে বিভক্তির গুঞ্জন শুরু হয়। যুগোস্লোভিয়ার রাষ্ট্রনায়ক মার্শাল টিটোর মৃত্যুর পর দেশটি বেশ কয়েকটি রাষ্ট্রে বিভক্ত হয়ে পড়ে। এর মাধ্যমে সার্বিয়া, ক্রোয়েশিয়া, মেসিডোনিয়া, বসনিয়া প্রভৃতি রাষ্ট্রের জন্ম হয়। কিন্তু ভিন্ন জাতীয়তাবাদে বিশ্বাসী রাষ্ট্রগুলোর মধ্যে বিভিন্ন বিষয়ে বিরোধ দেখা দেয়। আঞ্চলিক নেতারা সমঝোতায় পৌঁছাতে ব্যর্থ হয়। ফলে তারা একে অপরের বিরুদ্ধে এক নৃশংস গৃহযুদ্ধে জড়িয়ে পড়ে।

১৯৯১ সালে শুরু হয় গৃহযুদ্ধ। আর এ গৃহযুদ্ধে সবচেয়ে বেশি নৃশংসতা আর নিপীড়নের শিকার হয় মুসলিম জনগোষ্ঠী। ভূতপূর্ব যুগোস্লাভ প্রজাতন্ত্রে কয়েকটি জাতির বাস ছিল। এদের মধ্যে সার্ব (গোঁড়া খ্রিস্টান) ৩৬.৫%, ক্রোট (রোমান ক্যাথলিক খ্রিস্টান) ১৯.৭% এবং মুসলমান ৮.৯%। বাকিরা অন্যান্য জাতি। জনসংখ্যার দিক থেকে অত্র এলাকায় সার্ব ও ক্রোটদের সংখ্যাই বেশি। এই দু’টি জাতির প্রধান আবাসস্থল সার্বিয়া ও ক্রোয়েশিয়ার মধ্যবর্তী এলাকায় অবস্থান করছে বসনিয়া। ১৯৭১ সাল নাগাদ বসনিয়ায় মুসলমানরা একক বৃহত্তম জনগোষ্ঠীর প্রতিনিধিত্ব করত। পরবর্তী দুই দশকে, অসংখ্য সার্ব আর ক্রোয়াট বসনিয়ায় অভিবাসিত হন। এর ফলে ১৯৯১ এর এক আদমশুমারিতে দেখা যায়, বসনিয়ার ৪০ লাখ বাসিন্দার ৪৪ শতাংশ বসনিয়াক, ৩১ শতাংশ সার্ব, আর ১৭ শতাংশ ক্রোট।

গণহত্যা

পূর্ব বসনিয়ার তিনটি শহর–স্রেব্রেনিচা, জেপা, ও গোরাজদেকে ১৯৯৩-এ জাতিসংঘ ‘মুক্তাঞ্চল’ ঘোষণা করেছিল, যা নিরস্ত্রীকৃত ও রক্ষিত হওয়ার কথা ছিল আন্তর্জাতিক শান্তিরক্ষী বাহিনীদের দ্বারা। জাতিসংঘ কর্তৃক এলাকাগুলো মুক্তাঞ্চল ঘোষণার পর অন্যান্য এলাকার মুসলমানরাও নিরাপত্তার জন্য এ এলাকাগুলোতে এসে আশ্রয় নিয়েছিল। কিন্তু সার্ব খ্রিষ্টানদের থেকে নিজেদেরকে তারা এখানেও নিরাপদ মনে করতে পারছিলেন না। যেকোনো সময় সার্বরা আক্রমণ করে বসতে পারে। আর জাতিসংঘের নিরাপত্তারক্ষী, যারা এখানে পাহারারত ছিল, তাদের ওপরও মুসলমানরা ভরসা করতে পারছিল না। মুক্তাঞ্চল ঘোষণার পর কোনো ধরনের সসস্ত্র তৎপরতা চালাতে নিষেধ করা হয়েছিল তাদেরকে, কিন্তু তারা নিজেদের নিরাপত্তার কথা বিবেচনা করে আত্মরক্ষামূলক প্রস্তুতি নিয়ে রাখার আবেদন করেছিলেন জাতিসংঘের কাছে, জাতিসংঘ সে অনুমতি দেয়নি। ফলে পুরো অঞ্চলের মুসলমানদের কারও কাছে আত্মরক্ষার কোনো প্রস্তুতি তো দূর কি বাত, সামান্যতম কোনো অস্ত্রও ছিল না।

জাতিসংঘের মোতায়েনকৃত নিরাপত্তারক্ষীদের উপস্থিতিতেই অবশেষে ১৯৯৫-এর ১১ জুলাই সার্ব সেনারা রণসাজে স্রেব্রেনিচা এলাকায় আগমন করে। নিরাপত্তারক্ষীরা সামান্যতমও বাধা দেয়নি। তাদের চোখের সামনেই হিংস্র খ্রিষ্টান সার্ব সেনারা প্রথমে মুসলিম নারী ও শিশুদের আলাদা করে নেয়। তারপর পুরুষদেরকে গণহারে হত্যা করতে থাকে। শিশুরাও নিস্তার পায়নি এ নৃশংসতা থেকে। তবে নারীদেরকে বন্দী করে নিয়ে যায়। সার্বিয়ান বিশেষ শিবিরে নিয়ে চলানো হয় গণহারে ধর্ষণ। স্রেব্রেনিচায় সেদিন আট হাজারেরও অধিক মুসলমানকে হত্যা করে সার্ব বাহিনী। কিন্তু যে জাতিসংঘ এ অঞ্চলকে নিরাপদ বলে ঘোষণা করেছিল, সরবরাহ করেছিল শান্তিরক্ষী বাহিনী, তারা ভয়ানক নীরবতা পালন করেছিল প্রথমে। পরবর্তী সময়ে এ নিয়ে বিচার আদালত বসালেও এবং সে বিচার আজ অবধি চলতে থাকলেও, শান্তিরক্ষী বাহিনীর সেদিনকার ভূমিকা নিয়ে কোনো কথা বলেনি জাতিসংঘ।

শান্তিরক্ষী বাহিনী ও জাতিসংঘের গাদ্দারি

শান্তিরক্ষীদের আরও কিছু কারগুজারি বলি এ বিষয়ে। শান্তিরক্ষী সৈন্যরা ছিল হল্যান্ডের অধিবাসী। জাতিতে এরাও খ্রিষ্টান। তারা যখন বসনিয়ায় শান্তি মিশনে এল, জঙ্গি সার্বরা হল্যান্ডের ১৪ জন সেনাকে অপহরণ করে নিয়ে যায়। শান্তি রক্ষীরা স্বদেশী ওই ১৪ শান্তিরক্ষীকে মুক্ত করার জন্য বসনিয়ায় তাদের ঘাঁটিতে আশ্রয় নেয়া প্রায় ৫ হাজার বসনিয় মুসলমানকে জঙ্গি সার্বদের হাতে তুলে দেয়। এদিকে আরেকটি চুক্তিও হয়ে যায় উভয় বাহিনীর মধ্যে। সার্ব জঙ্গিরা হল্যান্ডের শান্তিরক্ষীদের নিরাপত্তা বিধানের প্রতিশ্রুতি দিয়েছিল এবং এর বিনিময়ে জাতিসংঘের শান্তিরক্ষীরা জঙ্গিদের ওপর বিমান হামলা চালাবে না বলে কথা দেয়। নীল টুপি পরা হল্যান্ডের শান্তিরক্ষীরা সার্বদের হামলা ঠেকানোর জন্য হল্যান্ড সরকারের বা ন্যাটোর সহায়তা চাইতে পারত। কিন্তু তারা তা না করে সেব্রেনিসা শহরটির নিরস্ত্র মুসলমানদেরকে বর্ণবাদী সার্বদের হাতে ছেড়ে দেয়। শান্তিরক্ষীরা মুসলমানদের রক্ষার জন্য বিন্দুমাত্র চেষ্টা চালায়নি। এমনকি শান্তিরক্ষী বাহিনীর প্রধান সার্বদের হাতে ওই শহর দখলকে ‘যৌক্তিক পদক্ষেপ’ বলে মন্তব্য করেছিলেন। হল্যান্ডের ওই কর্নেল ও তার অধীনস্থ সেনারা স্বদেশে ফিরে যাওয়ার পর সেখানে ব্যাপক অভ্যর্থনা পায় এবং তাদের পুরস্কারও দেয়া হয়।

সেব্রেনিচার গণহত্যায় নিহত ব্যক্তিদের আত্মীয়-স্বজন ওই গণহত্যা প্রতিরোধে নিস্ক্রিয়তা ও গণহত্যায় সহায়তার জন্য দায়ী এসব শান্তিরক্ষীদের বিরুদ্ধে মামলা দায়ের করার উদ্যোগ নিলেও হেগের আদালত ওই মামলা গ্রহণ করেনি। বসনিয়ার গণহত্যা শেষে সেখানকার জাতিগত শুদ্ধি অভিযান সম্পর্কে গঠিত তদন্ত কমিটির রিপোর্টে সেব্রেনিচায় গণহত্যা ঠেকানোর ব্যাপারে হল্যান্ড সরকার ও জাতিসংঘের অবহেলার কথা স্বীকার করা হয়েছে। কিন্তু ওই মারাত্মক দায়িত্বজ্ঞানহীনতার জন্য এ পর্যন্ত হল্যান্ড এবং জাতিসংঘের তৎকালীন কোনো কর্মকর্তাকে কখনও বিচারের সম্মুখীন করা হয়নি।

নিরাপত্তা দেওয়ার নাম করে আদতে ওই গণহত্যার পরিকল্পনায় জড়িয়ে পড়েছিল মানবতা ও শান্তির ধ্বজাধারী তথাকথিত জাতিসংঘ। বসনিয়ার এ গণহত্যায় খ্রিষ্টান সার্ব সেনারা যতটা না অপরাধ করেছে, তারচেয়ে ঢের বেশি অপরাধ খ্রিষ্টানদের পালিত জাতিসংঘ করেছে। জাতিসংঘের এ গাদ্দারি ইতিহাস কখনো ক্ষমা করবে না।