খেলাফত বিলুপ্তির একশো বছর, পতনের সঙ্কটকে ইসলামী জ্ঞানতত্ত্ব কীভাবে দেখে?

পৃথিবীতে খেলাফতব্যবস্থা বিলুপ্তির ৯৪ বছর পার হচ্ছে। ১৯২৪ সালের ৩ মার্চ খেলাফতের সর্বশেষ ধারা উসমানি খেলাফতের আনুষ্ঠানিক বিলুপ্তি ঘটেছিল। তারপর থেকে এ ব্যবস্থা ফিরিয়ে আনার ব্যাপারে খুব একটা চেষ্টা যেমন লক্ষ করা যায়নিতেমনি এই ব্যবস্থা নিয়ে পড়াশোনা কিংবা গবেষণার আগ্রহও ধীরে ধীরে হারিয়ে যাচ্ছে। খেলাফতের এই মহান ধারাটি নিয়ে ফাতেহ টোয়েন্টি ফোর কথা বলেছে হুসাইন মুহাম্মদ নাইমুল হকের সঙ্গে। 

হুসাইন মুহাম্মদ নাইমুল হক পড়াশোনা করেছেন চট্টগ্রামের দারুল মাআরিফ এবং দারুল উলুম হাটহাজারীতে। পরবর্তীতে কাতার বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ফিকাহ বিষয়ে অনার্স, মাস্টার্স ও এমফিল করেছেন। বর্তমানে কাতার বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষণা সেন্টার ইবনে খালদুনে পূর্ণকালীন গবেষক হিসেবে কর্মরত আছেন। খেলাফত ব্যবস্থা নিয়ে পাঠদান ও লেখালেখিসহ বিভিন্ন সেমিনার-সিম্পোজিয়ামে আলোচনা করেছেন। খেলাফত ব্যবস্থার নানা দিক নিয়ে আলাপ হয়েছে তাঁর সঙ্গে। ইফতেখার জামিলের নেওয়া সাক্ষাৎকার গ্রন্থনা করেছেন হামমাদ রাগিব।

  আনুষ্ঠানিকভাবে খেলাফত পতনের প্রায় একশো বছর হতে চলল। খেলাফতের শেষ সময়ে একদিকে শুরাবিহীন খেলাফতের সমর্থনঅন্যদিকে তাকে স্বৈরাচারী বা পরিপূর্ণ ইসলামি নয় ব্যাখ্যা দিয়ে বিরোধিতা। একশো বছর পরে এসে এই দ্বিমতকে কীভাবে মূল্যায়ন করবেন?

বিসমিল্লাহির রাহমানির রাহীম। উম্মাহর বর্তমান ধর্মীয়সামাজিক ও রাজনৈতিক অবস্থান থেকে আপনার প্রশ্নটি খুবই গুরুত্বপূর্ণ। তবে উত্তর দেওয়ার আগে আমি দুটি বিষয় স্পষ্ট করা সঙ্গত মনে করছি।

এক. রাষ্ট্রব্যবস্থার সাথে সম্পৃক্ত বিষয়গুলো সাধারণত জটিল। কারণ তাতে এক কথায় সমাধান দেওয়া অনেক ক্ষেত্রে কঠিন। পাশাপাশি আমাদের আলোচনা যখন খেলাফতের মতো একটি গুরুত্বপূর্ণ ও স্পর্শকাতর বিষয়ে হচ্ছেযা দীর্ঘ আলোচনা সাপেক্ষা বিষয়তাই আমাদের এই সংক্ষিপ্ত সাক্ষাৎকারের মাধ্যমে বিষয়টি খোলাসা করা যাবে না। হ্যাঁকিছু বিষয় স্পষ্ট হতে পারে। কিছু বিষয়ে নতুনভাবে চিন্তার ক্ষেত্র তৈরি হতে পারে। এই যা। তাই এই আলোচনাকে খেলাফতের বিষয়ে চূড়ান্ত কিছু ভাবার সুযোগ নেই।

দুই. আলোচনা যেহেতু খেলাফত সম্পর্কেই হচ্ছেএবং খেলাফত একটি  পরিভাষাতাই আলোচনার আগে পরিভাষাটি স্পষ্ট করা উচিত। ইসলামি জ্ঞানতত্ত্বে খেলাফত পরিভাষার বিভিন্ন প্রয়োগ থাকলেও ইসলামি সাংবিধানিক আইন’-এ তার সংজ্ঞা হলোইসলামের নির্দেশিত পদ্ধতি অনুসরণে রাষ্ট্র পরিচালনা করা।

এবার আপনার প্রশ্নের উত্তরে আসা যায়। খেলাফত যেহেতু ইসলামি সাংবিধানিক আইনের পরিভাষায়রাস্ট্র পরিচালনার ইসলামি পদ্ধতি অনুসরণের নামতাই খেলাফত সম্পর্কে অন্যদের মতামত মূল্যয়নের জন্য আমাদেরকে ইসলামের কাছেই ফিরে যাওয়া উচিত। কারণইসলামই এ বিষয়ে শুদ্ধাশুদ্ধি যাচাইয়ের মাপকাঠি।

কুরআন, সুন্নাহ ও ফিকহে ইসলামিকে সামনে রাখলে দেখা যায়প্রশ্নে উল্লেখিত দুটি অবস্থানের কোনটিই এককভাবে সঠিক নয়। কারণ ইসলাম শুরা বা পরামর্শ নির্ভর খেলাফত ব্যবস্থার কথা বলে। তাই শুরাবিহীন খেলাফত ব্যবস্থা ইসলামি আইন-বিরুদ্ধ। আর শুরাবিহীন একনায়কতন্ত্র ইসলামি দৃষ্টিকোণ থেকে সঠিক নয়। তার মানে এই নয় যে শুরানির্ভর না হওয়ার কারণে যারা খেলাফতের পুরো প্রক্রিয়াটার বিরুদ্ধাচারণ করছেন তাদের বক্তব্য সঠিক।

নাতাও সঠিক নয়। কারণশুরাব্যবস্থা খেলাফতের একটি অংশযদিও তা গুরুত্বপূর্ণ অংশতবে তা পুরো খেলাফত ব্যবস্থা নয়। তাই আংশিক ভুলের কারণে পুরো ব্যবস্থাকে ভুল বলা শরয়ি ও যুক্তির মানদণ্ডে গ্রহনযোগ্য নয়। তাছাড়া, খেলাফত ব্যবস্থার পুরো সময়কাল শুনাবিহীন ছিল তেমনটিও না। তাই কিছু ভুলের কারণে যদি পুরো প্রক্রিয়াকে অস্বীকার করা হয়তাহলে তার বিকল্প কী হবে? বিকল্প প্রস্তাব ছাড়া কোন ব্যবস্থা অস্বীকার করা ইসলামি এপ্রোচ নয়।

তাই আমার মনে হয়আমাদের দীর্ঘ ১৩শ বছরের খেলাফতের ইতিহাসে কিছু ভুলত্রুটি ছিল। কোনো কোনো পর্যায়ে স্বৈরাচারিতাএকনায়কতন্ত্রের মতো ইসলাম-বিরোধী আচরণও ছিল। তবে এমন ভুল পুরো খেলাফতকালে স্থায়ী ছিল না। সুতরাং কিছু ভুলের কারণে পুরো ব্যবস্থাটাকে অস্বীকার করার সুযোগ নেই।

খেলাফতের সংজ্ঞা আসলে কীখেলাফতে কামেলা-নাকেসাদাওলায়ে মুতাগাল্লেবা-মুলুকিয়াত–এই পরিভাষাগুলোকে কীভাবে ব্যাখ্যা করবেন?

খেলাফতের সংজ্ঞা আগেই উল্লেখ করা হয়েছে। যা মাওরদিতাফতাজানিইবনে খালদুনরশিদ রেজা ও তাকি উসমানীসহ বহু ইসলামি সাংবিধানিক আইনজ্ঞদের দেওয়া সংজ্ঞার সারসংক্ষেপ। এই সংজ্ঞাকে সামনে রেখে খেলাফতের বাস্তবিক প্রয়োগে এলে দেখা যাবেকোনো কোনো সময় খেলাফতব্যবস্থা পূর্ণ ইসলামের নির্দেশনা অনুসারে পরিচালিত হয়েছে। যেমনখোলাফায়ে রাশেদিনের সময়কাল। আবার কোনো কোনো সময় সংজ্ঞাগত খেলাফত এবং প্রয়োগিক খেলাফতের মাঝে কিছুটা দূরত্ব তৈরি হয়েছে। প্রথমোক্ত খেলাফতটি খেলাফতে কামেলা বা পূর্ণাঙ্গ ইসলামি খেলাফত ব্যবস্থা। দ্বিতীয়োক্ত খেলাফতটি খেলাফতে নাকেসা বা অপূর্ণ খেলাফত ব্যবস্থা।

তাহলে দেখা যাচ্ছেখেলাফত ব্যবস্থার সাথে পূর্ণ বা অপূর্ণ’ বিশেষণ যোগের মাপকাটি হলো তার সাথে ইসলামে নির্দেশনার সম্পৃক্ততা। তাই দাওলায়ে মুতাগাল্লেবা ও মুলুকিয়াত খেলাফতে নাকেসার উদাহরণ। কারণদাওলায়ে মুতাগাল্লেবা হলোযে রাষ্ট্রের শাসনভার এক বা একাধিক শক্তিধর ব্যক্তি জাতির মতামত ব্যতিরেকে জোরপূর্বক গ্রহণ করে নেয়।

এরূপ জোরপূর্বক শাসনভার গ্রহণ করা ইসলামে বিশুদ্ধ নয়। ইসলামের দৃষ্টিতে তা কবিরা গুনাহ বা মহাপাপ।কারণ তাতে উম্মাহর সাংবিধানিক অধিকার খর্ব হয়। তাই এ ধরনের ব্যক্তির মাধ্যমে পরিচালিত খেলাফত, বাকি সব ইসলামি হুকুম মেনে চললেও, খেলাফতে নাকেসা।  মুলুকিয়াত বা রাজতন্ত্রের ব্যাপারে একই কথা। কারণইসলামি রাষ্ট্রক্ষমতা কোনো ব্যক্তি ও তার পরিবার কুক্ষিগত রাখার অনুমোদন ইসলামে নেই। তাই ইসলামি অন্যান্য নির্দেশনা মেনে চললেও রাজতন্ত্র খেলাফতে কামেলা হতে পারে না।

এখানে আরেকটি বিষয় স্পষ্ট করা উচিত। খেলাফতে নাকেসা যদিও ইসলামের কোনো কোনো হুকুমের সাথে সাংর্ঘষিকতারপরও অনন্যোপায় হলে ফকিহগণ তার অনুমোদন দিয়েছেন। অর্থাৎ জোরপূর্বক ক্ষমতা গ্রহণকারীর অধীনে পরিচালিত ইসলামসিদ্ধ কাজগুলো বৈধ ধরা হবে। যদিও খলিফা বা রাষ্ট্রপ্রধান নিজেই অবৈধ। এবং তিনি মহাপাপে জড়িত। তবে তাঁর অধীনে যেসব  আইনিভাবে সিদ্ধ কর্ম সম্পাদন হবেপরবর্তীকালে বৈধ খলিফা এসে তা বাতিল করার অধিকার রাখেন না।

এ বিষয়টি শুধু ইসলামি আইনের সাথে সম্পৃক্ত নয়। প্রচলিত আইনেও এই নীতির প্রয়োগ আছে। কোনো ব্যক্তি জোরপূবর্ক ক্ষমতা গ্রহণ করলে বা আইনবর্হিভূত কোনো দায়িত্বপালন করলে গ্রিক আইনানুসারে তাকে De Facto  বলে। যার অর্থ ঐ ব্যক্তির মাধ্যমে সংঘটিত বৈধ কাজগুলো সঠিক বলে ধরে নেওয়া হবে। প্রাচীন গ্রিকদের এই De Facto নীতি আধুনিক ইউরোপীয় প্রায় সব আইনে প্রচলিত আছে।

আনুষ্ঠানিকভাবে খেলাফত পতনের পর মুসলিম বিশ্বে উপনিবেশ-বিরোধী আন্দোলনের অংশ হিসেবে জাতিরাষ্ট্র গড়ে উঠল। পাকিস্তান-ভারতও একই ধারাবাহিকতায় প্রতিষ্ঠিত হয়। পরবর্তীকালে কেউ কেউ কনফেডারেশন করার প্রস্তাব দিয়েছেন। কনফেডারেশন কি খেলাফতের মর্যাদা পেতে পারে?

জাতিরাষ্ট্রের কনসেপ্ট আরও পুরনো। খেলাফত পতনের সাথে সম্পৃক্ত নয়। ইউরোপে মূলত জাতিরাষ্ট্র গড়ে উঠেছে ১৬৪৮ সালের ওয়েস্টফালিয়া চুক্তির পর। তাই এই চুক্তিকে আধুনিক জাতিরাষ্ট্রের জন্মসূত্র হিসেবে দেখা হয়। আরববিশ্বে ব্রিটিশদের ইন্ধনে সর্বশেষ শক্তিশালী উসমানি খলিফা সুলতান দ্বিতীয় আব্দুল হামিদের পতনের পর ১৯০৮ সাল থেকে জাতিরাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার প্রক্রিয়া শুরু হয়। এর নেতৃত্ব দেন তৎকালীন হিজাজের উসমানি গভর্নর শরিফ হোসাইন ও তাঁর সন্তানেরা। যেমনটা হিজাজে নিয়োজিত ব্রিটিশ গোয়েন্ট টমাস এডওয়ার্ড লোরান্স তাঁর লিখিত Seven Pillars of Wisdom বইয়ে স্পষ্টভাবে উল্লেখ করেছেন।

হ্যাঁআমাদের উপহমহাদেশের প্রেক্ষিতে খেলাফত-পরবর্তী সময়ে জাতিরাষ্ট্রের ধারণা প্রয়োগ হয়েছে। এবং তা উপনিবেশ-বিরোধী আন্দোলনের অংশ হিসেবে গড়ে ওঠে। তবে এক্ষেত্রে যে বিশেষ পার্থক্য লক্ষ্য করবেন তা হলোইউরোপের জাতিরাষ্ট্রগুলো মূলত ধর্ম থেকে বেরিয়ে এসে গড়ে উঠেছিল। কারণওয়েস্টফালিয়া চুক্তি শর্তানুসারে গির্জার ক্ষমতা সংকুচিত হয়ে পড়েছিল।

কিন্তু উপমহাদেশে প্রেক্ষিতে এসে ধর্মই হয়ে দাঁড়াল জাতিরাষ্ট্রের মূল ভিত্তি! যার প্রমাণ ইসলাম ও হিন্দু ধর্মের ভিত্তিতে পাকিস্তান ও ভারত নামের দুটো রাষ্ট্রের প্রতিষ্ঠা। তার মানে জাতিরাষ্ট্রের ইউরোপীয় ভিত্তি উপমহাদেশে এসে অকেজো হয়ে গেল। ইংরেজ সরকার ক্ষমতায় থেকেও সে ভিত্তি রক্ষা করতে পারে নি। কারণপ্রতিটি জাতিগোষ্ঠীর নিজস্ব কিছু সাংস্কৃতিক ও ঐতিহ্যগত ভিত্তি রয়েছে। সামাজিকরাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক ক্ষেত্রে ‌এসব ভিত্তি ডিঙিয়ে যাওয়া সম্ভব নয়

এখানে আমাদের অতি উৎসাহি সেক্যুলার বুদ্ধিজীবিদের জন্য যে শিক্ষার বিষয় তা হলোপশ্চিমাদের সবকিছু আমাদের সমাজে প্রয়োগযোগ্য নয়। খোদ পশ্চিমারাই সে কাজ করে যেতে পারে নি। তাই আমাদের দেশে পশ্চিমা এজেন্ডা বাস্তবায়নের বাজি ব্যর্থ হওয়া সামাজিক প্রক্রিয়ার অংশ মাত্র। তবে হ্যাঁসেক্যুলাররা যদি কিছুটা তাদের প্রচেষ্টায় আর কিছু কিছুটা আলেমওলামা ও মুসলিম নেতৃবৃন্দের অসর্তকতাবশত পুরো সমাজব্যবস্থা পরিবতর্ন করে দিতে সক্ষম হন তা ভিন্ন কথা। আমাদের বর্তমান আর্থ-সামাজিক-রাজনৈতিক অবস্থা পর্যবেক্ষণ করলে দ্বিতীয়টি বাস্তবায়ন হওয়ার সম্ভাবনা অনেক বেশি। আল্লাহ সেটা না করুন। তাই মুসলিম নেতৃবৃন্দেরবিশেষতশিক্ষিত শ্রেণীর খুব সতর্ক থাকা এবং উদ্যমী হওয়া উচিত।

এবার কনফেডারেশনের বিষয়ে আসা যাকএকটি কনফেডেরাল রাষ্ট্র Confederal State একাধিক প্রদেশ দ্বারা ঘটিত হয়। প্রদেশগুলো অভ্যন্তরীণ বিষয়ে স্বাধীন হলেও কিছু মৌলিক বিষয়ে একই নীতি অনুসরণ করে থাকে। যেমন প্রতিরক্ষাব্যবস্থাপররাষ্ট্রনীতিঅর্থব্যবস্থা ইত্যাদি। এর অর্থ হলো,রাষ্ট্রের মৌলিক বিষয়গুলোর ক্ষেত্রে সব প্রদেশ একই নীতি অনুসরণ করবে। ভেতরগত বিষয়ে প্রত্যেকের পূর্ণ স্বাধীনতা থাকবে।

কনফেডেরাল রাস্ট্রের এই নীতি ইসলামি রাষ্ট্রের প্রদেশগুলোর ক্ষেত্রে প্রয়োগ করলে দেখা যাবেমৌলিক বিষয়গুলোর পাশাপাশি অভ্যন্তরীণবিষয়গুলোর মাঝে খুব বেশি পার্থক্য থাকবে না। কারণশেষ পর্যন্ত সব প্রদেশ অভ্যন্তরীণ বিষয়েও ইসলামের নির্দেশনা অনুসরণ করে চলবে। যেহেতু তা ইসলামি প্রদেশ। ফলে কনফেডেরাল স্টেইটের ধারণা অনেকটা একক খেলাফতব্যবস্থার কাছাকাছি এসে যায়। এটা আমার একান্ত ধারণা। এ মূহুর্তে আমার কাছে এ ধারণার স্বপক্ষে সুস্পষ্ট কোনো দলিল নেই। তাই কনফেডেরাল রাষ্ট্র খেলাফতের মর্যাদা পেতে পারে কথাটা জোর দিয়ে বলতে পারব না।

 খেলাফত কতটুকু ধর্মীয় আর কতটুকু ঐতিহাসিক?

আগেই বলেছিইসলামি সাংবিধানিক আইনানুসারে খেলাফত হলো রাষ্ট্র পরিচালনা ইসলামি পদ্ধতি অনুসরণের নাম। তাহলে একথা স্পষ্ট যে খেলাফত ধর্মীয় কনসেপ্টঐতিহাসিক নয়। হ্যাঁসময়ের পরিক্রমায় প্রয়োগিক ক্ষেত্রে কিছু বিষয় মাধ্যম বা অবলম্বন হিসেবে খেলাফত ব্যবস্থায় যোগ হয়েছে। যেমন আব্বাসিয়া ও উসমানীয়দের সময় বিভিন্ন মন্ত্রণালয়ের যোজন-বিয়োজন হয়েছে। এসব বিষয় যেহেতু মূল লক্ষ্য অর্জনের একান্ত মাধ্যম হিসেবে ব্যবহৃত হয়েছে এবং ইসলামের কোনো হুকুমের সাথে তার বিরোধ নেইতাই এসব ক্ষেত্রে পরিবর্তন আসতে পারে। যেমন শুরাব্যবস্থার শক্তিশালী করার মাধ্যমে খলিফা বা রাষ্ট্রপ্রধানের ক্ষমতা সংকুচিত করা। কেননা ব্যপক ক্ষমতার কারণে স্বৈরাচারিতার সম্ভাবনা বেশি থাকে

এমনকি খেলাফত পরিভাষার পরিবর্তে অন্য পরিভাষাও ব্যবহার করা যেতে পারে। কারণইসলামে পরিভাষাগুলো মূল লক্ষ্যণীয় বিষয় নয়বরং পরিভাষাগুলোর উদ্দেশ্য পূর্ণ হওয়াই মূল বিষয়। তাই হজরত ওমর রাদিয়াল্লাহু আনহু বনু তাগলিবের কাছ থেকে জিজিয়া নিয়েছেন ভিন্ন পরিভাষায়। কারণ বনু তাগলিবের জিজিয়া-পরিভাষার উপর অভিযোগ ছিল।

এখন অনেকে খেলাফত দাবি করছেন। তাদের সাথে আলেমরা ঠিক কী অর্থে দ্বিমত করছেন বা আগামীতে একটা রাষ্ট্রকে ঐতিহাসিক বা ধর্মীয় খেলাফত হয়ে উঠতে হলে মৌলিক কী কী শর্ত পূরণ করতে হবে?

আমার মনে হয়এ মুহূর্তে যারা খেলাফতের দাবি করছেন তাঁদের মধ্যে কিছু আলেমও রয়েছেনসবাই যে সাধারণ মানুষ তেমনটা নয়। তবে খেলাফত দাবির বিষয় নয়। বরং প্রয়োগিক বিষয়। আগেই বলা হয়েছে ইসলামের নির্দেশনা অনুসারে রাষ্ট্রপরিচালনার নাম খেলাফত। তাই রাষ্ট্রপরিচালনার ক্ষেত্রে ইসলামের নির্দেশনাগুলোযেমন কোরআন-সুন্নাহকে মূল সংবিধান হিসেবে মেনে নেওয়া তা প্রায়োগিক ক্ষেত্র বাস্তবায়ন করা,পূর্ণ অনুসরণের মাধ্যমে রাষ্ট্রব্যবস্থা প্রতিষ্ঠা হলেই খেলাফত প্রতিষ্ঠা হবে। খেলাফত নামে নামকরণ না করলেও খুব বেশি সমস্যা আছে বলে মন হয় না। আর রাষ্ট্রব্যবস্থায় ইসলামি দিক-নির্দেশনা প্রতিষ্ঠা করা ছাড়াবা ইসলাম-বহির্ভূত পদ্ধতিতে ক্ষমতা দখলের মাধ্যমে খেলাফত প্রতিষ্ঠার চেষ্টা করা কোনোটাই সঠিক নয়।

 ফাতেহ টোয়েন্টি ফোরকে সময় দেয়ার জন্য শোকরিয়া। জাযাকাল্লাহ। 

ফাতেহকেও মুবারকবাদ গুরুত্বপূর্ণ একটা বিষয় নিয়ে হাজির হবার জন্য। আল্লাহ তায়ালার কাছে ফাতেহের উত্তরোত্তর সফলতা কামনা করছি। শেষ করার আগে আবারও বলছিআমাদের এই আলোচনা খেলাফত ব্যবস্থার সব দিক স্পষ্টভাবে বোঝার জন্য যথেষ্ট নয়। এর জন্য গভীর পড়াশোনা,গবেষণাআলোচনা ও পর্যালোচনার প্রয়োজন। আল্লাহ তায়ালা আমাকেআপনাকে এবং সকলকে ইসলামের সব হুকুম ইসলামি পদ্ধতিতে যথাযথ পালনের তৌফিক দান করুন।