গাজালির দৃষ্টিতে ইসলামের খাদ্যদর্শন

খাজা হাসান মুঈনুদ্দীন:

খাদ্য এবং উপার্জনের বৈধতা-অবৈধতার মানদন্ড ঠিক কি! কিভাবে তৈরি হবে মুসলিম খাদ্যের নৈতিক ব্যবস্থাপনা! খাদ্য কি নিছক ভোগের জিনিস নাকি এর সঙ্গে আছে পরকালের গভীর সংযোগ। গাজালির দৃষ্টিতে ইসলামের খাদ্যদর্শন শীর্ষক আলোচনার মাধ্যমে আমরা একটি সুষ্ঠু নির্দেশনা হাজির করতে চাই।

ইমাম গাজালি বলেন, আল্লাহ তাআলা পরকালকে প্রতিদান ও শাস্তির কেন্দ্র সাব্যস্ত করেছেন এবং ইহকালকে করেছেন মেহনত ও উদ্যম সহকারে কর্মতৎপর হয়ে উপার্জন করার স্থান। কেবল পরকালীন চিন্তায় ব্যস্ত থাকার মধ্যেই ইহলৌকিক তৎপরতা সীমিত নয়; বরং জীবিকার চিন্তাও পরকালীন চিন্তার উপায় ও সহায়ক। ইহকাল থেকেই ক্রমান্বয়ে আসে পরকালের স্তর। এ ক্ষেত্রে মানুষকে তিন শ্রেণীতে বিভক্ত করা যায়- এক. যারা পরকাল-ভাবনায় জীবিকার প্রতি উদাসীন। দুই.যারা জীবিকার মধ্যে এমনই বিভোর হয় যে, পরকালের কথা বেমালুম ভুলে যায়। এরা বিধ্বস্ত ও ধ্বংসপ্রাপ্তদের দলের অন্তর্ভুক্ত। তিন. যারা সমতার খুব নিকটবর্তী; অর্থাৎ, জীবিকার কাজকর্ম পরকালের জন্যেই করে, তারা মধ্যপন্থী ও মধ্যবর্তী সম্প্রদায়। বলাবাহুল্য, যে ব্যক্তি জীবিকা অন্বেষণে নিজের জন্যে সততার পথ অপরিহার্য করে নেয় না, সে কখনও মধ্যবর্তিতার স্তর লাভ করতে সক্ষম হবে না এবং যে পর্যন্ত জীবিকা অন্বেষণে শরীয়তের আদবসমূহের অনুসারী হবে না, তার জন্যে দুনিয়া কখনও আখেরাতের ওসিলা হবে না !

এখানে প্রথম প্রকারের হিসেব বাদ। তাদের কাছে দুনিয়ায় তুলনায় পরকাল মুখ্য। দুনিয়া তাদের কাছে পরগাছা। তাদের সংখ্যা খুবই নগন্য। সমাজের বৃহত্তর অংশকে নিয়ে আমাদের আলাপ। এর মধ্যে একদল আছে যারা আখেরাতকে ভুলে দুনিয়ায় মোহে বুদ হয়ে আছে। ইমাম গাজালি তাদেরকে সুস্পষ্ট পথভোলা মানুষ বলে আখ্যায়িত করেছেন। তাদের সহ বাকিদের সরল পথ কেমন হবে তা তৃতীয় প্রকারে উল্লেখ করেছেন। পার্থিব জীবনে আয়-রোজগার ও কাজকর্ম সব পরকালের জন্যেই হবে। দুনিয়াতে জীবিকার জন্যে ছুটাছুটি হবে কেবল আখেরাত হাসিলের জন্যই।

মানুষের জীবনে গুরুত্বপূর্ণ একটা সময় ব্যয় হয় খাদ্য সংক্রান্ত ব্যাপারে। জীবিকার তাগিদে উপার্জনের নানান কর্মপন্থা আমাদের বেছে নিতে হয়। তবে সব পন্থা ইসলামের উসুল বিধিত নয়। আর সব খাদ্যের বৈধতাও ইসলাম দেয় না। ইসলাম জীবনোপকরণকে সহজসাধ্য, সুস্পষ্ট, ও পবিত্র করার নিমিত্বে সঠিক ও বৈজ্ঞানিক নির্দেশনা দিয়েছে। এই নির্দেশনা বহির্ভূত যাবতীয় উপার্জনই হারাম বা অবৈধ হিসেবে বিবেচিত হবে। ইমাম গাজালি বলেন, খাদ্যবস্তু স্বয়ং হালাল হতে হবে। তারপর উপার্জনের কর্মপন্থাও বৈধ ও হালাল হওয়াটা নিশ্চিত করতে হবে। আল্লাহ তাআলা কুরআনে বলেন,
يَٰٓأَيُّهَا ٱلنَّاسُ كُلُواْ مِمَّا فِي ٱلۡأَرۡضِ حَلَٰلٗا طَيِّبٗا وَلَا تَتَّبِعُواْ خُطُوَٰتِ ٱلشَّيۡطَٰنِۚ إِنَّهُۥ لَكُمۡ عَدُوّٞ مُّبِينٌ
হে মানুষ! পৃথিবীতে হালাল ও তাইয়্যেব যা রয়েছে তা থেকে আহার কর। আর শয়তানের পদাঙ্ক অনুসরণ করো না, নি:সন্দেহে সে তোমাদের প্রকাশ্য শত্রু। (সুরা বাকারাহ- ১৬৮)।
এখানে আল্লাহ তাআলা মানব জাতিকে সম্বোধন করে হালাল ও তাইয়্যিব যা রয়েছে তা থেকে আহার করতে বলেছেন। অধিকাংশ মুফাসসিরগণ আয়াতে হালাল শব্দ দ্বারা মূলগত বৈধতার এবং তাইয়্যিব দ্বারা পদ্ধতিগত বৈধতার অর্থ গ্রহণ করেছেন। কোন বস্তু তাইয়্যিব বা উত্তম হওয়ার অর্থ হলো তাতে অন্যের অধিকার সম্পৃক্ত না থাকা।
وَلَا تَأۡكُلُوٓاْ أَمۡوَٰلَكُم بَيۡنَكُم بِٱلۡبَٰطِلِ وَتُدۡلُواْ بِهَآ إِلَى ٱلۡحُكَّامِ لِتَأۡكُلُواْ فَرِيقٗا مِّنۡ أَمۡوَٰلِ ٱلنَّاسِ بِٱلۡإِثۡمِ وَأَنتُمۡ تَعۡلَمُونَ
তোমরা নিজেদের মধ্যে একে অপরের সম্পদ অবৈধ পন্থায় গ্রাস করো না এবং মানুষের ধন-সম্পত্তির কিয়দাংশ জেনে শুনে অন্যায়ভাবে গ্রাস করার উদ্দেশ্যে তা বিচারকগণের নিকট পেশ করো না।( সুরা নিসা-২৯)।

উপরোক্ত আয়াত দ্বারা সুষ্পষ্টভাবে প্রতিভাত হয় যে, উপার্জনের পদ্ধতি ও পন্থা অবশ্যই বৈধ হতে হবে। অন্যথায় কঠোর শাস্তির ঘোষনা রয়েছে। আর এ ধরনের উপায় জুলুমের নামান্তর। যার পরিণতি খুবই ভয়াবহ। অতএব প্রত্যেক মুসলমানের একান্ত উচিৎ উপার্জনের ক্ষেত্রে উপর্যুক্ত দু’টি বিষয়ের প্রতি গুরুত্বারোপ করা।
উপার্জন পদ্ধতি কেবল বৈধ হলেই চলবে না। ইমাম গাজালি সাথে আরো দুটি গুণ যুক্ত করেন। তিনি বলেন, তা সুন্নত ও তাকওয়ার পন্থা মোতাবেক হতে হবে। শরীয়ত গর্হিত কোন পন্থায় এবং খেয়াল খুশিমতো কোন উপায়ে উপার্জিত না হওয়া চাই। আল্লাহ তাআলা পবিত্র খাদ্য খাওয়ার আদেশ করেছেন। তিনি হত্যা নিষিদ্ধ করার পূর্বে অবৈধ পন্থায় উপার্জন সামগ্রী ভক্ষণ নিষিদ্ধ করেছেন, যাতে হারাম সামগ্রী অত্যন্ত মন্দ এবং হালাল সামগ্রী খুব বড় জ্ঞান করা হয়।
ইমাম গাজালির মতে, পাক-পবিত্র হওয়াই খাদ্যবস্তুর মূল কথা। এটা ধর্মের ফরজ ও মূলনীতিসমূহের অন্যতম।

হালাল উপার্জনের ফজিলত এবং এর লঙ্ঘন

ইমাম গাজালি কেবল হালাল পথে উপার্জনের কথা বলেই ক্ষান্ত হননি। তিনি মানুষকে এই পদ্ধতি অবলম্বনে উৎসাহ যুগিয়েছেন। ইহইয়াউ উলুমিদ্দীন কিতাবের দ্বিতীয় খণ্ডে একটি স্বতন্ত্র পরিচ্ছদ কায়েম করেছেন এই ব্যাপারে। সেখানে আয়াত, হাদিস ও মনীষীদের বক্তব্য এনে ব্যাখ্যা দিয়েছেন। আমরা সংক্ষিপ্তাকারে কিছু তুলে ধরব। আল্লাহ বলেন,
وَ جَعَلۡنَا لَکُمۡ فِیۡهَا مَعَایِشَ ؕ قَلِیۡلًا مَّا تَشۡکُرُوۡنَ
তোমাদের জন্য ওতে জীবিকা নির্বাহের উপকরণসমূহ সৃষ্টি করেছি, তোমরা খুব কমই কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করে থাক। (সুরা আরাফ-১০)। এ আয়াতে জীবিকাকে নেয়ামত বলা হয়েছে এবং এর জন্যে শোকর আদায় করতে বলা হয়েছে। অন্যত্র এসেছে,
لَیۡسَ عَلَیۡکُمۡ جُنَاحٌ اَنۡ تَبۡتَغُوۡا فَضۡلًا مِّنۡ رَّبِّکُمۡ
তোমাদের উপর কোন পাপ নেই যে, তোমরা তোমাদের রবের পক্ষ থেকে অনুগ্রহ অনুসন্ধান করবে।( সুরা বাকারা-১৯৮)।

আবু সাঈদ রাদিয়াল্লাহু আনহু থেকে বর্ণিত যে, নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, সত্যবাদী ও বিশ্বস্ত ব্যবসায়ী নবী, সিদ্দীক ও শহীদগণের সঙ্গে থাকবে। ( তিরমিজি- ১২০৯)। অন্য জায়গায় এসেছে, যে ব্যক্তি হালাল উপায়ে দুনিয়া অর্জন করে হাত পাতা থেকে বাঁচার জন্যে, সন্তান-সন্ততির সুখের চেষ্টা করার জন্যে এবং প্রতিবেশীর প্রতি দয়া করার জন্যে, সে পূর্ণিমার রাতের আলোকোভাসিত চাঁদের ন্যায় মুখমণ্ডল নিয়ে আল্লাহ তাআলার সাথে সাক্ষাৎ করবে।
এক হাদিসে বলা হয়েছে, মানুষ যা খায়, তার মধ্যে সর্বাধিক হালাল হচ্ছে তার উপার্জন। বর্ণিত আছে, হযরত ঈসা আ. এক ব্যক্তিকে দেখে জিজ্ঞেস করলেন, তুমি কি কাজ করো? সে বলল, আল্লাহ তাআলার ইবাদত করি। তিনি আবার প্রশ্ন করলেন, তোমার ভরণ-পোষণ কে করে? সে বলল, আমার এক ভাই। তিনি বললেন, তোমার ভাই তোমার চেয়ে বেশি ইবাদতকারী।

রসুলে করীম সা. এরশাদ করেন, আমার জানা মতে তোমাদেরকে যেসব কাজ জান্নাতের নিকটবর্তী এবং দোজখ থেকে দূরবর্তী করে দেয়, সেগুলো সম্পাদনের আদেশ আমি তোমাদেরকে না দিয়ে ছাড়িনি। পক্ষান্তরে আমার জানা মতে, যেসব কাজ তোমাদেরকে জান্নাত থেকে দূরে সরিয়ে দোজখের নিকটবর্তী করে, সেগুলো থেকে নিষেধ করতেও আমি কসুর করিনি। জিবরাঈল আ. আমার মনে একথা জাগিয়ে দিয়েছেন যে, কোন ব্যক্তি বিলম্বে হলেও তার রিজিক পুরোপুরি লাভ না করা পর্যন্ত মৃত্যুবরণ করবে না; অতএব তোমরা আল্লাহকে ভয় কর এবং উত্তম পন্থায় রিযিক অন্বেষণ কর। এ হাদিসে উত্তম পন্থায় রিজিক অন্বেষণ করতে বলা হয়েছে। একথা বলা হয়নি যে, রিজিক অন্বেষণ করো না। হাদিসের শেষাংশে বলা হয়েছে, বিলম্বে রিজিক প্রাপ্তি যেন আল্লাহর অবাধ্য হয়ে রিজিক অন্বেষণ করার কারণ না হয়ে যায়। কেননা, আল্লাহ তাআলার কাছে যা আছে, তা তার অবাধ্যতার মাধ্যমে পাওয়া যায় না।

লোকমান হাকীম তাঁর পুত্রকে বললেন, বৎস! হালাল উপার্জন দ্বারা নিঃস্বতা দূর করবে। কেননা, যে ফকির হয়ে যায়, তার মধ্যে তিনটি বিষয় সৃষ্টি হয়; এক. দ্বীনদারীতে তরলতা। দুই. জ্ঞানবুদ্ধির দুর্বলতা। তিন. ভদ্রতার অবসান। এই তিনটি বিষয়ের চেয়েও মারাত্মক হলো মানুষ তাকে ঘৃণা করে ।

হযরত ওমর রা. বলেন, রিজিক অন্বেষণ থেকে হাত গুটিয়ে বসে থাকা এবং আল্লাহ আমাকে রিজিক দাও বলা উচিত নয়। কেননা, তুমি জানো, আসমান থেকে স্বর্ণ ও রৌপ্য বর্ষিত হয় না। যায়েদ ইবনে সালামা নিজের ক্ষেতে বৃক্ষ রোপণ করছিলেন। হযরত ওমর রা. তাঁকে দেখে বললেন, তুমি চমৎকার কাজ করছ। মানুষের কাছ থেকে অমুখাপেক্ষী হয়ে যাওয়া উচিত। এতে তোমার দ্বীনদারী অধিক সংরক্ষিত থাকবে এবং এভাবেই তুমি মানুষের প্রতি অধিক কৃপা করতে পারবে।
হযরত ইবনে মাসউদ রা. বলেন, যখন কাউকে দেখি সে বেকার। দুনিয়ার কাজও করে না এবং দ্বীনের কাজও করে না, তখন আমার খুবই খারাপ লাগে ।

ইমাম গাজালি উপার্জনের এত ফজিলত বর্ণনা করে মূলত মানুষকে এতে উদ্বুদ্ধ করছেন। তা সত্ত্বেও তিনি একদল মানুষকে তা থেকে বিরত থাকাকে উত্তম বলেছেন। তিনি বলেন, চার ব্যক্তির জন্যে কোন পেশা গ্রহণ না করা উত্তম – প্রথম, যে ব্যক্তি শারীরিক ইবাদতে আবেদ। দ্বিতীয়, যে ব্যক্তি আধ্যাত্মিক জ্ঞানে এবং ইলমে হাল ও ইলমে কাশফের স্তরের আমল অর্জন করেছে।

তৃতীয়, যে বাহ্যিক আলেম মানুষের দ্বীনদারীতে সহায়ক কাজকর্মে মশগুল; যেমন মুফতী, মুফাসসির ও মুহাদ্দিস।

চতুর্থ, যে ব্যক্তি মানুষের জাগতিক কল্যাণ সাধনে ব্যাপৃত এবং তাদের প্রয়োজনীয় বিষয়াদির দায়িত্বে নিয়োজিত; যেমন শাসনকর্তা, বিচারপতি প্রমুখ। এই চার প্রকার লোকের জন্যে উপার্জনে মশগুল হওয়ার তুলনায় নিজ নিজ দায়িত্ব পালন করে যাওয়া উত্তম। তারা বায়তুল মাল থেকে নয়; বরং আলেম ও ফকীহদের জন্যে ওয়াকফকৃত তহবিল থেকে নিজেদের ভরণ-পোষণ নেবে। রাসুলুল্লাহ সা. এর মধ্যে উপরোক্ত চারটি গুণ আরও অনেক বর্ণনাতীত গুণসহ বিদ্যমান ছিল। তাই তাঁকে আল্লাহর পবিত্রতা বর্ণনা করার এবং সেজদাকারীদের অন্তর্ভুক্ত হওয়ার আদেশ করা হয়েছে- ব্যবসায়ীদের অন্তর্ভুক্ত হওয়ার আদেশ করা হয়নি। এ কারণেই হযরত আবু বকর সিদ্দীক রা. যখন খেলাফতের দায়িত্বভার গ্রহণ করলেন, তখন সহচরগণ তাঁকে ব্যবসা ছেড়ে দেয়ার পরামর্শ দিলেন। কেননা, ব্যবসা করলে মুসলমানদের কাজ করার মত অবসর পাওয়া যেত না। তাই তিনি বায়তুল মাল থেকে প্রয়োজন পরিমাণে অর্থ নিতেন। পরে ওফাত নিকটবর্তী হলে তিনি ওসিয়ত করেন, যে পরিমাণ অর্থ তিনি নিয়েছেন সেই পরিমাণ অর্থ যেন বায়তুল মালে ফেরত দেয়া হয়।

খাদ্য গ্রহণের মহৎ উদ্দেশ্য ও একটি ইবাদত

প্রাত্যহিক জীবনে নিয়ম করে কয়েক বেলা খাবার গ্রহণ করে থাকি আমরা। নিছক ক্ষুধা নিবারনের জন্যই কি আমরা খাবার খাই? এর পিছনে মহৎ কোন উদ্দ্যেশ্য কি আমাদের জীবনে পরিলক্ষিত হয়? মানব জাতির দুনিয়াতে আগমনের উদ্দেশ্য সুস্পষ্ট। জীবনের প্রধানতম লক্ষ্য হলো স্রষ্টার ইবাদত করা। ছোটখাটো সব কাজই এই মহৎ উদ্দেশ্যের সাথে মিলিত হওয়া উচিত। ইমাম গাজালি বলেন, বুদ্ধিমানদের উদ্দেশ্য হচ্ছে জান্নাতে খোদায়ী দীদার লাভ করে ধন্য হওয়া। খোদায়ী দীদার পর্যন্ত পৌঁছার একমাত্র পথ হচ্ছে ইলম ও আমল তথা জ্ঞানার্জন ও কর্ম সম্পাদন। দৈহিক সুস্থতা ব্যতিরেকে এ দু’টি বিষয় অব্যাহতভাবে সক্রিয় রাখা অসম্ভব। ক্ষুধার সময়ে প্রয়োজন অনুযায়ী খাদ্য গ্রহণ করতে থাকলেই দৈহিক সুস্থতা নিশ্চিত হয়। এ জন্যে খাদ্য গ্রহণে আল্লাহর ইবাদতে সামর্থ্য অর্জিত হওয়ার নিয়ত করবে, যাতে এ আহারের মধ্যেও আনুগত্যের বিষয় বহাল থাকে। খাদ্য গ্রহণে আনন্দ ও সুখ লাভের নিয়ত করবে না। আমাদের সামনে যখন খাদ্য গ্রহণের মাকসাদ বা উদ্দেশ্য স্পষ্ট হয়ে গেল। তখন আমাদের সেমতে নিয়ত করার প্রতি গুরুত্বারোপ করলেই খাদ্য গ্রহণটা ইবাদতে রুপ নিবে।

ইমাম গাজালি তার কিতাবে লেখেন, আগের কালের জনৈক বিশিষ্ট বুযুর্গ বলেন, খাদ্য গ্রহণ করাও একটি ইবাদত। এরপর তিনি কুরআনের একটি আয়াত উদ্বৃতি দিয়ে ব্যাপারটিকে আরো জোরালো করেন। আল্লাহ তাআলা এ বিষয়বস্তু ব্যক্ত করে বলেছেন,
کُلُوۡا مِنَ الطَّیِّبٰتِ وَ اعۡمَلُوۡا صَالِحًا
তোমরা পাক-পবিত্র বস্তু আহার করো এবং সৎকর্ম সম্পাদন করো।(সুরা আল-মুমিনুন- ৫১)। সুতরাং যে ব্যক্তি এ উদ্দেশে খাদ্য গ্রহণে উদ্যত হয় যে, এর দ্বারা ইলম ও আমলে সাহায্য হবে এবং তাকওয়া অর্জনে সামর্থ্য অর্জিত হবে, তার উচিত খাদ্য গ্রহণে সংযত আচরণ করা। ইমাম গাজালি খাবার কেন্দ্রিক মুসলমানদের বৈশিষ্ট্য তুলে ধরেছেন। তার মতে, অমুসলিমদের কাছে খাদ্য গ্রহণ নিছক কর্ম। যার বিশেষ কোন গুনাগুন নেই। কিন্তু মুসলমানদের কাছে এই কাজটাই মহত্ত্বপূর্ণ। এখানেই মুসলিমরা শ্রেষ্ঠের আসনে।

পরিমিত খাদ্যাভ্যাস গড়ে তোলা; ভোগবাদীদের কাছে খাদ্য গ্রহণের কোন লিমিট নেই। যাচ্ছেতাই গলাধঃকরণ করছে। সারাক্ষণ পশুর খাদ্য চর্বণ করে চলেছে। মানুষ আর পশুতে তফাতটা কোথায় রইল তখন। ইমাম গাজলি বলেন, ক্ষুধার্ত হওয়ার আগে খাবারের দিকে হাত না বাড়ানো এবং পরিতৃপ্ত হবার আগেই খাবার থেকে হাত উঠিয়ে নেওয়া। উদরপূর্তি একেবারেই কাম্য নয়। প্রয়োজন মাফিক কম খাওয়ার ইচ্ছাও পাকাপোক্ত করে নেবে। কেননা, উদরপূর্তি থেকে কম খেলেই ইবাদতে সামর্থ্য অর্জনের নিয়ত সাচ্চা হবে। কারণ, উদরপূর্তি ইবাদতের পরিপন্থী । তাই বেশী খাওয়ার পরিবর্তে অল্পে সন্তুষ্ট থাকা অপরিহার্য।

রাসুলুল্লাহ সা বলেন, মানুষ নিজের উদরের চেয়ে অধিক মন্দ কোন পাত্র পূর্ণ করে না। আদম সন্তানের জন্যে কয়েকটি লোকমা যথেষ্ট, যা তার মেরুদন্ড সোজা রাখবে। যদি তা না করে, তবে উদরের এক তৃতীয়াংশ খাদ্য খাবে। এক-তৃতীয়াংশ পানি পান করবে এবং অবশিষ্ট এক তৃতীয়াংশ শ্বাস নেয়ার জন্যে খালি রাখবে । উপরোক্ত নিয়তের মধ্যে এটাও অত্যাবশ্যক যে, যখন ক্ষুধা লাগবে তখনই খাওয়ার জন্যে হাত বাড়াবে। অর্থাৎ খাওয়ার পূর্ববর্তী বিষয়সমূহের মধ্যে ক্ষুধা লাগাও একটি জরুরী বিষয়। এর পর উদরপূর্তির আগেই হাত সরিয়ে নেবে। যে ব্যক্তি এরূপ করবে, সে চিকিৎসকের মুখাপেক্ষী হবে না।

ইমাম গাজালি উদরপূর্তি করার কয়েকটি ক্ষতি উল্লেখ করেছেন,
১. বেশি খেলে স্থূলবুদ্ধিতা জন্ম দেয়, মেধা বিনষ্ট করে এবং মস্তিষ্কে নেশার মত পৌঁছে চিন্তা-ভাবনার জায়গাকে ঘিরে ফেলে। ফলে অন্তর ভারী হয়ে চিন্তার দিকে ধাবিত হয় না এবং দ্রুত অনুভব করতে পারে না।
২. শরীরে রোগ বালাই হানা দেয়। দেহের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা কমতে থাকে।
৩. ফাহম ও ইলম কমতে থাকে। কেননা অতিভোজন বুদ্ধিকে লুপ্ত করে।
৪. বেশি খাওয়ার অন্যতম ক্ষতি হলো ইবাদতের গাফিলতি। কারণ বেশি খেলে শরীর ভার হয়ে যায়। চোখে রাজ্যের ঘুম জমা হয়। শরীর ছেড়ে দেয়। তখন ঘুম ছাড়া অন্য কিছু করতে মন সায় দেয় না।
৫. বেশি খেলে ইবাদতের মিষ্টতা হারিয়ে যায়।
৬. শাহওয়াত বেড়ে যায়। ফলে পাপাচারের শংকা বৃদ্ধি পায়।
৭. মৃত্যুর যন্ত্রণা অধিক হবে।
৮. সাওয়াবের কমতি বাড়তে থাকবে।
৯. বেশি খেলে কলবে কাঠিন্য চলে আসে। হৃদয় থেকে নুর চলে যায়।

ক্ষুধাবোধের কার্যকরী কিছু উপকারিতা

উদরপূর্তি না করে সামান্য ক্ষুধাবোধ রাখতে বলেন ইমাম গাজালি। তার এই দর্শনের পেছনে বেশ কিছু সুনিশ্চিত উপকার আছে, যা কার্যকরীও বটে। তিনি সবিস্তারে সেগুলো উল্লেখ করেছেন। কিছু নোক্তা এখানে বলা হচ্ছে,
১. ক্ষুধা দ্বারা অন্তরের পরিচ্ছন্নতা, স্বভাবের তীক্ষ্ণতা এবং অন্তর্দৃষ্টির পূর্ণতা অর্জিত হয়।

২. অন্তরের নম্রতা, যা দ্বারা অন্তরের জিকিরের ত্রুটি অনুভব করা যায়। প্রায়ই এমন হয় যে, অন্তরের উপস্থিতিসহ মুখে জিকির চালু থাকে; কিন্তু অন্তর তাতে প্রভাবিত হয় না। এর বাহ্যিক কারণ পাকস্থলী খালি হওয়া।

৩. বিনয় ও বশ্যতা অর্জিত হওয়া এবং দর্প ও অহংকার দূর হওয়া । ক্ষুধা দ্বারা নফস যতটুকু নম্র ও লাঞ্ছিত হয়, অন্য কোন কিছু দ্বারা ততটুকু হয় না।

৪. খোদায়ী আজাব ও বিপদগ্রস্তদের কষ্ট বিস্তৃত না হওয়া। কেননা, যারা পেট ভরে খায়, তারা ক্ষুধার্ত ও ক্ষুধা উভয়টি ভুলে যায়। হুঁশিয়ার ব্যক্তি কোন বিপদ দেখেই আখেরাতের বিপদ স্মরণ করে। যে ব্যক্তি কখনও ক্ষুধা ও পিপাসার কষ্ট না করে, সে আখেরাতের আজাব ভুলে যায়।

৫. খাহেশ চূর্ণ করা এবং “নফসে আম্মারা” তথা কুকর্মের আদেশদাতা নফসের বিরুদ্ধে জয়লাভ করা। এ উপকারিতাটি সর্ববৃহৎ। বলা বাহুল্য, সকল গোনাহের মূল কারণ হচ্ছে খাহেশ ও শক্তি, যার উপাদান খাদ্য ও আহার্য। খাদ্য হ্রাস করলে যাবতীয় খাহেশ ও শক্তি দুর্বল এবং নিস্তেজ হয়ে পড়ে। মানুষের সৌভাগ্য সবটুকুই নফসকে কাবু করে রাখার মধ্যে এবং দুর্ভাগ্য সবটুকুই নফসের কাবুতে চলে যাওয়ার মধ্যে নিহিত।

৬. নিদ্রা দূর হওয়া এবং অধিক সময় জাগ্রত থাকা। কেননা, যে পেট ভরে খায়, সে অনেক পানি পান করে। অধিক পানি পান করার কারণে নিদ্রা বেশী আসে।

৭. ক্ষুধা দ্বারা ইবাদত অব্যাহত রাখা সহজ হয়। কেননা, স্বয়ং আহার করা অধিক ইবাদতের পথে এ কারণে বাধা যে, এর জন্যে যথেষ্ট সময় ব্যয় হয়।

৮. দৈহিক সুস্থতা ও রোগব্যাধি প্রতিরোধ করা। কেননা, রোগব্যাধির কারণ হচ্ছে, অধিক ভোজন, যে কারণে অকর্মণ্য পিত্তাদি পাকস্থলী ও শিরায় একত্রিত থাকে। এর পর রোগী ইবাদত করতে সক্ষম হয় না। মন সর্বদা উদ্বিগ্ন থাকে এবং জীবন তিক্ত হয়ে যায়।

৯. ব্যয় কম হওয়া। কেননা, যে অল্প ভোজন করবে, তার জন্যে অল্প সামগ্রী যথেষ্ট হবে। মুমিন ব্যক্তির কর্তব্য খরচ কম করা।

১০. কম আহারের কারণে যে খাদ্য বেঁচে যাবে, তা সদকা-খয়রাতে ব্যয় করা যাবে। মানুষ যে পরিমাণ খাদ্য খেয়ে নেয়, তা মাটি ও পায়খানা হয়ে যায়। আর যে পরিমাণ সদকা করে, তা আল্লাহর রহমত লাভের জন্যে ভাণ্ডার হয়ে থাকে।

অতি ভোজন ও ক্ষুধাবোধের শেষ কথা

ইমাম গাজালি মতে, মানুষের মন যে সকল বস্তু চূড়ান্ত পর্যায়ে কামনা করে এবং তাতে কিছু অনিষ্ট থাকে, সেখানে শরীয়ত অতিমাত্রায় নিষেধবাণী উচ্চারণ করে, যাতে মূর্খরা বুঝে নেয় যে, সর্বাবস্থায় বিষয়টি থেকে বেঁচে থাকাই উদ্দেশ্য এবং যথাসম্ভব মনের চাহিদার বিপরীত আমল করা লক্ষ্য।

কিন্তু বুদ্ধিমান ও জ্ঞানী ব্যক্তি বুঝে নেয়, মিতাচারের স্তরই কাম্য । উদাহরণত, অত্যধিক উদরপূর্তি কোন মনের চাহিদা হলে শরীয়ত তার সামনে পূর্ণমাত্রায় ক্ষুধার গুণ ও প্রশংসা বর্ণনা করে, যাতে মন কোনরূপে তার চাহিদা থেকে বিরত থেকে মিতাচারের স্তর অর্জন করে নেয়। কেননা, মনের চাহিদার সম্পূর্ণ মূলোৎপাটন সম্ভবপর নয়। অতএব এমন কোন সীমা অবশ্যই থাকা দরকার, যার আমল শরীয়তের দৃষ্টিতে প্রশংসনীয় হবে। যেমন, রাত্রি জাগরণ ও রোজা সম্পর্কে শরীয়তে অতিমাত্রায় গুণগান করা হয়েছে। কিন্তু যখন রাসুলুল্লাহ সা. জানলেন, কিছু সংখ্যক লোক সদাসর্বদা রোজা রাখে এবং সারারাত জেগে নামাজ পড়ে, তখন তিনি তাদেরকে নিষেধ করে দিলেন। এ থেকে জানা গেল, উদ্দেশ্য কেবল সমতার স্তর।

সুতরাং খাওয়ার ব্যাপারে উত্তম ও মিতাচার হচ্ছে, এতটুকু খাবে, যাদ্ধারা পাকস্থলী ভারী না হয় এবং ক্ষুধার কষ্ট অনুভূত না হয়। কেননা, খাদ্যের উদ্দেশ্য হচ্ছে জীবন রক্ষা করা এবং ইবাদতের শক্তি অর্জন করা। পাকস্থলী ভারী হয়ে গেলে যেমন ইবাদত হতে পারে না, তেমনি ক্ষুধার কষ্টও অন্তরের কাজে বাধা হয়ে দাঁড়ায়। অতএব এমনভাবে খাবে যাতে খাদ্যের বোঝা অনুভূত না হয়, যাতে ফেরেশতাদের অনুরূপ হওয়া যায়।
ফেরেশতাদেরও খাদ্যের বোঝা ও ক্ষুধার কষ্ট মালুম। তাদের অনুসরণ করাই মানুষের জন্যে পূর্ণতার স্তর। ভোজনে তৃপ্তি ও ক্ষুধা থেকে কেউ নিষ্কৃতি পেতে পারে না। তাই উভয় অবস্থা থেকে অধিকতর দূরবর্তী স্তরটিই মধ্যবর্তী স্তর, যাকে সমতা বলা হয়। স্বল্পতা ও বাহুল্য থেকে মধ্যবর্তী স্তরে ফিরে যাওয়া এমন, যেমন লোহার একটি উত্তপ্ত বৃত্তকে মাটিতে রেখে একটি পিঁপড়াকে তার মধ্যস্থলে ছেড়ে দিলে পিঁপড়াটি বৃত্তের উত্তাপ থেকে আত্মরক্ষা করতে চতুর্দিক দিয়ে বের হয়ে যেতে চাইবে। কিন্তু সকল দিকেই উত্তাপ বিদ্যমান। সে কোন দিক দিয়ে বের হতে পারবে না এবং ইতস্তত ছুটাছুটি করতে থাকবে। অবশেষে এই বৃত্তের ব্যাসার্ধে পৌঁছে ঘেমে সে সকল দিকের উত্তাপ থেকে অধিকতর দূরত্বে থাকবে।

এমনিভাবে খাহেশও মানুষকে চতুর্দিক বেষ্টন করে রয়েছে। মানুষ পিঁপড়ার মত তার বৃত্তের মধ্যে পড়ে আছে। এই বৃত্ত অতিক্রম করে বের হয়ে যাওয়া মানুষের পক্ষে অসম্ভব। অথচ মানুষ ফেরেশতাদের অনুরূপ হতে চায়। এটা তখনই সম্ভব, যখন মানুষ খাহেশ থেকে যথাসম্ভব দূরে থাকে। সমতা সকল দিক থেকে সমান দূরে বিধায় সকল অবস্থা ও চরিত্রে সমতাই কাম্য হওয়া উচিত।

বরাত
১. ইহইয়াউ উলুমিদ্দীন, ২,৩- খন্ড, ইমাম গাজালি
২. মানাহিজুল আবেদীন, ইমাম গাজালি
৩. প্রাগুক্ত, ইমাম গাজালি

আগের সংবাদশঙ্কা কাটছে না : কবে হবে ইজতেমা?
পরবর্তি সংবাদভারতে ইলিশ রপ্তানি বন্ধে আইনি নোটিশ