গ্রিক দর্শন নিয়ে ড. তহা হুসাইনের দাবি ও একটি পর্যালোচনা

হুজায়ফা আওয়াদ

অনেকে মনে করেন গ্রিক দর্শন ইসলামি ভাবধারার উৎসমূল এবং মুসলিম মনীষীরা ইসলামি ফিকহে সমৃদ্ধ হয়েছেন ইউনানি চিন্তার ‘সাহারা’ নিয়ে। মূলত প্রাচ্যবাদের প্রভাব এই চিন্তা প্রসারে প্রবল মাত্রায় ক্রিয়াশীল ছিল।

ড. লুতফি সাইয়্যেদ, ড. তহা হুসাইন-সহ অরিয়েন্টাল-প্রভাবিত অনেকেই গত শতকের শুরুভাগে অত্যন্ত প্রবল মাত্রায় এই আওয়াজ তোলেন–‘সক্রাত্যাস, প্লাতন এবং আরিস্তোতেল্যাস কর্তৃক উদ্ভাবিত পশ্চিমা ভাববাদী দর্শনের সামনে ইসলামি দর্শন অনেকাংশে মাথা নত করে দিয়েছিল তৎকালে; ফলত ইসলামের অ্যাকাডেমিক ভাবধারার শক্তিশালী রূপটা গ্রিক দর্শনের আবেদন থেকে উৎসারিত। তাই, অতীত-বর্তমানের কালাবর্তে ইউনানি ফালসাফা তার সকল ধারণাসহ অনুরকরণযোগ্য, বরং আবশ্যিকও বটে।’

কেউ যদি দর্শন-চর্চার নতুন অধ্যায়ে চোখ রাখেন, দেখবেন একটা সময় পর্যন্ত মিশর-জর্ডান-সহ পশ্চিমা প্রভাবিত বহু দেশের জামেয়াতে গত শতকে ‘কমট ডি গ্লাজের’ চর্বিত চর্বনের চর্চা হয়েছে।এই গুরু এবং তাঁর ভাবশিষ্যদের বক্তব্য হলো–অ্যারাবিক ফালসাফা বলতে আদতে কিছুই নাই। কিনদি, ফারাবি, ইবনে সিনা এবং ইবনে রুশদের নামে যে দর্শন ইতিহাসে ঠাঁই পেয়েছে তা গ্রিক-টেক্সটের অ্যারাবিক অনুবাদ মাত্র! ড. অ্যারেন্স রাইনানও তাঁর কিতাবে এই বুলি শতবার আওড়িয়েছেন।

এবার আসি মূল আলাপে। ড. মুস্তফা আবদুর রাজ্জাক (সাবেক শায়খুল আজহার) যখন মিশরের ‘দর্শন ইনস্টিটিউটে’ অধ্যাপনার দায়িত্ব পান, খুব বলিষ্ঠ উচ্চারণে এ কথা বলেন যে, ইসলামি ফালসাফার অ্যাকাডেমিক সূচনা হয় ইমাম শাফেয়ি (২০৪হি.)-এর ইলমু উসুলিল ফিকহের মাধ্যমে। এবং ইমাম শাফেয়ি ইসলামি ফালসাফার প্রথম রূপকার। (যদিও তার বক্তব্যের সাথে আমার কিছুটা দ্বিমত আছে) এবং আরাবিয়্যাতের ক্ষেত্রে ইমাম শাফেয়ির সুসংহত অবস্থান তেমনই, গ্রিক দর্শনের ক্ষেত্রে আরাস্তুর (অ্যারিস্টটল) যেমন। আর কিন্দি, ফারাবিরা হলেন ইউনানি ফালসাফার আরবি অনুবাদক কেবল। উলুমে ইসলামিয়্যার ক্ষেত্রে তাঁদের বিশেষ কোনো বিশেষত্ব নাই।

এর বিপরীতে ড. লুতফি সাইয়্যেদ এবং ড. তহা হুসাইন উঠেপড়ে লাগেন। অ্যারিস্টটলের সামাজিকতা এবং রাজনীতির ভাষিক অনুবাদ করেন ড. সাইয়্যেদ। আর ওদিক থেকে তহা হুসাইন জামে’ আজহারের ভাষাবিজ্ঞান বিভাগে দাখেল করেন ইউনানি-ভাষা ফর্মুলা। গ্রিক চিন্তার ডাক মিশরে সরব হতে থাকে, ইসলামি ফিকরের স্বচ্ছতার সাথে পৌত্তলিকতার আজন্ম চৈন্তিক যুদ্ধের নতুন বারুদ জ্বলে ওঠে চারদিকে।সাধারণ মুসলিমরা এই সূচনাকে বিরূপ চোখে দেখেন, তবুও তাঁদের চিন্তাগম্য আগ বাড়তে থাকে ক্রমশ।

এটা ছিল ১৯২৫ -এর কথা। আমরা যদি আরেকটু অগ্রসর হই, তাহলে দেখব স্বয়ং পশ্চিমা পণ্ডিতদের লেখায় সম্পূর্ণ বিপরীত একটা চিত্র। দ্রাবির, ব্লে ফোট, জোসেফ লেবোন, সারটেন হোনকা-সহ প্রাচ্যবাদের বুদ্ধিবৃত্তিক জন্মদাতা অনেকেই তো স্বীকারোক্তি দিতে বাধ্য হয়েছেন যে, পশ্চিমে গির্জা আর পৌত্তলিকতার ছায়ামূলে আরাস্তুদের নামে যে দর্শনের চর্চা হয়েছে অনন্তকাল, বস্তুত সেটা স্বাধীন কোনো চর্চা ছিল না। এই দর্শন ঘরানাগত বৈষম্যের ঊর্ধ্বে কখনোই উঠতে পারেনি। কিন্তু ইসলাম এসে চার দেওয়ালের মাঝে কথিত আকলচর্চার বৈষয়িক মুক্তি দিয়েছে এবং বলেছে বুদ্ধিজীবিতারও অনেক বড় দখল রয়েছে ধর্মে।

ড. মাহমুদ কাসেম কত সুন্দর বলেছেন–পশ্চিম এমন এক ধোঁয়াসা, যা মুসলিমদেরকে টেনেছে আরাস্তু চর্চার দিকে, আর তারা গ্রহণ করেছে মুসলিমদের দর্শন-শৈলী–জাবের, ইবনুল হাইসাম, আল বেরুনি। একজন প্রাচ্যবিদ বুদ্ধিজীবী গ্রন্থই লিখেছেন এই নামে–“أوربا ولدت في آسيا” (ইউরো সভ্যতার জন্ম-ই হয়েছে এশিয়া থেকে)

অপর দিক থেকে দেখলে–ড. তহা বলছেন, ইসলামি দর্শন ইউনানি ফালসাফার সাথে আচরণগত নরমপন্থা অবলম্বন করেছে। কিন্তু আমরা তো ইতিহাসে দেখি ভিন্ন কিছু। ইসলামি ভাবধারার সাথে বৈ-সাদৃশ হাজারও বিষয়ে গ্রিক দর্শনকে ছুড়ে ফেলেছেন আমাদের সালাফ। সাধারণ একটা মাসআলা নিয়েও বছরভর তর্ক চলেছে। গাজালি আর ইবনে তাইমিয়ার জীবনের সিংহভাগ ব্যয় হয়েছে এসব অর্বাচীনদের পেছনে। তবুও কি বলা হবে যে, এটা আচরণগত নরমপন্থা?

ফারাবি আর ইবনে সিনাকে নিয়ে জল্পনার শেষ নেই। শতশত বছর ধরে এই বিতর্ক চলে আসছে যে, তাঁরা আদতে ইসলামি ভাবধারার বশবর্তিতা মেনে নিয়েছিলেন কি-না। ড. আবদুর রাজ্জাক তো তাঁদেরকে এই বৃত্তে দাখেল করতে স্পষ্টই অস্বিকৃতি জানিয়েছেন, যেমনটা পূর্বে উল্লেখ করা হয়েছে। অতএব তাঁদের ভাষিক ব্যাখ্যাকে ইসলামের আরাস্তু-চিন্তা গ্রহণের নামান্তর ভাবা নিতান্তই বাতুলতা বৈ কি!

ড. মুহাম্মাদ আব্দুর রাহমানের ভাষায়–গ্রিক এবং মুসলিমদের মাঝে যে দ্বৈত-চিন্তা একিভূত করণের প্রচেষ্টা হয়েছে ফারাবির মাধ্যমে, সেটা নিরাপদ নয় সর্বাংশে। কারণ, এর গতিপথে নানা উপাদানের মিশ্রণ ঘটেছে, যা ইসলামি ভাবধারার সাথে মোটেও যায় না।

এ ক্ষেত্রে ইমাম গাজালি (৫০৫হিঃ) এবং শাইখুল ইসলাম ইবনে তাইমিয়ার (৭২৮হিঃ) অবস্থানের প্রতি ইঙ্গিত করে শেষ করতে চাচ্ছি। ইউনানি স্রষ্টা-তত্ত্ব চর্চা প্রতিহত করার ব্যাপারে গাজালির ছিল খুব শক্ত ভূমিকা। গণিত, সমাজ এবং স্বভাবজাত দর্শন চর্চায় আপত্তি ছিল না তাঁর, কিন্তু তাওহিদের সাথে সংঘর্ষ বাঁধিয়ে ইলাহিয়্যাত চর্চা তাঁর জন্য ছিল দুচোখের বিষ। এ জন্য ভাববাদী বাতেনি ফেরকার লোকজনকে বহু জায়গায় কটূ কথাও বলেছেন তিনি, ইবনে সিনাকেও ছাড়েননি, তাকফির করেছেন খুব শক্তভাবে। ‘তাহাফুতুল ফালাসিফা’ গ্রন্থে বিশ জায়গায় তাঁকে রদ করেছেন, এর মধ্যে তিনটি ‘কারণ’ হলো কুফরি। শুধু গাজালিই না, ইবনে খাল্লিকান, ইবনুল কায়্যিম, ইবনে হাজার–সবাই তাঁর কুফরির কথা জোরালো ভাষায় বলেছেন। এখানে শুধু হাফেজ ইবনে কাসিরের বক্তব্য তুলে ধরছি ‘আল বিদায়া ওয়ান নিহায়া’ থেকে–
“وقد لخص الغزالي كلامه في ” مقاصد الفلاسفة “، ثم رد عليه في ” تهافت الفلاسفة ” في عشرين مسألة، كفره في ثلاث مسائل منهن ; وهي قوله بقدم العالم، وعدم المعاد الجسماني، وأن الله لا يعلم الجزئيات، وبدّعه في البواقي
ويقال: إنه تاب عند الموت. فالله سبحانه وتعالى أعلم” انتهى من البداية والنهاية (15/668)

(উল্লেখ্য : ইবনে সিনাকে নিয়ে আজও কোনো অকাট্য সিদ্ধান্ত হয়নি, যেমনটা ইবনে কাসিরের এই বক্তব্য থেকেও কিছুটা আঁচ করা যায়। তাই কেউ উপরোক্ত ব্যক্তিবর্গের সাথে আদবের সাথেই দ্বিমত পোষণ করতে পারেন, সে সুযোগ আছে।)

গাজালির প্রায় দু’শ বছর পর জন্ম ইমাম ইবনে তাইমিয়ার। ‘আর-রাদ্দু আলাল মান্তিকিয়্যিন’ গ্রন্থে তিনিও স্পষ্ট বলেছেন–ইসলামের একটা নিজস্ব ভাষা আছে, এর স্বকীয়তা আছে, কুরআন-সুন্নাহ যার উৎসমূল।ইবনে তাইমিয়া এই ভাবধারার নতুন এক নাম দিয়েছেন–‘আল মানতিকুল ইসলামি’ বা ইসলামি ভাবধারা।

ইমাম ইবনুল ওয়াজির আল ইয়ামানি রহ.-এর এ বিষয়ে অত্যন্ত চমকপ্রদ একটি গ্রন্থ আছে–“ترجيح أساليب القآن علي أساليب اليونان”

তো, বক্তব্যটা আরেকটু ক্লিয়ার করি। আমার আপত্তির জায়গাটা হলো, ড. তহা হুসাইন আদতে ইসলামি ভাবধারার শেকড়ের অস্তিত্ব নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন। মুসলিম মনীষীদের দর্শন-চর্চার মূল রূপকার বানিয়েছেন আরাস্তু’কে। যাঁদের চর্চার কেন্দ্রবিন্দু ছিল ‘মাবদা-মায়াদ’ এববং ইলাহিয়্যাত-তত্ত্ব, যা ইসলামি মাসদারে আসাস তথা কুরআন-সুন্নাহর সঙ্গে সম্পূর্ণ সাংঘর্ষিক। উপরন্তু মুসলিম ভাবধারার সমৃদ্ধির জন্য রিজালুল ইসলাম তাদের সাথে সর্বাংশে নরম-পন্থা অবলম্বন করেছেন। এ ব্যাপারগুলো আমি মেনে নিতে পারছি না। তবে এ কথাও অস্বীকার করছি না যে, গ্রিক ফালসাফা আর আমাদের মুতাকাল্লিমিনের সাথে শাখাগত ন্যূনত্ব যোগসূত্র ছিল। তবে ইসলামের একটা শ্বাশ্বত ভাষা আছে, এর নির্দখলীয় স্বকীয়তা এবং আবেদন আছে। যার মূলে হলো দুই আসাস (কুরান-সুন্নাহ)–এই কথাটা সাহস করে ড. তহা হুসাইনরা বলতে পারেননি, বা বলতে চাননি।

ড. তহা হুসাইনের সাথে যাঁরা তৎকালে স্বর মিলিয়েছিলেন, তাঁরা কেউই প্রাচ্যবাদের প্রবল থাবা থেকে মুক্ত ছিলেন না। ড. তহা তো স্বয়ং ফ্রান্স থেকে দিরাসাতে উলয়া শেষ করেছেন। ফলে আমার মনে হয় নিজের মগজ-মজ্জাকেও তিনি সে আদলেই গড়ে তুলেছিলেন। যার ফল তাঁর লেখার পরতে পরতে এখনও স্পষ্ট।

আল্লাহ তা’য়ালা আমাদেরকে প্রাচ্যবাদের বিষক্রিয়া থেকে হেফাজত করুন। আমিন।

সহায়ক গ্রন্থাবলী
১-সুমুমুল ইসতিশরাক, মুহাম্মাদ আল জানাদি
২-মুসতাকবিলুস সাকাফা, তহা হুসাইন
৩-আল ইসতিশরাক, সাঈদ
৪-আল ্আওজাউদ দীনিয়্যা ওয়াস সিয়াসিয়্যা, জাফের আল কিরদি
৫-আস সিরাউল ফিকরি ফিল বিলাদিল মুসতামারা, মালিক বিন নাবি