চামড়া কালেকশন: মাদরাসাগুলো যা ভাবছে

রাকিবুল হাসান:

চামড়া কালেশন নিয়ে এখনো চূড়ান্ত কোনো সিদ্ধান্ত নিতে পারছে না কওমি মাদরাসাগুলো। যারাই সিদ্ধান্ত নিচ্ছেন, বিকল্প চিন্তা মাথায় রেখেই সিদ্ধান্ত নিচ্ছেন। সংশ্লিষ্টগণ বলছেন, সরকারি সিদ্ধান্তের ওপর নির্ভর করছে অনেককিছু। মাদরাসা খোলার অনুমতি না পাওয়া পর্যন্ত চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেয়া যাচ্ছে না।

জামিয়া শরইয়্যাহ মালিবাগ মাদরাসার মুহতামিম মুফতি বুরহানুদ্দিন বলেন, ‘এখনো আমরা সিদ্ধান্ত নেইনি কিভাবে চামড়া কালেকশন করবো। আগামি শনিবার মিটিং ডেকেছি। মিটিংয়ে সিদ্ধান্ত নেয়া হবে।’

মাদরাসার সিদ্ধান্ত না হলেও নিজের ব্যক্তিগত মতামত কী? মুফতি বুরহানুদ্দিন বলেন, ‘এখানে দুটো বিষয়। এক—সরকার চামড়ার দাম কেমন দিচ্ছে। দুই—মাদরাসা খোলার অনুমতি হচ্ছে কিনা। এ দুটো মাথায় রেখেই সিদ্ধান্ত নেব। চামড়ার দাম এমন তলানিতে থাকলে তো চামড়া কালেকশনে শ্রম এবং রিসোর্স ব্যয় করে লাভ নেই।’

চামড়া কালেকশনের ব্যাপারে এখনো কোনো সিদ্ধান্ত নেয়নি নারায়ণগঞ্জের দারুল উলুম মাদানীনগর মাদরাসা। মাদরাসাটির মুহাদ্দিস মাওলানা ফয়সাল আহমদ জালালাবাদি বলেন, ‘আমাদের এখনো কোনো সিদ্ধান্ত হয়নি।’

সরকারের কাছে কুরবানি ঈদের আগে মাদরাসাগুলো খুলে দেয়ার আহ্বান জানিয়েছিলেন কওমি মাদরাসা কর্তৃপক্ষ। স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আশ্বাস দিয়েছিলেন মাদরাসা খোলার ব্যাপারে প্রধানমন্ত্রী থেকে অনুমতি নিয়ে একটি প্রজ্ঞাপন জারি করিয়ে দিবেন। এই আশ্বাসের ওপর ভিত্তি করে দুদল্যমনায় দুলছে মাদরাসাগুলো। বারবার পরামর্শে বসেও চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নিতে পারছে না কোনো মাদরাসা।

জামিয়া আরাবিয়া ইমদাদুল উলুম ফরিদাবাদ মাদরাসা এদের মধ্যে অন্যতম। মাদরাসাটির মুহাদ্দিস মুফতি ইমাদুদ্দিন বলেন, ‘বারবার পরামর্শ করেও চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নিতে পারেননি কর্তৃপক্ষ। সরকার মাদরাসা খোলার অনুমতি দিলে তো ছাত্রদের দিয়েই কালেকশন করানো যাবে। অনুমতি না দিলে বিকল্প চিন্তা করতে হবে। তা হলো—চামড়া কালেকশনের জন্য বড় কিছু ছাত্র মাদরাসায় নিয়ে আসতে হবে।’

একই ভাবনা চট্টগ্রামের দারুল উলুম মুঈনুল ইসলাম হাটহাজারি মাদরাসারও। বিষয়টি জানতে চাইলে মাদরাসাটির সিনিয়র শিক্ষক মাওলানা আশরাফ আলী নিজামপুরী বলেন, ‘বিগত বছরগুলোতো ছাত্রদের দিয়ে কালেকশন করাতাম। এক এক এলেকায় দেড়-দুইশ ছাত্রও পাঠানো হতো। এবার তেমন কিছু হবে না। আশপাশে কালেকশন হবে, তবে তেমন গুরুত্ব, দায়িত্ব থাকবে না। মাদরাসা খুললে তো ছাত্র থাকবেই। নয়তো বড় কিছু ছাত্র দিয়ে কালেকশন করাতে হবে। কারণ, এই কালেকশন সমাজের সঙ্গে মাদরাসার একটা বন্ধন। একবারে বন্ধ করে দেয়া যাবে না। তাই অল্প হলেও করতে হবে।’

তবে সরকারি সিদ্ধান্তের জন্য বসে না থেকে নিজেরাই চূড়ান্ত একটি সিদ্ধান্ত নিয়েছে জামিয়া ইমদাদিয়া কিশোরগঞ্জ মাদরাসা। করোনাভাইরাস সঙ্কট মাথায় রেখে স্বাস্থ্যসম্মত ব্যবস্থাপনা করবে তারা। মাদরাসাটির মুহতামিম মাওলানা শাব্বির আহমদ রশিদ বলেন, ‘আমরা সিদ্ধান্ত নিয়েছি আগের মতো বাড়ি বাড়ি গিয়ে চামড়া কালেকশন করবো না। আমরা বরং প্রত্যেক এলাকায় একটি করে ক্যাম্প করবো। প্রতিটি ক্যাম্পে একজন শিক্ষকের তত্ত্বাবধানে থাকবে ছয়-সাতজন ছাত্র। যারা স্বেচ্ছায় চামড়া দিতে চায়, তারা ক্যাম্পে চামড়া দিয়ে যাবে। নয়ত আমাদের হটলাইন থাকবে। কল করলে আমরা গিয়ে চামড়া নিয়ে আসবো। পরে পিকাপে করে সব ক্যাম্প থেকে চামড়া মাদরাসায় নিয়ে আসবো।’

চামড়ার দাম তলানিতে চলে আসার কারণে মাদরাসাগুলোর আয়ের খাত সংকুচিত হওয়ার বিষয়টি স্বীকার করেছেন সবাই। তবে তারা এতে হতাশ এবং নিরাশ হতে চান না। চামড়ার খাত বাদ দিলেও মাদরাসাগুলো চলতে পারবে বলে বিশ্বাস তাদের। জামিয়া শরইয়্যাহ মালিবাগের মুহাতমিম মুফতি বুরহানুদ্দিন বললেন, ‘চামড়া কালেকশন ছাড়াও মাদরাসাগুলো চলতে পারবে। ইতোমধ্যে অনেক মাদরাসা তা করে দেখিয়েছে। তবে এইক্ষেত্রে একটু কৌশলী হয়ে সুগঠিত পরিকল্পনা গ্রহণ করতে হবে। একটা সময় চামড়া কালেকশন ছাড়াই মাদরাসাগুলো চলেছে। চামড়া কালেকশনের সংস্কৃতি তো খুব বেশি দিনের নয়, হাফেজ্জি হুজুর এবং পীরজি হুজুর রহ. এর কালের। তখন চলতে পারলে এখনও চলতে পারবে।’