চেরুমন পেরুমল কি সাহাবী ছিলেন?

ইমরান রাইহান ও মাহমুদ সিদ্দিকী :

প্রশ্ন :মালাবারের রাজা চেরুমন পেরুমল সম্পর্কে জানতে চাই। তিনি নাকি ইসলাম গ্রহণ করে নবিজির সাথে দেখা করতে মক্কায় যান। এ ঘটনার সত্যতা কী? তিনি কি সাহাবি ছিলেন?

– হাবিবুল্লাহ, ব্যারাকপুর, ভারত।

উত্তর : চেরুমন পেরুমল সম্পর্কে অনেক কথাই প্রচলিত আছে। তার সম্পর্কে প্রচলিত সবগুলো গল্প সামনে রাখলে যে সারাংশ পাওয়া যায়, তা নিম্নরুপ-

চেরুমন পেরুমল নামে মালাবার অঞ্চলে একজন রাজা ছিলেন। তিনি নবিজি সাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের সমসাময়িক ছিলেন। তিনি নিজের রাজ্যে বসে চন্দ্র দ্বিখণ্ডিত হওয়ার ঘটনা দেখেছিলেন। এর কিছুদিন পর আরব থেকে একটি কাফেলা তার রাজ্যে আসে। এই বাহিনীর কাছে তিনি মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের কথা জানতে পারেন, তার নবুওয়তের কথা জানেন। তখন তিনি সেই কাফেলার সাথে মক্কার উদ্দেশ্যে রওনা হন। মক্কা পৌঁছে নবিজির কাছে কিছুদিন অবস্থান করেন। এরপর দেশে ফেরার পথে তার ইন্তেকাল হয়। মৃত্যুর আগে তিনি অসিয়ত করে যান, মালাবারে যেন মুসলমানদের জন্য মসজিদ স্থাপন করা হয়।’

চেরুমন পেরুমল সম্পর্কে যেসব প্রবন্ধ ও বইপত্র লেখা হয়েছে তার মূল কথা এটুকুই।

চেরুমন পেরুমল সাহাবি ছিলেন কি ছিলেন না, সে প্রশ্নের মীমাংসা করার আগে আমরা একটি বিষয় জেনে নেই। একজন ব্যক্তিকে কখন সাহাবি বলা হবে, আর কখন বলা হবে না, সে বিষয়ে নির্দিষ্ট উসূল আছে। এই উসূলের মাধ্যমে নবিজির সাথে কারো সোহবত সাব্যস্ত হলে তিনি সাহাবি। এই উসূল দ্বারা প্রমাণিত না হলে তিনি সাহাবি নন। উসূলটি হলো-

একজন সাহাবির সোহবত সাব্যস্ত হয় চার ভাবে

১. তাওয়াতুরের মাধ্যমে। অর্থাৎ ধারাবাহিক পরম্পরায় এত বেশি সনদে তার সাহাবি হওয়ার কথাটি প্রমাণিত, যা মিথ্যা হওয়া অসম্ভব।

২. ইস্তিফাযার মাধ্যমে, অর্থাৎ, তাওয়াতুর নয় কিন্তু ব্যাপকভাবে আলেমদের মধ্যে তা প্রসিদ্ধ।

৩. অন্য কোনো সাহাবির বর্ণনায় উক্ত সাহাবির সোহবতের কথা পাওয়া গেলে।

৪. উলামায়ে কেরামের কাছে বিশ্বস্ততা প্রমাণিত, এমন ব্যক্তি নিজেকে সাহাবি বললে।[1]

এই উসূলটি মনে রাখলে সামনের আলোচনা বোঝা সহজ হবে ইনশাআল্লাহ।

চেরুমন পেরুমলের ব্যাপারে যে গল্প প্রচলিত তার উৎস দুইটি

১. মালাবার অঞ্চলের লোককথা। এরমধ্যে রয়েছে ‘পরাবৃত্ত’ নামে একটি প্রাচীন পুঁথি।

২. হিজরী দশম শতাব্দীর একজন আলেম শায়খ যাইনুদ্দিন রচিত ‘তোহফাতুল মুজাহিদিন’ গ্রন্থটি।

এই দুইটি উৎস নিয়ে আমরা আলোচনা করবো। ইনশাআল্লাহ।

লোককথা বা লোকমুখে চলে আসা গল্প ইতিহাসের খুবই দুর্বল একটি উপাদান। এর দ্বারা বড়জোড় ইতিহাসের কোনো একটি কাঠামোর ব্যাপারে আবছা ধারণা নেয়া যায়, কিন্তু এর মাধ্যমে কোনো ঘটনার সত্যতা নির্নয়ের সুযোগ নেই। সাধারণত, সময়ের আবর্তনে এই গল্পগুলো এত বেশি পরিবর্তিত হয়, যার মূল ঘটনা খুঁজে পাওয়া অসম্ভব হয়ে পড়ে। ফলে লোককথার মাধ্যমে ইতিহাসের কোনো ঘটনা প্রমাণের সুযোগ নেই।

চেরুমন পেরুমল সাহাবী ছিলেন কিনা, তা নিশ্চিত হতে হলে পুরো বিষয়টি আমাদেরকে একটু আগে বলে আসা উসূলের মাপকাঠিতেই দেখতে হবে। মালাবারে প্রচলিত এ ধরণের লোককথাগুলো এই উসূলের মানদণ্ডে উত্তীর্ণ নয়। ফলে লোককাহিনির মাধ্যমে চেরুমন পেরুমলকে সাহাবি বলার সুযোগ নাই। এর মাধ্যমে বড়জোড় এটুকু বলা যেতে পারে, হিজরী প্রথম শতাব্দিতেই মালাবারে মুসলমানদের যাতায়াত শুরু হয়েছিল। এখানকার অনেকে তখন মুসলমানও হয়েছিলেন।

এবার আসা যাক শায়খ যাইনুদ্দিন রুচিত ‘তুহফাতুল মুজাহিদিন’ গ্রন্থ প্রসঙ্গে।

শায়খ আহমাদ যাইনুদ্দিন ছিলেন মালাবারের একজন বিখ্যাত আলেম। ৯৯১ হিজরীর পরে তিনি ইন্তেকাল করেন। তিনি বিভিন্ন বিষয়ে একাধিক গ্রন্থ রচনা করেন। তার বিখ্যাত একটি গ্রন্থ ‘তুহফাতুল মুজাহিদিন ফি বা’দি আখবারিল বুরতুগালিয়্যিন’। এই কিতাবটি চারটি অধ্যায়ে বিন্যস্ত। প্রথম অধ্যায়ে তিনি ইসলামের জিহাদ সংক্রান্ত বিধান আলোচনা করেছেন। দ্বিতীয় অধ্যায়ে আলোচনা করেছেন, মালাবারে মুসলমানদের আগমন ও ইসলাম প্রচারের ইতিহাস । তৃতীয় অধ্যায়ে এসেছে, হিন্দু জনগোষ্ঠীর সংস্কৃতি, অভ্যাস, জীবনাচার ও রীতিনীতি। চতুর্থ অধ্যায়ে রয়েছে, মালাবারে পর্তুগিজদের আগমন, তাদের নির্যাতন ও দখল এবং তাদের বিরুদ্ধে মুসলিম শাসকদের জিহাদের বিবরণ।

বইয়ের নাম থেকেই স্পষ্ট বোঝা যায়, লেখকের উদ্দেশ্য এই বইতে পর্তুগিজদের বিষয় নিয়ে আলোচনা করা। এজন্য বইয়ের প্রথম তিন অধ্যায় খুবই সংক্ষিপ্ত। অপরদিকে চতুর্থ অধ্যায়টি পুরো বইয়ের দুই-তৃতীয়াংশ। এই অংশে লেখক ৯০৪ হিজরী থেকে ৯৯১ হিজরী পর্যন্ত ঘটনাবলী আলোচনা করেছেন। এই সময়ে লেখক জীবিত ছিলেন, এবং বেশিরভাগ ঘটনা সরাসরি তার নিজের দেখা। ফলে তার এই গ্রন্থটি সংশ্লিষ্ট বিষয়ে একটি প্রামাণ্যগ্রন্থ বলে বিবেচ্য। গবেষকদের মতে, এই বিষয়ে ভারতবর্ষে রচিত প্রথম বই এটি। লেখক এই গ্রন্থটি রচনা করেছিলেন বিজাপুরের শাসক সুলতান আলি আদিল শাহের নামে। তবে সুলতানের জীবদ্দশায় তিনি এর কাজ সমাপ্ত করতে পারেননি। সুলতানের মৃত্যুর তিন বছর পর, ৯৯১ হিজরীতে তিনি বইটি রচনার কাজ সমাপ্ত করেন।

ইংরেজ আমলে ইংরেজরা বইটির সন্ধান পেলে নতুন করে বইটি নিয়ে আলোচনা শুরু হয়। গবেষকদের মধ্যে বইটি সাড়া ফেলে। ইংরেজি ও পর্তুগিজ ভাষায় এটি অনুবাদ হয়। ১৮৩৩ সালে মেজর রোন্যাল্ডসন বইটি ইংরেজিতে অনুবাদ করলে ‘ওরিয়েন্টাল ট্রান্সলেশন ফান্ড লন্ডন’ থেকে এটি প্রকাশিত হয়। ১৮৯৮ সালে লিসবন থেকে প্রকাশিত হয় এর পর্তুগিজ সংস্করণ। এটি অনুবাদ করেছিলেন প্রফেসর ডি লোপেজ। ১৯৪৬ সালে নবাব সদরে ইয়ার জং হাবিবুর রহমান খান শেরওয়ানির তত্ত্বাবধানে শেরওয়ানি প্রিন্টিং প্রেস, আলীগড় থেকে প্রকাশিত হয় এর উর্দু অনুবাদ।

বিখ্যাত ঐতিহাসিক মুহাম্মদ কাসিম ফিরিশতা তার লিখিত তারিখে ফিরিশতা গ্রন্থে ‘তুহফাতুল মুজাহিদিন গ্রন্থ থেকে সাহায্য নিয়েছেন, এবং সেখানে তিনি অকপটে স্বীকার করেছেন, ‘এই বিষয়ে এই বই ছাড়া আর কোনো বই আমার সামনে ছিল না’।[2]

এবার দেখা যাক শায়খ যাইনুদ্দিনের সেই গ্রন্থে কী লেখা আছে। তুহফাতুল মুজাহিদিন গ্রন্থের দ্বিতীয় অধ্যায়ে মালাবারে মুসলমানদের আগমন ও ইসলামের প্রচার প্রসঙ্গে তিনি লিখেছেন, ‘ইহুদি ও খ্রিস্টানদের একটি দল প্রাচীনকাল থেকেই কোদনগাল্লুর শহরে বসবাস করতো। এই শহর ছিল মালাবারের রাজধানী এবং রাজা এখানেই বসবাস করতেন। এই লোকেরা এসেছিল পরিবারসহ, বড় একটি জাহাজে করে। তারা এখানে বসবাসের জন্য রাজার কাছে জমিন, বাসস্থান ও বাগান চায়, এবং এখানেই বসবাস করতে থাকে।

এর অনেক পরে মুসলমানদের একটি জামাত এই এলাকায় আসে। তারা শ্রীলংকা যাচ্ছিল হজরত আদম আ. এর স্মৃতি বিজড়িত স্থান জিয়ারত করতে। রাজা যখন তাদের আগমনের কথা জানতে পারেন, তাদেরকে নিজের কাছে ডেকে নেন। তাদেরকে নানা বিষয়ে জিজ্ঞেস করেন। এই জামাতে একজন বয়স্ক মানুষ ছিলেন তিনি হজরত মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহিস সালামের অবস্থা, ইসলামের মৌলিক শিক্ষা এবং চন্দ্র দ্বিখণ্ডনের বিষয়টি বর্ণনা করেন। তাদের কথা শুনে রাজার সামনে ইসলামের সত্যতা পরিস্কার হয়, তিনি নবিজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামকে ভালোবেসে ফেলেন এবং তখনই তিনি ইসলাম গ্রহণ করেন।

রাজা ওই জামাতকে বলেন, তারা যেন শ্রীলংকা থেকে ফেরার সময় রাজাকেও তাদের সাথে নেয়। রাজা ওই জামাতকে বিষয়টি গোপন রাখারও নির্দেশ দেন। ওই জামাতের লোকেরা শ্রীলংকা থেকে ফিরে এলে বড় একটি জাহাজ ভাড়া করা হয়। রাজা গোপনে সফরের প্রস্তুতি নেন। পরিবার ও দরবারের লোকজনকে তিনি বলেন, আমি এক সপ্তাহ উপাসনা করবো, কেউ আমাকে বিরক্ত করো না। তারপর তিনি রাজ্যের শাসনভার বিভিন্ন লোকদের হাতে বুঝিয়ে দেন।

এরপর রাজা ওই জামাতের লোকজনের সাথে জাহাজে চেপে বসেন। জাহাজ পানতালায়ানি পৌঁছে। এখানে একদিন যাত্রাবিরতি দেয়া হয়। এরপর দারমাদাম[3] গিয়ে তিন দিন বিশ্রাম নেয় সবাই। এখন থেকে রওনা দিয়ে সবাই শুহর [4] নামক শহরে পৌঁছে এবং এখানে জাহাজ থেকে নামে। রাজা এখানে সেই জামাতের সাথে কিছুদিন অবস্থান করেন। এখানে একটি জামাতের সাথে তাঁদের দেখায় হয়। সেই লোকরা মালাবার যাচ্ছিল। তাদের ইচ্ছা ছিল সেখানে ইসলাম প্রচার করবে এবং মসজিদ নির্মাণ করবে। এ সময় রাজা অসুস্থ হয়ে পড়েন, তার সুস্থতার কোনো লক্ষণ দেখা যাচ্ছিল না। তখন রাজা সেই জামাতের লোকদের আদেশ দেন, তারা যেন তাদের সফরের প্রতিজ্ঞায় অটল থাকে। সেই জামাতের সদস্য ছিলেন শরফ বিন মালিক, মালিক বিন দিনার, মালিক বিন হাবিব ও অন্যরা। রাজা তাদেরকে মালাবারের ভাষায় একটি পত্র লিখে দেন। সেখানে তিনি নিজের আত্মীয়দের নাম লিখে দেন। মালাবারের কিছু স্থানের নাম বলে সেখানে তাদেরকে অবস্থান করতে বলেন। রাজার আদেশ ছিল এই কাফেলা যেন তার অসুস্থতা ও মৃত্যুর সংবাদ না জানায়। রাজার মৃত্যু হল। এর দুবছর পর শারাফ বিন মালিকদের কাফেলা মালাবার পৌঁছে। রাজার পত্র মালাবারের শাসককে দেখালে এই কাফেলার সদস্যদের জমিন ও বাগান দেয়া হয়। এখানে তারা বেশ কটি মসজিদ নির্মান করে।[5]

শায়খ যাইনুদ্দিনের ‘তুহফাতুল মুজাহিদিন’ গ্রন্থে মালাবারের রাজার ইসলামগ্রহণ সম্পর্কে এটুকুই আছে। পুরো বর্ণনাতে কয়েকটি বিষয় লক্ষ্যণীয়।

১. মালাবারে মুসলমান কাফেলার আগমন কত সালে হয়েছে তা নির্দিষ্ট করে বলা নেই। যারা এসেছিলেন তারা কি সাহাবী, তাবেয়ি নাকি এর পরের মানুষ ছিলেন তাও নির্দিষ্ট করে বলা নেই। এই ঘটনা কি নবিজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের জীবদ্দশায় ঘটেছিল নাকি পরে এ সম্পর্কেও শায়খ যাইনুদ্দিনের লেখায় কোনো তথ্য নেই।

২. মূল গ্রন্থে রাজার নামটিও নেই। শুধু রাজা বলেই উল্লেখ করা হয়েছে। এ প্রসঙ্গে বইটির উর্দু অনুবাদক লিখেছেন, লেখক ইসলামগ্রহণকারী রাজার নাম উল্লেখ করেননি। তবে ইন্ডিয়া অফিসের লাইব্রেরীতে একটি পুরনো আরবী পত্র আছে যা তুহফাতুল মুজাহিদিন গ্রন্থের আগে লেখা। সেখানে মালাবারে মুসলমানদের আগমন ও রাজার ইসলাম গ্রহণের কথা আছে। সেখানে রাজার নাম দেয়া আছে শাকুরতি ফরমা। শাকুরতি হলো সংস্কৃত শব্দ চক্রবর্তীর আরবী রুপ। ওরিয়েন্টালিস্টরা তামিল ও মালায়াম বিভিন্ন বর্ননার মাধ্যমে রাজার নাম চেরুমন পেরুমল বলে উল্লেখ করেছেন।[6]

এখানে একটি বিষয় গুরুত্বপূর্ণ। শায়খ যাইনুদ্দিন তার লেখায় রাজার নাম বলেননি। তিনি অনির্দিষ্ট করে বলেছেন। চেরুমন পেরুমল নামটি এসেছে তামিল ও মালায়াম বিভিন্ন লোককথা থেকে।

৩. রাজা মক্কায় পৌঁছেছেন, এমন কোনো তথ্য শায়খ যাইনুদ্দিনের লেখায় নেই। যাইনুদ্দিনের লেখা থেকে জানা যায়, রাজা ইয়ামানের একটি শহর পর্যন্ত পৌঁছতে পেরেছিলেন।

৪. নবিজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের সাথে রাজার দেখা হয়েছে, এমন কোনো তথ্যও শায়খ যাইনুদ্দিনের লেখায় নেই।

৫. শায়খ যাইনুদ্দিন তার লেখায় নামবিহীন একজন রাজার ইসলামগ্রহণ ও আরবের উদ্দেশ্যে যাত্রার কথা বলেছেন মাত্র। তাকে সাহাবিও বলেননি, তার সাথে নবিজির দেখা হয়েছে এসব কথাও বলেননি। তিনি সময়কাল সম্পর্কেও কিছু লেখেননি।

শায়খ যাইনুদ্দিনের লেখাতে চেরুমন পেরমলকে সাহাবি বলা হয়নি, এমনকি তার নামও বলা হয়নি। কিন্তু দুঃখজনক বিষয় হলো, পরে যারাই চেরুমন পেরুমলের কথা লিখেছেন সবাই শায়খ যাইনুদ্দিনের নামেই চালিয়েছেন। এবার এমন কিছু উদ্ধৃতি দেখা যাক।

১. মাওলানা মোহাম্মদ আকরম খাঁ মালাবার অঞ্চলে ইসলাম প্রচারের ইতিহাস আলোচনা করতে গিয়ে লিখেছেন, শেখ জয়নুদ্দীন কৃত তোহফাতুল মোজাহেদিন পুস্তকেও একজন রাজার মক্কার গমন, তাহার হজরত রাছুলে করীমের খেদমতে উপস্থিত হওয়া এবং স্বেচ্ছায় ইসলাম গ্রহণের বিবরণ প্রদত্ত হইয়াছে।[7]

– একটু আগেই আমরা দেখেছি শায়খ যাইনুদ্দিনের গ্রন্থে এমন কোনো কথাই নেই। আমাদের সামনে তুহফাতুল মুজাহিদিন গ্রন্থের তিনটি সংস্করণ রয়েছে। এক- মুআসসাতুল ওফা, বৈরুত থেকে প্রকাশিত এর আরবী সংস্করণ। এটি তাহকিক করেছেন মুহাম্মদ সাইদ আত তুরাইহি। দুই- শেরওয়ানি প্রিন্টিং প্রেস, আলীগড় থেকে প্রকাশিত এর উর্দু অনুবাদ। তিন- ইসলামিক বুক ট্রাস্ট কুয়ালালামপুর থেকে প্রকাশিত এর ইংরেজি অনুবাদ। এই তিনটি বইয়ের কোথাও এমন কোনো বর্ননা নেই, যা দ্বারা বুঝা যায় মালাবারের রাজা আরবে গিয়েছেন এবং নবিজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের সাথে তার দেখা হয়েছে।

কথা হলো, মাওলানা আকরম খাঁ তাহলে এটি লিখলেন কেন? আমাদের প্রবল ধারণা, তিনি সম্ভবত শায়খ যাইনুদ্দিনের বইটি দেখেননি। তিনি অন্য কোথাও থেকে এই উদ্ধৃতি নকল করেছেন। এই অনুমাণের একটা কারণ আছে, যা সামনে স্পষ্ট হবে।

একই আলোচনায় মাওলানা আকরম খাঁ কলকাতা থেকে প্রকাশিত বিশ্বকোষের উদ্ধৃতি দিয়েছেন। সেই বিশ্বকোষে ‘পরাবৃত্ত’ নামে হিন্দুদের প্রাচীন একটি সাহিত্যগ্রন্থের উদ্ধৃতি দিয়ে চেরুমন পেরুমলের ঘটনাটি উল্লেখ করা হয়েছে। আমরা আগেই বলেছি এ ধরণের সাহিত্যের গ্রন্থ ইতিহাসের তথ্য সরবরাহের ক্ষেত্রে বিশ্বাসযোগ্য নয়। বিশ্বকোষ প্রণেতা একইসাথে পরাবৃত্ত ও তুহফাতুল মুজাহিদিন থেকে তথ্য নিয়েছেন। মাওলানা আকরম খাঁ তথ্য নিয়েছেন সেখান থেকে। ফলে পরাবৃত্ত ও তুহফাতুল মুজাহিদিনের তথ্যগুলো মাওলানার লেখায় এসে মিশ্রিত হয়ে গেছে।

মাওলানার লেখার এই মিশ্রণ সমস্যা ছিল না, যদি পরে যারা গবেষণা করেছেন তারা সরাসরি তুহফাতুল মুজাহিদিন থেকে তথ্যের বিশুদ্ধতা যাচাই করে নিতেন। আফসোসের বিষয় হলো বেশিরভাগ গবেষক সরাসরি মাওলানার লেখাকে উদ্ধৃত করেছেন অথবা মাওলানার নাম না দিয়ে তুহফাতুল মুজাহিদিনের রেফারেন্স দিয়েছেন, কিন্তু তুহফাতুল মুজাহিদিন খুলে দেখেননি। ফলে মাওলানা আকরম খাঁর লেখায় যে ভুল ছিল তা রয়ে গেছে তাদের লেখাতেও। এমন তথ্য প্রচারিত হচ্ছে শায়খ যাইনুদ্দিনের বরাতে, শায়খ যা লিখেননি।

২. বর্তমান সময়ের একজন আলোচিত লেখক গোলাম আহমদ মোর্তজাও পেরুমন চেরুমলের বিষয়ে আলোচনা করেছেন। তিনি প্রথমে বিশ্বকোষের সূত্রে ‘পরাবৃত্তে’র উদ্ধৃতি দিয়ে লিখেছেন, চেরুমন পেরুমল স্বেচ্ছায় সিংহাসন ত্যাগ করে মক্কায় চলে যান। এরপর তিনি তুহফাতুল মুজাহিদিনের উদ্ধৃতি দিয়ে লিখেছেন, একজন হিন্দু রাজা মক্কা গমন করেন। নবিজির কাছে উপস্থিত হয়ে মুসলমান হয়েছেন। কিছুকাল হজরতের কাছে অবস্থান করে প্রত্যাবর্তনের সময় শহর নামক স্থানে তিনি মারা যান।[8]

গোলাম আহমদ মোর্তজার ক্ষেত্রেও একই সমস্যা দেখা যাচ্ছে। তিনি তুহফাতুল মুজাহিদিন গ্রন্থের বরাতে এমন তথ্য দিচ্ছেন যা সেখানে নেইই। সম্ভবত মোর্তজা সাহেবও অন্ধভাবে বিশ্বকোষকে অনুসরণ করেছেন এবং তুহফাতুল মুজাহিদিন গ্রন্থকে না দেখেই লিখে ফেলেছেন।

৩. বাংলাদেশে মুসলমানদের আগমন প্রসঙ্গে যে কয়টি লেখা আমাদের সামনে আছে, এর মধ্যে মাওলানা মুহিউদ্দিন খান রচিত ‘বাংলাদেশে ইসলাম : কয়েকটি তথ্যসূত্র’ প্রবন্ধটি গুরুত্বপূর্ণ। এই প্রবন্ধে তিনিও চেরুমন পেরুমলের আলোচনা করেছেন। তিনি লিখেছেন, রাজা চেরুমলের ইসলাম গ্রহণ সম্পর্কিত যেসব তথ্য তামিল ভাষার প্রাচীন পুথি-পুস্তক ও স্থানীয় লোকদের পুরাকাহিনীতে রয়েছে, তা মোটামুটি নিম্মরুপ-

আরবদেশের একদল লোক জাহাজযোগে মালাবারে আগমন করেছিলেন। তাঁদের প্রভাবেই রাজা চেরুমল-পেরুমল ইসলামে বায়াত হন। অতপর ইসলামের নবী হজরত মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের সাথে সাক্ষাত লাভ করার বাসনা নিয়ে রাজা একদল লোকসহ মক্কা শরীফে পৌঁছেন। রাজা সঙ্গে করে আল্লাহর নবীর জন্য কিছু মূল্যবান উপহার সামগ্রী নিয়ে গিয়েছিলেন। তন্মধ্যে আদা এবং এদেশে নির্মিত একটি তরবারিও ছিল। নবিজি সেই আদা নিজে খেয়েছিলেন এবং সাহাবিদের মাঝেও বন্টন করে দিয়েছিলেন। তরবারিটি বরাবরই তার কাছে ছিল। … (শায়খ যয়নুদ্দিন প্রণীত ‘তোহফাতুল মোজাহেদীন’ গ্রন্থ দ্রষ্টব্য।[9]

– মুহিউদ্দিন খান সাহেবের লেখার শুরুতে আছে তামিল ভাষার পুথি-পুস্তকের কথা। আবার শেষে রেফারেন্স দিয়েছেন তুহফাতুল মুজাহিদিনের। সাধারণভাবে পাঠকের মনে হবে তামিল এসব গল্পের উৎস হচ্ছে তোহফাতুল মুজাহিদিন বইটি এবং সেখানে এসব উদ্ধৃত আছে। কিন্তু বাস্তবতা হলো তুহফাতুল মুজাহিদিনে এমন কিছুই নেই। মুহিউদ্দিন খান সাহেব চেরুমনের সাথে নবিজির সাক্ষাত, আদা ও তরবারি নিয়ে যাওয়ার যে গল্প বলেছেন, তা তিনি লোককাহিনী থেকেই নিয়েছেন। তুহফাতুল মুজাহিদিন বই থেকে নয়। দেখুন মাওলানা আকরাম খাঁ তার লেখায় শুধু রাজার মক্কা গমনের কথা বলেছিলেন। মুহিউদ্দিন খান সাহেবের লেখায় এসে এর সাথে যুক্ত হয়েছে আদা ও তরবারির ঘটনাও। লোককাহিনীর উপর নির্ভর করলে এভাবেই গল্পের ডালপালা ছড়ায়। লোককাহিনীগুলো স্বর্ণলতার মতো, এর শুরু কিংবা শেষ বের করা যায় না। মুহিউদ্দিন খান সাহেবও সম্ভবত তুহফাতুল মুজাহিদিন গ্রন্থটি থেকে তথ্য যাচাই করেননি। ফলে তিনি এই গ্রন্থের রেফারেন্স দিয়ে এমন এক তথ্য লিখেছেন বইটিতে যা নেই। পরের গবেষকদের অনেকেই অন্ধের মত অনুসরণ করেছেন মুহিউদ্দিন খান সাহেবকে, ফলে তাঁদের লেখাতেও রয়ে গেছে একই ভুল।

৪. আবদুল মান্নান তালিব আরেকজন সমাদৃত গবেষক। তার বাংলাদেশে ইসলাম বইটি বহুল প্রশংসিত। এই বইতে তিনি লিখেছেন, শায়খ জয়নুদ্দীন তার ‘তুহফাতুল মুজাহিদীন ফি বাযে আহওয়ালিল বারতাকালিন’ গ্রন্থে এ রাজার শেষ নবী সা. সমীপে উপস্থিত হয়ে স্বেচ্ছায় ইসলাম গ্রহণের কথা বর্ণনা করেছেন।[10]

-আবদুল মান্নান তালিব যদিও শায়খ যাইনুদ্দিনের কথা বলেছেন, কিন্তু তিনি রেফারেন্স দিয়েছেন আকরম খাঁর মোছলেম বঙ্গের সামাজিক ইতিহাস বইয়ের। আর এই বইয়ের উদ্ধৃতি নিয়ে একটু আগেই কথা হয়েছে। গবেষণার ক্ষেত্রে নিজে তাহকিক না করে কাউকে অন্ধ অনুসরণের কী পরিণতি হয় তার সুন্দর একটি উদাহরণ এটি। আবদুল মান্নান তালিবের লেখায়ও চলে এসেছে এমন কথা, যা নেই শায়খ যাইনুদ্দিনের বইতে।

৫. ড. মোহাম্মদ কামাল আহসান ও ড. মো. আবুল বাশার একত্রে একটি প্রবন্ধ লিখেছেন ‘বাংলাদেশে ইসলামের আবির্ভাবপর্ব – একটি বিশ্লেষণাত্মক পর্যালোচনা’ শিরোনামে। এই প্রবন্ধে তারা রাজা চেরুমন পেরুমলের মক্কা গমন, সাথে আদা ও তরবারি নিয়ে যাওয়া ইত্যাদি বিষয় আলোচনা করেছেন।[11]

তারা এই তথ্যের দুটি রেফারেন্স দিয়েছেন। এক- শায়খ যাইনুদ্দিনের তুহফাতুল মুজাহিদিন। দুই- আবদুল মান্নান তালিবের বাংলাদেশে ইসলাম। তাঁদের প্রথম সুত্রটি সঠিক নয়, কারণ সেখানে এমন কোনো তথ্য নেই, যা আমরা আগেও স্পষ্ট করেছি। যে তথ্য শায়খ যাইনুদ্দিনের গ্রন্থে নেই, সেই তথ্য তার নামে উদ্ধৃত করাটা বিস্ময়কর। সম্ভবত তারা অন্য কোথাও দেখে উদ্ধৃত করেছেন। তাঁদের দ্বিতীয় সুত্র তথা, আবদুল মান্নান তালিবের উদ্ধৃতিটা নিয়ে পেছনেই আমরা আলাপ করে এসেছি।

এখানে একটা বিষয় দেখা গেল। আকরম খাঁ থেকে নিয়েছেন আবদুল মান্নান তালিব, আবদুল মান্নান তালিবের কাছ থেকে নিয়েছেন এই দুই গবেষক। এভাবে একটি ভুল ছড়িয়ে গেছে কয়েকটি গ্রন্থে।

৬. এ কে এম আবদুল মান্নান তার এক প্রবন্ধে চেরুমন পেরুমলের ঘটনা উদ্ধৃত করেছেন আকরম খাঁর সুত্র দিয়ে।[12]

দেখা যাচ্ছে ইনিও আকরম খাঁর দেয়া তথ্য যাচাই না করেই উদ্ধৃত করেছেন।

৭. এ কে এম নজীর আহমদের কিছু বইপত্র বেশ জনপ্রিয়। তিনিও তার লেখায় চেরুমন পেরুমলের মক্কা গমন ও নবিজির সাথে সাক্ষাতের ঘটনা উল্লেখ করেছেন।[13] তার লেখার সূত্র হিসেবে উল্লেখ করেছেন মুহিউদ্দিন খান সাহেবের লেখাটিকেই। এ নিয়ে আর নতুন করে কিছু বলার নেই।

এমন আরো অনেক গবেষকের লেখাকে উদ্ধৃত করা যায়। আলোচনা দীর্ঘ হবে ভেবে আমরা সেদিকে গেলাম না। যারাই চেরুমন পেরুমলের কথা এনেছেন তাঁদের লেখায় মৌলিক দুটি খুঁত রয়েছে।

এক – সাধারণত তারা কেউ শায়খ যাইনুদ্দিনের গ্রন্থ থেকে নিজে তাহকিক করেননি। কারো লেখায় পেয়েছেন শায়খ যাইনুদ্দিনের বইতে এমনটা আছে, ব্যস নিজেরাও সেটা লিখে ফেলেছেন।

দুই – কাউকে সাহাবী বলতে হলে কোন ধরণের উসুলের মাধ্যমে তা প্রমান করতে হয়, সেই আলোচনাও তারা এড়িয়ে গেছেন।

ফলে শায়খ যাইনুদ্দিন ও তুহফাতুল মুজাহিদিন গ্রন্থের উদ্ধৃতি দিয়ে ছড়িয়ে পড়েছে এমন ভুলের, যার সাথে শায়খের কোনো সম্পর্কই নেই।

অনলাইনের কিছু লেখায় আজকাল চেরুমন পেরুমলের মক্কাগমন ও ইসলামগ্রহণ প্রমাণের জন্য একটি হাদিসকে আনা হচ্ছে। এখানে এই হাদিসটি নিয়ে কিছু আলোচনা করা যাক।

আবু সাইদ খুদরি রাযিয়াল্লাহু আনহু থেকে বর্ণিত একটি হাদিস আছে এমন—আবু সাইদ খুদরি রাযিয়াল্লাহু আনহু বলেন, হিন্দুস্তানের বাদশাহ রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে একটি থলে হাদিয়া দেন। তাতে আদা ছিল। তখন নবিজি আদাটি টুকরো-টুকরো করে কেটে তাঁর সাহাবিদেরকে খাওয়ান। আমাকেও এক টুকরো খাওয়ান।

ইমাম হাকেম (৪০৫ হি.) রহ. হাদিসটি আল-মুস্তাদরাক আলাস-সহিহাইন কিতাবে বর্ণনা করার পর বলছেন—নবিজির আদা খাওয়া সংক্রান্ত অন্য কোনো হাদিস তিনি পাননি বিধায় এই হাদিসটি এনেছেন।[14]

প্রথমেই হাদিসটির তাখরিজ দেখে নিই। তাখরিজের ক্ষেত্রে শব্দগত মিল আছে কি নেই, তাও দেখব আমরা।

মুস্তাদরাকে হাকেম ছাড়াও বর্ণনাটি উকাইলির আয-যুয়াফাউল কাবির ৩/২৬৭ (দারুল কুতুবিল ইলমিয়্যাহ), ইমাম তাবারানির আল-মু’জামুল কাবির (মাজমায যাওয়ায়েদ, ৫/৪৫, দারুল কিতাবিল আরাবি) এবং ইমাম যাহাবির মিযানুল ই’তিদাল ৩/২৫৪ (দারুল মা’রিফাহ) সহ আব্দুল্লাহ ইবনে আদির আল-কামিল ফি যুআফাইর রিজাল কিতাবে এসেছে।

মুস্তাদরাকে হাকেমের বর্ণনা ছাড়া বাকি সব বর্ণনাতেই ‘মালিকুল হিন্দ’—হিন্দুস্তানের রাজার পরিবর্তে ‘মালিকুর রুম’—রোমের বাদশাহ শব্দে বর্ণিত হয়েছে। অর্থাৎ, মুস্তাদরাকে হাকেমে হিন্দুস্তানের রাজার কথা থাকলেও অন্য বর্ণনাগুলো বলছে রোমের বাদশাহর কথা।

এই বর্ণনাটি মোট দুটি সনদে বর্ণিত আছে। প্রথম সনদ হলো- আহমাদ ইবনে উমর আল-ওয়াদি>নযর ইবনে মুহাম্মাদ আল-জুরাশি>শু’বা ইবনুল হাজ্জাজ…>আবু সাইদ খুদরি রাযি.। দ্বিতীয় সনদ হলো—আহমাদ ইবনে উমর আল-ওয়াদি>আমর ইবনে হাক্কাম>শু’বা…>আবু সাইদ খুদরি রাযি.।

সনদ দুটো দেখা গেলেও মূলত সনদ এখানে একটি। বিষয়টি আবু জাফর উকাইলি রহ. পরিষ্কার করেছেন এভাবে, ‘এটি মূলত আমর ইবনে হাক্কামের হাদিস। আহমাদ ইবনে উমরের কাছে আমর ইবনে হাক্কাম এবং নযর ইবনে মুহাম্মাদ—দুজনের হাদিসই ছিল। (অর্থাৎ, আহমাদ দুজনেরই ছাত্র।) কিন্তু আহমাদের বাড়ি ধ্বসে গেলে হাদিসের কিতাবগুলো টুকরো-টুকরো হয়ে যায়। এরপর আহমাদের কাছে আমর ইবনে হাক্কামের হাদিসগুলো নযরের হাদিসের সাথে তালগোল পাকিয়ে যায়। কিন্তু এই হাদিসটি একমাত্র আমরের হাদিস বলেই পরিচিত। আহমাদের এই তালগোল পাকানোর কারণ হলো—উভয়েই শু’বার কাছ থেকে হাদিস বর্ণনা করেন। তাই এটিকে প্যাঁচ লাগিয়ে নযরের হাদিস বলে বর্ণনা করে ফেলেছে।’[15]

তাহলে বোঝা গেল সনদ মূলত একটি। অর্থাৎ, আমর ইবনে হাক্কামের সনদ।

এবার রাবি হিসেবে আমর ইবনে হাক্কামের মান দেখি। আমর ইবনে হাক্কাম হলেন ইমাম শু’বা ইবনুল হাজ্জাজের ছাত্র। শু’বা থেকে তিনি চার হাজার হাদিস বর্ণনা করলেও তার সবগুলো হাদিস পরিত্যাজ্য।

আলি ইবনুল মাদিনি বলেন—‘শু’বার যেসব ছাত্রের হাদিস পরিত্যাগ করা হয়, আমর ইবনে হাক্কাম তাদের একজন।’ ইমাম বুখারি বলেন—‘আমর ইবনে হাক্কাম মুহাদ্দিসদের নিকট তেমন মজবুত কেউ নন। আলি ইবনুল মাদিনি তাঁকে দুর্বল বলেছেন।’ আলি ইবনুল মাদিনি আরও বলেন-‘তোমরা দুই আমরের হাদিস পরিত্যাগ করো। আমর ইবনে হাক্কাম এবং আমর ইবনে মারযুক।’[16] ইমাম বুখারি যখন বলেন—‘তেমন মজবুত কেউ নয়’, এর অর্থ হলো—ব্যক্তিটি তার মতে দুর্বল।[17]

হাফেজ আব্দুল্লাহ ইবনে আদি বলেন—‘আমর ইবনে হাক্কাম যতগুলো হাদিস বর্ণনা করে, তার সব হাদিসের অবস্থা হলো—কোনো মুতাবাআত পাওয়া যায় না। তবে দুর্বল হলেও তার হাদিস লেখা যাবে।’[18]

মুতাবাআত পাওয়া যায় না মানে হলো—হাদিসগুলো আমর ইবনে হাক্কাম একাই বর্ণনা করেন। এগুলো তার তাফাররুদাত। আর দুর্বল হওয়ার কারণে তার তাফাররুদ হাদিস গ্রহণযোগ্য হয় না। এখানে দুটি বিষয় উল্লেখযোগ্য। ১. ইবনে আদির এই মূল্যায়ন উল্লেখ করে ইমাম যাহাবি কোনো প্রতিবাদ করেননি। অর্থাৎ, তিনি এই মূল্যায়ন মেনে নিয়েছেন। নয়ত মিযানুল ই’তিদালের বিভিন্ন জায়গায় দেখা যায় অন্যের মূল্যায়নকে তিনি রদ করেন। ২. ‘দুর্বলতা সত্ত্বেও আমর ইবনে হাক্কামের হাদিস লেখা যাবে’—এর অর্থ কী? এর অর্থ হলো—তার হাদিস কোনোকিছুর দলিল হতে পারবে না। তবে অন্য হাদিসের সমার্থক হতে পারবে।[19]

ইবনে আদির এই মূল্যায়ন হলো আমর ইবনে হাক্কামের সামগ্রিক হাদিস সম্পর্কে। এখন উক্ত হাদিসের অবস্থান কী—সেটা দেখি।

১. ইবনে আদির আল-কামিল এবং উকাইলির আয-যুআফাউল কাবির—এই দুই কিতাবের বৈশিষ্ট্য হলো—যেই রাবির আলোচনা চলছে, সেই রাবি সম্পর্কে মন্তব্য উদ্ধৃত করবার পর তার কিছু হাদিস উল্লেখ করা হয়। সেই হাদিসগুলো হয়ত যয়িফ মুতাফাররিদ, নয়ত স্পষ্ট মুনকার বা মাউযু। ওপরে তাখরিজে আমরা দেখেছি—এই হাদিসটি আল-কামিল এবং উকাইলির আয-যুআফাতে এসেছে। অর্থাৎ, তারা হাদিসটি এনেছেন মুনকার হিসেবে। এই হাদিসের কারণে খোদ আমরের নামই হয়ে গেছে ‘যানজাবিলি’—আদাওয়ালা।

২. হাদিসটি প্রথম পেয়েছি আমরা মুস্তাদরাকে হাকেমে। মুস্তাদরাকে হাকেম সামগ্রিক মান হিসেবে খুব উঁচু মানের কিতাব নয়। বরং এই কিতাবে প্রচুর পরিমানে যয়িফ জিদ্দান, মুনকার এবং এবং মাউযু হাদিস আছে। অনেক বাড়াবাড়ি পর্যায়ের শিয়া বর্ণনা আছে। এই কিতাবের ওপর ইমাম যাহাবি কাজ করেছেন। প্রতিটি হাদিস সম্পর্কে সংক্ষেপে মন্তব্য জুড়ে দিয়েছেন। সেখানে এই হাদিসের পর ইমাম যাহাবির মন্তব্য হলো—‘এই হাদিসের সনদে আমর ইবনে হাক্কাম আছে। এই হাদিসের কারণে ইমামগণ তাঁকে দুর্বল বলেছেন। ইমাম আহমদ তার হাদিস পরিত্যাগ করেছেন।’[20]

৩. মিযানুল ই’তিদালে হাদিসটি উল্লেখ করার পর ইমাম যাহাবি বলছেন—‘এই বর্ণনাটি একাধিক কারণে মুনকার। এক. রোমের বাদশাহ নবি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে কোনোকিছু হাদিয়া দিয়েছেন—এমন কথা কোথাও জানা যায় না। দুই. রোম থেকে হিজাযে আদা হাদিয়া পাঠানো আকলও অস্বীকার করে। এটা তো রোম থেকে মদিনায় খেজুর হাদিয়া পাঠানোর মতো ব্যাপার। আমর ইবনে হাক্কাম থেকে পরে অনেকে এই হাদিস বর্ণনা করেছে।’[21]

তাহলে সারকথা যা দাঁড়াচ্ছে তা হলো—আদা হাদিয়া পাঠানোর এই ঘটনা মুস্তাদরাকের বর্ণনায় হিন্দুস্তানের রাজার কথা থাকলেও একই সনদের অন্য একাধিক বর্ণনায় রোমের বাদশাহর কথা আছে। এই হাদিসের মূল রাবি আমর ইবনে হাক্কাম। বর্ণনাকারী হিসেবে আমর ইবনে হাক্কাম দুর্বল। এককভাবে তার কোনো হাদিসই দলিলযোগ্য নয়। এটা তার সামগ্রিক অবস্থা। তবে এই হাদিসটির অবস্থা শুধু সাধারণ দুর্বল নয়; বরং এটি মুনকার। ইমাম যাহাবি স্পষ্ট তাকে মুনকার বলেছেন। ইবনে আদি ও উকাইলি তার মুনকার হাদিসের প্রমাণ হিসেবে এই হাদিসটি এনেছেন।

সুতরাং এই বর্ণনা দিয়ে হিন্দুস্তান তো নয়ই, রোমের বাদশাহর উপঢৌকনের কথাও প্রমাণ করা যায় না।

পুরো আলোচনার সারকথা হলো

১. চেরুমন পেরুমলকে সাহাবী বলার মত মজবুত কোনো শাস্ত্রীয় দলিল এখন পর্যন্ত আমাদের সামনে আসেনি।

২. শায়খ যাইনুদ্দিনের বইতে একজন রাজার ইসলামগ্রহণের কথা আছে। কিন্তু তার সময়কাল, মক্কায় পৌছা, কিংবা নবিজির সাথে সাক্ষাত সম্পর্কে কিছুই বলা নেই সেখানে। যারাই শায়খ যাইনুদ্দিনের বরাত দিয়ে এই তথ্য লিখেছেন তারা স্পষ্ট ভুল করেছেন।

৩. মালাবারের লোককথার কিছু সোর্সে রাজার নাম ও মক্কাগমনের কথা আছে। কিন্তু এসব দিয়ে শাস্ত্রীয় বিষয় প্রমাণিত হয় না।

আল্লাহ আমাদেরকে সঠিক বিষয়টি অনুধাবনের তাওফিক দিক।

পাদটিকা:

[1] মুকাদ্দিমা ইবনিস সলাহ, পৃ-২৯৪ – ইবনুস সলাহ। তাহকিক – ড. নুরুদ্দিন ইতর, দারুল ফিকর।

[2] তারিখে ফিরিশতা, উর্দু অনুবাদ দ্রষ্টব্য।

[3] প্রাচীন কোনো শহর।

[4] ভারত মহাসাগরের তীরে অবস্থিত ইয়ামানের একটি শহর। মুজামুল বুলদান দ্রষ্টব্য।

[5] তুহফাতুল মুজাহিদিন, ২২৬ – শায়খ যাইনুদ্দিন। মুআসসাসাতুল ওফা, বৈরুত।

[6] তুহফাতুল মুজাহিদিন, উর্দু অনুবাদ, পৃ-১৪ – অনুবাদক – হাকিম সাইয়েদ শামসুল্লাহ কাদেরি হায়দারাবাদি। শেরওয়ানি প্রিন্টিং প্রেস, আলিগড়। ১৯৪৬ খ্রিস্টাব্দ।

[7] মোছলেম বঙ্গের সামাজিক ইতিহাস, পৃ- ৫৯ – মাওলানা মোহাম্মদ আকরম খাঁ। ঐতিহ্য।

[8] চেপে রাখা ইতিহাস, ৩৩ – গোলাম আহমদ মোর্তজা। মুনশী মোহাম্মদ মেহেরুল্লাহ রিসার্চ একাডেমি , ঢাকা।

[9] প্রাচীন বাংলায় মুসলিম আগমন, ২/৯৩ – ড. মোহাম্মদ হান্নান। বিশ্বসাহিত্য ভবন, ঢাকা।

[10] বাংলাদেশে ইসলাম, ৩৩ – আবদুল মান্নান তালিব। ইসলামিক ফাউন্ডেশন, ঢাকা।

[11] ড সিরাজুল হক ইসলামি গবেষনা কেন্দ্র, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়। ডিসেম্বর-জানুয়ারী, ২০১১।

[12] বাংলায় ইসলামের আবির্ভাব, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় পত্রিকা। সংখ্যা ৮৯, অক্টোবর ২০০৭।

[13] বাংলাদেশে ইসলামের আগমন, ২১ – এ কে এম নজীর আহমদ। বাংলাদেশ ইসলামিক সেন্টার, ঢাকা।

[14] আল মুসতাদরাক আলাস সহিহাইন, বর্ননা নং- ৭১৯০ – দারুল কুতুবিল ইলমিয়্যা।

[15] আয যুআফাউল কাবির, ৩/২৬৭ – উকাইলি।

[16] প্রাগুক্ত।

[17] আর রফউ ওয়াত তাকমিল ফিল জারহি ওয়াত তাদিল, ১৩০ নং পৃষ্ঠার টীকা দ্রষ্টব্য। দশম সংস্করণ, ২০১৬ খ্রিস্টাব্দ।

[18] আল কামিল ফি যুআফাইর রিজালের সুত্রে মিযানুল ইতিদাল, ৩/২৫৪ – হাফেজ শামসুদ্দীন যাহাবী

[19] আর রফউ ওয়াত তাকমিল ফিল জারহি ওয়াত তা’দিল, ১৬৪ পৃষ্ঠার টীকা দ্রষ্টব্য

[20] মুখতাসারু ইস্তিদরাকিল হাফিয যাহাবি আলা মুস্তাদরাকিল হাকিম, পৃ-২৬৫৪। ইবনুল মুলাক্কিন। দারুল আসিমাহ।

[21] মিযানুল ইতিদাল, ৩/২৫৪ – হাগেজ শামসুদ্দীন যাহাবী।