জাতীয় অর্থনীতিতে ঈর্ষণীয় অবদান রাখছে ব্রাহ্মণবাড়িয়া

মুনশি নাঈম:

নদী-মাতৃক বাংলাদেশের মধ্য-পূর্বাঞ্চলের ঐতিহ্যবাহী তিতাস-বিধৌত জেলা ব্রাহ্মণবাড়িয়া। পূর্ব ভারতের ত্রিপুরা রাজ্যের সীমান্ত সংলগ্ন ব্রাহ্মণবাড়িয়ায় ১৮৬০ ইং সালে মহকুমা প্রতিষ্ঠিত হয়। শুরুতে ত্রিপুরা জেলার অন্তর্ভুক্ত ছিল। ভারত বিভাগের পর কুমিল্লা জেলার একটি মহকুমা হিসেবে থাকে। ১৯৮৪ সালের ১৫ ফেব্রুয়ারী জেলা হিসেবে প্রতিষ্ঠা লাভ করে। শিল্প-সংস্কৃতি, শিক্ষা-সাহিত্যে দেশের অন্যতম অগ্রণী জনপদ ব্রাহ্মণবাড়িয়া। ব্রাহ্মণবাড়িয়া জেলা জাতীয় অর্থনীতিতেও ব্যাপক অবদান রাখছে। তিতাস গ্যাস ফিল্ড, সালদা গ্যাস ফিল্ড, মেঘনা গ্যাস ফিল্ড দেশের এক-তৃতীয়াংশ গ্যাস সরবরাহ যোগায়। আশুগঞ্জ তাপ বিদ্যুৎ কেন্দ্র দেশের ২য় বৃহত্তম বিদ্যুৎ উৎপাদন কেন্দ্র। আশুগঞ্জ সার কারখানা দেশের ইউরিয়া সারের অন্যতম বৃহত্তম শিল্প কারখানা। ব্রাহ্মণবাড়িয়া জেলা শিল্প সংস্কৃতির ধারক ও বাহক এবং দলমত নির্বিশেষে ধর্মীয় ও সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতির এক উজ্জ্বল মিলন মেলা হিসেবে এ দেশের মানচিত্রে বিশেষ মর্যাদার আসনে অধিষ্ঠিত।

ব্রাহ্মণবাড়িয়া জেলার নামকরণ নিয়ে একাধিক মত রয়েছে। এস এম শাহনূর প্রণীত ‘নামকরণের ইতিকথা’ থেকে জানা যায়, সেন বংশের রাজত্বকালে ব্রাহ্মণবাড়িয়ায় অভিজাত ব্রাহ্মণকুলের অভাবে পূজা-অর্চনায় বিঘ্ন সৃষ্টি হতো। এ কারণে রাজা লক্ষণ সেন আদিসুর কন্যকুঞ্জ থেকে কয়েকটি ব্রাহ্মণ পরিবারকে এ অঞ্চলে নিয়ে আসেন। তাদের মধ্যে কিছু ব্রাহ্মণ পরিবার শহরের মৌলভী পাড়ায় বাড়ী তৈরী করে। সেই ব্রাহ্মণদের বাড়ীর অবস্থানের কারণে এ জেলার নামকরণ ব্রাহ্মণবাড়িয়া হয় বলে অনেকে বিশ্বাস করেন। অন্য একটি মতানুসারে দিল্লী থেকে আগত ইসলাম ধর্ম প্রচারক শাহ সুফী হযরত কাজী মাহমুদ শাহ এ শহর থেকে উল্লেখিত ব্রাহ্মণ পরিবার সমূহকে বেরিয়ে যাবার নির্দেশ প্রদান করেন , যা থেকে ব্রাহ্মণবাড়িয়া নামের উৎপত্তি হয়েছে বলে মনে করা হয়।

ব্রাহ্মণবাড়িয়ার আঞ্চলিক উচ্চারণ ‘বাউনবাইরা’। এছাড়া ব্রাহ্মণবাড়িয়ার বিকৃত নাম ‘বি-বাড়িয়া’ বহুল প্রচলিত। যার ফলে ব্রাহ্মণবাড়িয়ার ঐতিহ্য ক্ষুণ্ণ হচ্ছে। এ অবস্থার উত্তরণে ব্রাহ্মণবাড়িয়া জেলা প্রশাসন হতে বিভিন্ন উদ্যোগ গ্রহণ করা হয়েছে এবং ২০১১ সালে ব্রাহ্মণবাড়িয়া জেলা প্রশাসন হতে সকল ক্ষেত্রে বি-বাড়িয়ার পরিবর্তে ‘ব্রাহ্মণবাড়িয়া’ লেখার প্রজ্ঞাপন জারি করা হয়।

ভৌগলিক তথ্য

জেলাটির আয়তন ১,৯২৭.১১ বর্গ কি:মি:। এতে রয়েছে ৯টি উপজেলা, ৫টি পৌরসভা, ১০০ ইউনিয়ন, ১৩২৩টি গ্রাম। এর উত্তরে হবিগঞ্জ জেলা, পূর্বে ভারতের ত্রিপুরা রাজ্য, দক্ষিণে কুমিল্লা জেলা, পশ্চিমে মেঘনা নদী ও নরসিংদী জেলা।

নয়টি উপজেলার নাম: ১. ব্রাহ্মণবাড়িয়া সদর: এত ১১টি ইউনিয়ন ২. আশুগঞ্জ উপজেলা: এত ৮টি ইউনিয়ন ৩. আখাউড়া উপজেলা: এত ৫টি ইউনিয়ন ৪. নবীনগর উপজেলা: এত ২১টি ইউনিয়ন ৫. নাসিরনগর উপজেলা; এত ১৩টি ইউনিয়ন ৬. কসবা উপজেলা; এত ১০টি ইউনিয়ন ৭. বাঞ্ছারামপুর উপজেলা; এত ১৩টি ইউনিয়ন ৮. সরাইল উপজেলা;এত ৯টি ইউনিয়ন ৯. বিজয় নগর উপজেলা; এত ১০টি ইউনিয়ন।

কৃষ্টি ও ঐতিহ্য

১. নৌকা বাইচ: মনসা পূজা উপলক্ষে ভাদ্র মাসের প্রথম তারিখে ব্রাহ্মণবাড়িয়ার তিতাস নদীতে শত বছর যাবত ঐতিহ্যবাহী নৌকা বাইচ অনুষ্ঠিত হয়ে আসছে । এ অনুষ্ঠানটির প্রাচীনতা সম্পর্কে ত্রিপুরা জেলা গেজেটীয়ার থেকে জানা যায় যে, ১৯০৮ সালে অনুষ্ঠিত নৌকা বাইচ ছিল একটি ঐতিহাসিক প্রতিযোগিতা । ঐ প্রতিযোগিতায় আখাউড়া, আশুগঞ্জ, চান্দুরা এবং কুটির ইংরেজ পাট ব্যবসায়ীরা বহু সোনার মেডেল দিয়ে নৌকা বাইচ প্রতিযোগীদের পুরষ্কৃত করেছিলেন । তাছাড়া কুমিল্লা জেলা গেজেটীয়ার থেকে বৃটিশ শাসনামলে নৌকা বাইচ সর্ম্পকে ব্রাহ্মণবাড়িয়ার তৎকালীন মহকুমা প্রশাসক মি: ওয়ারস এর রিপোর্টের বর্ণনায় আরো জানা যায় যে, এখানে নিয়ম-দস্তুর মাফিক কোন নৌকা বাইচ অনুষ্ঠিত হতো না । সাধারণ একটি নৌকা আর একটি নৌকাকে চ্যালেঞ্জ দিত এবং দাঁড়িরা তালে তালে দাঁড় ফেলে পাল্লা দিয়ে নৌকা চালিয়ে নিয়ে যেত । একটি নৌকা আর একটি নৌকাকে পেছনে ফেলে দিতে পারলেই তার জিত হতো । ১৯০৮ সালে কিন্তু আখাউড়ার কয়েকটি পাট কোম্পানীর দেওয়া স্বর্ণ পদকের জন্য দস্তুরমত নৌকা বাইচ হয়েছিল এবং তাতে এমন ভীষণ উত্তেজনার সৃষ্টি হয়েছিল যে, পুলিশকে বহু কষ্টে শান্তি রক্ষা করতে হয়েছিল ।

ত্রিশের দশকেও ব্রাহ্মণবাড়িয়া শহর সংলগ্ন তিতাসের বুকে অতি জাঁকজমকের সাথে গণ উৎসব এ নৌকা বাইচ অনুষ্ঠিত হতো । বিজয়ী নৌকাকে মেডেল, কাপ, শীল্ড, পিতলের কলস, পাঁঠা ইত্যাদি ট্রফি দেয়া হতো । নৌকা বাইচ উপলক্ষ্যে লঞ্চ, বিভিন্ন ধরনের নৌকা, কোষা, কলাগাছের ভেলা, এমন কি মাটির গামলাকে পর্যন্ত রং-বেরঙের কাগজের ফুল ইত্যাদি দিয়ে বিচিত্র সাজে সজ্জিত করা হতো।

২. আসিল মোরগ লড়াই: ব্রাহ্মণবাড়িয়ার সরাইলে এই ঐতিহ্যবাহী মোরগ লড়াই অনুষ্ঠিত হয়। সরাইলের হাঁসলী মোরগ এর উচ্চতা, ক্ষিপ্রতা, দৈহিক শক্তি ও কস্ট সহিষ্ণুতার জন্য বিখ্যাত । মোঘল আমল থেকে এ অঞ্চলে মোরগ লড়াই চালু হয় বলে জানা যায় । বিশেষ করে সরাইলের দেওয়ানদের প্রত্যক্ষ সহযোগিতায় মোরগ লড়াই এ অঞ্চলে বিশেষ তাৎপর্য লাভ করে । দুটি মোরগের মধ্যে অনুষ্ঠিত লড়াইয়ে মোরগের নখগুলোকে চোখা তীক্ষ্ণ করা হয় । যতক্ষণ না একটি মোরগ পরাজিত হচ্ছে ততক্ষণ পর্যন্ত লড়াই চলতে থাকে । সরাইলের দেওয়ান মনোয়ার আলী সুদূর ইরান থেকে মতান্তরে রায়বেরেলি থেকে একপ্রকার যুদ্ধবাজ মোরগ দেশে আনয়ন করেন । এ ধরনের মোরগকে হাঁসলি মোরগ বা আসলি মোরগ নামে সবাই চেনে। অত্যন্ত দুধর্ষ ও কষ্ট সহিষ্ণু হিসেবে এদের সুনাম আছে । এ মোরগগুলো যুদ্ধের সময় যে কায়দায় পরষ্পরকে মার দেয় এগুলোর আলাদা নাম আছে । যেমন – নিম, কারি, বাড়ি, ফাঁক, ছুট ও কর্ণার।

হাঁসলি মোরগ বিশেষ বৈশিষ্ট্যমণ্ডিত । হাঁসলী মোরগের যেগুলোর গলায় পালক থাকে না সেগুলো অত্যন্ত জেদী যোদ্ধা হয়ে থাকে । এগুলো পরাজয় বরণে পিছু হটেনা । শেষ পর্যন্ত যুদ্ধ চালিয়ে থাকে । যোদ্ধা একজোড়া ভাল মোরগের দাম ২৫,০০০/- টাকা থেকে ৩০,০০০/-টাকা পর্যন্ত হয়ে থাকে ।

৩. গরুর দৌড়: বাঞ্ছারামপুর থানার রূপসদী গ্রামে এই ঐতিহ্যবাহী গরুর দৌড় অনুষ্ঠিত হয়।

৪. ভাদুঘরের বান্নী (মেলা): ব্রাহ্মণবাড়িয়া অঞ্চলে বিভিন্ন মাজারের উরশ শরীফকে কেন্দ্র করে ২/৩ দিন আবার কোন কোন স্থানে সপ্তাহ ব্যাপী মেলা উদযাপিত হয়। সুদূর প্রাচীন কাল থেকে চলে আসা চৈত্র মাসের কৃষ্ণা ত্রয়োদশী শতভিষা নক্ষত্র যুক্ত হলে যে বারুনী যোগ হয়, সেই যোগে গঙ্গাস্নানের নাম বারুনী স্নান। সরাইল থাকার ধিতপুরেও এ ধরনের বারুনী স্নান অনুষ্ঠিত হয় বলে গবেষক লুৎফুর রহমান তাঁর বইয়ে উল্লেখ করেছেন । ভাদুঘরের বান্নী ১৪ বৈশাখ প্রতি বৎসর অনুষ্ঠিত হয়ে আসছে । অনেকে মনে করেন ভাদুঘরের মেলা খাজনা আদায়কে উপলক্ষ্য করেই অনুষ্ঠিত হয়ে থাকবে ।

৫. রঈসুল মোফাচ্ছিরীন, বড় হুজুর আল্লামা সিরাজুল ইসলাম রহ.- এর স্মৃতিবিজড়িত সুহিলপুর তাফসির মাঠে ১৫ দিন ব্যাপী ঐতিহাসিক সুহিলপুর কোরআন তাফসীর মাহফিল

৬. জামিয়া ইসলামিয়া ইউনুছিয়া, ব্রাহ্মণবাড়িয়া মাদরাসার বার্ষিক মাহফিল

৭. খড়মপুর কেল্লাশাহ’র মাজারের বার্ষিক ওরশ।

৮. চিলোকুট গ্রামে সৈয়দ আ: রউফ এর ওরশ ।

৯. মিষ্টি: বৃটিশ রাজত্ব কালে ব্রাহ্মণবাড়িয়ার মিষ্টি, ছানামুখি এর সুখ্যাতি দেশ বিদেশে ছড়িয়ে পড়েছিল । জানা যায় , ভারতের বড়লাট লর্ড ক্যানিং এর জন্য একটি বিশেষ ধরনের মিষ্টি তৈরী করে পাঠানো হয়েছিল কলকাতায় । লর্ড ক্যানিং এবং স্ত্রী লেডী ক্যানিং এ মিষ্টি খেয়ে খুব প্রশংসা করেছিলেন । এরপর এ মিষ্টির নাম রাখা হয় ‘লেডি ক্যানিং’মিষ্টি বর্তমানে যা‘লেডি ক্যানি’নামে পরিচিত। আর একটি মিষ্টির নাম ‘ছানামুখী’। এ ছানামুখীর সুনাম এখনও দেশ বিদেশে অক্ষুন্ন রয়েছে। ১৯৮৬ সনে ইসলামাবাদে বাংলাদেশের রাষ্ট্রদূত অফিসে বাংলাদেশের স্বাধীনতা দিবসের এক অনুষ্ঠানে তৎকালীন পাকিস্তানের প্রেসিডেন্ট জেনারেল জিয়াঊল হক ব্রাহ্মণবাড়িয়ার লেডী ক্যানি খেয়ে উচ্ছ্বখিত প্রশংসা করেছিলেন যা পাকিস্তানের বিভিন্ন পত্র পত্রিকায় ছাপা হয়েছিল।

শিল্প ও অর্থনীতি

ব্রাহ্মণবাড়িয়ার তাঁত শিল্প বিখ্যাত। ১৮৭৬ খ্রীষ্টাব্দে রচিত ডব্লিউ, ডব্লিউ, হান্টারের “স্যাটেস্টিক্যাল এ্যাকাউন্ট অব বেঙ্গল, ভলিউম-৬”-এ উল্লেখ রয়েছে যে, বিগত শতাব্দীর শেষ পাদে ব্রাহ্মণবাড়িয়ার সরাইলে তনজেব নামের অতি উৎকৃষ্ট মসলিন বস্ত্র তৈরী হতো। এ তনজের ঢাকার বিখ্যাত শবনম মসলিনের সমকক্ষ ছিল বলেও উক্ত গ্রন্থে বলা হয়েছে।

গত শতকের গোড়ার দিকে আখাউড়া, আশুগঞ্জ, চান্দুরায় ইংরেজ ব্যবসায়ীরা জুট বেইলিং সেন্টার প্রতিষ্ঠা করেছিলেন বলে “ইর্স্টান বেঙ্গল ডিস্ট্রিক্ট গেজিটিয়ার্স টিপারা”-(রচনাকাল ১৯১০ খ্রী:) তে উল্লেখ করা হয়েছে । চান্দুরা এলাকায় উৎপন্ন পাট পৃথিবীর শ্রেষ্ঠ কোয়ালিটির পাট বলে কথিত এবং তা শুধু কথার কথাই নয়, বৃটিশ আমলে ডান্ডিতে চান্দুরার পাট চান্দুরা পাট পরিচয়ে খ্যাতি অর্জনে সক্ষম হয়েছিল ।

জেলার ব্যবসা কেন্দ্রগুলোর মধ্যে ব্রাহ্মণবাড়িয়া সদর শহর, আশুগঞ্জ, আখাউড়া, ফান্দাউক, চাতলপাড়, সিঙ্গারবিল, সিমনা বাজার, চান্দুরা, চইয়ারকুড়ি, পানিশ্বর, সাতবর্গ, নবীনগর, আজবপুর, রামচন্দ্রপুর, মানিকনগর, কুটি, বাঞ্ছারামপুর উল্লেখযোগ্য। রামচন্দ্রপুরের লুঙ্গি ও বাঞ্ছারামপুরের তাতেঁর কাপড় বিখ্যাত।

তিতাস নদীর পাড়ে পাড়ে রয়েছে অনেকগুলো ইটখোলা । এসব ইটখোলায় গ্যাস, কয়লা ও জ্বালানি কাঠে পোড়ানো ইট স্থানীয় চাহিদা মিটিয়ে চলেছে ।

সুতাকল

ব্রাহ্মণবাড়িয়া শহরের উত্তর প্রান্তে মেড্ডা গ্রামে কোকিল টেক্সটাইল মিলস নামে একটি সুতাকল রয়েছে । এতে ১৯৬৬ সালের জানুয়ারী মাসে উৎপাদন শুরু হয় । বর্তমানে এই টেক্সটাইল এর কার্যক্রম বন্ধ রয়েছে ।

বিসিক শিল্প নগরী

ব্রাহ্মণবাড়িয়া সদর থানার নন্দনপুরে একটি বিসিক শিল্প নগরী রয়েছে ।

রাধিকার টুপি

এ টুপি শিল্পও উল্লেখযোগ্য প্রশংসার দাবিদার। ব্রাহ্মণবাড়িয়া শহর থেকে পাঁচ মাইল দক্ষিণে অবস্থিত সদর থানার রাধিকা নামের গ্রামটি তার বাসিন্দাদের হাতের কাজের পারদর্শিতার গুণে বিশিষ্টতা অর্জন করেছে । প্রায় ২০০ বছর ধরে এ গাঁয়ের ১০০ এর বেশী পরিবারের অনেকগুলো নিপুণ হাত তালের ডায়গা আর জালি বেতের আঁশ দিয়ে টুপি তৈরী করে আসছে । বছরে চার মাস এ কাজে নিয়োজিত থাকেন তারা । তাছাড়া এ শিল্পকর্ম রাধিকা গ্রামের ক্ষুদ্র গণ্ডি অতিক্রম করে ব্রাহ্মণবাড়িয়া সদর থানার মেড্ডা, ভাদুঘর, জগৎসার, হাবলাউচ্চ ও চানপুর গ্রামগুলোতেও সম্প্রসারিত হচ্ছে ।

তাপ বিদ্যুৎ কেন্দ্র

আশুগঞ্জ তাপ বিদ্যুৎ কেন্দ্রটি মেঘনা নদীর তীরে অবস্থিত । বিদ্যুৎ উৎপাদন কেন্দ্রের আয়তন ৩১১ একর । পশ্চিম জার্মানী থেকে আর্থিক সহায়তা নিয়ে এই বিদ্যুৎ কেন্দ্র নির্মাণ করা হয় । ভবনসমূহের নিমার্ণ কাজ শুরু হয় ১৯৬৬ সনের মে মাস থেকে । ১৯৬৮ সনের শেষ দিকে শুরু হয় মূল যন্ত্রপাতিগুলো বসানোর কাজ । প্রথম ইউনিটটি ১৯৭০ এর ২৭শে জুলাই ও দ্বিতীয়টি ১১ই আগস্ট চালু হয় । উভয় ইউনিটের ক্ষমতা ৬৪০০ মেগাওয়াট করে । কেন্দ্রটি স্থাপনের সময়ে এই ইউনিটগুলোর ক্ষমতা ১০০ মেগাওয়াট করে সম্পসারণের ব্যবস্থা রাখা হয়েছিল । এছাড়াও দ্বিতীয় পর্যায়ে একটি অতিরিক্ত ইউনিটে প্রায় ২০০ মেগাওয়াট সম্প্রসারণের ব্যবস্থা ছিল ।

স্বাধীনতার পরে দেশের বিদ্যুৎ চাহিদা বেড়ে যায় দ্রুত হারে । এ চাহিদা মেটানোর জন্যে আশুগঞ্জ বিদ্যুৎ কেন্দ্রের সম্পাসারণের সিদ্ধান্ত নেয়া হয় দ্বিতীয় পঞ্চবার্ষিক পরিকল্পনায়। বিশ্বব্যাংক আর্থিক সহায়তার প্রতিশ্রুতি দেয় এবং প্রতিটি ১৫০ মেগাওয়াট ক্ষমতার দুটো নতুন ইউনিট বসানোর পরামর্শ দেয় । পরবর্তীকালে ৩য় ও ৪র্থ ইউনিট স্থাপনের জন্যে প্রাপ্ত ঋণের কিছু অর্থ থেকে যাওয়ায় বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ড একই ক্ষমতাসম্পন্ন আরেকটি ইউনিট স্থাপনের সিদ্ধান্ত নেয় । ১৯৮৪ সালের মার্চে ৩য় ও ৪র্থ ইউনিটের কাজ শুরু হয় আর ৫ম টির কাজ শুরু হয় ১৯৮৫এর নভেম্বরে । এই ইউনিট তিনটি যথাক্রমে ১৯৮৬ এর ডিসেম্বর, ৮৭ এর মে এবং ৮৮ এর মার্চে চালু হয় । বর্তমানে আশুগঞ্জ বিদ্যুৎ উৎপাদন কেন্দ্রের উৎপাদন ক্ষমতা ৭২৪ মেগাওয়াট। এখানকার ষ্টীম ও গ্যাস উভয় ধরনের টারবাইনে জ্বালানী হিসেবে তিতাস গ্যাস ফিল্ড থেকে প্রাপ্ত প্রাকৃতিক গ্যাস ব্যবহার করা হয় ।

আশুগঞ্জ সার কারখানা

আশুগঞ্জ ফার্টিলাইজার কোম্পানী লিমিটেড দেশের চালু সার কারখানাগুলোর মধ্যে দ্বিতীয় বৃহত্তম কারখানা । এটি ব্রাহ্মণবাড়িয়া জেলার আশুগঞ্জে মেঘনা নদীর পূর্ব পাড়ে অবস্থিত একটি অত্যাধুনিক সার কারখানা। আশুগঞ্জের সন্নিকটে ব্রাহ্মণবাড়িয়ার তিতাস গ্যাস থেকে ইউরিয়া সারের প্রধান উপাদান গ্যাসের সহজলভ্যতা এবং সারা দেশের সাথে রেল, সড়ক এবং নদীপথে যাতায়াত ও যোগাযোগ ব্যবস্থার সুবিধা বিবেচনা করে সরকার আশুগঞ্জকে এ কারখানা নির্মাণের স্থান নির্বাচন করে।

কারখানাটি বাস্তবায়নের জন্য সরকার ১৯৭৪ সালের অক্টোরব মাসে শিল্প মন্ত্রণালয়ের অধীন আশুগঞ্জ ফার্টিলাইজার এন্ড কেমিক্যাল কোম্পানী লিমিটেড নামে একটি কোম্পানী গঠন করে । ১৯৮৩ সনের ১লা ডিসেম্বর কারখানাটির পরিচালনার ভার বাংলাদেশ কেমিক্যাল ইন্ডাষ্ট্রিজ কর্পোরেশনের অধীনে ন্যস্ত করা হয় ।১৯৭৬ সালে কারখানার নির্মাণ কাজ শুরু হবার কথা ছিল । ১৯৭৮ সালে কারখানার প্রকৃত নিমাণ কাজ শুরু হয় এবং ১৯৮১ সালে কারখানায় উৎপাদন আরম্ভ হয় । বৃটেনের ফষ্টার হুইলার লিমিটেড কারখানা সাধারণ ঠিকাদার হিসাবে কাজ করে। বৃটেন, যুক্তরাষ্ট্র, জাপান, ইতাল, পশ্চিম জার্মানী, ফ্রান্স, ভারত, অষ্ট্রিয়া, সুইজারল্যান্ড ও কানাডাসহ পৃথিবীর বহু দেশ হতে কারখানার মেশিনপত্র এবং নির্মাণ সামগ্রী আনা হয় । নির্মাণকালে প্রায় ২০০ বিদেশী কারিগরসহ দৈনিক প্রায় ৮,০০০(আট হাজার) লোক কাজ করে। বিশ্ব ব্যাংক, এশীয় উন্নয়ন ব্যাংক, যুক্তরাষ্ট্রেও আন্তর্জাতিক উন্নয়ন সংস্থা, কে.এফ.ডব্লিউ (জার্মানী), ওভারসিজ ডেভেলপমেন্ট মিনিষ্ট্রি (ইউ.কে), ইরান, সুইজারল্যান্ড, ইফাদ, ওপেক ও ইইসি প্রকল্পের জন্য ঋণদান করে । ৩৫০.১৮ কোটি টাকা দেশীয় মুদ্রাসহ মোট ৭৫৭.৭৪ কোটি টাকা ব্যয়ে কারখানা নির্মাণ করা হয়।উৎপাদন ক্ষমতাঃকারখানাটির দৈনিক উৎপাদন ক্ষমতা ১৬০০ মেট্রিক টন ইউরিয়া এবং ৯৩০ মেট্রিকটন এ্যামোনিয়া । বার্ষিক উৎপাদন ক্ষমতা ৫,২৮,০০০ মেট্রিক টন ইউরিয়া ।

পাদুকা শিল্প

ব্রাহ্মণবাড়িয়া জেলা শহরের মধ্যপাড়া থেকে পীরবাড়ি এলাকায় জুতা শিল্পের ছোট ছোট কারখানা গড়ে উঠেছে যা এ অঞ্চলের মানুষের পাদুকা চাহিদা মেটানোর পরও দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে সরবরাহ করা হয় । এসব শিল্প কারখানায় এ অঞ্চলের মানুষের কর্মসংস্থান সৃষ্টির ফলে একদিকে যেমন বেকার সমস্যার সমাধান হচ্ছে অন্য দিকে দক্ষ জনশক্তি গড়ে উঠছে । এ সম্ভাবনাময় শিল্পটিকে প্রয়োজনীয় সহায়তা করা হলে ভবিষ্যতে ব্যাপক পরিসরে বিস্তার লাভ করবে । নৌযান শিল্প (অরুয়াইল পাকশিমূল),আশুগঞ্জ চালের মিল ও লাকড়ি, লিচু ও অন্যান্য ফলমূল, অর্কিড রপ্তানী (সরাইল)

প্রাকৃতিক সম্পদ

তিতাস গ্যাস ফিল্ড

এটি ব্রাহ্মণবাড়ীয়া জেলা শহরের সদরে অবস্থিত। ১৯৬২ সালে পাকিস্তান শেল অয়েল কোম্পানী এ গ্যাস ক্ষেত্রটি আবিষ্কার করে। ফিল্ডটি উত্তর-দক্ষিণে ১৯x১০ বর্গ কিলোমিটার এবং প্রায় ৫০০ মিটার একটি উলম্ব ক্লোজার ব্যাপী বিস্তৃত। পেট্রোবাংলার থেকে প্রাপ্ত তথ্যানুসারে তিতাস গ্যাস ক্ষেত্রের মোট উত্তোলনযোগ্য গ্যাসের পরিমাণ ৭,৫৮২ বিলিয়ন ঘনফুট (বিসিএফ)। ১৯৬৮ সাল থেকে এ গ্যাস ক্ষেত্র থেকে বাণিজ্যিকভাবে গ্যাস উৎপাদন শুরু করা হয়।

৩১ জানুয়ারি, ২০১৯ পর্যন্ত সর্বমোট ৪৬৭২.২২৭ বিলিয়ন ঘনফুট গ্যাস বা উত্তোলনযোগ্য মোট মজুদের শতকরা ৬১.৬২% গ্যাস উৎপাদন করা হয়েছে। ২০১৯ সালের জানুয়ারি মাসে, তিতাস ফিল্ডের ২৬টি উৎপাদনরতকূপ থেকে গড়ে দৈনিক ৫১০.৯১ মিলিয়ন ঘনফুট হারে গ্যাস উৎপাদিত হয় এবং ১০ টি গ্লাইকল ডিহাইড্রেশন টাইপ, ৪ টি নিম্ন তাপমাত্রার সেপারেটর (LTS) এবং ২ টি গ্লাইকল উইথ এলটিএস টাইপ ডিহাইড্রেশন প্রসেস প্লান্টের মাধ্যম প্রক্রিয়া করে তিতাস গ্যাস ট্রান্সমিশন অ্যান্ড ডিস্ট্রিবিউশন কোম্পানি লিমিটেড (টিজিটিডিসিএল) এবং গ্যাস ট্রান্সমিশন কোম্পানি লিমিটেড (জিটিসিএল) এর ট্রান্সমিশন পাইপলাইনে সরবরাহ করা হয়। এ ফিল্ড থেকে ২০১৯ সালের জানুয়ারি মাসে গ্যাসের উপজাত হিসেবে গড়ে দৈনিক ৪৩৫.২৯ ব্যারেল কনডেনসেট উৎপাদিত হয়। ২০১৯ সালের জানুয়ারি মাসে এ গ্যাস ক্ষেত্রের কনডেনসেট ও গ্যাসের গড় অনুপাত ০.৮৫০ ব্যারেল/মিলিয়ন ঘনফুট এবং পানি ও গ্যাসের গড় অনুপাত ০.৮০০ ব্যারেল/মিলিয়ন ঘনফুট (তিতাস কূপ নং- ১২, ১৩, ২১ ও ২২ ব্যতীত)।

বিজিএফসিএল এর তিতাস, নরসিংদী এবং হবিগঞ্জ ফিল্ডের উৎপাদিত কনডেনসেট এবং বাপেক্সের শ্রীকাইল, রূপগঞ্জ, সালদা ও সেমুতাং ফিল্ড হতে উৎপাদিত কনডেনসেট তিতাস ফিল্ডে স্থাপিত দুটি ফ্রাকশনেশন প্লান্টের মাধ্যমে প্রক্রিয়াকরণ করে এমএস (পেট্রোল) এবং এইচএসডি (ডিজেল) উৎপাদন করা হয়। উৎপাদিত পণ্য পদ্মা অয়েল কোম্পানি লিমিটেডের নিকট বিক্রয় করা হয়।

মেঘনা গ্যাস ফিল্ড

ব্রাহ্মণবাড়ীয়া জেলার বাঞ্ছারামপুর উপজেলায় মেঘনা গ্যাস ফিল্ড অবস্থিত। ১৯৯০ সালে পেট্রোবাংলা মেঘনা গ্যাস ক্ষেত্রটি আবিষ্কার করে। পেট্রোবাংলার হিসাব অনুযায়ী, এ গ্যাস ক্ষেত্রটির মোট উত্তোলনযোগ্য গ্যাসের মজুদ ১০১ বিলিয়ন ঘনফুট (বিসিএফ)। ১৯৯৭ সালে মেঘনা ফিল্ড থেকে বাণিজ্যিক গ্যাস উৎপাদন শুরু করা হয়। শুরুতে মেঘনা গ্যাস ক্ষেত্র হতে দৈনিক ২০ মিলিয়ন ঘনফুট হারে গ্যাস উৎপাদন করা হয় কিন্তু অত্যাধিক পানি উৎপাদনের কারণে ১০ আগস্ট, ২০০৭ সাল থেকে এ ক্ষেত্রটির গ্যাস উৎপাদন স্থগিত করা হয়।

পরবর্তীতে ওয়ার্কওভারের মাধ্যমে পূন:সম্পাদন করে (ডুয়াল কমপ্লিশন) ৮ সেপ্টেম্বর, ২০১০ সাল থেকে শর্ট ট্রিং থেকে গ্যাস উৎপাদন শুরু করা হয়। ১৬ ফেব্রুয়ারি, ২০১৬ সালে কূপটির লং স্ট্রিং দিয়ে দৈনিক ৫ মিলিয়ন ঘনফুট হারে গ্যাস উৎপাদন শুরু করা হলেও অতিরিক্ত পানি উৎপাদনের জন্য ১৬ মে, ২০১৬ সাল থেকে গ্যাস উৎপাদন বন্ধ করে দেয়া হয়। বর্তমানে শুধুমাত্র শর্ট স্ট্রিং দিয়ে গড়ে দৈনিক ১৩ মিলিয়ন ঘনফুট হারে গ্যাস উৎপাদন করা হচ্ছে। ৩১ জানুয়ারি, ২০১৯ পর্যন্ত মোট উত্তোলনযোগ্য গ্যাসের পরিমাণ ৬৯.৩১৪ বিলিয়ন ঘনফুট বা শতকরা ৬৮.৬৩% । এ ফিল্ডের একটি মাত্র কূপ হতে ২০১৯ সালের জানুয়ারি মাসে গড়ে দৈনিক ১২.০১ মিলিয়ন ঘনফুট হারে গ্যাস উৎপাদন করে ফিল্ডে স্থাপিত দুটি এলটিএক্স টাইপ প্রসেস প্লান্টের মাধ্যমে প্রক্রিয়াকরণ করে বিজিএসএল এর সিস্টেমে সরবরাহ করা হয়। গ্যাসের উপজাত হিসেবে দৈনিক প্রায় ১৮.৭৭ ব্যারেল কনডেনসেট উৎপাদিত হয়।

সালদা নদী গ্যাস ফিল্ড

এটি ব্রাহ্মণবাড়িয়া জেলায় অবস্থিত । ১৯৯৬ সালে বাপেক্স গ্যাসক্ষেত্রটি খনন করে যার গভীরতা ২৫১২ মিটার । বর্তমানে এই গ্যাসক্ষেত্রটি থেকে গ্যাস উৎপাদন করা হচ্ছে।

নদ-নদী 

জেলার প্রধান নদী তিতাস ও মেঘনা। উপনদী ও শাখা নদী-আউলিয়া জুড়ি, ডোল ভাঙ্গা, পাগলা, বুড়ী, কালাছড়া, ছিনাইহানি, বলভদ্র, বালুয়া, বিজনা, রোপা, লংঘন, লহুর, সোনাই, হাওড়া প্রভৃতি। জেলা মেহেদী ও আকাশি প্রধান হাওর। জেলার উল্লেখযোগ্য দীঘি হচ্ছে সাগরদীঘি, কল্যাণীদীঘি, শোকসাগর দীঘি, গঙ্গাসাগর দীঘি, ধর্ম দীঘি, রাজার দীঘি, ফসলা দীঘি।

(আগামীকাল দ্বিতীয় পর্বে থাকছে শিক্ষা ও সংস্কৃতি বিষয়ক আর্টিকেল )

বিজ্ঞাপন