ডিল অফ দ্য সেঞ্চুরি : কী ঘটতে যাচ্ছে ফিলিস্তিনের ভাগ্যে?

তুহিন খান

আমেরিকার প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প, ট্রাম্প-জামাতা কুশনার ও তাঁদের আরব বন্ধুদের ভাষায় ‘ডিল অফ দ্য সেঞ্চুরি’। ফিলিস্তিনের প্রেসিডেন্ট মাহমুদ আব্বাস বলেছেন ‘স্ল্যাপ অফ দ্য সেঞ্চুরি’। ফিলিস্তিনের জনগণের অভিমত— এর নাম হওয়া উচিত ‘ডিল অফ দ্য ডেভিল’। বিবিসির সিনিয়র সাংবাদিক বিল ল’র ভাষায়, এটা হলো ‘স্টিল অফ দ্য সেঞ্চুরি’। কথা হচ্ছে আরব বিশ্বে ‘শান্তিপ্রতিষ্ঠা’র লক্ষ্যে আমেরিকার প্রস্তাবিত নতুন অর্থনৈতিক কর্মসূচি নিয়ে। আমেরিকা ও তার আরব মিত্ররা এটি বাস্তবায়নের জন্যে আদাজল খেয়ে নামলেও, ফিলিস্তিন বা মুসলিম বিশ্ব এই কর্মসূচিকে ঘৃণার সাথে প্রত্যাখ্যান করেছে। তুরস্কের প্রেসিডেন্ট এরদোগান বলেছেন, আমেরিকার এই ‘ডিল অব সেঞ্চুরি’র ছলে আঙ্কারা ভুলবে না। আর চিন্তাবিদ, সোশাল অ্যাক্টিভিস্ট ও মধ্যপ্রাচ্য গবেষকরা আশঙ্কা করছেন, ‘ডিল অব সেঞ্চুরি’ আসলে ফিলিস্তিনি জনগণের ভাগ্যকফিনে শেষ পেরেকটি ঠুকে দেয়ার পাঁয়তারা।

ডিল অফ দ্য সেঞ্চুরি কী?

ফিলিস্তিনের মাটিতে অবৈধ ইসরাইল রাষ্ট্রের প্রতিষ্ঠার পর থেকেই, আমেরিকা ও ইউরোপের মানবতাবাদী রাজনীতির ঝকঝকে মুখোশটি ধীরে ধীরে গোটা বিশ্বের সামনে খুলে গেছে। মধ্যপ্রাচ্যে আমেরিকার যেকোনো ‘শান্তিপ্রস্তাব’ হলো, খুলে পড়া সেই মুখোশটা পুনরুদ্ধারের ব্যর্থ চেষ্টা, যা অতীতে বারবারই প্রমাণিত হয়েছে। এর আগেও আমেরিকা এ ধরনের ‘শান্তিপ্রস্তাব’ এনেছিল, সেগুলো হালে পানি পায়নি। ফিলিস্তিনের মুক্তিকামী জনগণ তাদের স্বাধীনতার দাবি ছেড়ে ‘আমেরিকার ছলনায়’ ভোলে নাই।

‘ডিল অফ দ্য সেঞ্চুরি’ আমেরিকার অতীত সরকারগুলোর ধারাবাহিকতায়ই, মধ্যপ্রাচ্যে ট্রাম্প-প্রশাসনের তরফে প্রস্তাবিত একটি ‘শান্তিপ্রস্তাব’। বিগত প্রায় তিন বছর যাবত ট্রাম্প-জামাতা ও হোয়াইট হাউজের প্রধান অ্যাডভাইজার জ্যারেড কুশনার এই শান্তিপ্রস্তাবের খসড়া তৈরি এবং এর পক্ষে আরব মিত্রদের সম্মতিগ্রহণের কাজ করে চলেছেন। ২০১৭ সালে ট্রাম্প তাঁর জামাতা ও প্রধান পরামর্শদাতা কুশনারকে মধ্যপ্রাচ্য, বিশেষত ফিলিস্তিন ইস্যুতে একটা চূড়ান্ত পদক্ষেপ গ্রহণের জন্য পরিকল্পনা প্রণয়নের আদেশ দেন। প্রো-ইসরাইল হিসেবেই সারাবিশ্বে পরিচিত জ্যারেড কুশনার প্রায় সাথেসাথেই কাজে নেমে পড়েন। মধ্যপ্রাচ্যে তাঁর শান্তিদূত জ্যাসন গ্রিনব্লাটকে সাথে নিয়ে একের পর এক সৌদি আরব, কাতার, মিশর, জর্ডান, বাহরাইন, আরব আমিরাতসহ মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলোতে সফর শুরু করেন কুশনার। লক্ষ্য একটাই–ফিলিস্তিন ইস্যুতে আরব নেতাদের আমেরিকার সঙ্গ দিতে রাজি করা এবং পরিকল্পনাধীন শান্তিপ্রস্তাবে তাঁদের সম্মতি গ্রহণ। ইজসরাইলে আমেরিকান অ্যাম্বাসি তেল আবিব থেকে পূর্ব জেরুসালেমে স্থানান্তর এবং পূর্ব জেরুসালেমকে ইসরাইলের রাজধানী হিসেবে স্বীকৃতি দেয়াও এই ‘ডিল অব সেঞ্চুরি’র অংশ বলেই মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা। মজার ব্যাপার হলো, একের পর এক বিভিন্ন আরব রাষ্ট্রে এবং ইসরাইলে ‘শান্তিপরিকল্পনা’ নিয়ে সফর করলেও, যে ফিলিস্তিনিদের নিয়ে এই পরিকল্পনা, তাদের কোনো প্রতিনিধির সাথেই দেখা করেননি কুশনার। আমেরিকার ‘ডিল অব সেঞ্চুরি’র আসল স্বরূপ এর মধ্য দিয়েই ধরা পড়ে যায়।

কবে নাগাদ প্রকাশিত হচ্ছে ‘ডিল অফ দ্য সেঞ্চুরি’?

প্রায় তিন বছর যাবত তোড়জোড় চললেও, এখনও পর্যন্ত এই শান্তিপ্রস্তাবের পূর্ণাঙ্গ কোনো রূপরেখা প্রকাশ করেনি হোয়াইট হাউজ। গত জুনে এটি প্রকাশের কথা থাকলেও, বাহরাইনে আরব দেশগুলোর সম্মেলনে এর অংশবিশেষমাত্র প্রকাশ করেছে আমেরিকা। পরে, ‘ফিলিস্তিনি জনগণের জন্য শান্তি ও সমৃদ্ধির নতুন বার্তা’ শিরোনামে প্রকাশিত এই প্রস্তাবের অর্থনৈতিক চুক্তি সংক্রান্ত অংশটির পূর্ণাঙ্গ আরবি অনুবাদ নিজের টুইটারে শেয়ার করেন মধ্যপ্রাচ্যে আমেরিকার শান্তিদূত জ্যাসন গ্রিনবেল্ট।

বিশেষজ্ঞদের ধারণা, আরব মিত্র রাষ্ট্রগুলোর অনুরোধে এবং ইসরাইলের আসন্ন নির্বাচন ও রাজনৈতিক অস্থিরতার মুখেই পূর্ণাঙ্গ খসড়া প্রকাশে বিলম্ব করছে আমেরিকা। সেপ্টেম্বরে ইসরাইলের সংসদ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হবে, এবং বিশ্লেষকদের মতে এটিই ঘোষণা মুলতবি রাখার সবচেয়ে বড় কারণ। তাছাড়া, আরবের ক্ষমতাপ্রিয় মিত্র নেতাদের আমেরিকা পাশে পেলেও, সমগ্র আরব বিশ্বের আপামর জনগণ এবং মুসলিম বিশ্ব আমেরিকার এই প্রহসনকে ইতিমধ্যেই প্রত্যাখ্যান করেছে। জুনের শুরুতেই ফিলিস্তিন ও আরব বিশ্বসহ বিভিন্ন দেশে হাজার হাজার মানুষ আমেরিকার এই পদক্ষেপের প্রতিবাদ করেছে। ফলে, মিত্র আরব নেতারা আমেরিকাকে সবকিছু চূড়ান্ত করার আগে তা প্রকাশ না করার অনুরোধ জানিয়েছেন বলেও অনেকের ধারণা, যাতে আরব বিশ্বের রাজনীতির হাওয়া ফের উল্টোদিকে বইতে শুরু না করে।

অপ্রকাশিত বা অর্ধপ্রকাশিত থাকলেও কুশনার বা ট্রাম্পের বিভিন্ন মন্তব্য, আরব নেতাদের বক্তব্য এবং চুক্তির প্রকাশিত অংশ থেকে অনুমান করে নেয়া যায়, কেমন হতে পারে এই ‘ডিল অফ দ্য সেঞ্চুরি।’ বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এই চুক্তি এর আগেকার যেকোনো শান্তিপ্রস্তাবের চাইতে বেশি একরোখা, চাঁচাছোলা, অপমানজনক এবং ইসরাইলবান্ধব।

কেমন হতে পারে এই ‘ডিল অফ দ্য সেঞ্চুরি’?

‘ডিল অফ দ্য সেঞ্চুরি’ নামের এই প্রহসনের পূর্ণাঙ্গ রূপরেখা প্রকাশিত না হলেও এর মধ্যেই এই শান্তিপ্রস্তাবের মূলসুর অনুমান করা যাচ্ছে। এখন পর্যন্ত প্রাপ্ত তথ্যাদির ভিত্তিতে বিশেষজ্ঞরা বলছেন, ‘ডিল অফ দ্য সেঞ্চুরি’ হলো কিছু সামান্য অর্থের লোভ দেখিয়ে ফিলিস্তিনিদের স্বাধীনতার আকাঙ্ক্ষাকে কিনে নেয়া।

মূলত এই শান্তিপ্রস্তাবটি পূর্বের যেকোনো শান্তিপ্রস্তাবের চাইতে ভয়াবহ ও অপমানজনক। ‘ফিলিস্তিনি জনগণের জন্য শান্তি ও সমৃদ্ধির নতুন দিগন্ত’ শিরোনামে এই শান্তিপ্রস্তাবের লোভনীয় অংশ বা টোপটি প্রকাশ করা হয় গত জুনে, বাহরাইনে আয়োজিত এক ইকোনমিক ওয়ার্কশপে। মূলত ফিলিস্তিন এবং তার আশপাশের অঞ্চলগুলোতে ৫০ বিলিয়ন ডলার ইনভেস্ট করা, ফিলিস্তিনের অবকাঠামোগত উন্নয়ন, জিডিপি গ্রোথ বাড়ানো, বেকারত্ব দূরীকরণ, স্বাস্থ্য ও শিক্ষার মান বৃদ্ধি—এগুলোই কথিত ‘ডিল অফ দ্য সেঞ্চুরি’র মূল প্রস্তাব। অর্থনৈতিক উন্নয়নের এই টোপ ফেললেও, ফিলিস্তিনের মূল যে রাজনৈতিক আকাঙ্ক্ষা, ইসরাইলের অবৈধ স্যাটেলমেন্ট তুলে নেয়া বা স্বাধীন ফিলিস্তিন রাষ্ট্রের সংগ্রাম, সেসব নিয়ে এই ডিলে কোনো কথাই নেই। এমনকি আমেরিকার পূর্ব-প্রস্তাবিত ‘টু স্টেট সলুশন’ অথবা ২০০২-এর আরব সামিটে প্রস্তাবিত স্বাধীন ফিলিস্তিন রাষ্ট্রের রূপরেখার ব্যাপারেও নীরব এই ডিল। বরং নেতানিয়াহুর ঘনিষ্ঠ বন্ধু জ্যারেড কুশনারের বিভিন্ন সময়ের নানান মন্তব্য ও আমেরিকার সাম্প্রতিক কর্মকাণ্ডে এটা ভেবে নেয়া যেতেই পারে যে, বিজনেসম্যান ট্রাম্প মূলত ফিলিস্তিনের স্বাধীনতা সংগ্রামকে ‘উন্নয়ন’ নামক ফাঁপা বুলির বিনিময়ে কিনতে চাইছেন।

এই ডিল আসলেই কি কোনো শান্তি আনতে সক্ষম?

কিন্তু প্রশ্ন হচ্ছে, কুশনারের এই ডিল আসলেই কি মধ্যপ্রাচ্যে বা ফিলিস্তিনে শান্তি আনতে সক্ষম? নাকি আমেরিকা ও তার আরব মিত্রদের গলার কাঁটা ফিলিস্তিনকে সমূলে উপড়ে ফেলার জন্যেই এই কথিত ‘ডিল অফ দ্য সেঞ্চুরি’? বিশেষজ্ঞদের মতে, এই শান্তিপ্রস্তাব ফিলিস্তিনের স্বাধীনতা সংগ্রামের কফিনে সর্বশেষ পেরেকটি গেঁথে দেওয়ার প্রস্তুতি।

যেসব ফাঁপা উন্নয়নের কথা এই ডিলে বলা হয়েছে, সেসব নিয়ে বিস্তারিত কথা বলেছেন অনেকেই। শিকাগোনিবাসী আরব-আমেরিকান জার্নালিস্ট, শিকাগো ট্রিবিউন ও লস এঞ্জেলেস টাইমসের নিয়মিত কলামলেখক, ফিলিস্তিন ইস্যুতে ‘ওয়ান স্টেট সলুশন’-এর পক্ষে সবচেয়ে স্পষ্ট কণ্ঠস্বর, ‘ইলেক্ট্রিক ইন্তেফাদা’র সহ-প্রতিষ্ঠাতা এবং ‘ওয়ান কান্ট্রিঃ আ বোল্ড প্রপোজাল টু অ্যান্ড দ্য ইসরাইলি-প্যালেস্টিনিয়ান ইমপ্যাস’-এর মতো দুর্দান্ত বইয়ের লেখক আলি আবু নি’মাহও কথা বলেছেন এই কথিত পিসডিল নিয়ে। তাঁর মতে, ট্রাম্পের এই পিস ডিল মূলত ফিলিস্তিনের উপর ইসরাইলি অবরোধ ও অবৈধ দখলদারত্ব আরও জোরদার করার প্রয়াস।

আলি আবু নি’মাহ এক সাক্ষাৎকারে আমেরিকার অর্থনৈতিক উন্নয়নের প্রস্তাবের ব্যাপারে বলেন, ‘আমেরিকা এবং ইজরাইল মিলেই তো ফিলিস্তিনের অর্থনীতি ধ্বংস করেছে। আমেরিকা যে ফিলিস্তিনে অনুদান বন্ধ করে দিয়েছিল, সেকথা কেউই ভোলে নাই। বছরে প্রায় ৫০০ মিলিয়ন ডলারের অর্থ সাহায্য, যা আমেরিকার এজেন্সিগুলো ফিলিস্তিনি রিফিউজিদের দিত, ট্রাম্প সরকার বন্ধ করে দিয়েছে। জেরুসালেমের ৬টি প্রধান হাসপাতালে প্রতি বছর প্রায় ২৫ মিলিয়ন ডলারের অর্থসাহায্য বরাদ্দ ছিল, আমেরিকা তা বন্ধ করে দিয়েছে। আর এখন সেই আমেরিকাই কিনা বলছে ফিলিস্তিনের অর্থনৈতিক উন্নয়নে তারা ইনভেস্ট করবে? এটা হাস্যকর।’

আলি আবু নি’মাহ প্রশ্ন তোলেন, ‘কুশনার বলছেন যে, ফিলিস্তিনের জনগণ সবচেয়ে বেশি অনুদান পাওয়া জাতি—এটা খুবই অপমানজনক ভাষা। আমি ওয়ার্ল্ড ব্যাংকের ফ্যান না, তবুও ওদের একটা ডাটা দিই। ওয়ার্ল্ড ব্যাংকের মতে, ফিলিস্তিনের জিডিপি প্রায় ৩৫% কমে গেছে শুধুমাত্র ইসরাইলের অবৈধ অবরোধের কারণে। গাজায় ভার্সিটি গ্রাজুয়েটদের মধ্যে বেকারত্বের হার প্রায় ৮০%। এগুলো এজন্যে না যে, তারা অলস বা অক্ষম। এটা ১২ বছরের ইসরাইলি অবরোধের ফল। তার মানে, ওয়ার্ল্ড ব্যাংকের মতে, শুধুমাত্র ইসরাইলি অবরোধ তুলে নিলেই ফিলিস্তিনের জিডিপি গ্রোথ অটোমেটিক ৩৫% বাড়বে, অথচ কুশনারের ‘প্রসপারিটি ডিল’-এ এ নিয়ে কোনো কথাই নাই।’

ইসরাইলের কড়া অবরোধ ভেদ করে কীভাবে ৫০ বিলিয়ন ডলার ফিলিস্তিনিদের কাছে পৌঁছবে, এ নিয়েও বিশ্লেষকরা প্রশ্ন তুলেছেন। আলি আবু নি’মাহ এ প্রসঙ্গে বলেন, ‘প্রথমত, এই অনুদানের এখন পর্যন্ত কোনো অস্তিত্ব নাই, এটা এখনও আন ফান্ডেড। ধরে নিলাম, এটা আসলেই আছে, তো কারা দেবে এটা? গাল্ফ স্টেটগুলো। আর এ ধরনের অনুদানের কথা বলে ওয়াদা ভঙ্গের রেকর্ড তাদের পুরানা। যদি দেয়ও, অর্ধেক যাবে ফিলিস্তিনে আর অর্ধেক যাবে মিশর, লেবানন ও অন্যান্য যেসব দেশে ফিলিস্তিনি রিফিউজি আছে সেসব দেশে। সেক্ষেত্রে ফিলিস্তিন পাবে ২৫ বিলিয়ন, তাও ১০ বছরে, মানে বছরে মাত্র আড়াই বিলিয়ন। এই টাকা যুদ্ধবিধ্বস্ত ফিলিস্তিনের জন্যে কিছুই না।’

ফিলিস্তিনের জনগণের ‘অর্থনৈতিক উন্নতি ও সমৃদ্ধি’র জন্য এই ফাঁপা অর্থনৈতিক প্রকল্প প্রস্তাব করলেও, যে কারণে ফিলিস্তিনের জনগণের এই প্রায় শতাব্দীকালের দুর্দশা ও দুর্ভোগ, যে স্বাধীনতা অর্জনের জন্য তাদের প্রায় অর্ধ শতাব্দীকালের এই লড়াই ও সংগ্রাম—সে ব্যাপারে কুশনারের এই ডিলে কিছুই নেই। ইসরাইলের গাজা অবরোধ ও পশ্চিম তীরে অবৈধ স্থাপনা নির্মাণ বিষয়ে, কিংবা ফিলিস্তিন-ইসরাইলের মধ্যে শতাব্দীকালব্যাপী চলমান রাজনৈতিক সংকট নিয়ে কী প্রস্তাবনা এই ডিলের? বিশেষজ্ঞদের অনুমান আশঙ্কাজনক। জ্যারেড কুশনার বা ট্রাম্প—কেউই এ ব্যাপারে স্পষ্ট কিছু বলেননি। তবে কুশনারের প্রো-ইসরাইলি নীতি, পূর্ব জেরুসালেমে আমেরিকান অ্যাম্বেসি স্থানান্তর, মূল সংকট এড়িয়ে হুট করে অর্থনৈতিক সাহায্যের প্রলোভন, ইসরাইলে আমেরিকার রাষ্ট্রদূত ফ্রিডম্যানের পশ্চিম তীরের অবৈধ স্থাপনায় সম্মতি প্রদান আর বিভিন্ন সময়ের নানান কথাবার্তার প্রেক্ষিতে এটুকু স্পষ্ট যে, ইসরাইলের স্বার্থবিরোধী কোনো কাজ আমেরিকা করবে তো নাই, বরং এই ডিল ফিলিস্তিনকে আরও গভীর সংকটে ফেলে দেবে। কুশনারের কিছু বক্তব্য দেখে নেয়া যাক।

এই ডিলের রাজনৈতিক প্রস্তাবনার ব্যাপারে কুশনার বলেছেন, ২০০২-এ আরব নেতাদের বৈঠকে যে শান্তি প্রস্তাবনা দেয়া হয়েছিল, এবারের রাজনৈতিক প্রস্তাবনায় হয়তো সেটুকু সুযোগও ফিলিস্তিনিদের জন্য থাকবে না। ২০০২-এর আরব সামিটে যে শান্তি প্রস্তাব আনা হয়েছিল, সেখানে ইসরাইলকে স্বাধীন সার্বভৌম রাষ্ট্র হিসেবে স্বীকার করে নেয়ার কথা বলা হয়েছিল, তাদের সাথে পূর্ণ কূটনৈতিক সম্পর্কের কথাও বলা ছিল, এমনকি কিছু অবৈধ সেটেলমেন্টও ওই প্রস্তাবনায় মেনে নেয়ার কথা বলা হয়েছিল। শর্ত ছিল, গাজা ও পশ্চিম তীরে একটি স্বাধীন ফিলিস্তিন রাষ্ট্র ইসরাইলের মেনে নিতে হবে। অথচ কুশনার বলছেন, এবারের রাজনৈতিক প্রস্তাবনায় এরচেয়েও কম সুযোগ থাকবে! এরচেয়ে কম সুযোগ কেমন হতে পারে, তা খুবই স্পষ্ট একটি ব্যাপার।

সেটা অবশ্য কুশনার নিজে বেশ স্পষ্টভাষায় বলেছেনও। HBO চ্যানেলে দেয়া এক সাক্ষাৎকারে ,ডিলের পলিটিকাল প্ল্যানে ‘টু স্টেট সল্যুশন’ থাকছে কিনা এ প্রসঙ্গে কুশনার বলেন, ‘ফিলিস্তিনিরা অবশ্যই আত্মনিয়ন্ত্রণ অর্জনের দাবিদার’, কিন্তু ফিলিস্তিনের স্বাধীনতার প্রশ্ন এড়িয়ে গিয়ে ‘তারা একটি স্বাধীন দেশ চালাতে সক্ষম কিনা’, এ ব্যাপারে অনিশ্চয়তা প্রকাশ করেন। এমনকি ‘টু-স্টেট সলুশন’ থাকছে কিনা, এ প্রশ্নও তিনি এড়িয়ে যান। উল্লেখ্য, ইসরাইলকে মেনে নিয়েই, পূর্ব জেরুসালেমকে রাজধানী করে গাজা ও পশ্চিম তীরে স্বাধীন ফিলিস্তিন রাষ্ট্র গঠনই হল ‘টু স্টেট সলুশন’। কুশনারের ডিল এ ব্যাপারেও যখন নীরব, তখন এই ডিলের স্বরূপ বেশ স্পষ্ট।

মজার ব্যাপার, বাহরাইনে গত জুনে যে ইকোনমিক ওয়র্কশপে এই ডিলের অংশবিশেষ প্রকাশিত হয়েছে, সেখানে কোনো ফিলিস্তিনি বা ইসরাইলি প্রতিনিধি উপস্থিত ছিলেন না। ফিলিস্তিন ও ইসরাইলকে দূরে রেখে, আমেরিকা ও তার আরব মিত্ররা যে ইসরাইলের ইশারায় তাদের নতুন সম্পর্কের পথে বড় বাধা ফিলিস্তিনকে সরিয়ে ফেলতে চাইছে, তা এ থেকে স্পষ্টই বোঝা যায়।

ডিল অফ দ্য সেঞ্চুরি : আরব নেতাদের ভূমিকা

আরব রাষ্ট্রগুলো, বিশেষত সৌদি আরব ও গালফ স্টেটগুলোর সাথে আমেরিকা ও ইসরাইলের নতুন উষ্ণ সম্পর্কের কথা এখন আর কারোরই অজানা নয়। বিশেষত আরব বসন্ত এবং সিরিয়ার গৃহযুদ্ধ থেকে উদ্ভুত নতুন রাজনৈতিক পরিস্থিতিতে, মধ্যপ্রাচ্যে নিজেদের বংশানুক্রমিক ক্ষমতা ও আধিপত্য টিকিয়ে রাখার জন্য সৌদি আরবসহ অন্যান্য রাষ্ট্রগুলোর তৎপরতা বেড়েছে। এবং সেই রাজনৈতিক সমীকরণ থেকেই ইসরাইলকে প্রকাশ্য স্বীকৃতি প্রদান এবং আমেরিকা ও ইসরাইলের সাথে সম্পর্ক বাড়ানো আরব নেতাদের অন্যতম রাজনৈতিক এজেন্ডায় পরিণত হয়েছে। এরই বলি হচ্ছে সাধারণ ফিলিস্তিনিরা।

ফিলিস্তিন নিয়ে আরব নেতাদের সত্যিকারের কোনো উদ্বেগ আদৌ কখনও ছিল কিনা, বলা মুশকিল। ফিলিস্তিন প্রসঙ্গে হোয়াইট হাউজের নির্দেশনার বাইরে তারা কখনোই কিছু করতে পারেনি। কিন্তু যেহেতু ফিলিস্তিন ছিল বিশ্ব মুসলিমের আবেগ ও লড়াই-সংগ্রামের প্রতীক, তাই আরব নেতারা নিজেদের রাজনৈতিক ফায়দার জন্যেই ফিলিস্তিনকে ব্যবহার করেছে। এজন্যেই দেখা যাচ্ছে, যেকোনো জিও-পলিটিকাল প্রশ্নে মতদ্বৈততা থাকলেও, ফিলিস্তিন প্রশ্নে ইরান ও সৌদি আরব একই কাতারে দাঁড়িয়ে। এজন্যেই দেখা যাচ্ছে, ২০১৮ সালে রিয়াদে অনুষ্ঠিত আরব লীগের সম্মেলনকে বলা হচ্ছে ‘আল-কুদস সামিট’, যদিও তার মাত্র কয়েক মাস আগেই পূর্ব জেরুসালেমকে ইসরাইলের রাজধানীর স্বীকৃতি দিয়েছে সৌদির অন্যতম প্রধান মিত্র আমেরিকা। সামগ্রিকভাবে, নিজেদের রাজনৈতিক স্বার্থের বাইরে, ফিলিস্তিন নিয়ে আরব দেশগুলো কখনোই তেমন চিন্তিত ছিল না।

প্রেসিডেন্ট নির্বাচনের বেশ আগ থেকেই আরব বিশ্বে বেশ বড়সড় মিত্রপক্ষ গড়ে তুলেছিলেন প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প। আরব বসন্ত, সিরিয়ার যুদ্ধ, আইসিস এবং ইরান ও রাশিয়ার এলায়েন্স মধ্যপ্রাচ্যের রাজতান্ত্রিক শাসন এবং সৌদি নেতৃত্বের জন্য বেশ অস্বস্তিকর পরিবেশ তৈরি করে। সেই সমীকরণ থেকেই আমেরিকা ও তার মিত্র ইসরাইলের সাথে প্রকাশ্য গাঁটছড়া বাঁধার সিদ্ধান্ত নেয় আরব দেশগুলো। ২০১৫ সালে আমেরিকার প্রেসিডেন্ট নির্বাচনের আগে, লোহিত সাগরে বিন সালমান ও সিসিসহ অন্যান্য আরব নেতাদের গোপন বৈঠকের মিশন এটিই ছিল—প্রেসিডেন্ট হিসেবে ট্রাম্পের মনোনয়ন।

প্রেসিডেন্ট হিসেবে মনোনীত হয়েই ট্রাম্প তাঁর ফিলিস্তিননীতি বাস্তবায়ন শুরু করেন। আরব নেতাদের ইসরাইল ও আমেরিকার সাথে প্রকাশ্য মিত্রতা গড়ে তুলে মধ্যপ্রাচ্যে নিজেদের ক্ষমতা কায়েম রাখার পথে সবচেয়ে বড় রাজনৈতিক বাধা ছিল ফিলিস্তিন। ফলে ট্রাম্প প্রশাসন শুরু থেকেই ফিলিস্তিন ইস্যুতে চূড়ান্ত কিছু করার ইঙ্গিত দিয়ে আসছিল। ত্রাণ পাঠানো বন্ধ করে দেয়া, পূর্ব জেরুসালেমে অ্যাম্বাসি স্থানান্তর এসবেরই ধারাবাহিকতামাত্র। ‘ডিল অফ দ্য সেঞ্চুরি’র প্রক্রিয়া শুরু করার পরপরই কুশনার আরব দেশগুলোতে সম্মতি আদায়ের জন্য সফর শুরু করেন। সৌদির বিন সালমান ও মিশরের সিসি বিশেষভাবে এই প্ল্যান বাস্তবায়নে সাহায্যের আশ্বাস দেন। এক পর্যায়ে আমিরাত বা বাহরাইনের মতো দেশগুলোও কুশনারের এই ডিল মেনে নেয়।

বিন সালমান এ ব্যাপারে তাঁর কথা বেশ স্পষ্টভাবেই বলেছেন— ‘এখনই সময় প্রস্তাবগুলো মেনে নিয়ে আলোচনার টেবিলে আসার। নতুবা ফিলিস্তিনিদের উচিত নিজেদের মুখ এবং মুহুর্মুহু অভিযোগ বন্ধ করা।’ বাহরাইনের অর্থমন্ত্রী এক সাক্ষাৎকারে বলেন, ‘ইসরাইল থাকবে। আমাদের ইসরাইলের সাথে কোনো সমস্যা নেই।’ এ ব্যাপারে আলি আবু নি’মাহ বলেন, ‘এই রেজিমগুলো মাইনরিটি। এরা বংশানুক্রমিক শাসন চালাচ্ছে। এবং বর্তমান রাজনৈতিক অবস্থায়, আমেরিকা ও ইসরাইলকে তারা নিজেদের রক্ষক হিসেবে দেখছে। তাই ইসরাইলের সাথে তারা স্বাভাবিক সম্পর্ক চাচ্ছে। তবে এপথে ফিলিস্তিন বড় বাধা। এই ডিল গালফ স্টেট ও ইসরাইলের মধ্যে, আমেরিকার ঘটকালিতে এক ধরনের ‘পাবলিক ওয়েডিং’, যা ইরানবিরোধী সৌদি-আমেরিকা-ইসরাইলের নেতৃত্বাধীন জোটের কাজকে জোরদার করবে।’

বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, মধ্যপ্রাচ্যে বর্তমান রাজনৈতিক অস্থিতিশীলতায় নিজেদের রাজনৈতিক স্বার্থেই আরব নেতারা ফিলিস্তিনকে বিক্রি করতে চাচ্ছেন। তবে আরবসহ মুসলিম বিশ্বের আপামর জনগণ তাঁদের পথে সবচেয়ে বড় বাধা। আর এজন্যেই, পরিকল্পনা চূড়ান্ত হওয়ার আগে তাঁরা এটি না প্রকাশ করতে আমেরিকাকে অনুরোধ জানিয়েছেন।

শেষ কথা

কেমন হবে আমেরিকার এই নতুন ‘শান্তিপ্রস্তাব’? কী ঘটতে চলেছে ফিলিস্তিনের ভাগ্যে? চূড়ান্ত পরিকল্পনা প্রকাশিত না হলেও, বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এই শান্তিপ্রস্তাব মূলত কুশনারের রিয়েল এস্টেট ব্যবসার মতোই। ফিলিস্তিনি জনতার অর্ধ শতাব্দীর সংগ্রামকে কিছু টাকা ও উন্নয়নের ফাঁকা বুলির বিনিময়ে ক্রয় করা। তাদের থাকতে দেওয়া হবে, খেতে-পরতে দেওয়া হবে, কিন্তু সবই হবে পরাধীনতার শেকলে আবদ্ধ থেকে। আমেরিকার এই ডিলের ব্যাপারে আলি আবু নি’মাহ বলেন, ‘ভবিষ্যতে ইসরাইল কোনো চূড়ান্ত পদক্ষেপ নিলে যেন আমেরিকা তাতে সম্মতি দেয়ার অজুহাত বিশ্বকে দেখাতে পারে, সেজন্যেই এই শান্তিপ্রস্তাব। কারণ আমেরিকা জানে, ফিলিস্তিনিরা এই প্রস্তাব কিছুতেই মেনে নেবে না।

আর মেনে নেবেই-বা কেন? ফিলিস্তিনি যুবক আহমদের ভাষায়, ‘কেবলমাত্র শান্তিই যথেষ্ট না। যেখানে ন্যায়বিচার নেই, স্বাধীনতা নেই, মানুষের মতো বাঁচার অধিকার বা মর্যাদা নেই, সেখানে টাকা-পয়সা বা উন্নয়ন দিয়ে শান্তি আনার কথা হাস্যকর। আমার কাছে শান্তির অর্থ ভিন্ন।’

কুশনার, আমেরিকা ও তার মিত্রদের ফিলিস্তিন বেচাকেনার এই সওদা কি সফল হবে? নাকি ‘ডিল অফ দ্য সেঞ্চুরি’ আমেরিকা ও তার আরব মিত্রদের জন্যে ডেকে আনবে কোনো নতুন বিপদ? প্রায় শতবর্ষব্যাপী এই পরাধীনতার শৃঙ্খল ভেঙে ফিলিস্তিনিরা কি পাবে মুক্তির স্বাদ, নাকি পৃথিবীর মানচিত্র থেকে ফিলিস্তিন নামক ভূখণ্ডটি হারিয়ে যাবে? এ প্রশ্ন এখন সময় ও সময়ের সহসী সন্তানদের জন্যেই তোলা রইল।

তুহিন খান কবি ও ক্রিটিক; সহযোগী সম্পাদক, ফাতেহ টোয়েন্টি ফোর