ড. মুহম্মদ শহিদুল্লাহ : মুসলিম বাংলার কিংবদন্তী ভাষাতাত্ত্বিক

রাগিব রব্বানি

আজ ১০ জুলাই। মুসলিম বাংলার কিংবদন্তী ভাষাতাত্ত্বিক ড. মুহম্মদ শহীদুল্লাহর জন্মবার্ষিকী। ১৮৮৫ সালের এ দিনে পশ্চিমবঙ্গের চব্বিশ পরগনা জেলার বসিরহাট মহকুমার পেয়ারা গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন তিনি। ছেলেবেলা থেকেই ছিলেন তুমুল আনন্দোচ্ছল। হাসি ও আনন্দ দিয়ে আশপাশের সবাইকে মাতিয়ে রাখতেন সারাক্ষণ। বন্ধু-বান্ধবরা এজন্য তাঁর নাম দিয়েছিল সদানন্দ। স্কুলের মাস্টার মশাই চলনে বলনে মুনশিয়ানা দেখে ডাকতেন সিরাজুদ্দৌলা নামে। আর আকিকার সময় আত্মীয়-স্বজনের পছন্দে নাম রাখা হয়েছিল ইবরাহিম। কিন্তু ইতিহাসের পাতায় মায়ের রাখা শহিদুল্লাহ নামটা সর্বাধিক প্রসিদ্ধি লাভ করেছে। শহিদে কারবালার চাঁদে মায়ের গর্ভে এসেছিলেন তিনি। মা ভাবলেন, ছেলের নাম ‘শহীদুল্লাহ’ রাখলে নামের বরকতে একসময় হয়তো স্মরণীয় মনীষীদের তালিকায় নাম উঠবে তাঁর ছেলের। মায়ের এ আশা ও ভাবনা পরবর্তীকালে ষোল আনাই পরিপূর্ণতা লাভ করেছিল। মায়ের রাখা নাম অনুযায়ী বাংলা ভাষা ও সাহিত্যে তিনি বরণীয় হয়ে আছেন ড. মুহম্মদ শহীদুল্লাহ নামে।

পড়াশোনায় সর্বদা নিমগ্ন থাকতে ভালোবাসতেন, অধ্যয়ন আর জ্ঞান-গবেষণায় ছিল তাঁর সমস্ত আনন্দ। এজন্য নিজে নিজের নাম দিয়েছিলেন জ্ঞানানন্দ। নামের যেমন বাহার ছিল তাঁর, কর্মের বাহার ছিল তারচেয়ে ঢের বেশি। কর্মের বাহারে তিনি হয়ে উঠেছিলেন মুসলিম বাংলার কিংবদন্তী ভাষাবিদ, ভাষাবিজ্ঞানী, গবেষক ও শিক্ষাবিদ। ভাষা ও ভাষাতত্ত্বে অর্জন করেছিলেন অগাধ পাণ্ডিত্য। আঠারোটি ভাষায় বিস্তৃত ছিল তাঁর এ পাণ্ডিত্য। বাংলা, ইংরেজি তো রয়েছেই, সংস্কৃত, আরবি, ফার্সি, উর্দু, হিন্দিতে যথেষ্ট জ্ঞান ছিল তাঁর। এ ছাড়া তিনি রপ্ত করেছিলেন গ্রিক, তামিল, আর ল্যাটিন ভাষাও। আসামি, পাঞ্চাবি, গুজরাটি, মারাঠি, ওড়িয়া, কাশ্মীরী, নেপালি, তিব্বতি ইত্যাদি ভাষাও শিখেছিলেন।

ভাষাশিক্ষার এ আগ্রহ বলতে গেলে পারিবারিক সূত্রে অর্জন করেছিলেন তিনি। তাঁর পিতাও চার-পাঁচটা ভাষা জানতেন। সেই সুবাদে প্রাথমিক পর্যায়ে পারিবারিকভাবে এবং পরে ব্যক্তি উদ্যোগে তাঁর ভাষাশিক্ষা জ্ঞানার্জনের শুরু।

ড. মুহম্মদ শহীদুল্লাহর পিতার নাম মফিজুদ্দীন আহমদ আর মাতা হুরুন্নেসা খাতুন। তাঁর বংশ পরিচয় সম্পর্কে জানা যায়, সৈয়দ আব্বাস আলি মক্কি নামে এক কামিল দরবেশ চতুর্দশ শতকে দক্ষিণ বাংলায় ইসলাম প্রচার করেন। পীর গোরাচাঁদ নামেও তিনি পরিচিত। ১২৬৫ সালে পবিত্র মক্কানগরে এই সাধকের জন্ম। কারো কারো মতে তিনি হজরত শাহজালাল রহমতুল্লাহি আলায়হির ৩৬০ আউলিয়ার অন্যতম। হাড়োয়ায় পীর গোরাচাঁদের মাজার অবস্থিত। শহীদুল্লাহর আদি পুরুষ শেখ দারা মালিক এই দরবেশ সাহেবের প্রধান খাদেমরূপে হিন্দুস্তান থেকে এ দেশে আগমন করেন এবং তাঁর দরগাহের বংশানুক্রমিক খাদেমরূপে বহাল হন। ইনিও একজন কামেল দরবেশ ছিলেন। ড. মুহম্মদ শহীদুল্লাহর রক্তে এই কামেল দরবেশের রক্তধারা এবং পীর গোরাচাঁদের রুহানি ফায়েজ প্রবাহিত হয়েছিল।

চার ভাই ও তিন বোনের সংসারে ভাইদের মধ্যে তিনি ছিলেন তৃতীয়। ১০ বছর বয়সে তাকে ভর্তি করানো হয়েছিল হাওড়ার মধ্য ইংরেজি স্কুলে। সেখানে চার বছর পড়াশোনার পর ১৮৯৯ সালে ভর্তি হলেন হাওড়া জেলা স্কুলে। পড়াশোনায় যথেষ্ট মনোযোগী ছিলেন আর স্মৃতিশক্তি ছিল অত্যন্ত প্রখর। হাওড়া জেলা স্কুলে ভর্তির পর প্রথমবারই বার্ষিক পরীক্ষায় লাভ করলেন রৌপ্য পদক।

ছাত্রাবস্থায়ই ভাষা শেখার প্রতি ছিল তাঁর ভীষণ ঝোঁক। স্কুলে পড়া অবস্থায় তিনি সংস্কৃত আর ফার্সি কবিতা বাংলায় অনুবাদ করতেন। ১৯০৪ সালে প্রবেশিকা বা এনট্রান্স পাস করে তিনি কলকাতার প্রেসিডেন্সি কলেজে ভর্তি হন। এখান থেকে ১৯০৬ সালে এফএ পাস করেন। সংস্কৃতে অনার্স নিয়ে বিএ ভর্তি হন হুগলি কলেজে। অসুস্থতার জন্য বিএ পরীক্ষায় পাস করা হয় না, ফলে শিক্ষকতা পেশায় যোগ দেন যশোর জেলা স্কুলে। পরবর্তীকালে ১৯১০ সালে কলকাতা সিটি কলেজ থেকে সংস্কৃতে বিএ অনার্স ডিগ্রি লাভ করেছিলেন।

কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ে তিনি ভর্তি হয়েছিলেন সংস্কৃতে এমএ পড়বেন বলে। কিন্তু তা সম্ভব হয়নি। ফলে কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের তৎকালীন ভাইস চ্যান্সেলর স্যার আশুতোষ মুখোপাধ্যায়ের পরামর্শক্রমে তিনি ভর্তি হন তুলনামূলক ভাষাতত্ত্ব নামে নতুন একটি বিষয়ে। সে বছরই এ বিষয়টি কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ে প্রথমবারের ন্যায় যুক্ত হয় এবং শহীদুল্লাহ এ বিশ্ববিদ্যালয়ে এ বিষয়ের প্রথম ছাত্র হিসেবে ১৯১২ সালে এমএ পাস করেন। জার্মানিতে সংস্কৃত বিষয়ে পড়াশোনার জন্য সরকারি বৃত্তি লাভ করলেও স্বাস্থ্যগত সমস্যার কারণে যেতে পারেননি। পরবর্তীকালে ফ্রান্সের প্যারিসের সোরবন বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ভাষাতত্ত্বে ডিপ্লোমা করেন। এবং একই বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ডিলিট ডিগ্রি লাভের গৌরব অর্জন করেন।

অসামান্য প্রতিভাধর মুহম্মদ শহীদুল্লাহ ছিলেন সুপণ্ডিত ও বহু ভাষাবিদ। ছিলেন মুক্তবুদ্ধির অধিকারী। প্রাচীন ভাষা ও সাহিত্য সম্পর্কে দুরূহ ও জটিল সমস্যার যুক্তিপূর্ণ ব্যাখ্যা ও বিশ্লেষণে অসামান্য পাণ্ডিত্যের পরিচয় দিয়েছেন তিনি।

১৯১৪ সালে তিনি কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে আইন বিষয়ে ডিগ্রি লাভ করেন। তারপর রুটি-রুজির তাগিদে চট্টগ্রামের সীতাকুণ্ড হাইস্কুলে প্রধান শিক্ষক হিসেবে যোগদান করেন। কিন্তু এক বছরের বেশি চাকরি করলেন না। শিক্ষকতা পেশা ছেড়ে দিয়ে ১৯১৫ সাল থেকে ১৯১৯ সাল পর্যন্ত ওকালতি ব্যবসা শুরু করলেন। এ সময় তাঁর সাহিত্য চর্চাও চলল সমান তালে।

১৯১০ সালে বিয়ে করেন। তাঁর স্ত্রী মারগুবা খাতুন। দাম্পত্যজীবনে দুই ছেলের জনক তিনি।

ড. মুহম্মদ শহীদুল্লাহ তৎকালীন স্বনামখ্যাত পত্রিকা ‘ভারতী’তে ‘মদনভস্ম’ নামে একটি প্রবন্ধ লিখেছিলেন। কোহিনুর পত্রিকায় কয়েকটি কবিতা লিখেছিলেন। প্রতিভা পত্রিকায় লিখেছিলেন প্রবন্ধ। সেই সঙ্গে বঙ্গীয় মুসলিম সাহিত্য পত্রিকার সম্পাদনার দায়িত্ব পালন করেছিলেন বেশকিছু দিন। ‘আল-এসলাম’ পত্রিকায় নিয়মিত লেখালেখি করতেন, পাশাপাশি এর সহ-সম্পাদকও ছিলেন। সাহিত্য পরিষদ পত্রিকায় তার বাংলা ভাষা সম্পর্কে গবেষণাপত্র ছাপা হয়েছিল। তিনি বঙ্গীয় মুসলিম সাহিত্য সমিতির সম্পাদক ছিলেন। শহীদুল্লাহ নিজেই ছোটদের জন্য ‘আঙ্গুর’ নামে একটি মাসিক পত্রিকা বের করেছিলেন। কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের বাংলা বিভাগের অধ্যক্ষ ড. দীনেশচন্দ্র সেন এ পত্রিকার উচ্ছ্বসিত প্রশংসা করেছিলেন। প্রথম সংখ্যায় বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর ‘রথযাত্রা’ নামক ছোটদের জন্য গল্প লিখেছিলেন। ৩য় সংখ্যায় নজরুল কবিতা লিখেছিলেন।

শহীদুল্লাহ কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ে শরৎকুমার লাহিড়ী গবেষণা সহায়ক পদে চাকরিতে যোগদান করলেও ১৯২১ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠিত হলে তিনি স্থায়ীভাবে ঢাকা চলে আসেন এবং ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সংস্কৃত ও বাংলা বিভাগে বাংলা ভাষা ও সাহিত্যের প্রথম এবং একমাত্র শিক্ষক হিসেবে ওই বছরের জুন মাসে যোগদান করেন। ১৯৪৪ সাল পর্যন্ত টানা তেইশ বছর তিনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে অধ্যাপনা করেছিলেন। পরবর্তীকালেও বিক্ষিপ্তভাবে আরও কয়েক বছর এ বিশ্ববিদ্যালয়ে অধ্যাপনার সঙ্গে জড়িত ছিলেন। ১৯৩৭ সালে সংস্কৃত থেকে বাংলা বিভাগ আলাদা হয়ে গেলে তিনি বাংলা বিভাগের অধ্যক্ষের দায়িত্ব পালন করেন।

১৯৪০ সালে ফজলুল হক মুসলিম হল নির্মিত হলে তিনি এর প্রভোস্টের দায়িত্ব পালন করেন। ১৯৪৪ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ছেড়ে তিনি বগুড়ার আজিজুল হক কলেজের অধ্যক্ষ হিসেবে চার বছর কাটিয়ে ১৯৪৮ সালে আবার ফিরে এলেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে এবং ১৯৫২-৫৪ সাল পর্যন্ত বাংলা ও সংস্কৃত বিভাগের অধ্যাপক ও অধ্যক্ষরূপে দায়িত্ব পালন করেন। পাশাপাশি কলা অনুষদের ডিন ছিলেন এক বছর। ১৯৫৪ সালে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠিত হলে তিনি সেখানকার বাংলা বিভাগের অধ্যক্ষরূপে যোগদান করেন। ১৯৫৫ সালে সেখানেও তিনি কলা অনুষদের ডিন ছিলেন। উর্দু উন্নয়ন সংস্থার উর্দু অভিধানের সম্পাদক হিসেবে করাচিতে কাটিয়েছেন দু’বছর। পড়াশোনার খাতিরে তিনি ফ্রান্স, জার্মানি প্রভৃতি দেশ ঘুরে বেড়িয়েছেন। ঘুরেছেন চীন, সৌদি আরবসহ বেশ কয়েকটি দেশে ও শান্তি নিকেতনে গিয়েছেন বেশ কয়েকবার। প্যারিসের সোরবন বিশ্ববিদ্যালয়, জার্মানির ফ্রাইবুর্গ বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়াশোনা করেছেন। বাংলা ভাষার সবচেয়ে পুরনো কবিতা সম্পর্কে গবেষণা করে তিনি ডক্টরেট ডিগ্রি লাভ করেন।

১৯৩১ সালে তার প্রথম প্রবন্ধের বই ‘ভাষা ও সাহিত্য’ প্রকাশিত হয়। ১৯৩২ সালে ‘রকমারি’ নামক একটি গল্পের বই প্রকাশ করেন। ১৯৫৩ সালে ‘বাংলা সাহিত্যের কথা’ প্রথম খণ্ড প্রকাশিত হয়। এ সময় ‘আমাদের সমস্যা’ নামে একটি বইও প্রকাশ করেন। আলাওলের ‘পদ্মাবতী’ আর ‘বিদ্যাপতি-শতক’ নামে দুটি গ্রন্থের সম্পাদনা করেন। বাংলা একাডেমিতে থাকাকালীন তিনি একাডেমির হয়ে বাংলা আঞ্চলিক ভাষার অভিধান ও ইসলামী বিশ্বকোষ সম্পাদনা করেন। ‘বাংলা সাহিত্যের কথা’ (২য় খণ্ড) ও ‘বাংলা ভাষার ইতিবৃত্ত’ নামক বইগুলো প্রকাশিত হয় এ সময়ে। তিনি ওমর খৈয়ামের বাংলা অনুবাদ করেন। তাঁর রচিত বাংলা ভাষার ব্যাকরণ একটি উল্লেখযোগ্য গ্রন্থ।

আশি বছর পূর্ণ হওয়া উপলক্ষে দেশবাসীর পক্ষ থেকে তাঁকে বিপুল সংবর্ধনা দেয়া হয়। ধীরে ধীরে তাঁর শরীর খারাপ হয়ে আসতে থাকে। একসময় তাকে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। দীর্ঘদিন রোগভোগের পর হাসপাতালেই ১৯৬৯ সালের ১৩ জুলাই তিনি শেষনিঃশ্বাস ত্যাগ করেন। তাঁর অত্যন্ত পছন্দের স্থান ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় এলাকাতেই তাঁকে দাফন করা হয়।

মুসলিম বাংলার কিংবদন্তী ভাষাতাত্ত্বিক ড. মুহম্মদ শহীদুল্লাহ মাতৃভাষা আর মাতৃভূমির ভালোবাসায় আজীবন বেঁচে থাকবেন।