ঢাকায় ফাগুন: একটি নির্মোহ পর্যালোচনা

আবিদা সুলতানা উমামা:

ব্যক্তিগতভাবে আমার ভেতরে প্রবল ঢাকা-প্রীতি কাজ করে, যেটাকে আমরা বলি—খুবই অবসেসড। ঢাকা আমার জন্মস্থান না হলেও একযুগেরও বেশি সময় ওই শহরের অলিগলির হাওয়া, ধুলোবালি গায়ে মেখে বেড়ে উঠেছি। সেইসব দিন পেছনে ফেলে এসেছি কবেই! স্মৃতিতে অমলিন আমার সেই ফেলে আসা ‘বায়ান্ন হাজার তেপ্পান্ন গলির শহর’টার অলি-গলির গল্পকে ‘ঢাকায় ফাগুন’ উপন্যাসে পেয়েছি বেশ খানিকটা ভিন্নতার মোড়কে।

সন্ধ্যা ঝুলে আছে বায়ান্ন হাজার তেপ্পান্ন গলির কাঁধের উপর’

একটা গল্পের উপাদান যদি হয় একই সাথে ঐতিহাসিক, রাজনৈতিক, সামাজিক এবং মনস্তাত্ত্বিক বিষয়— তাহলে প্লটটা কতটা ইউনিক আর ইন্টারেস্টিং হয় তা আর বলতে! এতগুলো বিষয় লেখক যেভাবে টাইম-ট্রাভেলের প্রলেপে জোড়া লাগিয়েছেন তার কোথাও কোনো খটকা তো নেই, বরং কিভাবে সব উপাদান একজায়গায় এনেছেন সেটাই আসলে আমার কাছে বিস্ময়ের ব্যাপার মনে হয়েছে। আপাতদৃষ্টিতে “ঢাকায় ফাগুন” দৃষ্টি নন্দন প্রচ্ছদের একটা উপন্যাস। নামটা থেকে কিছু কি অনুমান করা যায়? না, আমার মনে হয় উপন্যাসের গভীরে গেলে তবেই উপলব্ধি করা যাবে সেটা। এই উপন্যাসের দশটা অধ্যায় যেন দশটা স্বতন্ত্র গল্প। আবার স্বতন্ত্র হয়েও একটা গল্প অন্য গল্পের সাথে প্রত্যক্ষভাবে জুড়ে গিয়ে একটা গোটা উপন্যাস। প্রতিটা অধ্যায় শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত একটানা মনোযোগ ধরে রাখছিলো। বিশেষ করে চার নম্বর অধ্যায় আমি ব্যক্তিগতভাবে সবচেয়ে বেশি উপভোগ করেছি। পুরো বইটা পড়ার সময় চরিত্রগুলোর মধ্যে কীরকম করে ঢুকে পড়েছি, তার উদাহরণ দেয়া যায় জহিরের গালে ঠাস করে একটা চড় পড়ার ঘটনাটাকে।

“…সবকিছুকে উপেক্ষা করে চটকানা বসিয়ে দিলাম জহিরের গালে।” —যে কোনো গল্পের প্রেক্ষিতে এমন একটা বর্ণনা খুবই স্বাভাবিক ব্যাপার। কিন্তু, এতোটা অকস্মাৎ মনে হচ্ছিলো যেন চটকানাটা আমার সামনেই কারো গালে পড়েছে। আমার মনে হয়, এটাই লেখকের সার্থকতা। প্রতিটা অধ্যায়ে নতুন নতুন অভিজ্ঞতা আর নতুন নতুন চমক। উপন্যাসের আরো একটি কেন্দ্রীয় চরিত্র হাসান জামিলের আবির্ভাবের কথাই বলা যাক৷ এমনভাবে তার প্রসঙ্গ এসেছে, আমি তো ভেবেছি সে গল্পে বেশিক্ষণ থাকছে না। কিন্তু চমকটাই এখানে। এত পরে এসে এই চরিত্রটাই এভাবে সবটুকু মনোযোগের মূল হয়ে যাবে এটা অনুমানও করা যায়নি।

এবার বলা যাক, হাসান মাহফুজের স্ত্রী সালমার কথা, শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত যার নাম হাসান মাহফুজ সবচেয়ে বেশিবার নিয়েছেন। প্রথম দিকে এই ব্যাপারটা একটু চোখে লাগছিলো কিন্তু যখন হাসান মাহফুজের মানসিক অবস্থা সম্পর্কে ধারণা পাওয়া গেলো তখন আবার মনে হচ্ছিলো, এইতো। ঠিকই আছে।

কোথায় যেন পড়েছিলাম—’ফিকশন হচ্ছে কালের দর্পণ’। ‘ঢাকায় ফাগুন’ পড়ার সময় এই কথাটা আমার বারবার মনে হয়েছে। বর্তমান করোনাকালীন প্রেক্ষাপটে গল্পের শুরু। গল্পগুলো হাসান মাহফুজ নামের একজন লেখকের। শুরুটা সেই লেখকের একাকী, বিষাদ আর নস্টালজিয়া দিয়ে হলেও জহির নামের অদ্ভুত এক আগন্তুকের উপস্থিতিতে গল্পে ছোঁয়া আসে ইতিহাসের, টাইম-ট্রাভেল রহস্যের আর টানটান উত্তেজনার।

গল্পের সাবলীল বুননে—আজকের উঠতি মধ্যবিত্তের উপস্থাপন, একজন লেখকের চিন্তা-চেতনা-আশা-হতাশা-মানসিক দ্বন্দ, সাংসারিক দ্বৈরথের টানাপোড়েন—দেখি। এই যে বর্তমান বাংলাদেশে আমরা এই জেনারেশন কত আজগুবি সব ব্যাপারের ভিতর দিয়ে যাচ্ছি—অনলাইন ভিত্তিক যে কত ঘটনা—টুকটাক সেসবের ছাপও এইখানে আছে। এইজন্যই, ফিকশন কালের দর্পণ—কথাটা এনেছি।

গল্পটা সবার জানা উচিৎ’

ঢাকায় ফাগুন বইয়ের মূল চরিত্র হাসান মাহফুজের ভাষ্যমতে, জহির নামের এক আগন্তুককে ঘরে ঢোকানোই ছিলো তার সবথেকে বড় ভুল। আর এই ভুল তাকে শেষ পর্যন্ত কোথায় নিয়ে দাঁড় করিয়েছে সেই গল্পটা তার মতে সবার জানা উচিৎ।

একটু ভাবুন, আপনার সামনে বসে থাকা একজন মানুষ চোখ মুখে বিস্ময় নিয়ে একবার ফ্যান দেখছে তো আরেকবার লাইট দেখছে। আর তারপর যখন আপনার স্মার্টফোন অপারেট করা দেখে সে কিছুই বুঝতে পারে না, আপনি বোঝাবেনটা কিভাবে? শুরুর দিকের এই অংশটুকুতে আমার বেশ মজা লাগছিলো। ১৯৪২ সাল থেকে এসেছে দাবি করা লোকটাকে হাসান মাহফুজ যেভাবে ডিল করছিলো, পুরো বর্ণনাটুকু এত বেশি রিয়েলিস্টিক ছিলো যেন কেউ স্মৃতি থেকে হুবহু বলছে।

এখানে পাঠক হিসেবে অনেস্টলি একটা অনুভূতি বলা দরকার। ঢাকায় ফাগুনের লেখক যদি আমার পরিচিত গণ্ডির ভেতরের কেউ না হতেন, তাহলে লেখকের সাথে যে এমন কিছু তার বাস্তবজীবনে ঘটেনি সেটা আমার জন্য বিশ্বাস করা বেশ কঠিনই হতো।

প্রথম অধ্যায় শুরু করার পর কিছু জায়গায় একটু একটু খটকা লাগতে শুরু করেছিলো। কিন্তু পরে দেখা গেলো, লেখক ঠিকই খুব সাধারণভাবে সেইসবের সন্তোষজনক ব্যাখা দিয়ে দিয়েছেন। ব্যাপারটা এরকম না যে—এমন কেন হলো, অমন কেন হলো—গল্পের মাঝখানে তার বিশাল কোনো কারণ দর্শানো, বরং গল্পের স্বাভাবিক গতিতেই সেই ব্যাখাটুকু অতি সংক্ষেপে অথচ প্রয়োজনমত বসে গেছে।

আমি বই পড়ার সময় আগে থেকে অনুমান করতে পছন্দ করি, আর অনুমান মিলে গেলে আত্মশ্লাঘা অনুভব করি। কিন্তু এইদিক থেকে ঢাকায় ফাগুন একটু যেন দুঃখই দিলো আমাকে। শেষ পর্যন্ত পুরো গল্পটা একটানা আনপ্রেডিক্টেবলই। দুঃখজনক আনন্দ বলা যায়। এরকম আনন্দ অনেকদিন উপভোগ করিনি।

‘ঢাকায় ফাগুন’ গত এপ্রিল মাসের শেষ সপ্তাহে প্রকাশ হয়েছে। হিস্ট্রিকাল থ্রিলার ধাঁচের উপন্যাসটি প্রকাশ করেছে ‘বাতিঘর প্রকাশনী’। মাত্র দেড় মাসেই বইটি নিয়ে বেশ কথা হচ্ছে। আমিও সদ্যই পড়ে শেষ করেছি বইটি। পড়া শেষ করে মনে হলো বইটি নিয়ে আরো আলোচনা হওয়া উচিত। তাই নিজের জায়গা থেকে খানিকটা লেখার চেষ্টা করলাম।

বইয়ের কয়েকটি দূর্বল দিকও রয়েছে। ভবিষ্যতে চরিত্র নির্মাণে লেখক আরো যত্মবান হবেন আশাকরি। উপন্যাসের ভিতরেই টুকরো টুকরো কয়েকটি গল্প আছে। হাসান জামিল নামক এক তরুণ লেখকের গল্প। আমার কাছে মনে হয়েছে গল্পগুলোর কারণে উপন্যাসের মূল গল্প কিছুটা বাধাপ্রাপ্ত হয়েছে। যোগেশ চন্দ্রের নামের শেষে কোথাও ‘ঘোষ’ কোথাও ‘বোস’ ব্যবহার করা হয়েছে। এমন টুকটাক কয়েকটি অসঙ্গতি চাপিয়ে রেখে বইটিকে দশে দশ দেওয়াই যায়।

হাসান ইনাম-এর প্রায় সব লেখা আমার সুযোগ হয়েছে। যখন তিনি লেখালেখি শুরু করেছেন তখন আমিও কেবল উঠতি পাঠক। বিভিন্ন সাহিত্য সাময়িকীতে ঘুরেফিরে যাদের নাম সামনে আসতো তাদের ভিতর হাসান ইনাম থাকতেন। সাপ্তাহিক লিখনীর একটি ঈদ সংখ্যায় হাসান ইনামের বড় একটি গল্প পড়েছিলাম। সম্ভবত ২০১৪ তে। লেখালেখির শুরু থেকেই হাসান ইনাম সম্ভাবনাময় তরুণ লেখক হিসেবে সমাদৃত বা পরিচিতি পেয়ে আসছে। এই বইয়ের আগে তার বেশ কয়েকটা ছোট গল্পের বই বেরিয়েছে। তবে ‘ঢাকায় ফাগুন’ তার পূর্বের সব কাজকে ছাপিয়ে যেতে পেরেছে বলে আমার বিশ্বাস।

 

বিজ্ঞাপন
আগের সংবাদনাইজেরিয়ায় ১২ বছরের সহিংসতায় নিহত প্রায় সাড়ে তিন লাখ মানুষ
পরবর্তি সংবাদসোমবার থেকে সারাদেশে কঠোর লকডাউন