তিতাসের পাড়ে, শিক্ষা ও সংস্কৃতির শহরে

মুনশি নাঈম:

ব্রাহ্মণবাড়িয়া জেলা বাংলাদেশের দক্ষিণ-পূর্বাঞ্চলের চট্টগ্রাম বিভাগের একটি প্রশাসনিক অঞ্চল। শিক্ষা ও সংস্কৃতির পীঠস্থান রূপে পরিচিত ব্রাহ্মণবাড়িয়া জেলাকে বাংলাদেশের সাংস্কৃতিক রাজধানী বলা হয়। জেলাটি শিল্প সংস্কৃতির ধারক ও বাহক এবং দলমত নির্বিশেষে ধর্মীয় ও সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতির এক উজ্জ্বল মিলন মেলা হিসেবে এ দেশের মানচিত্রে বিশেষ মর্যাদার আসনে অধিষ্ঠিত। এখানে একদিকে যেমন মাজার-মসজিদ, আরেকদিকে গির্জা-মন্দির। একদিকে মাদরাসা, আরেকদিকে স্কুল-কলেজ। এই উপমহাদেশের সঙ্গীত জগতে ব্রাহ্মণবাড়িয়ার নাম প্রত্যুজ্জ্বল তারকার মতো চমকায়। গুণ ও গুণীর শহর ব্রাহ্মণবাড়িয়া জেলার শিক্ষা ও সংস্কৃতি নিয়ে আজকের এই পর্ব।

জেনারেল শিক্ষা

ব্রাহ্মণবাড়িয়া জেলার শিক্ষার হার ৫২ দশমিক ৩ ভাগ।

জেলায় ডিগ্রী কলেজ ১৯টি, উচ্চ মাধ্যমিক কলেজ ১৮ টি, মাধ্যমিক বিদ্যালয় ১৮৭ টি, নিম্ন মাধ্যমিক ২৫টি, মোট বিদ্যালয় ২৩২টি, সরকারী প্রাথমিক বিদ্যালয় ৬৯০ টি, রেজিস্টার্ড বেসরকারী প্রাথমিক বিদ্যালয় ২৮৬ টি, কমিউনিটি বিদ্যালয় ৭৮ টি, পরীক্ষা বিদ্যালয় ১টি, উচ্চ বিদ্যালয় সংলগ্ন প্রাথমিক বিদ্যালয় ১৫ টি, কিন্ডার গার্টেন ৮৭ টি, এনজিও পরিচালিত পূর্ণাঙ্গ বিদ্যালয় ১টি, পিটিআই ১টি, ল’কলেজ ১টি, নার্সিং ইন্সটিটিউট ১টি, মুক-বধির বিদ্যালয় ১টি, ভোকেশনাল ট্রেনিং ইন্সটিটিউট ২টি, টেক্সটাইল ইঞ্জিনিয়ারিং স্কুল ১টি সংগীত স্কুল ২টি, হোমিও কলেজ ১টি।

এরমধ্যে উল্লেখযোগ্য কয়েকটি শিক্ষা প্রতিষ্ঠান: ব্রাহ্মণবাড়ীয়া সরকারি কলেজ (১৯৪৮), ব্রাহ্মণবাড়ীয়া সরকারি মহিলা কলেজ (১৯৬৪), নবীনগর সরকারি কলেজ (১৯৬৯), শহীদ স্মৃতি কলেজ (১৯৭২), বাঞ্ছারামপুর ডিগ্রি মহাবিদ্যালয় (১৯৭৩), ব্রাহ্মণবাড়ীয়া উচ্চ বিদ্যালয় (১৮৬০), অন্নদা সরকারি উচ্চ বিদ্যালয় (১৮৭৫), সরাইল অন্নদা সরকারি উচ্চ বিদ্যালয় (১৮৯৪), নবীনগর পাইলট উচ্চ বিদ্যালয় (১৮৯৬), গুনিয়ক উচ্চ বিদ্যালয় (১৮৯৭), কসবা সরকারি উচ্চ বিদ্যালয় (১৮৯৯), শ্যামগ্রাম মোহিনী কিশোর উচ্চ বিদ্যালয় (১৯০০), রামকানাই হাই একাডেমী (১৯০১), চাতালপুর ওয়াজউদ্দিন উচ্চ বিদ্যালয় (১৯০২), দেবগ্রাম পাইলট উচ্চ বিদ্যালয় (১৯০৫), শাহবাজপুর বহুমুখী উচ্চ বিদ্যালয় (১৯০৭), বিদ্যাকুট অমর উচ্চ বিদ্যালয় (১৯১৩), নিয়াজ মুহম্মদ উচ্চ বিদ্যালয় (১৯১৪), কৈতলা যজ্ঞেশ্বর উচ্চ বিদ্যালয় (১৯১৮), কুটি অটল বিহারী উচ্চ বিদ্যালয় (১৯১৮), ফান্দাউক পন্ডিত রাম উচ্চ বিদ্যালয় (১৯১৯), বাংলাদেশ রেলওয়ে সরকারি উচ্চ বিদ্যালয় (১৯২০), জমশেরপুর উচ্চ বিদ্যালয় (১৯২৩), সাতবর্গ উচ্চ বিদ্যালয় (১৯৩১), মডেল সরকারি গার্লস হাইস্কুল (১৯৩৬), মিশন প্রাথমিক বিদ্যালয় (১৯১০), ব্রাহ্মণবাড়ীয়া ইন্ডাষ্ট্রিয়াল স্কুল (১৯৪১), মিরাসানী পলিটেকনিক একাডেমী (১৯৪৮)।

ধর্মীয় শিক্ষা

কওমি মাদরাসা 

ব্রাহ্মণবাড়িয়া জেলায় কওমি মাদরাসা আছে তিন শতাধিক। জামিয়া ইসলামিয়া ইউনুছিয়া মাদরাসার সিনিয়র শিক্ষক মুফতি রুহুল আমীন কাসেমী বলেন, ‘জেলার আঞ্চলিক বোর্ড একটি: এদারায়ে তালিমিয়া ব্রাহ্মণবাড়িয়া বাংলাদেশ। এ বোর্ডের অধীনে আছে দেড় শতাধিক মাদরাসা। আর বেফাকুল মাদারিসিল আরাবিয়া বাংলাদেশের অধীনে আছে তিন শতাধিক মাদরাসা। বেফাক জেলা শাখার চেয়ারম্যান জামিয়া ইসলামিয়া ইউনুছিয়া মাদরাসার মুহতামিম মুফতি মুবারকুল্লাহ সাহেব। আঞ্চলিক বোর্ডের চেয়ারম্যান জামিয়া ইসলামিয়া ইউনুছিয়া মাদরাসার নায়েবে মুহতামিম আল্লামা আশেকে এলাহি ইব্রাহিমী।’

জেলায় মহিলা কওমি মাদরাসা রয়েছে ৩৭০ এর অধিক। ব্রাহ্মণবাড়িয়া মহিলা মাদরাসা শিক্ষাবোর্ডের মহাসচিব, বেফাকুল মাদারিসিল আরাবিয়া বাংলাদেশের মজলিসে আমেলার সদস্য মাওলানা মাহফুজুল হাসান ইব্রাহিমী বলেন, ‘আমাদের কাছে ৩৭০টি মহিলা কওমি মাদরাসার নাম লিপিবদ্ধ আছে। কিন্তু প্রকৃত সংখ্যা আরও বেশি।’

এরমধ্যে উল্লেখযোগ্য কয়েকটি কওমি মাদরাসার নাম: জামিয়া ইসলামিয়া ইউনুছিয়া মাদ্রাসা, ব্রাহ্মণবাড়িয়া, জামিয়া দারুল উলূম আলীনগর সরাইল বি.বাড়িয়া, জামিয়া সিরাজিয়া দারুল উলূম ভাদুঘর বি.বাড়িয়া, জামিয়া দারুল আরকাম আল ইসলামিয়া বি.বাড়িয়া, জামিয়া ইসলামিয়া ইমদাদুল উলূম আশুগঞ্জ, বি-বাড়িয়া, জামিয়া দারুল কোরআন হোসাইনিয়া মাদ্রাসা সরাইল বি.বাড়িয়া, জামিয়া রাহমানিয়া বেড়তলা মাদ্রাসা সরাইল বি.বাড়িয়া, জামিয়া ইসলামিয়া দারুল উলূম শাহবাজপুর সরাইল বি.বাড়িয়া, জামিয়া আশরাফিয়া মহিউদ্দিন নগর মাদরাসা, আশুগঞ্জ বাজার মাদরাসা, হাফেজ মুহাম্মাদুল্লাহ ইসলামিয়া মানিকপুর মাদরাসা, বাঞ্ছারামপুর।

আলিয়া মাদরাসা

জেলায় কামিল মাদ্রাসা ৩টি, ফাজিল মাদ্রাসা ৮টি, আলিম মাদ্রাসা ২১ টি, দাখিল মাদ্রাসা ৫১ টি, স্বতন্ত্র এবতেদায়ী মাদ্রাসা ২২টি। এরমধ্যে উল্লেখযোগ্য কয়েকটির নাম: আদমপুর ফাজিল মাদ্রাসা (১৯১৭), দাঁতমন্ডল এরফানিয়া আলিম মাদ্রাসা (১৯৫০), বাঞ্ছারামপুর সোবহানিয়া ইসলামিয়া দাখিল মাদ্রাসা (১৯৮১), রাধানগর কালিকাপুর রাহমানিয়া দাখিল মাদ্রাসা (১৯৯৩)।

এক হিসেব অনুযায়ী জেলায় মসজিদ রয়েছে ৪,৫০০টি, মক্তব রয়েছে ২ হাজার ৩১৪টি। এটা নির্দিষ্ট কোনো হিসেব নয়। তবে এর কম হবে না , বরং বেশিই হবে। সরকারি হিসেবে এতিমখানা আছে ৩৯টি।

ব্রাহ্মণবাড়িয়া কওমি মাদরাসার জন্যই বেশি প্রসিদ্ধ। বিভিন্ন ইস্যুতে মাঠে ময়দানে সরব থাকে কওমি মাদরাসার ছাত্ররাই। তাদের সরব সক্রিয়তার সবচে বড় প্রমাণ ফতোয়া আন্দোলন। এর বর্ণনা সামনে আসবে।

মাজার

ব্রাহ্মণবাড়িয়া জেলার অন্যতম একটি ঐতিহ্য মাজার। জেলার প্রত্যেকটি উপজেলায় মাজার আছে। সবচে বেশি মাজার নবীনগর এবং বাঞ্ছারামপুরে। সবচে বড় মাজর আখাউরায়। নিচে কয়েকটি মাজারের নাম দেয়া হলো।

সদর: শাহ সূফী খন্দকার মোখলেছুর রহমান জৌনপুরীর মাজার, ফকির আইয়ুব আলী শাহ্ এর মাজার, বাবা আব্দুল্লাহ শাহ মাজার, চান্দেরপাড়া হাজী বাড়ি নিলু শাহ মাজার।

কসবা: হযরত একিন আলী শাহ মাজার, মন্দভাগ লেংটার মাজার, লেশিয়ারা শাহ সুফির মাজার, তাহের শাহ ফকিরের মাজার।

সরাইল: বিটঘর আয়াত উল্লাহ শাহের মাজার, বিটঘর ইছাক কারীর মাজার, শাহজাদাপুর রুকন উদ্দিন শাহের মাজার।

আশুগঞ্জে অনেক সাধু পীরের মাজার রয়েছে। আখাউড়া উপজেলার খড়মপুরে আছে বিখ্যাত কেল্লা শাহের মাজার। মাজারটি ২৬০ একর জমির উপরে অবস্থিত। জেলার সবচে বড় মাজার এটিই।

নবীনগরে অনেক মাজার রয়েছে। তার মধ্যে উল্লেখ্যযোগ্য কিছু মাজার: গনি শাহের মাজার, ফকির আফতাব উদ্দিন খাঁয়ের মাজার, হাছান শাহের মাজার, ওয়ালী শাহের মাজার, খার ঘর মাজার।

বাঞ্ছারামপুরে অর্ধশতাধিক মাজার রয়েছে। এরমধ্যে উল্লেখ্যযোগ্য কিছু মাজার: ফরদাবাদ কারামত চিশতীর মাজার, ফরদাবাদ রম্নকু মৌলভীর মাজার, বাক্কী শাহের মাজার, হোগলাকান্দি বোবা শাহের মাজার, হোগলাকান্দি জামান শাহের মাজার, রূপসদী মৌলভী লাল মিয়া শাহের মাজার, বাজেবিশারা মুখলেস শাহের মাজার, ছলিমাবাদ মোহন ফকিরের মাজার, বুধাইরকান্দি আজমত আলী শাহ ও শাহসাবের মাজার, মীরপুর রামসুন্দরের মাজার, উলুকান্দি মুর্শিদের মাজার, কল্যানপুর নোয়াব আলী শাহের মাজার, চরশিবপুর বুজলু ফকিরের মাজার। এমন আরও অনেক মাজার আছে।

গির্জা ও মন্দির

গির্জা

ব্রাহ্মণবাড়িয়ায় চার্চ রয়েছে একটি। এখানে ১৯১০ সালে স্থাপিত হয় ব্যাপিস্টস্ট চার্চ। নিউজিল্যান্ড মিশনারীগণ এসে এই স্থানটিকে মিশন স্থাপনের জন্য বেছে নেন। তখন ছিল বৃটিশ যুগ। বর্তমানে সেই যুগের কেউ বেচে নেই। এই চার্চ স্থাপনের সংগে সংগে একটি হাসপাতাল যা খ্রীস্টিয়ান মেডিক্যাল সেন্টার নামে পরিচিতি এটি এবং একটি স্কুল যা খ্রীস্টিয়ান মিশন স্কুল পরিচিত তা স্থাপিত হয়। ব্রাহ্মণবাড়িয়া ব্যাপ্টিস্ট চার্চ ১০০ বছরেরও অধিক সময় অতিক্রান্ত করেছে। কোন এক সময় এই মিশন যারা স্থান করেছিল তাদের মধ্যে একজন মিশনারী, নাম জন টেকেল, তিনি একসময় ব্রাহ্মণবাড়িয়া পৌরসভার  চেয়ারম্যানের দায়িত্বও পালন করে গেছেন। মিশন স্থাপনের উদ্দেশ্য ছিল সাধারণ জনগণের সেবা করা এবং এই লক্ষে বর্তমানে স্কুলটিতে ১৮০০ অধিক ছাত্র-ছাত্রী অধ্যয়ন করছে।

মন্দির

ব্রাহ্মণবাড়িয়া জেলার বিভিন্ন উপজেলায় ৪২০টি মন্দির রয়েছে। এরমধ্যে সদরে রয়েছে ৪৬টি, বিজয়নগরে রয়েছে ৩৭টি, নসিরনগরে ১২৮টি, আশুগঞ্জে ৯টি, আখাউড়াতে ১৮টি, সরাইলে ৪৬টি, কসবাতে ৪০টি, নবীনগরে ১৯, বাঞ্ছারামপুরে ৭৬টি।

সংবাদপত্র ও সাংবাদিকতা

বাংলাদেশের আঞ্চলিক বা মফস্বল সংবাদপত্রের ইতিহাসের দিকে দৃষ্টি দিলে দেখা যায়, ব্রাহ্মণবাড়িয়া এ ক্ষেত্রে একটা বিশেষ স্থান অধিকার করে আছে। উনিশ শতকের শেষার্ধে ত্রিপুরা জেলা তথা বর্তমান ব্রাহ্মণবাড়িয়া জেলার সংবাদপত্র ও সাময়িকীর উদ্ভব ও বিকাশ ঘটে। ব্রাহ্মণবাড়িয়া থেকে স্থানীয় সংবাদপত্র মাসিক ঊষা (১৮৯৩) এবং মাসিক হীরা (১৮৯৪) প্রকাশিত হয়। সে সময় ব্রাহ্মণবাড়িয়া থেকে প্রকাশিত ঊষা, হীরা, জয়ন্তী ও সেবক পত্রিকা বাংলা সাময়িক পত্রের ইতিহাসে আলোড়ন সৃষ্টি করেছিল। গ্রাম থেকে পত্রিকা প্রকাশ বিশেষ করে চুন্টা প্রকাশ ও ‘পল্লী প্রদীপ’ জেলার সংবাদপত্র ও সাময়িকীর ইতিহাসে এক উজ্জ্বল সূচনা করেছে।

জেলায় সংবাদপত্র প্রকাশের ১১৮ বছরের এক সমৃদ্ধ ইতিহাস রয়েছে। জেলা সংবাদপত্রগুলোর মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলো– মাসিক ঊষা (১৮৯৩), মাসিক হীরা (১৮৯৪), মাসিক সন্তান (১৯১৩), মাসিক পল্লী প্রদীপ (১৯২০), মাসিক চুন্টাপ্রকাশ (১৯২৬), মাসিক জয়ন্তী (১৩৪৬ বাংলা), মাসিক মা (১৯৬৯), মাসিক ভোলা (১৯৬৮), ত্রৈমাসিক আল বুশরা, প্রবাহ, সাহিত্য লোক, মান্দাল, ধূমকেতু, সাপ্তাহিক ত্রিপুরা বিকাশ, সেবক, তিতাস মা, প্রতিচ্ছবি, ব্রাহ্মণবাড়িয়া, সাকিয়াত তিতাসের খবর, দৈনিক ব্রাহ্মণবাড়িয়া, প্রজাবন্ধু, আজকের হালচাল, তিতাস কণ্ঠ, রাহবার, সমতট বার্তা, দিনদর্পন ইত্যাদি।

সরকারি তথ্যমতে, বর্তমানে দৈনিক পত্রিকা রয়েছে ১৫টি, সাপ্তাহিক ১৯টি, পাক্ষিক ৬টি এবং মাসিক ৩টি।

সঙ্গীত

এই উপমহাদেশের সঙ্গীত জগতে ব্রাহ্মণবাড়িয়ার নাম স্বর্ণাক্ষরে খচিত। গোটা ব্রাহ্মণবাড়িয়া জেলা-ই সঙ্গীতের উর্বর শস্যভূমি । তিতাস নদী বিধৌত এই ভূ-ভাগে আদিকাল হতে গড়ে উঠেছে ঋদ্ধ সঙ্গীত ঐতিহ্য। এখানে জন্ম নিয়েছেন সুর সম্রাট আলাউদ্দিন খাঁ, ওস্তাদ আয়েত আলী খাঁ, ওস্তাদ আলী আকবর খাঁ, মহর্ষি মনোমোহন দত্ত, রওশন আরা অন্নপূর্ণা, ওস্তাদ বাহাদূর হোসেন খান, ওস্তাদ মোহাম্মদ হোসেন খসরু এবং সৈয়দ আব্দুল হাদী প্রমুখ সঙ্গীত সাধক । ব্রাহ্মণবাড়িয়ার সঙ্গীতে তীর্থভূমি শিবপুর, সাতমোড়া, মইনপুর এবং কালীকচ্ছ । এর মধ্যে ব্রাহ্মণবাড়িয়া শহরের নামও বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য ।

ব্রাহ্মণবাড়িয়া শহরে সঙ্গীত চর্চার ঐতিহ্যও উল্লেখযোগ্য । ১৯৫৭ সালে ওস্তাদ আয়েত আলী খাঁ “দি আলাউদ্দিন মিউজিক্যাল কলেজ” এবং ১৯৭৫ সালে শিল্পাচার্য জয়নুল আবেদিন “দি আলাউদ্দিন সঙ্গীতাঙ্গন” গড়ে তোলেন।

সঙ্গীতে এ শহরে বিশেষ ভূমিকা রেখেছেন ওস্তাদ ফকির (তাপস) আফতাব উদ্দিন খাঁ, ওস্তাদ আলাউদ্দিন খাঁ, ওস্তাদ আয়েত আলী খাঁ, ওস্তাদ আলী আকবর খাঁ, ওস্তাদ বাহাদুর হোসেন খাঁ, ওস্তাদ আবেদ হোসেন খাঁ, ওস্তাদ খাদেম হোসেন খাঁ, ওস্তাদ রাজা হোসেন খান, অমর পাল, ওস্তাদ খুরশিদ খান, ওস্তাদ সুবল দাস, ওস্তাদ আফজালুর রহমান, ওস্তাদ মোহাম্মদ হোসেন খসরু, সবদর হোসেন খান, মনোমোহন দত্ত, লোকশিল্পী দুলা মিয়া, ওস্তাদ মোহাম্মদ হোসেন খান, রওশন আরা বেগম (অন্নপূর্ণা), সৈয়দ আবদুল হাদী প্রমুখ।

লোক সংগীতেও সমৃদ্ধ জনপদ ব্রাহ্মণবাড়িয়া । লোক সংগীতে প্রাচীনকাল থেকেই একটি বিশেষ ধারা এখানে প্রচলিত হয়েছে । মৃরজা হোসেন আলী, বানচন্দ্র তর্কালঙ্কার, মনোমোহন দত্ত, লবচন্দ্র পাল, ফকির আফতাব উদ্দিন, দুলা মিয়া মাস্টার, গিরীন চক্রবর্তী ও দূর্গাচরণ দাসের লোক সংগীত সারা উপমহাদেশেই গ্রহণ যোগ্য হয়েছে । নিচে দুলা মিয়া মাস্টার ও গিরীণ চক্রবর্তীর দুটি লোকগানের উদ্ধৃতি দেয়া হল :

ক.
সাধের তিতাস নদীরে/গাঙ্গে দইল ধুয়া পানি। একখান জাহাজে টানে/চল্লিশ খান রপ্তানি। তিতাস নদীর মাঝে একখান/জাহাজ আসিল/কৈরা ইছা মুছ তাওয়াইয়া বসিয়া রহিল। এমন সময় দাড়ি মাল্লা/নোঙর তুলিল। ভাসিতে ভাসিতে জাহাজ/নারান গঞ্জে গেল। ইছা বলে সাধের জাহাজ/তিতাসেই রহিল।

খ.
মাসির বাড়ি কিশোরগঞ্জে/মামার বাড়ি চাতল পাড়। বাপের বাড়ি বাউনবাইরা/নিজের বাড়ি নাই আমার। আমি রে যে জলের ঢেউ/আমার বলতে নাইরে কেউ/চান্দের হাট ভাইঙ্গা গেছে/একূল ওকূল অন্ধকার।

তিতাস একটি নদীর নাম

অদ্বৈত মল্লবর্মণের উপন্যাস ‘‘তিতাস একটি নদীর নাম’’ যেমন ব্যাপক জনপ্রিয়তা পায়, তেমনই তিতাস ও ব্রাহ্মণবাড়িয়াকে দেশ বিদেশে ব্যাপক পরিচিতি এনে দেয়। জেলার নাসিরনগর থানার চাতলপুর নামক স্থানে নিকটস্থ মেঘনা নদী থেকে উৎপন্ন হয়ে পূর্বমুখে প্রবাহিত হয়ে চান্দোরা গ্রামের উত্তরে-পশ্চিমে-দক্ষিণ মুখে অগ্রসর হয়ে ব্রাহ্মণবাড়িয়া শহরের নিকট পূর্ব দক্ষিণ মুখে প্রবাহিত হয়ে আখাউড়া রেলজংশনের দক্ষিণে পশ্চিম-উত্তর মুখে গিয়ে নবীনগরের পশ্চিমে লালপুরের নিকট মেঘনা নদীতে পতিত হয়েছে। নদীটি ইংরেজী বর্ণ এম আকারে প্রবাহিত হচ্ছে।

চাতলপুর থেকে লালপুরের দূরত্ব ১৬ মাইল হলেও সমগ্র নদীটি প্রায় ১২৫ মাইল দীর্ঘ। আর এই নদীটিই তিতাস নদী নামে পরিচিত। এছাড়া আরো কয়েকটি নদী তিতাস নদী নামে এই এলাকায় পরিচিতি লাভ করেছে। সেগুলি হলো-

নবীনগর থানার পশ্চিম প্রান্তে অবস্থিত কালিগঞ্জ বাজারের উত্তরে মেঘনা নদী থেকে উৎপন্ন হয়ে একটি ছোট নদী দক্ষিণ মুখে গিয়ে পূর্ব দিকে মোড় নিয়ে জীবনগঞ্জ বাজারকে বাম পাশে রেখে দরিকান্দি গ্রামের উত্তর পার্শ্ব দিয়ে প্রবাহিত হয়ে কালাইনগরের নিকট দক্ষিণমুখী গতি ধারণ করে বাঞ্ছারামপুর থানাকে ডান পাশে রেখে ঘাঘুটিয়ার নিকট তিতাসের আর একটি গতিধারার সঙ্গে মিশে পশ্চিম মুখে গিয়ে উজানচরকে ডানপাশে ও হোমনা থানাকে বামপাশে রেখে শ্রীমদ্দির নিকট মেঘনা নদীতে পড়েছে। এটি তিতাস নদী নামেই পরিচিত। হোমনা থানায় এটি আবার চিতিগঙ্গা নামে পরিচিত।

আবার বাঞ্ছারামপুর থানার দরিকান্দি গ্রামের উত্তর পূর্ব দিক থেকে প্রায় অনুরূপ আকারের একটি নদী দক্ষিণ মুখে প্রবাহিত হয়ে রামকৃষ্ণপুরের নিকট আরও একটি তিতাস নদীর সঙ্গে মিলিত হয়ে পশ্চিম দিকে প্রবাহিত হয়ে ঘাঘুটিয়ার নিকট পূর্বোক্ত তিতাসের সঙ্গে মিলিত হয়েছে। এটিও তিতাস নদী নামে পরিচিত।

কোম্পানিগঞ্জ- নবীনগর সড়কের প্রায় মধ্যবর্তী স্থানে এবং সড়কের পূর্ব দিকে অবস্থিত পান্ডুগড় গ্রামের নিকট উৎপন্ন হয়ে পূর্বোক্ত সড়ক ভেদ করে পশ্চিম মুখে গিয়ে ধাপতিখোলা ও দীঘির পাড় গ্রামের পাশ দিয়ে গিয়ে পশ্চিম মুখে প্রবাহিত হয়ে কামাল্লা গ্রামকে উত্তর পাশে রেখে রামচন্দ্রপুর বাজারের দক্ষিণ দিক দিয়ে উত্তর পশ্চিম মুখী হয়ে বাজারের পশ্চিম পাশ দিয়ে প্রবাহিত হয়ে চিতিগঙ্গা নামক তিতাসের সহিত মিশেছে।

তিতাস একটি প্রাচীন নদী। তিতাস নদীর নামে ‘তিতাস গ্যাস’ নামকরণ করা হয়। মানুষের জীবন যাত্রা ও ভূমি গঠনে এ নদীর বিশেষ প্রভাব রয়েছে। তিতাস নদীর ধারা যদিও পরবর্তী সময়ে একাধিকবার পরিবর্তন হয়। তথাপি এর বিভিন্ন উপশাখা নদী চোখে পড়ে।

জেলার নদী তীরবর্তী এলাকাগুলোর মাঝে মাঝেই জেলে সম্প্রদায়ের বাস । তাদের জীবিকা নির্বাহের একমাত্র অবলম্বন মৎস্য শিকার করা। তাছাড়া কৃষকেরা ও নিজেদের খাদ্যের জন্য বিভিন্ন মৌসুমে খালে-বিলে মাছ ধরে থাকেন। ব্রাহ্মণবাড়িয়া জেলায় প্রচুর হাওড়, খাল-বিল, জলাশয় থাকায় এখানে প্রচুর পরিমাণে মাছ পাওয়া যায়। জেলায় ছোট-বড় অনেক পুকুর রয়েছে যেখানে দেশি-বিদেশি প্রচুর মাছ চাষ করা হয়।

ব্রাহ্মণবাড়িয়ায় সাহিত্য কর্মে উল্লেখযোগ্য ভূমিকা রেখেছেন অদ্বৈত মল্লবর্মণ, জ্যোতিরিন্দ্র নন্দী, আবদুল কাদির, আল মাহমুদ প্রমুখ। তিতাস নিয়ে অদ্বৈত মল্লবর্মণ লিখেছেন বিখ্যাত উপন্যাস। আর আল মাহমুদ লিখেছেন বিখ্যাত কবিতা;

এ আমার শৈশবের নদী, এই জলের প্রহার
সারাদিন তীর ভাঙে, পাক খায়, ঘোলা স্রোত টানে
যৌবনের প্রতীকের মতো অসংখ্য নৌকার পালে
গতির প্রবাহ হানে। মাটির কলসে জল ভরে
ঘরে ফেরে সলিমের বউ তার ভিজে দু’টি পায়।
অদূরের বিল থেকে পানকৌড়ি, মাছরাঙা, বক
পাখায় জলের ফোঁটা ফেলে দিয়ে উড়ে যায় দূরে;

জনপদে কী অধীর কোলাহল মায়াবী এ নদী
এনেছে স্রোতের মতো, আমি তার খুঁজি নি কিছুই।

কিছুই খুঁজি নি আমি, যতোবার এসেছি এ তীরে
নীরব তৃপ্তির জন্যে আনমনে বসে থেকে ঘাসে
নির্মল বাতাস টেনে বহুক্ষণ ভরেছি এ বুক।
একটি কাশের ফুল তারপর আঙুলে আমার
ছিঁড়ে নিয়ে এই পথে হেঁটে চলে গেছি। শহরের
শেষ প্রান্তে যেখানে আমার ঘর, নরম বিছানা,
সেখানে রেখেছি দেহ। অবসাদে ঘুম নেমে এলে
আবার দেখেছি ঝিকিমিকি সেই শবরী তিতাস
কী গভীর জলধারা ছড়ালো সে হৃদয়ে আমার।

(আগামীকাল তৃতীয় পর্বে থাকছে ব্রাহ্মণবাড়িয়ার আন্দোলন সংগ্রামের কথকতা নিয়ে আর্টিকেল)

বিজ্ঞাপন