দিনযাপনের ভাংতি গদ্য

মুজিব হাসান:
রবিবার, ৭ ফেব্রুয়ারি
কিশোরগঞ্জ জেলা পাবলিক লাইব্রেরি। ২০১০ সাল থেকে ওখানে আমার যাতায়াত। সেবার জামিয়া ইমদাদিয়ায় এসেছিলাম ইবতেদায়ি মারহালার বেফাক পরীক্ষা দিতে। হঠাৎ একদিন কৌতূহলী মনে উঁকি দিলাম জামিয়া-লাগোয়া এই বই-ভবনটায় আর এত এত বইয়ের জোগান দেখে দারুণ বিস্মিত হলাম। এরপর ২০১৫ সালে জামিয়ায় ভর্তি হওয়ার সুবাদে যাতায়াত নিয়মিত হয়ে গেল। ছাত্রজীবনের প্রায়দিনের বিকেলগুলো বই-পড়ুয়ার মন নিয়ে ওখানে নিকেল করে ফিরতাম। কোনো কোনো বিকেল বই-তালাশের ঘোরে ফুরিয়ে যেত—এই সেলফ, ওই সেলফ ঘাঁটাঘাঁটি করে পছন্দনীয় বইয়ের খোঁজ করার মধ্য দিয়ে। এমন বইগুলোর জন্য একটি গোপন জায়গাও ঠিক ছিল আমার; ওখানে রেখে আসতাম পছন্দনীয় বইগুলো। ২০১৬ সালে লাইব্রেরির সদস্য হয়ে গেলাম। সেই থেকে এখনও জুড়ে আছি এর সঙ্গে।
অনেক দিন হলো প্রাণের লাইব্রেরিতে যাওয়া হয় না। পাশ দিয়ে হেঁটে যাই; কোনোদিন এক পলক তাকাই, কোনোদিন না-তাকিয়ে চলে যাই। এখন আমি যে রুমটিতে বসবাস করছি, ওটিও একটি লাইব্রেরি। দিনরাত বইয়ের আবহে সময় পার করি। এখন আমার চোখ বইয়ের সারি দেখতে দেখতে ক্লান্ত। মাথার মধ্যে কাজের প্রচুর চাপ—যে কারণে বইয়ের আবহে ডুবে থেকেও তেমন বই পড়া হয় না। তবে এমন উচ্ছল আবহের ভেতর থাকতে পেরে সবসময় নিজেকে প্রাণবন্ত লাগে। এখন মন না-চাইলেও প্রতিদিন একটু-না-একটু বই পড়া হয়ে যায়—এমন কর্মক্লান্তজীবনে এটিই আমার পরম সৌভাগ্য আর এই সৌভাগ্যের বারিধারায় আমি সিক্ত হচ্ছি প্রতিনিয়ত।
গত দিন দশেক আগে এক তীব্র টান নিয়ে পাবলিক লাইব্রেরিতে যাই। তিনতলায় বেশ পুরনো ও সমৃদ্ধ অনেকগুলো বুকসেলফ আছে; ওগুলোর ভেতরে রয়েছে দুর্মূল্য সব বইয়ের খনি। লাইব্রেরিয়ানকে বলে এর একটিকে খুললাম আর ভেতরে পেয়ে গেলাম বাংলা, আরবি, ফারসি, উরদু, ইংরেজি—এই পাঁচ ভাষায় লেখা দুর্মূল্য বই-কিতাবের জোগান। পুরোটা ঘেঁটে শেষ করতে পারিনি; তিন ভাগের আধা ভাগ ঘেঁটেছি; বাকিটা আরেকদিনের জন্য রেখে দিয়ে এসেছি। ওখানে যেসব কিতাব পেয়েছি, এর প্রতিটি বেশ গুরুত্বপূর্ণ এবং আমার বেশ কিছু পরিকল্পিত কাজে সহায়ক গ্রন্থ। কিছু বইয়ের ছবি তুলে নিয়ে এসেছি। আবার কবে ওই খাজানায় হাত দেব, সেই অপেক্ষায় রইলাম!
শনিবার, ১৩ ফেব্রুয়ারি
[উসতাদে মুহতারাম মাওলানা শামসুল ইসলাম রহ. স্মরণে]
আজ শনিবার। বাদ মাগরিব। সাপ্তাহিক তাফসির দিবস। বসে আছি শহীদী মসজিদ চত্বরে। মসজিদের ভেতর মজমা হচ্ছে। ওখানে যেতে মন চাচ্ছে না। বাবা, আপনিই ছিলেন এই মজমার একমাত্র মধ্যমণি। আপনিবিহীন শনিবারের মজমায় আমার আর মন বসবে না।
বাবা, আপনার কথা খুব মনে পড়ছে! চারপাশে এত কোলাহল অথচ আমি কত নীরব! আপনার বিরহব্যথা আমাকে নিদারুণ ব্যথিত করছে। বাবা, কোথায় আপনি? প্রতি শনিবার মজমা শেষে আপনি তো এই অধমটাকে শাসাতে যেতেন জামিয়ার পাঠাগারে। ওখানে আপনার কিছু বইয়ের পাণ্ডুলিপি নির্মাণের কাজ চলছিল। নির্মাণ-কাজ অব্যাহত অথচ আপনি চলে গেলেন অন্তর্ধানে!
বাবা, আমি আজকেও অপেক্ষায় আছি মজমা শেষে আপনার দেখা পাব বলে। জানি, আজ কেউ এসে আমাকে আর হাত ধরে টেনে নিয়ে আল-আতহার লাইব্রেরিতে ঢুকবে না বইয়ের খোঁজে; নতুন বইয়ের তালাশ করবে না। বই সংগ্রহের পর বলবে না, এই বেত্তমিজটা, বাদাম খাইবেনি? তারপর গরম বালুয় ভাজা একঠোঙা বাদাম আমার হাতে দিয়ে বলবে না, যাহ বেত্তমিজটা, এইগুলা খাইতে খাইতে আমার বইটা লেখ গিয়া। তাড়াতাড়ি কাজ শেষ করবি। আমি আগাগোড়া সম্পাদনা করাম। যাহ!
বাবা, শহীদী মসজিদের ভেতরে চলছে আপনিবিহীন মজমা আর আমি রোয়াকে বসে বসে ভাবছি আপনার কথা। আপনিই কি সত্যিই চলে গেছেন বাবা? নাহ, মেনে নিতে পারছি না আপনার এমন অন্তর্ধান! বাবা, আপনি কোথায়?
বৃহস্পতিবার, ৮ এপ্রিল
অনেকদিন পর ছুটির আমেজ নিয়ে বাড়ি ফিরলাম। ছাত্রজীবন শেষ হওয়ার পর ভুলেই গিয়েছিলাম ছুটির স্বাদ-গন্ধ। দুয়েকদিনের জন্য বাড়ি আসি, দশটা-পাঁচটার ছুটির মতো। বাড়ির বাতাস একটু গায়ে মাখতে পারলেই হলো, জুড়িয়ে যায় আমার পরান। কিন্তু আজকের ছুটিটা বেশ পুলকদায়ক লাগছে। মনে হচ্ছে, সব ঝামেলা থেকে মুক্ত হয়ে নিজের জগতে ডুবে থাকার মতো একটা ফুরসত পাওয়া গেল; সপ্তাহখানেকের প্রাণবন্ত ফুরসত। পরান-খিদের খোরাক হিসেবে সঙ্গে নিয়ে এসেছি একগাদা বই। বসন্ত-বাতাসে বাড়ির সামনে ছায়াবীথিতলে বসে বসে দিনমান পড়ব; পঠনে রতন হবো আর নৈসর্গিক সৌন্দর্য দেখে ঋদ্ধ করব পরানের গহীন ভেতর।
শুক্রবার, ২৩ এপ্রিল
আজ ছিল বই দিবস। দিনটা চলে গেল দেখতে দেখতে; অথচ দিনের শুরুতেই বই নিয়ে আমার কিছু কথা বলা দরকার ছিল। দরকারটা নিজের জন্যই—মনের সঙ্গে মুজাকারা।
আমার যেখানে দিনযাপন হচ্ছে, এটি একটি পাঠাগার। চারদিকে নানাবিধ বইয়ের সমাহার। হাত বাড়ালেই বই। চাইলে তো পড়া হয়ই; না-চাইলেও পড়া হয়ে যায় অনেক বই। কাজ করতে করতে ক্লান্ত হয়ে যখন চোখ তুলে তাকাই, দেখি এদিকে-ওদিকে তাকে তাকে থরে থরে সাজানো বই। জায়গা ছেড়ে উঠে কিছু পড়তে হয় না, অদূরে বসে বইয়ের নামগুলো পড়তে পড়তেই মন ভরে ওঠে এনার্জিতে; কাজে ফিরে পাই উদ্যম।
পড়ুয়া-মন বই ছাড়া আর কিছুতে স্পন্দন পায় না; পড়ুয়াজন বইয়ের মধ্যেই খুঁজে পায় পরম সুখ। একেকটি বই একেকটা জীবনের ভাষান্তর। তাই বই ছাড়া জীবন অচল।
রবিবার, ২৬ এপ্রিল
বিকেলবেলা। সারাদিন ঘরকুনো থেকে এবেলাতে বাইরে বেরুলাম। আজকাল ঘরবন্দি থেকে কেটে যাচ্ছে দিনরাতের আলো-আঁধারি প্রহরগুলো। সপ্তাহ কেটে যায় ঝলমলে রোদ দেখি না, গায়ে মাখি না ঝিরিঝিরি বাতাসের দমক। কী যে একপেশে দিনযাপন হচ্ছে!
বিকেল হলেই মনটা আনচান করে ওঠে : একটু বাইরে বেরুই, আকাশ দেখি, গাছের তল দিয়ে হাঁটতে হাঁটতে দেখি পাতাদের সংসার।
হ্যাঁ, পাতাদের সংসার, আমাকে খুব টানে। মাথার ওপর চাঁদোয়া করে কী সুন্দর সংসার পাতে তারা, পাতারা। হাঁটতে হাঁটতে মুগ্ধ চোখে ওগুলো দেখি। দেখি ডালের সঙ্গে ডালের আড়ি চললেও পাতারা খুব সংঘবদ্ধ; জড়াজড়ি করে সংসার করে যাচ্ছে। রোদ-বাতাসে ভরে তুলছে সবুজ জীবনটা।
আহা, বড্ড মায়া লাগায় তাদের, পাতাদের, এ সংসার!
মঙ্গলবার, ২৫ মে
বাইরে তুমুল বৃষ্টি হচ্ছে, বইছে উত্তাল ঝড়ো হাওয়া। সারাদিনের দমবদ্ধ গরম ধুয়ে গেছে ঝুম বৃষ্টির ডলকে। বিদ্যুৎ নেই, ঘরভর্তি গাঢ় অন্ধকার। ড্রয়ারে মোমবাতি আর দিয়াশলাই ছিল। আয়েশ করে আলো জ্বালালাম; হলুদাভ আলোয় ভরে উঠল আমার বইরাজ্যের বাসস্থান।
মুগ্ধচোখে তাকিয়ে আছি টেবিলের ওপর রাখা মোমবাতির দিকে। দেখছি, একটি ননির মিনার তরল সোনার গম্বুজ মাথায় নিয়ে ধীরে ধীরে কী সুন্দর দ্রবীভূত হয়ে যাচ্ছে! মোমের আলো, কাঁচা আলো। এই আলোয় বই পড়লে অন্যরকম ভালো লাগায় ভরে ওঠে দেহমন। আমি তা-ই করছি। মোমের আলোয় চোখের সামনে মেলে ধরেছি ময়মনসিংহ-গীতিকা। বৃষ্টির রিমঝিম আর মেঘের গুড়ুমে মোমবাতির হলুদ আলোয় পুঁথি পাঠে কী যে আনন্দ হচ্ছে, এটা ভাষায় ব্যক্ত করতে পারছি না। পুঁথিপুরাণের গন্ধে বিমোহিত হয়ে উঠছে আমার চারপাশ। এত সুন্দর একটি মুহূর্ত উপভোগ করতে পেরে আপ্লুত হয়ে উঠছি বারবার!
রাব্বানা, লাকাল হামদ!
সোমবার, ৩১ মে
বিকেল থেকে কী কারণে জানি—হয়তো অকারণে কিংবা কারণটা অব্যক্ত—খুব মনখারাপ লাগছে। সন্ধ্যা নামার সঙ্গে সঙ্গে মনের আকাশও ছেয়ে গেছে বিষাদের কালো মেঘে। বুঝতে পারলাম, আজ আমার মনখারাপের মন ভালো নেই। গুমোট হয়ে বসে রইলাম অনেকক্ষণ। তখন মনে হলো, এই সময়ে কারও কাছ থেকে চিঠি পেলে হয়তো একটু প্রসন্নতা পাব। এই ভেবে দুইজন ‘মানুশ’কে বন্ধুতার (?) দাবি জানিয়ে বললাম, খুব মনখারাপ, আমাকে একটি চিঠি লেখো আজ! কিন্তু দুজনই মুখের ওপর না বলে দিল; যেন আমি খুব আদিখ্যেতা করে ফেলেছি! অথচ আমি বেশ আশাবাদী ছিলাম, ওরা আমার প্রতি এটুকু সহানুভূতি দেখাবে। জানো তো, অতি করুণ সময়ে এই না বলাটা কত যে বেদনাদায়ক!
তারপর হঠাৎ মনে পড়ল প্রিয় বন্ধু মাসরুর জাকারিয়ার চিঠি আর এলিজির কথা। টেবিলের ড্রয়ারে—আমার হৃদয়েরই তোরঙ্গে—সযতনে রেখেছিলাম এই মহব্বতের নজরানা। ওখান থেকে বের করে দুটো হলদে খাম নিলাম। একটার মধ্যে পেলাম বেশ দীর্ঘ একটা চিঠি, আরেকটায় আমার জন্য লেখা একটি কবিতা—মুজিব, তোমার জন্য এলিজি।
ওর মতো করে এত বন্ধুতা আর ভালোবাসা দেখিয়ে কেউই আমাকে এমন করে কিছু লেখেনি। ও-ই প্রথম আমার জন্য এলিজি লেখেছে। ওর এলিজিই আজ আমার মনখারাপের মন ভালো করবে।
মুজিব, তোমার জন্য এলিজি
চোখে আর ঘুম নেই—কেবল লাল লাল হাওয়া
বুকের তোরঙ্গে তুলে রাখি আজকাল দুঃসহ কিছু ইনসমনিয়া
এইসব গভীর রাতে তড়পায় অকারণই মন
চিরটাকাল ধরে ঘুমের ভিতরে শুধু হাওয়া শনশন
তুমি কি ব্যথার হাওরে ভেসে, কভু
ঢেউ এলে কাঁপো তরতর—
ডেকেছে কি কেউ কোনোদিন
তোমাকে, পরানের গহীন ভিতর?
আমারও হৃদয় হাওরের জলে ডুবে-ভাসে
আমিও দিনমান একা গাই বিষাদের গান
শরীরে ঝুলিয়ে রেখে এপিটাফ প্লেট
চোখ দিয়ে ঢেকে রাখি ব্যথা অভিধান
তোমাকে ভুলতে গেলেই যেন হয়ে যায় পাপ
তোমাকে মনে পড়া মন লুকিয়ে রাখি চুপচাপ
তোমাকে যেদিন মনে পড়ে খুব, ঠিক পরদিন যত্ন করে ভুলি
বলো তুমি—এই মুখস্থ মুখ কার কাছে গিয়ে বলি!
শনিবার, ৫ জুন
দিনমান ঘরবন্দি থেকে বিকেলবেলা বাইরে বেরুই। নাহলে বড্ড দমবন্ধ লাগে। আজিমুদ্দিন মাঠের পাশে রেললাইন; বেশ নিরিবিলি জায়গা। নিঃসঙ্গ বিকেল কাটাতে প্রায়ই এখানে ছুটে আসি। স্লিপারে পা ফেলে হাঁটাহাঁটি করি। মুগ্ধ চোখে দেখি গাছগাছালির বিচিত্র শোভা। পাতায়, ডালে, ছালে, শেকড়ে গাছেদের কত শোভা! ধীর পায়ে হেঁটে হেঁটে ওসব দেখি। প্রতিটি গাছ নিশ্চল অথচ জীবন-বৈচিত্র্যে কী দারুণ প্রাণবন্ত! গাছেরাও পালন করে মানুষের মতো সংসার-জীবন। শুধু গাছই নয়, পাতাপত্তর, ডালপালা, ফুলকুঁড়ি, ফলপাকড় এবং বাকল-শেকড়েরও রয়েছে আলাদা সংসার। জীবন-মরণের প্রতিটি অনুষঙ্গ প্রতিনিয়ত ওদের দোলায়িত করে যায়। হাঁটতে হাঁটতে আমি ওসবেরই খোঁজ করি।
বিজ্ঞাপন
আগের সংবাদনাইজেরিয়ায় ১২ বছরের সহিংসতায় নিহত প্রায় সাড়ে তিন লাখ মানুষ
পরবর্তি সংবাদসোমবার থেকে সারাদেশে কঠোর লকডাউন