দুইটি ছবি এবং সিরিয়ান কিশোরীর তিনটি স্বপ্ন

(আল জাজিরার ফিচার বিভাগে ফটোগ্রাফাররা তাদের ফটোগ্রাফির গল্প বলেন। তিন বছরের ব্যবধানে উদ্বাস্তু এক সিরিয়ান কিশোরীর দুটি ছবি ক্যামেরাবন্দী করেছিলেন ফ্রিল্যান্সার চলচ্চিত্র নির্মাতা এবং ফটোগ্রাফার লুসি লিয়ন। আরবের আঞ্চলিক বিষয়-আশয় নিয়েও তিনি লেখালেখি করেন। এখানে তিনি সিরিয়ান কিশোরীর দুটো ছবির পেছনের গল্প বলেছেন। লেখাটি বাংলায় রুপান্তর করেছেন রাকিবুল হাসান।)

মেয়েটির নাম ফাতেমা। তার সঙ্গে আমার প্রথম দেখা ২০১৩ সালের এক রোদপোড়া দিনে। দশ বছর বয়সী ফাতেমা তখন বসবাস করছে জর্ডানের মাফরাক জেলার একটি বাড়ির ছাদে। বাবা-মা দুজনই বধির; শুনতে পান না কারও কথা। ছাদের ছোট্ট সেই ঘরে তারা তিনজন মিলে গড়ে তুলেছে সংসার।

এর এক বছর আগে, ২০১২ সালে তারা থাকতো সিরিয়ার বাবে আমর এলাকায়। সরকারি বাহিনীর আক্রমণে তারা দিকশূণ্য হয়ে পড়ে। তারপর এক সন্ধ্যায় একটি বাসে করে তারা চলে আসে সীমান্ত পেরিয়ে জর্ডানে। সঙ্গে নিয়ে আসে কেবল কয়েক পিস কাপড়। আর কিছুই আনতে পারেনি। জর্ডানে এসে যে বাড়ির ছাদে উঠেছে, সেখানে পানি নেই, বিদ্যুৎ নেই। ভ্যাপসা গরম সবসময় অস্বস্তিতে ফেলে রাখে সবাইকে।

আমি আম্মান থেকে গাড়িতে করে তার বাড়িতে গিয়েছিলাম। রাস্তায় পথনির্দেশক সাইনবোর্ড ছিল না। আমার কাছে জিপিএসও ছিল না। তবে পথে মানবাধিকার কর্মীদের পেয়েছিলাম। তারাই আমাকে ফাতেমার বাড়ি খুঁজে পেতে সাহায্য করে। গাড়ি থেকে নেমেই দেখলাম মরিচ রঙের সোয়েটার পরে ফাতেমা হাসি হাসি মুখ করে দাঁড়িয়ে আছে।

ফাতেমা আমাকে ছাদে নিয়ে গেলো। ৩৬০ ডিগ্রি এঙ্গেলে, যেখান থেকে দেখা পুরো শহর। দেখা যায় ফাতেমার জন্মভূমি সিরিয়াও। আমরা তাকিয়ে থাকি, ফাতেমার চোখের কোণে জমে উঠে জল। আমার অজান্তে। জড়ানো কণ্ঠে ফাতেমা বললো, ‘আমার মা-বাবা কথা বলতে পারেন না। তাই ফোন এলে আমাকেই ধরতে হয়। সবার সঙ্গে যোগাযোগ আমাকেই করতে হয়। জাতিসংঘের খাদ্য ভাউচার দিয়ে খাবার সংগ্রহ এবং প্রতিবেশীর বাড়ি থেকে পানি আনতে হয় আমাকেই। বাবা-মায়ের একমাত্র সন্তান আমি।’

Behind the lens - Fatima - Lucy Lyon

ফাতেমা পানির ধাতব ট্যাঙ্কে থুতনি লাগিয়ে জানালা দিয়ে বাইরে তাকিয়েছিল। তার একপাশে একটি পুতুল। দূরে নির্বিকার এক দৃষ্টি মেলে দিয়ে সে বলছিলো, ‘আমি স্বপ্ন দেখি আমি আমার গ্রামে ফিরে যাব। যেখানে আমার জন্ম, যেখানে আমার আত্মীয় স্বজন। আমার স্কুলটি ছিল খুব সুন্দর। যা কিছুই শিখেছিলাম, সব ভুলে গেছি।’ আমি জিজ্ঞেস করেছিলাম তুমি স্কুলে যাও না? সে বলেছিলো, ‘মানবাধিকার সংস্থাগুলো শরণার্থী শিশুদের জন্য স্কুল করেছে। তবে আমি যেতে পারছি না। বাবা-মায়ের সঙ্গে থাকতে হয়। কারণ তারা তো অক্ষম।’

পানির ট্যাঙ্কে থুতনি রেখেই ফাতেমা তার স্বপ্নের কথা বললো। সে ডাক্তার হতে চায়। সিরিয়া ফিরে যেতে চায়। সিরিয়াতেই পুরো জীবন কাটাতে চায়। আমি ভাবছিলাম, দশ বছরের একটি মেয়ে যে স্বপ্ন দেখছে, তা পূরণ হওয়া তো অসম্ভব কিছু নয়।

তিন বছর পর আবার

তিন বছর কেটে গেছে তারপর। ২০১৬ সালে আরেকটি অ্যাসাইনমেন্ট হাতে এলো আমার। আমি সিদ্ধান্ত নেই ফাতেমাকে খুঁজে বের করবো। তখন তারা আগের জায়গা থেকে অন্য এলাকায় চলে গেছে। এনজিও কর্মীদের সাহায্যে আমি মাফরাক জেলার রিবা গ্রামে ফাতেমাকে খুঁজে পাই। ফাতেমা বাড়ি থেকে বেরিয়ে এলো সহাস্যে। তবে তার সেই হাসিতে লেগে ছিল লজ্জার চিহ্ন।

ফাতেমা আমাকে ভেতরে নিয়ে এলো। হাসতে হাসতে আমাকে বললো, ‘আমার জীবন নিয়ে এখন আমি সুখী। বড় বাড়িতে থাকি। বাড়িওয়ালা ভাড়া নেন নামেমাত্র। ঘরে এখন পর্যাপ্ত পানি আছে, বিদ্যুৎ আছে, ফ্রিজ এবং টেলিভিশন আছে।’ ফাতেমা আমাকে তার রুমে নিয়ে গেলো। দেখলাম ফাতেমার কাপড়গুলো জানালায় হেঙ্গারে ঝুলছে। ফাতেমার মা-বাবা ক্রমশ বৃদ্ধ হচ্ছেন। বাবার মাথার চুল ধূসর হয়ে গেছে। ফাতেমা যা বলছে, তার সঙ্গে ‘হু হু’ করে মাথা নাড়িয়ে সমর্থন জানাচ্ছেন।

Behind the lens - Fatima - Lucy Lyon

কিন্তু ফাতেমা হঠাৎ করেই উদাস হয়ে গেলো। জানালা দিয়ে বাইরে তাকিয়ে ব্যথাতুর গলায় বললো, ‘আমি এখনো পড়তে পারি না। লিখতে পারি না। এমনকি টেক্সট মেসেজও না। অস্বস্তি হয়। আমার সহকর্মীরা সব পারে। মাঝেমধ্যে তারা আমাকে নিয়ে ঠাট্টা করে।’

দেখলাম ফাতেমা উদাস হয়ে গেছে আরও। তার চোখে ভর করছে মাতৃভূমির স্বপ্ন। সে বললো, ‘আমার প্রধান স্বপ্ন সিরিয়ায় ফিরে যাওয়া। দ্বিতীয় স্বপ্ন বাবা-মায়ের সুস্থতা; তারা যেন কথা বলতে পারেন। তৃতীয় স্বপ্ন ডাক্তার হওয়া। কিন্তু জানি—আমার এ স্বপ্ন পূরণ হবার নয়।’

তিন বছর পর আবারও

তারপর আরও তিন বছর কেটে গেছে। এখন ২০২০। ছবিগুলোর দিকে তাকিয়ে ভাবি—ফাতেমা কীভাবে কী করছে এখন? সে স্কুলে যেতে পেরেছে? নাকি এখনও জানালায় দাঁড়িয়ে বাইরে তাকিয়ে স্বপ্ন দেখে। যে স্বপ্ন কখনও পূরণ হবে না?