দুর্দান্ত হামাস, আয়রন ডোমের ব্যর্থতায় ইজরাইল

হাবিবুল্লাহ বাহার:

এবারের লড়াইটা আর একমুখী হচ্ছে না। যুদ্ধ শুরুর প্রথম প্রহরেই সেটা অনেকটা স্পষ্ট হতে শুরু করে। ইসরাইল চেয়েছিল প্রতিবারের মতো কমান্ডো স্টাইলে আগ্রাসন চালিয়ে গাজাভিত্তিক ফিলিস্তিনি প্রতিরোধ সংগঠন হামাসকে নিস্তব্ধ করে দিবে। কিন্তু অপ্রত্যাশিত যা ঘটে গেল তাতে ইসরাইলি সেনাআধিকারিকদের মাথায় যেন বাজ পড়েছে। অনেক ইসরাইলি নিরাপত্তা বিশ্লেষক বিস্ময় প্রকাশ করে বলেছেন, এবার দৃশ্যপট সম্পূর্ণ বদলে গেছে।

আয়রন ডোমের ব্যর্থতা

আয়রন ডোম ইসরাইলের রাষ্ট্রায়ত্ত প্রতিরক্ষা প্রতিষ্ঠান রাফায়েল অ্যাডভান্সড ডিফেন্স সিস্টেম এর একটি অত্যাধুনিক আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা। ২০০৬ এর জুলাইয়ে লেবাননের হিজবুল্লাহ গোষ্ঠীর রকেট হামলায় ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি হওয়ার পর প্রকল্পটি হাতে নেয় ইসরাইল। ইসরাইল এটিকে তার শক্তির অন্যতম উৎস হিসেবে দেখে আসছিলো। ইসরাইলি সেনাধ্যক্ষদের বিভিন্ন সময়ে এ নিয়ে দম্ভ করতে দেখা গেছে। কারণ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থাটিতে এমন তিনটি উপাদান ছিল যা শতভাগ নিরাপত্তা নিশ্চিত করে। ১. রাডার ও ট্র্যাকিং সিস্টেম যা আক্রমণকারী মিসাইলগুলি সনাক্ত করে। ২. নির্ণায়ক ব্যবস্থা যা হুমকির মাত্রা নির্ণয় করে। ৩. প্রতিরোধী স্বয়ংক্রিয় “তামির” রকেট প্রক্ষেপণ ব্যবস্থা যা ছুটে আসা রকেটকে জনশূন্য এলাকায় বিধ্বস্ত করে। এছাড়া এটি দিনরাতের যে কোন মুহূর্তে যে কোন প্রতিকূল আবহাওয়াতে কাজ করার উপযোগী।

মানব সৈন্যের স্থান পূরণ করায় এর নামকরণ করা হয়েছিল আয়রন ডোম বা লৌহ পুলিশ। ইসরাইলের দাবী অনুসারে গত এক দশকে এটি হামাসের কয়েক হাজার রকেট প্রতিহত করেছে এবং এর সফলতার হার ৯০%। যদিও এটি নিরপেক্ষ গবেষণার দাবী রাখে।

ইসরাইলি প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা গবেষক মাইকেল আর্মস্ট্রং লিখেন, প্রথম থেকেই ইসরাইলি রাজনীতিবিদ, সেনাআধিকারিক ও নাগরিক সমাজে আয়রন ডোম নিয়ে ব্যাপক চর্চা ছিল। আন্তর্জাতিক অস্ত্রবাজারে এটি বিশেষ আগ্রহের বিষয় হয়ে দাঁড়ায়। ২০১৬ সালে আজারবাইজান এটি কেনার জন্য চুক্তিবদ্ধ হয়। লক্ষ্য ছিল আর্মেনিয়া ব্যবহৃত রাশিয়ান ইস্কান্দার রকেটব্যবস্থা প্রতিরোধ করা । ২০১৭ সালে ভারত দুই বিলিয়ন ডলার মূল্যে এটি ক্রয় করে। ২০১৮ সালে রোমানিয়া এটি কেনার জন্য চুক্তিবদ্ধ হয়। এছাড়া আমেরিকা এর ব্যাটারি কিনেছে মধ্যপ্রাচ্য ও আফগানিস্তানে মার্কিন ঘাঁটিগুলোর নিরাপত্তার জন্য।

গাজায় ইসরাইলের চলমান আগ্রাসনের প্রতিবাদে প্রতিরোধ আন্দোলন হামাসের ছোঁড়া রকেটগুলো রাজধানী তেলআবিবসহ গুরুত্বপূর্ণ অনেকগুলো শহরে পৌঁছে গেছে আয়রন ডোমকে ভেদ করেই । ভিডিও ফুটেজে ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতিও লক্ষ্য করা গেছে। প্রাণহানি হয়েছে বেশ কজনের। ইতোমধ্যে আয়রন ডোমের সক্ষমতা ও কার্যকারিতা নিয়ে প্রশ্ন দেখা দিয়েছে। হুমকির মুখে পড়েছে এর রপ্তানিবাজার। যা ইসরাইলের অর্থনীতিকে বিধ্বস্ত করবে। ইসরাইল অবশ্য ব্যর্থতা লুকোবার চেষ্টা করেছে। রাষ্ট্রীয় টেলিভিশন এক প্রতিবেদনে বলেছে, যান্ত্রিক ত্রুটিজনিত কারণে এমনটা হয়েছে। যদিও ত্রুটির ধরণ স্পষ্ট করা হয় নি। আসকালানে আল জাজিরার সংবাদদাতা ইলয়াস কাররাম প্রশ্ন তুলেছেন কী করে সবগুলো আয়রন ডোম একসাথে বিকল হয়ে পড়েছে ?

আদতে হামাসের রকেট এ পর্বে অনেক বেশি সক্ষমতা দেখিয়েছে। বিশ্লেষকরা মনে করছেন, হামাসের বিজ্ঞানীরা আয়রন ডোম নিয়ে ব্যাপক গবেষণা করেছেন এবং এটি প্রতিরোধে বিভিন্ন মাত্রায় গুচ্ছ রকেট নিক্ষেপণ পদ্ধতি ব্যবহার করছেন। যা সামাল দিতে রীতিমত হিমশিম খেতে হচ্ছে আয়রন ডোমকে।

সংঘাতের রীতি কি বদলাচ্ছে ?

আমেরিকান সংবাদপত্র মনিটরে প্রকাশিত এক নিবন্ধে ইসরাইলি সাংবাদিক ও নিরাপত্তা বিশ্লেষক বেন ক্যাসবেত লিখেছেন, এবার আমরা হামাসকে রীতিমত হুমকি দিতে দেখলাম রবিবার সন্ধ্যা ৬ টার মধ্যে মসজিদ আল আকসা ও শাইখ জাররাহ মহল্লা থেকে সেনা প্রত্যাহার না হলে প্রতিশোধ নেয়া হবে । হামাসের এ আচরণ ইসরাইলের জন্য সম্পূর্ণ নতুন ও অস্বাভাবিক। বৃহৎশক্তি ইসরাইলের বিরুদ্ধে ক্ষুদ্রশক্তি হামাসের এ হুমকি কল্পনাতীত। জেরুজালেমে হামাসের ছোঁড়া ছয়টি রকেট নিক্ষেপের ঘটনায় হতাহতের ঘটনা না ঘটলেও ব্যাপক আতঙ্ক ছড়ায়। ভেস্তে যায় বসতিস্থাপনকারীদের বার্ষিক জেরুজালেম দখল উৎসব। মুহূর্তে বাতিল করা হয় জেরুজালেমের নেসেট সদর দপ্তরে অনুষ্ঠিত একটি অধিবেশন। আইনপ্রণেতারা আশ্রয় নেন নিরাপদ বাঙ্কারে।

ইসরাইলি বিশ্লেষকের মন্তব্যে যোগ করে বলা যায়, প্রতিরোধ আন্দোলনের এবারের প্রতিআক্রমণ শক্তি ও প্রজ্ঞার মিশেলে দৃশ্যপট একদম পাল্টে দিয়েছে। এবার হামাস কোন ভূমিকা ছাড়াই সরাসরি জেরুজালেমে আঘাত হেনেছে। যা অদৃষ্টপূর্ব । মসজিদ আল আকসার পাশে থাকবার বার্তা বহন করছে এটি।

১০ মে মঙ্গলবার সন্ধ্যায় হামাসের সামরিক শাখা আল কাসসাম বিগ্রেডের প্রধান আবু উবাইদা এক বিবৃতিতে বলেন, কাসসাম বিগ্রেড দখলদার ইসরাইলকে দু’ঘণ্টার আল্টিমেটাম দিচ্ছে। এ সময়ের মধ্যে আল আকসায় অবস্থান নেয়া বিক্ষোভকারীদের উপর আরোপিত অবরোধ তুলে নিতে হবে। হামাস তাদের হুমকি অক্ষরে অক্ষরে কার্যে পরিণত করেছে। দখলীকৃত পশ্চিমতীরের বেরযিত বিশ্ববিদ্যালয়ের গণমাধ্যম বিভাগের অধ্যাপক নাশাত আকতাশ মনে করেন, এ পদক্ষেপ প্রমাণ করে প্রতিরোধ আন্দোলনগুলো শত্রুকে চ্যালেঞ্জ করার মতো যথেষ্ট শক্তি অর্জন করেছে। ইসরাইলের বিমান হামলা বৃদ্ধির সাথে সাথে হামাসের সামরিক প্রধান আবু উবাইদা বেসামরিক টাওয়ার ধ্বংসের জন্য তেলআবিবে ভয়ানক রকেট হামলা চালাবার অঙ্গীকার করলেন। সেটাই হতে দেখা গেলো। তেলআবিবে বৃষ্টির মত রকেট বর্ষণ হলো। যাতে ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি হয়। অনেক বিশ্লেষক মনে করছেন এখানে নতুন একটি সমীকরণ হতে চলেছে। যা ইসরাইলের ঔদ্ধত্বের রাশ টেনে ধরে ফিলিস্তিনিদের আক্রমণ করার পূর্বে অন্তত দশবার ভাবাবে।

ইসরাইলি সংবাদপত্র বদিওত আহরোনোত এর নিরাপত্তা বিশ্লেষক মুশা ইয়াহুশা বর্তমান পরিস্থিতিকে দেখছেন ভারসাম্যের অভাবনীয় পরিবর্তন হিসেবে। হামাস শক্তিশালী আঘাত হেনে আগ্রাসন থামাতে বললো। পরিস্থিতি আমাদের সৈন্যদের বিব্রত করেছে। থামাতে হয়েছে জেরুজালেম দখলবার্ষিকী উদযাপন। মুহূর্তেই বন্ধ করতে হয়েছে আইনসভার অধিবেশন। অন্যদিকে জেরুজালেমের আরবরা আমাদের বিপদে উৎসব করছে।

আল আকসা ফিলিস্তিনিদের ঐক্যবদ্ধ করছে

নিষ্ক্রিয় ফিলিস্তিনি স্বশাসন কর্তৃপক্ষ ফাতাহ ও সশস্ত্র বিপ্লবী দল হামাসের দ্বন্দ্ব বেশ পুরনো। দখলদার ইসরাইল আরোপিত ভৌগলিক বিভাজনের ফলে ফিলিস্তিনিরা কার্যত বহুকাল ধরে দ্বিধাবিভক্ত। ফাতাহ শাসিত পশ্চিমতীর, হামাস শাসিত গাজা উপত্যকা, ইসরাইল নিয়ন্ত্রিত অঞ্চল ও বহির্বিশ্বে অবস্থানকারী ফিলিস্তিনিদের জাতীয় বিষয়গুলোতে যৌথ বিবৃতি দিতে দেখা গেলেও কার্যত কারো বিপদে কেউ সক্রিয়ভাবে পাশে দাঁড়ায়নি। গাজায় আগ্রাসন কিংবা আল আকসা মসজিদে হামলা প্রত্যেকটা ঘটনায় প্রতিরোধ গড়েছেন স্থানীয়রা। অন্যেরা বিবৃতি দিয়েই দায় সেরেছে। এবারের সংঘাত পরিস্থিতি সব ফিলিস্তিনিকে ঐক্যবদ্ধ করেছে। বিশেষত এবারের ঘটনার প্রারম্ভটা হয়েছে মসজিদ আল আকসা থেকে যা ফিলিস্তিনিদের জাতীয় সম্মানের প্রতীক।

এ প্রথমবার গাজার প্রতিরোধ আন্দোলনগুলো ইসরাইলি সৈন্যদের জানান দিচ্ছে ফিলিস্তিনের যে কোন স্থানে আগ্রাসন হলে বসে থাকবে না তারা। আল আকসায় ইহুদি বসতিস্থাপনকারীদের বিরুদ্ধে গর্জে উঠবে হামাসের রকেট। হামাসের সেনাপ্রধান বলে পরিচিত মুহাম্মাদ দইফ ইসরাইলি নীতিনির্ধারকদের উদ্দেশ্যে যে হুমকি দিয়েছেন তা এককথায় অনন্য। তার বিবৃতির ভাষ্য, চিপ অফ স্টাফ স্পষ্ট ও চূড়ান্ত সতর্কতা জারী করছে শাইখ জাররাহ মহল্লায় আমাদের ভাইদের উপর চলমান আগ্রাসন অবিলম্বে বন্ধ না হলে চরম মূল্য দিতে হবে ইসরাইলকে। আমরা হাত গুটিয়ে বসে থাকবো না।

গাজার প্রতিরোধ আন্দোলনের সংহতি প্রকাশে উজ্জীবিত সকল ফিলিস্তিনি। মসজিদ আল আকসা প্রাঙ্গণ, জাররাহ মহল্লা, দামেস্ক গেট সহ ফিলিস্তিনের সর্বত্র মুহাম্মাদ দইফ জিন্দাবাদ স্লোগান উঠেছে। আল আকসার অধিবাসীরা কখনোই মসজিদ প্রাঙ্গণে কোন রাজনৈতিক ব্যক্তির জন্য স্লোগান দেন না। মুহাম্মাদ দইফ এক্ষেত্রে ব্যতিক্রম। তিনি ইতোমধ্যে ফিলিস্তিনি যুবকদের কাছে প্রতিরোধ ও জাতীয় চেতনার আইকন হয়ে উঠেছেন। যেমনটা বলতে শোনা গেছে ফিলিস্তিনি রাজনীতি বিশ্লেষক হাদি আব্দুল হাদিকে।

সম্পূর্ণ নতুন যে প্রবণতা দেখা গেলো সেটা হলো ইসরাইলে অবস্থানরত ফিলিস্তিনিরাও প্রতিবাদমুখর হয়েছে। আরব অধ্যুষিত মুছাল্লাস, জালিল, নাকাব তো বটেই আরব ইসরাইলি মিশ্র অসংখ্য শহর গ্রামও বিক্ষোভে উত্তাল হয়েছে। ইসরাইলি বসতিস্থাপনকারী ও সেনাদের সাথে দফায় দফায় রক্তক্ষয়ী সংঘাত হয়েছে আরব যুবকদের।

রাজধানী তেলআবিবের মাত্র ১৫ কি.মি. দক্ষিণ পূর্বের শহর লুদ এ সবচেয়ে বেশি সংঘাত লক্ষ্য করা গেছে। শহরের মেয়র ইয়ার বেবাভো বলতে বাধ্য হয়েছেন, আমরা শহরের নিয়ন্ত্রণ পুরোপুরি হারিয়েছি। ইহুদি ও আরব বাসিন্দাদের মধ্যে রীতিমত গৃহযুদ্ধ শুরু হয়েছে। প্রধানমন্ত্রী নেতানিয়াহু শেষ পর্যন্ত জরুরি অবস্থা জারী করতে বাধ্য হয়েছেন। শহরের নিয়ন্ত্রণ পুনরুদ্ধার করতে পাঠাতে হয়েছে সীমান্ত বাহিনী।

সূত্র: আল জাজিরা ও সাসা পোস্ট

বিজ্ঞাপন
আগের সংবাদ৪৬ ধরনের পণ্য আমদানিতে থাকছে না শুল্ক-কর
পরবর্তি সংবাদযুদ্ধবিরতিতে বাধ্য হল ইজরাইল