দ্বিতীয় ধাপের পৌর নির্বাচনে আওয়ামী লীগের জয়-জয়কার

ফাতেহ ডেস্ক:

প্রথম ধাপের পৌরসভা নির্বাচনের মতো দ্বিতীয় ধাপের নির্বাচনেও আধিপত্য বজায় রেখেছেন আওয়ামী লীগের মেয়র পদপ্রার্থীরা। দ্বিতীয় ধাপে আজ শনিবার ৬০টি পৌরসভায় নির্বাচন হয়। এর মধ্যে ৫৮টি পৌরসভা নির্বাচনের ফলাফল পাওয়া গেছে। দুটি পৌরসভার দুটি কেন্দ্রে ফলাফল স্থগিত থাকায় সেখানে মেয়র পদের ফলাফল পাওয়া যায়নি।

৫৮টি পৌরসভার মধ্যে ৪৪টিতে আওয়ামী লীগের প্রার্থীরা নৌকা প্রতীক নিয়ে বেসরকারিভাবে মেয়র নির্বাচিত হয়েছেন। ছয়টি পৌরসভায় আওয়ামী লীগের বিদ্রোহী প্রার্থী, চারটিতে বিএনপির প্রার্থী, দুটিতে বিএনপির বিদ্রোহী প্রার্থী মেয়র পদে জয়ী হয়েছেন। একটি পৌরসভায় জাতীয় পার্টি ও একটিতে জাসদের প্রার্থী মেয়র পদে জয় পেয়েছেন। এ ছাড়া ভোটগ্রহণের আগেই চারটি পৌরসভায় মেয়র পদে জয়ী হন আওয়ামী লীগের প্রার্থীরা।

গতকাল সকাল ৮টা থেকে দেশের ৬০টি পৌরসভায় ইলেকট্রনিক ভোটিং মেশিনের (ইভিএম) মাধ্যমে ভোটগ্রহণ চলে। ভোটগ্রহণ করা হয় বিকেল ৪টা পর্যন্ত। নির্বাচনে কয়েকটি স্থানে ধাওয়া-পাল্টাধাওয়া, ভাঙচুর ও নির্বাচন বর্জনসহ কিছু বিচ্ছিন্ন ঘটনার মধ্য দিয়ে ভোটগ্রহণ শেষ হয়।

আওয়ামী লীগের যাঁরা জয়ী : আওয়ামী লীগের নৌকা প্রতীক নিয়ে মেয়র পদে জয়ী হয়েছেন- দিনাজপুরের বিরামপুরে অধ্যাপক মো. আক্কাস আলী, বগুড়ার সারিয়াকান্দিতে মতিউর রহমান, নওগাঁর নজিপুরে মো. রেজাউল কবির চৌধুরী, রাজশাহীর কাকনহাটে আতাউর রহমান খান ও ভবানীগঞ্জে আবদুল মালেক মণ্ডল, নাটোরের নলডাঙ্গায় মো. মনিরুজ্জামান মনির, গোপালপুরে রোকসানা মোর্ত্তজা লিলি ও গুরুদাসপুরে মো. শাহনেওয়াজ আলী, সিরাজগঞ্জ পৌরসভায় সৈয়দ আব্দুর রউফ মুক্তা, উল্লাপাড়ায় এস. এম. নজরুল ইসলাম ও রায়গঞ্জে মো. আব্দুল্লাহ আল পাঠান, পাবনার ঈশ্বরদীতে ইছাহক আলী মালিথা, ফরিদপুরে খ ম কামরুজ্জামান মাজেদ ও সাঁথিয়ায় মাহবুবুল আলম বাচ্চু, মেহেরপুরের গাংনীতে আহম্মেদ আলী, কুষ্টিয়া সদরে আনোয়ার আলী, কুমারখালীতে মো. সামসুজ্জামান ও মিরপুরে মোহা. এনামুল হক, ঝিনাইদহের শৈলকুপায় কাজী আশরাফুল আজম, বাগেরহাটের মোংলায় শেখ আব্দুর রহমান, মাগুরায় মো. খুরশীদ হায়দার টুটুল, ময়মনসিংহের মুক্তাগাছায় বিল্লাল সরকার ও ফুলবাড়িয়ায় গোলাম কিবরিয়া, নেত্রকোনার মোহনগঞ্জে লতিফুর রহমান রতন ও কেন্দুয়ায় মো. আসাদুল হক ভূঞা, কিশোরগঞ্জের কুলিয়ারচরে সৈয়দ হাসান সারওয়ার মহসিন, ঢাকার সাভারে আবদুল গনি, নরসিংদীর মনোহরদীতে আমিনুর রশিদ সুজন, শরীয়তপুরে পারভেজ রহমান, সুনামগঞ্জে নাদের বখত ও ছাতকে মো. আবুল কালাম চৌধুরী, মৌলভীবাজারের কুলাউড়ায় সিপার উদ্দিন আহমদ ও কমলগঞ্জে জুয়েল আহমদ, কুমিল্লার চান্দিনায় মো. শওকত হোসেন ভূইয়া, ফেনীর দাগনভূঞায় ওমর ফারুক খাঁন, নোয়াখালীর বসুরহাটে আবদুল কাদের মির্জা, চট্টগ্রামের সন্দ্বীপে মোক্তাদের মাওলা সেলিম, খাগড়াছড়িতে নির্মলেন্দু চৌধুরী, বান্দরবানের লামায় জহিরুল ইসলাম ও গাজীপুরের শ্রীপুরে মো. আনিছুর রহমান।

বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় চারজন জয়ী

ভোট নেওয়ার আগেই সিরাজগঞ্জের কাজিপুরে আবুল ইমাম মো. কামরান চৌধুরী, পাবনার ভাঙ্গুরায় মো. গোলাম হাসনাইন, নারায়ণগঞ্জের তারাবতে হাছিনা গাজী ও পিরোজপুর সদরে মো. হাবিবুর রহমান মালেক বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় মেয়র নির্বাচিত হন। তাঁরা সবাই আওয়ামী লীগের প্রার্থী ছিলেন।

আওয়ামী লীগের ছয় বিদ্রোহী প্রার্থী জয়ী

দিনাজপুরের বীরগঞ্জে পৌরসভায় মো. মোশাররফ হোসেন, কুড়িগ্রামের নাগেশ্বরীতে মোহাম্মদ হোসেন ফাকু, গাইবান্ধায় মতলুবর রহমান, রাজশাহীর আড়ানীতে মুক্তার আলী, সিরাজগঞ্জের বেলকুচিতে মো. সাজ্জাদুল হক রেজা ও টাঙ্গাইলের ধনবাড়ীতে মুহাম্মদ মনিরুজ্জামান বকল আওয়ামী লীগের মনোনয়ন না পেয়ে বিদ্রোহী হিসেবে মেয়র নির্বাচিত হয়েছেন।

বিএনপির চার প্রার্থী জয়ী

দিনাজপুর পৌরসভায় সৈয়দ জাহাঙ্গীর আলম, বগুড়ার সান্তাহারে তোফাজ্জল হোসেন, হবিগঞ্জের মাধবপুরে হাবিবুর রহমান মানিক ও নবীগঞ্জে ছাবির আহমদ চৌধুরী জয়ী হয়েছেন।

বিএনপির বিদ্রোহী জয়ী

বগুড়ার শেরপুরে মো. জানে আলম খোকা ও সুনামগঞ্জের জগন্নাথপুরে মো. আক্তার হোসেন বিএনপির মনোনয়ন না পেয়ে বিদ্রোহী হিসেবে মেয়র নির্বাচিত হয়েছেন।

জাতীয় পার্টির একজন জয়ী

গাইবান্ধার সুন্দরগঞ্জে জাতীয় পার্টির মো. আব্দুর রশীদ রেজা সরকার বেসরকারিভাবে মেয়র নির্বাচিত হয়েছেন।

জাসদের একজন জয়ী

কুষ্টিয়ার ভেড়ামারায় জাসদের আনোয়ারুল কবির টুটুল বেসরকারিভাবে মেয়র নির্বাচিত হয়েছেন।

দুটি পৌরসভায় ফল মেলেনি

কিশোরগঞ্জ পৌরসভা নির্বাচনে মেয়র পদে নৌকা প্রতীকে আওয়ামী লীগের প্রার্থী বর্তমান মেয়র মো. পারভেজ মিয়া এগিয়ে থাকলেও একটি ভোট কেন্দ্রের ফলাফল স্থগিত থাকায় চূড়ান্ত ফলাফল ঘোষিত হয়নি। কারণ বেসরকারি ফলাফলে প্রাপ্ত ২৮টি কেন্দ্রের মধ্যে ঘোষিত ২৭টি কেন্দ্রের ফলাফলে মো. পারভেজ মিয়া ৪৮৪ ভোটে এগিয়ে থাকলেও স্থগিত হওয়া ওয়ালী নেওয়াজ খান কলেজের পূর্ব তিনতলা ভবন কেন্দ্রের ভোটার সংখ্যা এক হাজার ৮৫২টি। তাই নির্বাচনে জয়-পরাজয় ওই কেন্দ্রের ফলাফলের ওপর নির্ভর করছে বলে জানিয়েছেন রিটার্নিং কর্মকর্তা মোহাম্মদ আশ্রাফুল আলম। এ ব্যাপারে নির্বাচন কমিশনের সিদ্ধান্তে পুনরায় নির্বাচনের পদক্ষেপ নেওয়া হবে।

ফরিদপুরের বোয়ালমারী পৌরসভারও একটি কেন্দ্রের ফল না পাওয়ায় মেয়র পদের ফলাফল পাওয়া যায়নি।

এর আগে কয়েকটি পৌরসভায় ককটেল বিস্ফোরণ, দুই পক্ষের মধ্যে সংঘর্ষ, ধাওয়া-পাল্টাধাওয়ার ঘটনা ঘটেছে। কেন্দ্র দখল, প্রকাশ্যে ভোট দেওয়া ও ভোটে বাধা দেওয়ার অভিযোগে বাগেরহাটের মোংলা, রাজশাহীর ভবানীগঞ্জ, পাবনার ঈশ্বরদী ও কিশোরগঞ্জের কুলিয়ারচর পৌরসভার বিএনপির প্রার্থী নির্বাচন বর্জন করেছেন। একই কারণে মেহেরপুরের গাংনী পৌরসভায় আওয়ামী লীগ প্রার্থী ছাড়া সব প্রার্থী ভোট বর্জনের ঘোষণা দেন।

ভোটগ্রহণের শেষে এক প্রতিক্রিয়ায় নির্বাচন কমিশনার মাহবুব তালুকদার সাংবাদিকদের বলেছেন, ‘চলমান পৌরসভা নির্বাচনকে অংশগ্রহণমূলক বলা যায় না। আজ শনিবার আমি সাভার পৌরসভার তিনটি ভোটকেন্দ্রের ১৮টি বুথ পরিদর্শন করি। দুপুর ১টা পর্যন্ত ওইসব ভোটকেন্দ্রে সাত হাজার ৩১১ জন ভোটারের মধ্যে এক হাজার ২৩২ জন ভোট প্রদান করেছেন। তিনটি বুথে আমি তিনজন বিরোধী দলীয় প্রার্থীর পোলিং এজেন্ট দেখতে পাই। কিন্তু অন্য কোথাও এজেন্ট ছিলেন না। এ ছাড়া সাভার পৌর এলাকায় আমি বিরোধীদলীয় প্রার্থীর কোনো পোস্টার দেখতে পাইনি। এমতাবস্থায়, এই নির্বাচনকে অংশগ্রহণমূলক বলা যায় না। যেকোনো নির্বাচন অংশগ্রহণমূলক না হলে তা সিদ্ধ হয় না। এ ছাড়া পৌরসভার নির্বাচনে ক্রমাগত সহিংসতা বেড়ে চলেছে। সহিংসতা ও নির্বাচন একসঙ্গে চলতে পারে না।’

পরে নির্বাচন কমিশনের জ্যেষ্ঠ সচিব মো. আলমগীর বলেছেন, ‘পাঁচ-সাতটি স্থানে বাদে আমাদের ৬০ পৌরসভার সব কেন্দ্রে সুন্দরভাবে ভোটগ্রহণ হয়েছে। প্রচুর ভোটার সেখানে ভোট দিয়েছেন। কিছু কিছু ক্ষেত্রে দুষ্কৃতিকারীরা ভোটকে বিতর্কিত করার চেষ্টা করে। তাদের উদ্দেশ্যই থাকে যে, সুষ্ঠু নির্বাচন যাতে না হতে পারে। সেটাকে ব্যর্থ করে দিয়ে, আমি বলব যে, ইসি এবং আইনশৃঙ্খলা বাহিনী আপনাদের সবার সহযোগিতায় সুন্দর একটি নির্বাচন সম্পন্ন করা সম্ভব হয়েছে। ৪টা পর্যন্ত ভোট হয়েছে, কিছু কিছু জায়গায় দেখা গেছে লাইনে দাঁড়িয়ে মানুষ এখনো ভোট দিচ্ছে (তখন সময় প্রায় ৬টা)। যারা ৪টার আগে লাইনে দাঁড়িয়েছিলেন, তাদের এখনো ভোটগ্রহণ চলছে। আমরা আশা করছি কোথাও কোথাও ৭০ ভাগ ভোট পড়বে, কোথাও তা ৮০ হবে। এভারেজ বলতে গেলে, ৭০ থেকে ৭৫ ভাগ ভোট পড়বে বলে আমি মনে করি।’

দেশের ৬০টি পৌরসভা নির্বাচনে আজ ভোট শুরু হয় সকাল ৮টা থেকে। ভোটের শুরুর পর কিছু পৌরসভায় ভোটকেন্দ্রে গোলযোগ দেখা দেয়।

গাইবান্ধা পৌরসভার সরকারি টেক্সটাইল স্কুলকেন্দ্রে দুই মেয়র পদপ্রার্থীর সমর্থকদের ধাওয়া-পাল্টাধাওয়া হয়েছে। এ ছাড়া ব্যালট পেপার ছিনতাই ও নৌকা প্রতীকের প্রার্থীর অফিস ভাঙচুরের ঘটনা ঘটে।

ঝিনাইদহের শৈলকুপা পৌরসভার এক নম্বর ওয়ার্ডের সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় কেন্দ্রে দুই মেয়র পদপ্রার্থীর সমর্থকদের মধ্যে সংঘর্ষ হয়েছে। প্রত্যক্ষদর্শীরা জানায়, দেশি অস্ত্রশস্ত্র নিয়ে দুই পক্ষ সংঘর্ষে জড়িয়ে পড়ে। এতে বেশ কয়েকজন আহত হয়। দুজনকে হাসপাতালে ভর্তি করা হয়।

ফেনীর দাগনভূঞার ৮ নম্বর ওয়ার্ডের গনিপুর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় কেন্দ্রে ককটেল বিস্ফোরণের ঘটনা ঘটে। এ ছাড়া কাউন্সিলর প্রার্থীদের মধ্যে ধাওয়া-পাল্টাধাওয়ার ঘটনা ঘটনা ঘটেছে।

নাটোরের লালপুরে ভোট চাওয়াকে কেন্দ্র করে প্রিজাইডিং কর্মকর্তার সঙ্গে বাকবিতণ্ডায় জড়িয়ে পড়েন আওয়ামী লীগপ্রার্থী রোকসানা মোর্ত্তজা লিলি।

মোংলা পৌরসভার নয়টি ওয়ার্ডের ১২টি কেন্দ্রে ইভিএম পদ্ধতিতে ভোট নেওয়া হয়েছে। তিন নম্বর ওয়ার্ডের চালনা বন্দর ফাজিল মাদ্রাসা কেন্দ্রে ভোট দিয়েছেন আওয়ামী লীগের প্রার্থী শেখ আবদুর রহমান। এর পর পরই ভোট দিয়েছেন বর্তমান মেয়র ও বিএনপির প্রার্থী মো. জুলফিকার আলী। তবে এর ঘণ্টা খানেক পরই কেন্দ্র দখল, প্রকাশ্যে ভোট দেওয়া ও ভোটে বাধা দেওয়ার অভিযোগে নির্বাচন বর্জনের ঘোষণা দেন বিএনপির প্রার্থী। একই অভিযোগে ভোট বর্জনের ঘোষণা দেন চারজন স্বতন্ত্র মেয়র পদপ্রার্থীসহ ১২ জন কাউন্সিলর প্রার্থী।

এ ছাড়া নির্বাচন বর্জনের ঘোষণা দিয়েছেন রাজশাহীর ভবানীগঞ্জ, পাবনার ঈশ্বরদী, কিশোরগঞ্জের কুলিয়ারচর পৌরসভার বিএনপির প্রার্থী। মেহেরপুরের গাংনী পৌরসভায় আওয়ামী লীগের প্রার্থী ছাড়া বাকি প্রার্থীরা ভোট বর্জন করেছেন।

বাকি পৌরসভাগুলোয় বড় ধরনের অভিযোগ ছাড়াই অনুষ্ঠিত হয়েছে ভোট। কুষ্টিয়া সদর, কুমারখালী, মিরপুর ও ভেড়ামারায় উৎসবমুখর পরিবেশে নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়েছে। সদর পৌরসভার সরকারি কলেজ কেন্দ্রে ভোট দিয়েছেন আওয়ামী লীগের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক মাহাবুব উল আলম হানিফ। নোয়াখালীর বসুরহাটে দীর্ঘ লাইনে দাঁড়িয়ে ভোট দিয়েছেন ভোটাররা।

এ ছাড়া সুনামগঞ্জ সদর, ছাতক ও জগন্নাথপুর পৌরসভা, কুড়িগ্রামের নাগেশ্বরী, কিশোরগঞ্জ সদর, বান্দরবানের লামা, বগুড়ার শেরপুর, সারিয়াকান্দি ও সান্তাহার, নারায়ণগঞ্জের তারাব, টাঙ্গাইলের ধনবাড়ী পৌরসভায় উৎসবমুখর পরিবেশে ভোট হয়েছে। তবে সাভার পৌরসভায় ভোটারের খুব একটা উপস্থিতি লক্ষ করা যায়নি।

বিজ্ঞাপন