ধরা পড়েছে বেফাকের মেশকাত জামাতের প্রশ্নফাঁসের ‘মূল হোতা’

বিশেষ প্রতিবেদক

অবশেষে ধরা পড়েছে বেফাকের চলতি বছরের মেশকাত জামাতের পরীক্ষার প্রশ্নফাঁসের মূল হোতা। তাঁর নাম মাহবুবুল আলম। ময়মনসিংহ সদরের হালিমা সাদিয়া মহিলা মাদরাসা নামের একটা মহিলা মাদরাসার শিক্ষক তিনি। ময়মনসিংহের রেজায়ে মাওলা মহিলা মাদরাসায় বেফাকের পরীক্ষাকেন্দ্রে এ বছর নেগরানে আলার দায়িত্ব পেয়েছিলেন মাহবুবুল আলম। আর এই সুযোগকে কাজে লাগিয়ে প্রশ্নফাঁসের মতো চরম খেয়ানতিতে লিপ্ত হয়েছিলেন তিনি।

প্রশ্নফাঁস তদন্তের জন্য গঠিত বেফাক ও হাইয়ার পাঁচ সদস্য বিশিষ্ট কমিটি তদন্ত করে এ হোতাকে বের করেছে।

নামপ্রকাশে অনিচ্ছুক বেফাকের বিশ্বস্ত একটি সূত্র এ তথ্য নিশ্চিত করেছে ফাতেহ টোয়েন্টি ফোর ডটকমকে।

সূত্রটি জানায়, মেশকাতের ফাঁস হওয়া প্রশ্নের কপিটির কোড নম্বর অনুসরণ করে রেজায়ে মওলা মহিলা মাদরাসা-কেন্দ্রের নেগরানে আলা মাহবুবুল আলমকে শনাক্ত করে তদন্ত কমিটি। গত ১৬ এপ্রিল মঙ্গলবার তদন্ত কমিটির বিশেষ টিম মাহবুবুল আলমকে ময়মনসিংহ থেকে পাকড়াও করে বেফাক অফিসে নিয়ে আসে। অফিসে এনে জিজ্ঞাসাবাদের পর প্রশ্নপত্র ফাঁসের মূল ঘটনা তাঁর মাধ্যমেই সংঘটিত হয়েছে বলে তিনি স্বীকারোক্তি দেন।

স্বীকারোক্তিতে মাহবুবুল আলম জানান, পরীক্ষা শুরুর আগের দিন বেফাকের ময়মনসিংহ জোন থেকে রেজায়ে মওলা মহিলা মাদরাসার প্রশ্নপত্র নেগরানে আলা হিসেবে তিনি সংগ্রহ করেন। প্রশ্নপত্র সংগ্রহের পর নিয়ম হলো প্রশ্নপত্র নিয়ে সরাসরি পরীক্ষাকেন্দ্রে চলে যাওয়া। কিন্তু মাহবুবুল আলম তা না করে প্রশ্নপত্র নিয়ে নিজের মাদরাসা হালিমা সাদিয়া মহিলা মাদরাসায় চলে যান। সেখানে মাদরাসার এক শিক্ষিকার মাধ্যমে পরীক্ষার আগের দিন প্রশ্নপত্রের প্যাকেট খুলে একটি করে কপি রেখে দেন। এবং এই কপিগুলোই পরবর্তী সময়ে তিনি ফাঁস করেন। এর সঙ্গে আরও বেশ কয়েকজনও জড়িত রয়েছেন এবং সবাই মিলে টাকার বিনিময়ে প্রশ্নপত্র ফাঁস করেছেন বলে জানান মাহবুবুল আলম।

স্বীকারোক্তিতে তাঁর সঙ্গে জড়িত অন্যান্যদের নাম বললেও প্রমাণ না থাকায় ফাতেহ টোয়েন্টি ফোরের কাছে সেই নামগুলো উল্লেখ করতে রাজি হয়নি বেফাকের বিশ্বস্ত ওই সূত্রটি। তবে সূত্রটি জানিয়েছে মাওলানা সাদ অনুসারী ও বেফাক-বিদ্বেষী ছোট্ট একটি মাদরাসা-বোর্ডের লোকজন আছেন এই তালিকায়।

সূত্রটি আরও জানায়, মাহবুবুল আলমকে পাকড়াও করে আনার পর বেফাকের খাস কমিটি করণীয় নির্ধারণে একাধিকবার বৈঠকে বসেছে। তাঁর বিরুদ্ধে আইনের আশ্রয় নেওয়া হবে কি-না, প্রথমে এ ব্যাপারে আলোচনা হয়। সিদ্ধান্ত হয় আইনজীবীদের সঙ্গে কথা বলে ব্যবস্থা নেওয়ার। কিন্তু উঁচু পর্যায়ের একাধিক আইনজীবীর সঙ্গে কথা বললে আইনজীবীরা পরামর্শ দেন, উনি যেহেতু আলেম, তাই ব্যাপারটা ঘরোয়াভাবে মিটমাট করে নিতে। তাছাড়া বেফাকের হাতে যে প্রমাণ রয়েছে তা দিয়ে তাঁকে দোষী সাব্যস্ত করা যাবে না। আইনের ফাঁক-ফোঁকড় দিয়ে নিজেকে নির্দোষ প্রমাণের যথেষ্ট সুযোগ আছে তাঁর।

আইনজীবীদের এ পরামর্শ পুনর্মূল্যায়নে আজ সকালে আবারও বৈঠক বসে খাস কমিটির। কিন্তু খাস কমিটি এ ব্যাপারে কঠোরতা প্রদর্শন করে মাহবুবুল আলমকে পুলিশে সোপর্দ করার সিদ্ধান্তে প্রথম পর্যায়ে অনড় থাকে। কিন্তু বৈঠকের শেষ দিকে ময়মনসিংহের বড় মসজিদের ইমাম ও বেফাকের সহসভাপতি মাওলানা আবদুল হককে মাধ্যম ধরে মাহবুবুল আলমের পিতা এবং শ্বশুর মাহবুবুল আলমের সমস্ত অপরাধ স্বীকার করে বোর্ডের কাছে ক্ষমা চান এবং তাঁর বিরুদ্ধে আইনিব্যবস্থা না নেওয়ার আবেদন করেন।

খাস কমিটি তাঁদের এই আবেদন বিবেচনায় নিয়ে ৩০০ টাকার স্টাম্পে মাহবুবুল আলমের অপরাধের লিখিত স্বীকারোক্তি নেন। এবং নিজের কৃত ভুলের জন্য ক্ষমাপ্রার্থনাপূর্বক আগামীতে এ ধরনের অপরাধ আর করবে না মর্মে একই স্ট্যাম্পে জবানবন্দী গ্রহণ করেন। স্ট্যাম্পে মাহবুবুল আলমের পিতা, শ্বশুর, বেফাক সহসভাপতি মাওলানা আবদুল হক এবং বেফাকের যুগ্মমহাসচিব মুফতি নুরুল আমীন জামিন হিসেবে সাক্ষর করেন।

পরে খাস কমিটি মাহবুবুল আলমকে এই মর্মে নিজেদের পাকড়াও থেকে মুক্ত করে দেয় যে, ময়মনসিংহের স্থানীয় ওলামায়ে কেরাম এবং বেফাক কর্তৃপক্ষ পরবর্তীতে ঘরোয়াভাবে তাঁর বিচার করবে। আদালতে তাঁর ব্যাপারে কোনো মামলা করা হবে না।

এ বিষয়ে প্রশ্নফাঁস তদন্ত কমিটির বক্তব্য জানতে চেয়ে তদন্ত কমিটির একাধিক সদস্যের মোবাইল ফোনে বেশ কয়েকবার যোগাযোগ করা হলে এ রিপোর্ট লেখা পর্যন্ত কেউ কল রিসিভ করেননি।

এদিকে বেফাকের বিশ্বস্ত ওই সূত্রটি জানিয়েছে, প্রশ্নফাঁসের মূলহোতা কেবল মাহবুবুল আলমই নয়, আরও আছেন। তাঁদের খুঁজে বের করতে তদন্ত কমিটি কাজ করছে। তাছাড়া হাইআর দাওরায়ে হাদিসের প্রশ্নফাঁসকারীদেরও ইতিমধ্যে চিহ্নিত করেছে তদন্ত কমিটি। তথ্যপ্রমাণ জোগাড় করে খুব শিগগিরই তাদের পাকড়াও করা হবে।

কিন্তু পাকড়াও করে মাহবুবুল আলমের মতো যদি তারাও ছাড়া পেয়ে যায়, তবে প্রশ্নফাঁসের যে অসৎ প্রবণতার চর্চা শুরু হয়েছে কওমিশিক্ষাধারায়, আগামীতে কি তা রোধ করা যাবে? সচেতন মহলের অনেকেরই রয়েছে এমন প্রশ্ন।