ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানগুলোতে চাঁদা কালেকশন : একটি নির্মোহ আলোকপাত

মাওলানা সাবের চৌধুরী

ভূমিকা
কিছু কিছু বিষয় আমাদের মাঝে বার বার আলোচিত হয়। কিন্তু দুঃখজনক হলো—বেশির ভাগ লোকই এসব বিষয়ে টুকটাক আলোচনা করে পাশ কাটিয়ে যান। অথবা পক্ষে বা বিপক্ষে একপেশে বক্তব্য উপস্থিত করেন। একটা বিষয়কে সামগ্রিক দিক থেকে তেমন কেউই খোলাসা করতে চান না। তবে, ইদানীং এ ব্যাপারটিতে একটা পরিবর্তন দেখা যাচ্ছে। আমি বলছি, এটা অবশ্যই আশা জাগানিয়া। আলোচনা-তর্ক-ঝগড়া সবকিছু হোক। এভাবেই তো জট খোলে।

বিশেষ করে ইদানীং বিভিন্ন জনের লেখা-জোখায় মাদরাসা-মসজিদ-মক্তবের জন্য চাঁদা কালেকশনের বিষয়টা ঘুরে ফিরে আলোচিত হচ্ছে। বড় বড় লেখাও আসছে। ব্যক্তিগতভাবে এতে আমি খুবই আনন্দিত। সে-সূত্র ধরে আমিও অংশ নিলাম। দাবি করছি না যে, আমি সামগ্রিক আলোচনা করতে পারবো এবং এ বিষয়ে চূড়ান্ত কোনো সিদ্ধান্ত পেশ করবো। বরং, বিষয়টিতে আমার চিন্তাটিও হাজির রাখলাম, এই হলো কথা। আলোচনা চলুক।

শুরুতে কিছু কথা বলে রাখি
আমি দেশজুড়ে প্রচলিত চাঁদা কালেকশনের অনেকগুলো পদ্ধতির পক্ষে নই। একে অসম্মানজনক এবং ক্ষতিকর মনে করি। এর জন্য আমাদের মধ্যে সচেতনতা তৈরী করা যেমন জরুরি, তেমনি প্রত্যেকের সামর্থ অনুযায়ী মাঠপর্যায়ে উদ্যোগ নেওয়াও প্রয়োজন। অবস্থার পরিবর্তনের জন্য শুধুই দ্রোহ এবং আঘাতের মানসিকতা বিশৃঙ্খলাই তৈরী করে, সর্বদা, সর্বত্র এবং সর্বক্ষেত্রে। অর্থাৎ, কাজ যখন নিজের মধ্যে করবেন, তখন আপনাকে পজেটিভ ভঙ্গিতেই করতে হবে। অথচ, আঘাতের মানসিকতা এবং দ্রোহের প্রকাশই আমাদের মধ্যে বেশি দেখা যায়।

তবে, এটা সত্য–বিলকুল চাঁদা কালেকশন বন্ধ করা যাবে না, এ অর্থে যে, এ থেকে একদম বিমুখ হয়ে চলা আমাদের জন্য সম্ভব নয়। কেন সম্ভব নয়, সামনে বলছি।

প্রস্তাবনা
আমি মনে করি এই সংকটটির ব্যাপারে সঠিক সমাধানে যেতে হলে, আগে আমাদের জন্য বেশ কয়েকটি কাজ করা জরুরি। যেমন–
• সংকট না থাকার অবস্থাটি কী?
• এ সংকটের পেছনের ইতিহাস কী?
• সে ঐতিহাসিক বাস্তবতার আলোকে বিকল্প কী হতে পারতো?
• সংকটের উদ্ভবটি কীভাবে হলো?
• সংকটগুলো কী কী?
• এর পেছনে দায়ী কে বা কারা?

এভাবে যখন একটা সংকটকে মূল্যায়ন ও বিশ্লেষণ করবো, তখন এর ভেতর থেকে তূলণামূলক ভালো সমাধানটি বেরিয়ে আসবে, অর্থাৎ, বেরিয়ে আসবে যে, আমাদের এখন কী করা দরকার।

সংকট না থাকার অবস্থাটি
একটা শিক্ষাব্যবস্থা মূলত একটি জাতিকে নির্মাণ করে। এ জন্য শিক্ষা, বলতে গেলে, রাষ্ট্রের প্রতিটি জনগণের মৌলিক অধিকার। অন্যথায় শিক্ষাহীনতায় বা ভুল শিক্ষায় ভুল জাতি নির্মিত হবে। তাই, এর সার্বিক ব্যবস্থাপনার কাজটি জাতির পরিচালক শাসনযন্ত্রকেই করতে হয়। তারা জাগতিক বিষয়াশয়সংশ্লিষ্ট শিক্ষার ব্যবস্থা যেমন করবে, তেমনি সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিয়ে ধর্মীয় শিক্ষার ব্যবস্থা এবং এর সার্বিক আয়োজনও তারাই করবে। সমস্ত খরচ বহন করবে রাষ্ট্রের বাইতুল মাল। প্রতিষ্ঠানের পরিচালক, শিক্ষাসচিব ও শিক্ষকগণ শুধু পড়াবেন, শিষ্টাচার শিখাবেন এবং ধর্মীয় বিষয়গুলোতে দিকনির্দেশনা ও গবেষণার কাজ করবেন। চাঁদা কালেকশনের কোনো অপশনই নেই।

কিন্তু, সমস্যা হলো বর্তমানে আমাদের দেশে ইসলামি বাইতুল মাল নেই।

এই সময়ে আমরা একটি জাতিরাষ্ট্রে বসবাস করছি। শরীয়ত অ-সমর্থিত বিভিন্ন কার্যপদ্ধতি সর্বত্র প্রতিষ্ঠিত হয়ে গেছে। কিন্তু এদেশের বেশির ভাগ মানুষ ধর্মপ্রাণ এবং ধর্মীয় শিক্ষা তাদের মৌলিক দাবির অন্তর্ভুক্ত।

সুতরাং, প্রতিষ্ঠিত এ পদ্ধতিটি বিপুল মানুষের পছন্দ না হলেও তারা যেহেতু দেশের সমস্ত নাগরিকের ন্যায্য দাবি ও অধিকার আদায়ের দায় নিয়ে ক্ষমতায় বসেছেন, তাই জনগণের এ অধিকারটিও নির্বিঘ্নে আদায় করার জন্য এ শাসনযন্ত্র নীতিগতভাবে অর্থাৎ আইনগতভাবে বাধ্য।

অতএব, মূল অবস্থাটি হওয়া দরকার ছিলো এমন—হয় উলামায়ে কেরামের সমন্বয়ে দেশব্যাপী সম্পূর্ণ ইসলামি পন্থায় একমুখী শিক্ষাব্যবস্থা কার্যকর করবেন; অথবা, অন্তত, ইসলামপন্থীদের জন্য আলাদা ধর্মীয় শিক্ষাব্যবস্থার আয়োজন করবেন এ অর্থে যে, তারা সবধরণের পৃষ্ঠপোষকতা করবেন; কিন্তু সিলেবাস, পদ্ধতি, বিষয়, কার্যক্রম ইত্যাদি নির্ধারণ ও এসবের পরিচালনা করবেন উলামায়ে কেরাম। তখনও উলামায়ে কেরামকে চাঁদা কালেকশনের কাজটি করতে হতো না। ন্যায্য ও বৈধ অধিকারে পাওয়া শক্তি নিয়ে নির্বিঘ্নে সম্মানের সাথে একাডেমিক কাজটি করতে পারতেন।

এ সংকটের পেছনের ইতিহাস
সংক্ষেপের জন্য আমি শুধু আমাদের বাংলাদেশ নিয়েই আলোচনা করতে চাই, এবং নিকট অতীত ধরে এগোতে চাই। তো, আমরা দেখি—আমাদের ইসলামি বাইতুল মাল নেই। এরপর বৃটিশ শাসনামলে আমাদেরকে আমাদের এ ন্যায্য অধিকারটি দেওয়া হয়নি এবং দেওয়ার প্রশ্নও আসে না।

এরপর পাকিস্তান আমলেও পাইনি। বাংলাদেশ স্বাধীন হওয়ার পরও পাইনি। কোনো সরকারই আন্তরিকতার সাথে আমাদের এ অধিকারটি নিয়ে, এমনকি ভেবেছে, এমন কোনো লক্ষণও দেখা যায়নি।

অবশ্য কখনো আদায় করতে চেয়েছে; কিন্তু তা নির্বিঘ্ন ছিলো না। ফলে বাধ্য হয়েই আমাদেরকে সরে আসতে হয়। তো, আদায় নির্বিঘ্ন না করার অর্থ আদায় না করা। বরং, উল্টো সর্বদাই একে বিনষ্ট ও প্রতিরোধ করতে চেষ্টা করা হয়েছে। ভুল পথে পরিচালিত করার জন্য বারবার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে এবং মাঠপর্যায়ে দমন-পীড়ন চালানো হয়েছে।

বিকল্প কী হতে পারতো?
পুরো জাতি-কেন্দ্রিক একটি শিক্ষাব্যবস্থা মানে বিশাল ব্যাপার। এর আয়োজন সহজে করতে পারে কেবল সরকারক্ষমতা। কিন্তু তারা যখন ন্যায্যভাবে করে না; উল্টো আক্রমণ করে এর বিনাশ করতে চায়, তখন স্বাভাবিকভাবেই এটি নির্মূলতার দিকে ধাবিত হয়।

এদিকে, ধর্মের একাডেমিক চর্চা না থাকলে এবং ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানগুলো উপস্থিতহীন হলে কী হবে? ঈমান ও ইসলাম সমাজ থেকে স্রেফ মিটে যাবে। অথচ ঈমান ও ইসলাম হলো একজন মুসলিমের জন্য সবকিছুর চেয়ে দামি। এমন, যে, এটা ছাড়া সবকিছু নিষ্ফল। সুতরাং ইসলাম ও ঈমানহীনতা বিরাট এক সমস্যা।

প্রশ্ন হলো—সমস্যাটা কার? বৃহত্তর মুসলিম সমাজের।

তো, ইসলামি শিক্ষা ও এর কার্যক্রম জারি রাখা, যেভাবেই হোক, মুসলিম সমাজের প্রতিটি সদস্যের ব্যক্তিগত দায়িত্ব। একা উলামায়ে কেরামের দাযিত্ব না। কারণ, তারা মুসলিম সমাজের ক্ষুদ্র একটা অংশ; সবটুকু না।

অতএব, উলামায়ে কেরামসহ প্রতিটি সদস্যের উচিত ছিলো নিজস্ব অর্থায়নে ইসলামি প্রতিষ্ঠানগুলো গড়ে তোলা। এর পরিচালনার জন্য যোগ্য লোকদেরকে বাছাই করে তাদের জন্য সবকিছু সাজিয়ে দেওয়া।

কিন্তু দুঃখজনক বাস্তবতা হলো সমাজের বেশিরভাগ, বলতে গেলে প্রায় সকল মানুষ এ ব্যাপারে গাফেল থেকেছে, সর্বদা, সর্বত্র। বিশেষ করে বিত্তশালী অংশটি একে কখনো দায়িত্ব মনে করে এগিয়ে আসেনি। যারা করতে চেয়েছে তারা খুবই অল্পসংখ্যক এবং অর্থসঙ্গতিহীন। এবং বিষয়টি এমন নয় যে, এ পরিস্থিতি অতীতে একসময় ছিলো; এখন আর নেই। না। এটি সর্বদা চলমান একটি বাস্তবতা। ফলে ইসলামের একাডেমিক চর্চা সবসময়ই সীমাহীন প্রতিকুলতার মুখোমুখি হয়েছে।

সংকটের উদ্ভব
কিন্তু ইসলামের একাডেমিক চর্চাটি তো টিকিয়ে রাখতে হবেই। উলামায়ে কেরাম বসে থাকতে পারেন না। থাকেনও নি। তারা অল্পসংখ্যকের সহায়তায় হাতের কাছে যা ও যারা আছে তা ও তাদের দিয়ে শুরু করেছেন। তারা পুরো শিক্ষাব্যস্থার দায়িত্ব নেওয়া সম্ভব নয়; এ তো বিশাল ব্যাপার। টিকে থাকাই যেখানে মুশকিল, সেখানে এটি শাকের উপর আটি নয়; রীতিমত বিশাল আকৃতির দশতলা বিল্ডিং।

এমনকি শুধু ধর্মীয় সেক্টরটিও অনেক বিশাল। এমন সঙ্গতি নিয়ে এতো বিশাল একটি ব্যাপার গড়ে তোলা অসম্ভবই। কিন্তু উলামায়ে কেরাম হাল ছাড়েননি। তারা মানুষের দ্বারে দ্বারে ঘুরেছেন। বুঝিয়েছেন। সমর্থন ও সহযোগিতা আদায় করেছেন। ভদ্র ও সম্মানজনকভাবে তাদের থেকে অর্থ সংগ্রহ করেছেন। কিছু মানুষ সঙ্গ দিয়েছে। বিপুল মানুষ মুখ ফিরিয়েছে। উপহাস ও বিরোধিতা করেছে। ফলে একে কেন্দ্র করে শক্তিশালী কোনো কেন্দ্র গড়ে ওঠেনি। চেইন অব কমান্ড আসেনি। যে যেখানে পারে সামর্থ অনুযায়ী এ কাজ করেছেন। ফলে শন ও টিনের ঘর। দরজা ভাঙ্গা। চাল ফুটো। জানালা নেই। খাবার নেই। শিক্ষাসামগ্রী নেই। অভিজাত পাড়ায় এর আবেদন নেই। আরো আরো নেই নেই।

এটা একটা বাস্তবতা। আমি মনে করি বর্তমানে উলামা সমাজ ও মাদরাসা-মসজিদ-কেন্দ্রিক যে বিশেষ সমস্যাগুলো দেখা দিয়েছে, এগুলো সে বাস্তবতারই আবশ্যকীয় প্রতিক্রিয়া। এরকম অন্যতম একটি সমস্যা হলো যত্রতত্র এবং যাচ্ছেতাইভাবে চাঁদা কালেকশন। শুরু থেকেই বৈরী পরিস্থিতির কারণে সর্বত্র একটা চেতনা ছিলো—যার যেভাবে যেখানে সুযোগ হয় মাদরাসা-মক্তব-মসজিদ গড়ে তোলো। জনগণকে কাছে ভিড়াও, কাজে লাগাও। এদিকে চেইন অব কমান্ড নেই। কেন্দ্রীয় কোনো নিয়ন্ত্রক শক্তি নেই। সুতরাং, এ কাজে একসময় যে বিশেষ কিছু বিশৃঙ্খলা দেখা দেবে, তা জানা কথা এবং দুঃখজনক রকমের স্বাভাবিক।

সংকট
মৌলিকভাবে মহৎ কোনো কাজের জন্য চাঁদা কালেকশন মোটেও খারাপ কিছু নয়। ধর্মীয় দৃষ্টিকোণ থেকেও নয়। স্বয়ং রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম অনেকবার অনেকভাবে এ কাজ করেছেন। সাহাবায়ে কেরাম করেছেন। এবং মহৎ কাজে অর্থ ব্যয় করার জন্য কুরআন ও হাদীসে অসংখ্য বক্তব্য রয়েছে। এবং দানগ্রহীতার আচরণ কী হওয়া উচিত, দানকারীর আচরণ কী হওয়া উচিত, কীভাবে কোথায় কোথায় দান করা উচিত—ইত্যাদি বিষয়ে বিস্তারিত দিকনির্দেশনা রয়েছে। যারা অর্থসংগ্রহের কাজে অংশগ্রহণ করে তারা বিশেষ সম্মানের পাত্র। পুরো সমাজ তাদের প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রদর্শন করা তাদের একান্ত দায়িত্ব।

এমনিভাবে, সামাজিক দৃষ্টিকোণ থেকেও একে অত্যন্ত শ্রদ্ধা ও সম্মানের দৃষ্টিতে মূল্যায়ন করা হয়। এবং আমরা দেখি মাদরাসা-মসজিদ-কেন্দ্রিক ছাড়া অন্যান্য নানা বিষযে প্রতিদিন এ অর্থ সংগ্রহের কাজ করা হয়। ব্যক্তি-উদ্যোগে, বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের উদ্যোগে, এমনকি রাষ্ট্রিয় উদ্যোগে চাঁদা কালেকশনের কাজ করা হয়। আরো এমনকি বাংলাদেশের সরকার বহির্বিশ্বে গিয়েও এ কাজ করে থাকেন। এমন উদাহরণ অসংখ্য। সমাজের সর্বস্তরের লোকজন এ কাজকে সম্মানের দৃষ্টিতে দেখে থাকে।

এমনিভাবে, ধর্মীয় প্রতিষ্ঠান ও ওয়াজ-মাহফিলসহ বিভিন্ন বিষয়াশয়ে সাধারণ মানুষ অর্থ সংগ্রহ করে থাকে। উলামায়ে কেরামেরও বড় একটা অংশ নিজের ব্যক্তিত্ব বজায় রেখে মানুষকে বাস্তবতা বুঝিয়ে সম্মানের সাথে এ কাজ করছেন। এগুলোকে কেউ খারাপ চোখে দেখে না।

সমস্যাটা তাহলে কোন জায়গায়? কাদের সাথে?

এটাই হলো সংকটের মূল জায়গাটি। সমস্যাটি হলো মাদরাসা-মক্তব-মসজিদ-কেন্দ্রিক অর্থ সংগ্রহের কিছু পদ্ধতি যখন এগুলো করেন আলেম, মাদরাসার ছাত্র বা দাড়িটুপিওয়ালা কেউ। যেমন–
• রশিদ বই নিয়ে বিভিন্ন যানবাহনে একজন ফকির যেমন ভিক্ষা করে সেভাবে কালেকশন করা।
• বস্তা নিয়ে গ্রামের মানুষের দুয়ারে দুয়ারে ধান-চাল তোলা।
• কুরবানির চামড়া কালেকশন করা।
• ওয়াজ-মাহফিল করে মানুষের কাছে বিগলিতভাবে অনুনয়-বিনয় করে চাঁদা তোলা।
• অবৈধ টাকার মালিকদেরকে তোয়াজ করে সহযোগিতা নেওয়া।
• শিল্পপতিদের দুয়ারে গিয়ে অসহায় সাহায্যপ্রার্থীর মতো আচরণ করা।
• যাকাত-ফিতরা-মান্নতের টাকা চেয়ে পোস্টারিং ও লিফলেট বিতরণ করা।
• মোড়ে মোড়ে মাইক লাগিয়ে টাকা ওঠানো।
• বাজারে দোকানে দোকানে গিয়ে পাঁচ-দশ-একশ টাকা করে ওঠানো।
• এসব কাজে কোমলমতি ছোট ছোট শিশু-কিশোরদেরকে ব্যবহার করা। ইত্যাদি।

এগুলোকে বর্তমানে খুব নীচু নজরে দেখা হয়। ভদ্রশ্রেণীর মানুষ এসব দেখে মাদরাসা-মক্তবের ব্যাপারে খারাপ ধারণা গ্রহণ করেন, এভাবে সমাজের মানুষের মনে মাদরাসা-কেন্দ্রিক একটি অসঙ্গত আবহ প্রতিষ্ঠিত হয়ে গেছে। এটা অত্যন্ত অনাকাঙ্ক্ষিত ও দুঃখজনক পরিস্থিতি। এই সমস্ত কাজ থেকে বেরিয়ে আসার সময় হয়েছে। কিন্তু এখানে একটা বিষয় লক্ষ্যণীয়—

সংকটের জন্য দায়ী কারা?
এ সমস্যাগুলো তৈরী হলো কেন? এর দায় কার? আগেই বলা হয়েছে—বাংলাদেশের বৃহত্তর মুসলিম সমাজের। রাষ্ট্রীয় অক্ষমতার পরিপ্রেক্ষিতে বিশেষভাবে এ দায় আসে মুসলিম সমাজের ধনিক শ্রেণীটির উপর। তারা যখন নিজেদের ব্যক্তিগত দায়িত্ব আদায়ে উন্নাসিকতা দেখিয়েছেন, তখন উলামায়ে কেরাম বিবেকের তাড়নায় এবং দীনি দায়বোধ থেকে সম্পূর্ণ ব্যক্তিগত উদ্যোগে সমাজের মুষ্টিমেয় দুর্বল অংশটিকে নিয়ে শিক্ষার এ আন্দোলনকে এগিয়ে নিয়ে গেছেন। নানা সীমাবদ্ধতার সাথে প্রতিনিয়ত লড়াই করে করে টিকে থেকে ঈমান ও ইসলামের একাডেমিক চর্চাকে ধরে রেখেছেন।

হ্যাঁ, বিত্তশালীদের অংশগ্রহণও ছিলো; কিন্তু, তা যথেষ্ট পরিমাণে ছিলো না, সঠিক ভঙ্গিতে ছিলো না। এ জন্য পুরো জাতি উলামায়ে কেরামের প্রতি সবিনয় কৃতজ্ঞ থাকা উচিত, সর্বদা।

তবে, উলামায়ে কেরামকে সর্বদা একটা অক্ষমতার ভেতর থেকে কাজ করতে হয়েছে। এইসব সীমাবদ্ধতার কারণে কেন্দ্রীয় শক্তি তৈরী হয়নি। শৃঙ্খলা ও পরিকল্পিত ব্যবস্থা আসেনি। সুতরাং, এসব থেকে আবশ্যকীয়ভাবে এই সমস্যাগুলো তৈরী হয়েছে।

যারা এখন বিরূপ মনোভাব প্রদর্শন করছেন, তারা কি নিজেদের এ দায়বোধকে স্বীকার করে নাক উঁচা করেন?

কেউ বলতে পারেন, এখানে কি উলামায়ে কেরামেরও কোনো দায় নেই? তারা কি চাইলে নিজেদের মধ্যে অন্তত শিক্ষাকেন্দ্রিক নির্মোহ একটি প্লাটফর্মে ঐক্যবদ্ধ হতে পারতেন না? পারস্পরিক আলোচনার ভেতর দিয়ে সমস্যাগুলো চিহ্ণিত করে সমাধানের পথে এগুতে পারতেন না? তারা তো যথেষ্ট সময় পেয়েছেন।

তো, সরল স্বীকারোক্তি হলো—তাদের দায় অবশ্যই আছে এবং এটা দুঃখজনক। কিন্তু একটা বাস্তবতা কী জানেন? সমাজের একটা অংশ যখন সামাজিক, রাজনৈতিক ও রাষ্ট্রীয় নিগ্রহের শিকার হয় তখন তাদের সামনে নানা সংকট ও সীমাবদ্ধতা আসে। ফলে এ থেকে সেই সমাজের ভেতর একটা অস্থিরতা, বিক্ষিপ্ততা, বিশৃঙ্খলা এবং অনৈক্য আসে। এটা আসবেই। এর ভেতর দিয়েই শুদ্ধতা ও ন্যায়ের দিকে এগিয়ে যেতে হয়। কিন্তু, এটা আপনার অন্যায় ও অশুদ্ধতাকে বৈধতা দেয় না।

আমাদেরকে যা করা উচিত
• অন্তত শিক্ষাকে কেন্দ্র করে দেশব্যাপী একটা ঐক্য গড়ে তোলা।
• মাদরাসা-শিক্ষাব্যবস্থার ভেতরগত নানা দুর্বলতাগুলো কাটিয়ে ওঠা।
• উলামায়ে কেরামের নিজেদের ভেতরে নিজেদের দায়বোধকে জাগ্রত করা এবং সর্বত্র একটা সচেতনতা সৃষ্টি করা।
• সাধারণ জনগণকে ইসলামি শিক্ষার গুরুত্ব ও এ ব্যাপারে তাদের অতীতের দায় এবং বর্তমানের দায়িত্বের কথা কথা মনে করিয়ে পরিবেশকে এমন করার চেষ্টা করা যেন তারা নিজেরা উদ্যোগী হয়ে এসব কাজ আঞ্জাম দেওয়ার জন্য স্বেচ্ছায় এসে উলামায়ে কেরামের কাছে উপস্থিত হয়।
• কালেকশনের অসম্মানজনক পথগুলো এড়িয়ে সম্মানজনকভাবে মানুষকে এগুলোর সাথে জড়িত করা।
• যদি সম্ভব হয় তাহলে মাদরাসার স্থায়ী আয়ের ব্যবস্থা করা।
• বর্তমানে আরেকটা সুযোগ তৈরী হয়েছে—এখন মানুষ সঠিক দীনি শিক্ষার জন্য টাকা-পয়সা খরচ করতে একান্ত সম্মত। এ জন্য ছাত্রদের থেকে উপযুক্ত টাকা গ্রহণ করে তা দিয়ে মাদরাসা পরিচালনার চেষ্টা করা।

মনে রাখতে হবে
একটা সমস্যা যখন কোনো একটি প্রতিষ্ঠানে দেখা দেয় বা কোনো অফিসে, তখন এর সমাধান তুলনামূলক অনেক সহজ। কারণ, এটি শুধুমাত্র মুষ্টিমেয় কিছু মানুষের সাথে জড়িত। কিন্তু একটা সমাজ মানে বিশাল ব্যাপার। এ জন্য কোনো সমস্যা যখন পুরো একটি সমাজকে কেন্দ্র করে সৃষ্টি হয়, তখন এর সমাধান করাটি খুবই জটিল। তার উপর যখন সমাধানকারীদের হাতে কোনো চেইন অব কমান্ড থাকে না, সামর্থের স্বল্পতা থাকে এবং নানা অক্ষমতা ও সীমাবদ্ধতা থাকে, তখন তো তা জটিলতর। এজন্যই মুজাদ্দিদ বা সমাজ সংস্কারক মহামানবের মর্যাদা পান।

কেউ বলতে পারেন, সে-ই তো আপনি এগুলো বাদ দেওয়ার কথাই বললেন, তাহলে এতক্ষণ এত কথা না বলে এগুলো শুরুতেই বলে দিলে পারতেন। আপনার এই কথায় আমার আপত্তি আছে। কারণ, পেছনে উল্লেখিত বাস্তবতাগুলো সামনে রাখলে উদ্ভূত সমস্যাগুলোকে সঠিক ভঙ্গিতে গ্রহণ করতে পারবো এবং সঠিক দৃষ্টিকোণ থেকে মূল্যায়ন করতে পারবো। তখন সমাধান হিসেবে দেওয়া আমার বক্তব্যের শব্দব্যবহারে পরিবর্তন আসবে এবং সঠিক পন্থায় আমাদের কর্মকৌশল নির্ধারিত করা যাবে। পারস্পরিক বোঝাপড়ার জন্য এবং কোনো সংকটের সমাধানের জন্য এ দুই জিনিস অত্যন্ত জরুরি। অন্যথায়, আগপিছ বিবেচনা বাদ দিয়ে রেডিমেটভাবে বর্তমান থেকে দৃষ্টিকটু এবং অমানবিক কিছু দৃশ্য এনে একপেশে রাগই ঝাড়বো। দেখুন, একপেশে মনোভাব থেকে শুধু দ্রোহ, শুধু অভিমান, শুধু আঘাত কোনো কাজ করে না; বিশৃঙ্খলাই বাড়ায় শুধু।

লেখক : ক্রিটিক আলেম ও মুদাররিস