ধর্মীয় সাহিত্যে পৃষ্ঠপোষকতা: মাওলানা আতহার আলীর ভূমিকা

মুজিব হাসান:

মুজাহিদে মিল্লাত মাওলানা আতহার আলী রহ. একটি সুবিদিত নাম, সমুজ্জ্বল ব্যক্তিত্ব। বাঙালি আলেমসমাজের মধ্যে এক অনন্য উচ্চতায় তাঁর অধিষ্ঠান। যে কারণে তাঁর জীবনপ্রবাহ ও চেতনার স্রোত যেদিকে বয়ে গেছে, সেদিকটি হয়ে উঠেছে উর্বর ও প্রাচুর্যময়। এ ব্যাপারে তাঁর ভাবশিষ্য মাওলানা মুহিউদ্দীন খান রহ.-এর অভিব্যক্তি হলো—‘মাওলানা আতহার আলী রহ. সত্যিকার অর্থেই একজন মহাপুরুষ ছিলেন। তাঁর বহুমুখী কর্মসাধনা দ্বারা এ দেশের রাজনৈতিক, সামাজিক, তালিমি ও ইসলাহি ময়দানের পূর্ণ একটি শতাব্দীর ইতিহাস বিধৃত হয়েছে।’

চেতনার সওগাত

ইতিহাসের মহানায়ক মাওলানা আতহার আলী রহ. ছিলেন একজন যুগসচেতন আলেমেদ্বীন। চিন্তা-চেতনা ও কর্মক্ষেত্রে তিনি সময়কে ধারণ করে চলতেন। মসজিদ-মাদরাসার গতানুগতিক পরিমণ্ডলে সীমাবদ্ধ ছিল না তাঁর খেদমতের পরিধি। তিনি ভাবতেন সবার থেকে ভিন্ন করে। তাঁর দৃষ্টির সীমারেখা ছিল দিগন্তপ্রসারী। সময়ের চেয়ে অনেক বেশি অগ্রসর ছিল তাঁর চিন্তা। অর্ধশত বছর পরে এসে বাংলার আলেমসমাজ যেসব বাস্তবতা মেনে নিয়েছেন, তা তিনি বুঝতে পেরেছিলেন পঞ্চাশ বছর আগেই। তাঁর মতো সর্বপ্লাবী ভাবনাশীল আলেমের সংখ্যা এ ভূখণ্ডে নেই বললেই চলে। এজন্য চলে যাওয়ার এত বছর পরও তিনি এখনও প্রাসঙ্গিক।

তিনি ছিলেন একজন প্রখর চিন্তাশীল আলেম। বাংলাভাষী আলেমসমাজের সামনে রেখে গেছেন তাঁর চেতনার এক অনন্য সওগাত : মাতৃভাষায় শিক্ষাবিস্তারের সুদূরপ্রসারী পরিকল্পনা ও স্বপ্ন বাস্তবায়নের নিদর্শন। তাঁর একান্ত অভিলাষ ছিল, এ ধারাটিকে কর্মমুখী করে তোলা। সে উদ্দেশ্যে তাঁর প্রতিষ্ঠিত ঐতিহ্যবাহী দ্বীনি বিদ্যাপীঠ আল জামিয়াতুল ইমদাদিয়ার পাঠ্যসূচিকে তিনি ঢেলে সাজিয়েছেন। কারিগরি বিভাগের সঙ্গে গঠন করেছেন অনুবাদ ও রচনা বোর্ড এবং নিজস্ব প্রকাশনা বিভাগ। ঐতিহাসিক শহীদি মসজিদের পাঁচতলা মিনারাটি আজও দাঁড়িয়ে আছে তাঁর এ পরিকল্পনার উজ্জ্বল নিদর্শন হয়ে। এর একেক তলাকে তিনি নির্ধারণ করেছিলেন একেক কাজের জন্য। দ্বিতীয়তলা মাজালিসে আবরার—সুধীর আসর, তৃতীয়তলা দারুল মুতালায়া—পাঠাগার, চতুর্থতলা দারুল কুতুব—লাইব্রেরি, পঞ্চমতলা দারুত তাসনিফ—রচনালয়। তাঁর জীবদ্দশায় এসবের বেশকিছু কার্যক্রম শুরু হয়েছিল। বিশেষত পাঠাগার গঠনের ব্যাপারটি। বিভিন্ন ভাষা ও বিচিত্র বিষয়ের মূল্যবান কিতাবাদি দিয়ে গড়ে তুলেছেন জামিয়া ইমদাদিয়ার মাকতাবাটি। তখনকার সময়ে অনেক বড় বড় উলামায়ে কেরাম ও জাঁদরেল ব্যক্তিবর্গ সেটি পরিদর্শন করে অভিভূত হয়েছেন। এরকম শহীদি মসজিদেও গঠন করেছেন একটি সাধারণ পাঠাগার, যেখানে জামিয়ার ছাত্র-শিক্ষকদের পাশাপাশি সাধারণ লোকজনও বই-পুস্তক অধ্যয়ন করতেন।

ইতিহাসের স্বর্ণরেণু—১

পঞ্চাশের দশকে যখন কওমি মাদরাসায় বাংলাভাষার আলাদা কোনো ব্যবহারিক তাৎপর্য ছিল না, সেসময়ে মাওলানা আতহার আলী রহ. বাংলাভাষা চর্চার ওপর জোর দিয়েছেন। বাংলাভাষার উন্নতি এবং একে জাতীয় জীবনের সর্বস্তরে প্রচলিত করার জন্য চালিয়েছেন সর্বাত্মক প্রচেষ্টা। বিশেষত সেসময়ে বাংলাভাষা চর্চা ও বই-পুস্তক প্রকাশের ব্যাপারটি আলেমসমাজের কাছে এতটা স্বীকৃত ছিল না। তখনকার আলেমসমাজ এদিক থেকে অনেকটাই বিমুখ ছিলেন। মাওলানা আতহার আলী রহ. এ বাস্তবতাকে উপলব্ধি করতে পেরেছিলেন—‘বর্তমান ফেতনাপূর্ণ সমাজে ইসলামকে টিকিয়ে রাখার জন্য সর্বপ্রথম দায়িত্ব হচ্ছে, মাতৃভাষায় ইসলামি সাহিত্য ও প্রবন্ধ রচনা করা এবং বদ্বীনি ও ধর্মহীনতার জবাব-সম্বলিত বই-পুস্তক প্রচার-প্রসারের ব্যবস্থা করা। এসময়ে এসব বই-পুস্তকের প্রচার-প্রসারই দ্বীনের বড় খেদমত।’ এ যুগচাহিদাকে উপলব্ধি করে তিনি বাংলাভাষায় বই-পুস্তক রচনা এবং পত্রিকা প্রকাশের ব্যাপারে উদ্যোগী হয়েছেন। তাঁর ছাত্র ও অনুসারীদের দিয়েছেন সোৎসাহ পৃষ্ঠপোষকতা।

১৯৬০ খ্রিষ্টাব্দে তাঁর প্রত্যক্ষ পৃষ্ঠপোষকতায় জামিয়া ইমদাদিয়ায় গড়ে উঠেছিল ‘নাদিয়াতুল আদব’ নামে একটি সাহিত্য-কাফেলা। জামিয়ার সাহিত্যমনা ছাত্র-শিক্ষক এবং সেসময়কার ইসলামি লেখকদের অনেকেই ছিলেন এর সক্রিয় সদস্য। সেখান থেকে বিভিন্ন সাহিত্য-কার্যক্রম প্রকাশিত হতো। ‘আল-মুনাদী’ নামে একটি দেয়ালপত্রিকা বের হতো নাদিয়াতুল আদব-এর মুখপত্র হিসেবে। পরবর্তীতে এটি জামিয়ার প্রকাশনা বিভাগ থেকে মাসিক পত্রিকা হিসেবে বের হয়েছিল। মাওলানা আতহার আলী রহ. তাঁদের দিয়ে বিভিন্ন রচনাদি ও অনুবাদের কাজ করাতেন। দেশের একজন জাতীয় নেতা ও শীর্ষস্থানীয় মুরব্বি হিসেবে তাঁর পরিমণ্ডল ছিল ব্যাপক ও বিস্তৃত। সর্বক্ষণ নিজেকে কাজের মধ্যে ডুবিয়ে রাখতেন। এ অবস্থায় তাঁর পক্ষে কলম ধরা কষ্টকর ছিল। সেজন্য তিনি একটি বিষয়ের যাবতীয় তথ্য-উপাত্ত ও প্রাথমিক খসড়াটি নিজে প্রণয়ন করে কাউকে দিয়ে একে বইয়ের রূপদান করাতেন। কাজ শেষে সেই ব্যক্তিকে উপযুক্ত সম্মানী দিয়ে পুরস্কৃত করতেন। এভাবে তাঁর অনেক নিজস্ব বইও হয়ে গেছে। মাওলানা রহ.-এর নিজস্ব রচনাবলি এবং তাঁর তত্ত্বাবধানে রচিত ও অনূদিত গ্রন্থাদির একটি তালিকা পেশ করা হলো :

তাঁর নিজস্ব রচনাবলি :
১. কুরআন বুঝিবার পথ (বাংলা)
২. নেজামে ইসলামের আলোতে (বাংলা)
৩. ইসলামি শাসন কেন চাই (বাংলা)
৪. মালফুজাতে হাকিমুল উম্মত (উর্দু)
(এটি হাকিমুল উম্মত মাওলানা আশরাফ আলী থানভি রহ.-এর বয়ান ও উপদেশমালার একটি সংকলন, যা তিনি থানাভবন খানকাহে ইমদাদিয়া আশরাফিয়ায় থাকার সময়ে হজরত হাকিমুল উম্মতের একান্ত সুহবতে থেকে সংকলন করেছিলেন। যা প্রায় ২৫০ পৃষ্ঠা সম্বলিত)
৫. দরসে কাশ্মীরি (উর্দু)
(এটি ইমামুল আসর আল্লামা আনোয়ার শাহ কাশ্মীরি রহ.-এর তিরমিজি শরিফের দরসের তাকরির, যা তিনি দারুল উলুম দেওবন্দ পড়াকালীন হজরতের দরসে বসে সংকলন করেছিলেন। এটিও প্রায় ২০০ পৃষ্ঠা সম্বলিত।)

তাঁর তত্ত্বাবধানে রচিত ও অনূদিত গ্রন্থাদি :
১. পর্দা ও ইসলাম (ইংরেজি)
২. আল-উজরু ওয়ান নুজরু (উর্দু-বাংলা)
৩. বাস্তবক্ষেত্রে সমাজতন্ত্র (বাংলা)
৪. ইসলামের অর্থবণ্টন ব্যবস্থা (বাংলা)

ইতিহাসের স্বর্ণরেণু—২

ইসলামি সাহিত্য-শীলনের পাশাপাশি আলেমদের সাংবাদিকতায় আত্মনিয়োগের ব্যাপারেও মাওলানা আতহার আলী রহ. ছিলেন উদ্যোগী উপদেষ্টা ও দরদি পৃষ্ঠপোষক। এ ব্যাপারে তাঁর অবদান একজন মহান পথিকৃতের মতো। আমাদের কওমি মাদরাসার অঙ্গন থেকে এখনও পর্যন্ত কোনো দৈনিক পত্রিকা (প্রিন্ট মিডিয়ায়) বের হয়নি। মিডিয়া আগ্রাসনের শিকার হওয়ায় এর প্রয়োজনীয়তা কতটুকু, তা বোধহয় সবাই অনুধাবন করেন। কোনো কোনো আলেম পত্রিকা প্রকাশের ব্যাপারে প্রাথমিক উদ্যোগ নিলেও তা বেশিদূর এগোয়নি। কিন্তু অর্ধশতাব্দীকাল আগে একজন আলেম দৈনিক পত্রিকা—হোক তা মানে যেমনই—প্রকাশ করে দেখিয়ে দিয়েছেন। কিশোরগঞ্জের মতো মফস্বল শহরে থেকেও তিনি অগ্রসর চিন্তা-চেতনার দিক থেকে একটুও পিছিয়ে থাকেননি। মাওলানা আতহার আলী রহ.-এর মহান পৃষ্ঠপোষকতায় যেসব পত্রিকা প্রকাশিত হয়েছিল, এর একটি বর্ণনা-তালিকা পেশ করা হলো :

১. দৈনিক নাজাত

প্রতিষ্ঠাতা পৃষ্ঠপোষক
মাওলানা আতহার আলী রহ.

সম্পাদক
মাওলানা আবদুশ শহীদ রহ.

সহকারী সম্পাদক
সুলতান আহমদ

প্রকাশনায়
নেজামে ইসলাম প্রেস, বড়কাটরা, ঢাকা

প্রকাশকাল
ষাটের দশক

ধরন
টেবলয়েড
পৃষ্ঠা: ৮

২. সাপ্তাহিক নেজামে ইসলাম

প্রতিষ্ঠাতা পৃষ্ঠপোষক
মাওলানা আতহার আলী রহ.

সম্পাদক
হাকিম হাফেজ আজিজুল ইসলাম রহ.

নির্বাহী সম্পাদক
মাওলানা মুহিউদ্দীন খান রহ.

প্রকাশনায়
নেজামে ইসলাম প্রেস, বড়কাটরা, ঢাকা

প্রকাশকাল
ষাটের দশক

ধরন
টেবলয়েড
পৃষ্ঠা: ৮

৩. মাসিক আল-মুনাদী

প্রতিষ্ঠাতা পৃষ্ঠপোষক
মাওলানা আতহার আলী রহ.

সম্পাদক
মাওলানা আবদুল হান্নান রহ.

সহকারী সম্পাদক
মাওলানা ফরীদ উদ্দীন মাসউদ

প্রকাশনায়
জামিয়া ইমদাদিয়া প্রকাশনা বিভাগ, কিশোরগঞ্জ

প্রকাশকাল
ষাটের দশক

ধরন
রয়েল সাইজ
পৃষ্ঠা: ৬৪

কালের ধুলোয় লেখা

মাওলানা আতহার আলী রহ. ছিলেন একজন মননশীল হৃদয়ের অধিকারী এবং অসাধারণ সাহিত্যপ্রেমী ব্যক্তিত্ব। ইসলামি সাহিত্যের পৃষ্ঠপোষকতার পাশাপাশি তিনি নিজের ভেতরেও লালন করতেন এক অনন্য সাহিত্য-মনন। তাঁর সেই মননশীলতার ছাপ আজও প্রতীক হয়ে আছে জামিয়া ইমদাদিয়ার দেয়ালে।

১৯৫২ সালে যখন বাংলাকে রাষ্ট্রভাষা করার দাবিতে গোটা দেশে আন্দোলনের জোয়ার বয়ে গিয়েছিল, সেসময় মাওলানা আতহার আলী রহ.-এর অবস্থান ছিল রাষ্ট্রভাষা বাংলা হওয়ার সপক্ষে। এজন্য তিনি ব্যক্তিগতভাবে যেরকম উদ্যোগ ও প্রচেষ্টা গ্রহণ করেছেন, তেমনই দলীয়ভাবেও অনেক কর্মসূচি আঞ্জাম দিয়েছেন। তাঁর ব্যক্তিগত উদ্যোগের একটি চমৎকার নমুনা আজও মূর্ত হয়ে আছে জামিয়ার দক্ষিণ ভবনের তিলতলার রেলিংয়ে।

তখন জামিয়া ইমদাদিয়ার বাংলা বিভাগের শিক্ষক ছিলেন কাজী শামসুদ্দীন আহমদ রহ.। সেই বিক্ষুব্ধ সময়ে জামিয়ার শানে তিনি একটি কবিতা রচনা করেছিলেন বাংলাভাষায়। শায়খুল জামিয়া মাওলানা আতহার আলী রহ.-এর সেই কবিতাটি এতই পছন্দ হয়েছিল, সেটিকে তিনি নান্দনিক শিল্পকর্মের মাধ্যমে বরণীয় করে রেখে দিয়েছেন। জামিয়ার দক্ষিণ ভবন নির্মাণকালে কবিতাটি তিনি খোদাই করে রেখে দিয়েছেন তিনতলার রেলিংয়ে, সিমেন্টের পাকা অক্ষরে। তাঁর সাহিত্য-মননের নিদর্শন হিসেবে কবিতাটি আজও অক্ষত আছে যথাস্থানে। কবিতাটি হলো—

নীতি শিক্ষার এইযে কেন্দ্র ইলমে দীনের এইযে খনি,
হাদিস-ফিকার আলোচনা খোদার নামের অমর ধ্বনি।
জ্ঞান-গরিমার আলোকরশ্মি গবেষণার জ্যোৎস্না-দ্যুতি,
প্রতি কণ্ঠের মারহাবা রব দ্বার প্রাচীরে মূর্ত অতি।

কিশোরগঞ্জের এই জামিয়া বাক শিখানোর এক মোজেজা,
আঁধারে কেউ মশাল জ্বালি দেখায় যথা পথটি সোজা।
কভু জাগায় প্রাণের স্পন্দন কভু ফোটায় ফুলের কলি,
মহাশূন্যে গুঞ্জরিত ছিল যখন একটি বুলি।

উত্তরাধিকার স্বরূপে স্বত্ব যে জ্ঞান আম্বিয়াদের,
সে জ্ঞান শুধু মিলবে যাতে রেজামন্দি আল্লাপাকের।

মুজাহিদে মিল্লাত মাওলানা আতহার আলী রহ. বাস্তবিক অর্থেই একজন দরদি পৃষ্ঠপোষক ছিলেন। দ্বীনি, ইসলাহি, রাজনৈতিক, সামাজিক ও সাংস্কৃতিক যেকোনো বিষয়ে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা তাঁকে একজন মহান অভিভাবক ও দরদি পৃষ্ঠপোষক হিসেবে পেয়েছেন। আলেমসমাজের ইসলামি সাহিত্য ও সাংবাদিকতায় আত্মনিয়োগের ক্ষেত্রে তাঁর অবদান অনস্বীকার্য। বস্তুত সাহিত্যচর্চা তাঁর ক্ষেত্র না-হলেও ইসলামি মূল্যবোধ জাগরণী সাহিত্যকে তিনি আজীবন ভালোবেসে গেছেন। তাঁর এ ভালোবাসাই আমাদের আদর্শ।

বিজ্ঞাপন