ধর্ষকের সাথে ধর্ষিতার বিবাহ : ইসলাম কী বলে?

রাগিব রব্বানি

বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে ধর্ষণের মতো নৃশংস ও নির্মম ঘটনা এখন নিত্তনৈমিত্তিক ব্যাপার হয়ে দাঁড়িয়েছে। প্রতিদিনই খবরের শিরোনাম হচ্ছে তিন-চারটি/পাঁচটি ধর্ষণের ঘটনা। ধর্ষণ বন্ধে কার্যকরী যে পদক্ষেপগুলো নেয়ার কথা এবং বিচারের দ্রুতগামিতা, কার্যকারিতা ও স্বচ্ছতা যেভাবে নিশ্চিত করার কথা, আমাদের সামাজিক ও রাষ্ট্রীয় সর্বাঙ্গীন অধঃপতনের কারণে তা নেওয়া হচ্ছে না, বরং সম্ভব হচ্ছে না।

গ্রামে গঞ্জে বা মফস্বলে একটা মেয়ে যখন ধর্ষণের শিকার হয়, প্রায়ই দেখা যায়, গ্রাম্য মাতব্বররা তখন সালিশ বসিয়ে ধর্ষিতা ওই মেয়েকে তার ধর্ষকের সঙ্গে বিবাহ পড়িয়ে দেন। সম্প্রতি এমন একাধিক ঘটনা খবরের শিরোনাম হয়েছে।

গ্রাম্য মাতব্বররা সামাজিক শৃঙ্খলা বজায় রাখতে গিয়ে এমনটা করছেন দাবি করলেও এবং অনেক ক্ষেত্রে তাদের উদ্দেশ্য সৎ থাকলেও ধর্ষক-ধর্ষিতার দাম্পত্যজীবন, যেখানে একজন নিপীড়ক আরেকজন নিপীড়িতা, তাদের যৌথজীবন কতটা ভালো ও সুন্দর হবে তা সহজেই অনুমেয়।

ধর্ষকের সাথে ধর্ষিতাকে এভাবে বিয়ে দিয়ে দেওয়াকে ইসলাম কীভাবে দেখছে, বা ইসলামের দৃষ্টিভঙ্গি এ ব্যাপারে কী জানতে চেয়ে কথা বলেছিলাম দুজন অভিজ্ঞ মুফতির সঙ্গে।

রাজধানীর যাত্রাবাড়িস্থ জামিআ আবু বকর সিদ্দিক রাদিআল্লাহু আনহু মাদরাসার সিনিয়র মুহাদ্দিস ও মুফতি মাওলানা রেজাউল করীম আবরার বলেন, ‘প্রথমত ধর্ষণের নির্দিষ্ট শাস্তি আছে শরিয়তে; বিবাহিত হলে প্রস্তারাঘাতে হত্যা করা আর বিবাহিত না হলে ১০০টি বেত্রাঘাত করা৷ আমাদের দেশে শরিয়া আইন যেহেতু নেই, এজন্য দেখা যায় ধর্ষক গ্রেপ্তার হলেও কিছুদিন পর আইনের ফাঁক গলে মুক্তি পেয়ে যায়৷

‘গ্রামাঞ্চলে আরেকটি কাজ করতে দেখা যায়৷ ব্যাভিচারকারী পুরুষ এবং মহিলাকে বিয়ে করিয়ে দেওয়া হয়৷ ধর্ষণ এবং ব্যভিচারের মাঝে যদিও পরিভাষাগত পার্থক্য আছে, কিন্তু কোনোটির শাস্তি স্বরূপ শরিয়ত উভয়কে বিয়ে করিয়ে দেওয়ার কথা বলেনি৷

‘তদুপরি গ্রামের মুরব্বিরা অনেক সময় সামাজিক মান-সম্মানের কথা চিন্তা করে উভয়ের মাঝে বিয়ে পড়িয়ে দেন৷ কারণ, ঘটনা জানাজানি হয়ে যাওয়ার পর এ মেয়ের জীবন দূর্বিষহ হয়ে ওঠে৷ কেউ তাকে বিয়ে করতে চায় না৷ এ ছাড়া শরিয়তের আলোকে তারা বিবাহ বন্ধনে আবদ্ধ হতে সমস্যাও নেই৷ এ হিসেবে সামাজিকভাবে মুরব্বিরা বিয়ে পড়িয়ে দিলে বিয়ে হয়ে যাবে৷ যদি বিবাহ বিশুদ্ধ হওয়ার সকল শর্তাবলি পাওয়া যায়।’

সিলেটের শীর্ষস্থানীয় মুফতি ও শহরের কাজির বাজার মাদরাসার সিনিয়র মুহাদ্দিস মাওলানা শফিকুর রহমান ধর্ষক-ধর্ষিতার বিয়ে প্রক্রিয়াকে একটু ভিন্নভাবে ব্যাখ্যা করেছেন।

তিনি বলেন, ‘ধর্ষক-ধর্ষিতার সম্মতি থাকলে বিয়েটা হয়ে যাবে, কিন্তু এখানে বিয়েপরবর্তী তাদের দাম্পত্যজীবন নিয়ে ভাবনার ব্যাপার আছে। সামাজিক শৃঙ্খলা রক্ষা করতে গিয়ে গ্রাম্য সালিশ তাদেরকে বিয়েবন্ধনে আবদ্ধ করে দিলেও মনের বন্ধন তৈরি না হলে সে বিয়ে মেয়ের জন্য আশির্বাদের বদলে উল্টো আরও অভিশাপ হয়ে দাঁড়াবে। আর একজন ধর্ষক জালেম, যে কি না জোরজবরদস্তি ও জুলুম করে একদা তাকে ভোগ করেছে, সেই জালেমকে ওই মেয়েটি কীভাবে নিজের স্বামী ও জীবনসঙ্গী হিসেবে মন থেকে মেনে নেবে, তা আমাদেরকে ভাবতে হবে।

‘এ ক্ষেত্রে আমি বলব (ইসলামের দণ্ডবিধি তো ১০০ বেত্রাঘাত কিংবা প্রস্তর নিক্ষেপে হত্যা, এর কোনো অন্যথা নেই), গ্রামের মাতব্বররা এখানে মাতব্বরি না করে ধর্ষককে সরাসরি আইনের হাতে তুলে দিয়ে তার কঠিন ও প্রচলিত আইনে যথাযথ শাস্তি নিশ্চিত করতে সচেষ্টা হওয়াই যুক্তিযুক্ত।

‘তবে হ্যাঁ, আমাদের দেশে কিন্তু অন্য একপ্রকারের ধর্ষণের প্রচলন ঘটেছে, যেটা আদতে ধর্ষণ না, জিনা বা ব্যভিচার। ইসলামি আইন চালু থাকলে দুজনকেই কড়া শাস্তির সম্মুখীন হতে হতো এ ক্ষেত্রে। এ ধরনের ধর্ষণের নমুনা হলো নারীপুরুষ উভয়ই প্রেম বা অনঢ কোনো সম্পর্কের সুবাদে পরস্পর সম্মতির ভিত্তিতে এক বা একাধিক বার ব্যভিচারে লিপ্ত হয়েছে, পরে নারীটির কোনো স্বার্থে আঘাত লাগলে বা প্রতিশ্রুত ওয়াদা পুরুষটি পূরণ না করলে ওই ব্যভিচারকে নারীটি ধর্ষণ বলে চালিয়ে দেয়।

‘এমনতর ধর্ষণের ক্ষেত্রে গ্রাম্য মাতব্বররা যদি উভয়ের মধ্যে বিবাহের ব্যবস্থা করে দেন, তবে এটা করা যেতে পারে। কারণ, তখন স্বামীর ব্যাপারে ধর্ষণ সংক্রান্ত ঘৃণা মেয়েটির ভেতরে কাজ করবে না। দাম্পত্যজীবনেও পড়বে না ধর্ষণের কোনো প্রভাব।’