নরসিংদীতে হিন্দুর অনুদানে মাদরাসা ভবন নির্মাণ, ভবন উদ্বোধনে গীতাপাঠ : নেপথ্যে কী

রাগিব রব্বানি :

নরসিংদী জেলার রায়পুরা উপজেলার শ্রীরামপুর গ্রামে অবস্থিত মদিনাতুল উলুম মাদরাসায় গত ২৮ সেপ্টেম্বর হিন্দু ব্যক্তির অনুদানে নির্মিত নতুন ভবন উদ্বোধন উপলক্ষে অনুষ্ঠিত এক অনুষ্ঠানে কুরআনের পাশাপাশি গীতাপাঠ এবং হিন্দু উগ্রবাদী সংগঠন ইসকন নেতাদের উপস্থিতি নিয়ে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে সম্প্রতি বেশ সমালোচনার সৃষ্টি হয়েছে।

জানা যায়, হিফজ ও নুরানি বিভাগের ওই মাদরাসায় স্থানীয় হিন্দু দানবীর ইঞ্জিনিয়ার মানিক কে. ভট্টাচার্য ছাত্রদের থাকার জন্য একটি ভবন নির্মাণ করে দেন। গত ২৮ সেপ্টেম্বর ভবনটির আনুষ্ঠানিক উদ্বোধন হয়। উদ্বোধন অনুষ্ঠানে ভবনদাতা ইঞ্জিনিয়ার মানিক কে. ভট্টাচার্যের সঙ্গে বেশ কিছু হিন্দু লোকও উপস্থিত থাকেন। তাদের মধ্যে নরসিংদী জেলা ইসকনের প্রধান প্রহ্লাদ কৃষ্ণ দাসও ছিলেন।

অনুষ্ঠানে হিন্দুদের অংশগ্রহণ ও উপস্থিতির কারণে মানিক ভট্টাচার্য কুরআন তেলাওতের পাশাপাশি গীতা পাঠের মাধ্যমে অনুষ্ঠান উদ্বোধন করতে বলেন। তাঁর কথা মতো কুরআন তেলাওতের পরপর গীতাপাঠ করা হয়। ব্যাপারটি ফাতেহ টুয়েন্টি ফোর ডট কমের কাছে স্বীকার করেছেন মাদরাসাটির পরিচালক মাওলানা ফজলুল হক।

তিনি বলেন, মানিক কে. ভট্টাচার্য আমাদের রায়পুর উপজেলার বিশিষ্ট দানবীর। গত ২০-২৫ বছর ধরে তিনি উপজেলার বিভিন্ন এলাকায় শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, ধর্মীয় উপাসনালয় এবং সামাজিক বিভিন্ন প্রয়োজনে আর্থিক অনুদান দিয়ে আসছেন। তারই ধারাবাহিকতায় আমাদের মাদরাসায় একটি ভবন নির্মাণ করে দেওয়ার প্রস্তাব এলে আমরা তাতে দ্বিমত করিনি।

Image may contain: one or more people and people sitting

মাওলানা ফজলুল হক আরও বলেন, আমাদের ছোট্ট এ মাদরাসাটি টিনশেড একটি ঘরে পরিচালিত হতো। একটি পাকা ভবনের দরকার ছিল। কিন্তু আমরা নিজ থেকে তাঁর কাছে চাইনি। স্বপ্রণোদিত হয়ে দিতে চেয়েছেন বিধায় আমরা নিয়েছি।

অনুষ্ঠানে ইসকন নেতার উপস্থিতির বিষয়ে জানতে চাইলে তিনি বলেন, ইসকন পরিচয়ে কেউ আমাদের অনুষ্ঠানে আসেননি। ইঞ্জিনিয়ার মানিক প্রতিবছর একটা অনুষ্ঠানের মাধ্যমে এলাকার বিভিন্ন সামাজিক উন্নয়নে এবং হিন্দু মন্দিরগুলোতে কিছু অনুদান দেন। আমাদের মাদরাসার উদ্বোধনী অনুষ্ঠানটা মূলত সেই অনুষ্ঠান ছিল। তাই মন্দিরের অনুদান গ্রহণের জন্য হিন্দু সম্প্রদায়ের অনেকে উপস্থিত হয়েছেন। বিশেষ দাওয়াতে কিংবা অতিথি হিসেবে কেউ আসেননি। এদের মধ্যে কেউ যদি ইসকনের সঙ্গে সম্পৃক্ত থাকেন, তবে আমার জানা নেই।

একটি মুসলিম দেশে মাদরাসার মতো ধর্মীয় শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে হিন্দুদের অনুদানে ভবন নির্মাণ, অনুদানের স্বীকৃতি স্বরূপ হিন্দু ব্যক্তির নামে ভবনের নামকরণ কতটা মানানসই প্রশ্ন করলে মদীনাতুল উলুম মাদরাসার এ পরিচালক বলেন, এটা ‘তাকওয়া’র খেলাফ নিঃসন্দেহে। কিন্তু শরয়ি দৃষ্টিকোণ থেকে নাজায়েজ তো না। আমাদের প্রয়োজন ছিল, তারা স্বপ্রণোদিত হয়ে প্রয়োজন পূরণ করেছেন, এতে তো আপত্তির কিছু নেই।

কিন্তু উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে কুরআনের পাশাপাশি গীতাপাঠ কি কুরআনের অবমাননা নয়, তাও একটি মাদরাসায়, এমন প্রশ্নের কোনো সদুত্তর দিতে পারেননি মাওলানা ফজলুল হক।

তবে নরসিংদী জেলার শীর্ষস্থানীয় ও সর্বজন শ্রদ্ধেয় আলেম মাওলানা ইসমাঈল নুরপুরী এই ঘটনায় দুঃখপ্রকাশ করে তীব্র নিন্দা জানিয়েছেন। তিনি বলেন, মাওলানা ফজলুল হক রায়পুরের সর্বজন শ্রদ্ধেয় একজন আলেম এবং বুজুর্গ ব্যক্তিত্ব। চট্টগ্রামের নানুপুরের পীর সাহেবের খলিফাও। সাধাসিদে ও সরল মানুষ। এত প্যাঁচগোছ বুঝেন না। তিনি কারও ষড়যন্ত্রের শিকার হয়ে এমনটা করলেন কি না, তা দেখার বিষয়।

ইসমাঈল নুরপুরী ফাতেহ টুয়েন্টি ফোরকে বলেন, বিষয়টি আমার জানা ছিল না। আপনাদের কাছ থেকে প্রথম জানলাম। মাদরাসার মতো একটি জায়গায় কুরআনের পাশাপাশি গীতাপাঠ কোনোভাবেই কাম্য নয়। নরসিংদীর ওলামায়ে কেরামের সঙ্গে পরামর্শ করে ভবিষ্যতে এমনটা যেন আমাদের অঞ্চলে আর না ঘটে, সে ব্যাপারে যথাযথ পদক্ষেপ নেওয়ার চেষ্টা করব ইনশাআল্লাহ।