নাগরিক আইনের বিরুদ্ধে মাসজুড়ে দিল্লির শাহিনবাগে ভারতীয় নারীদের অপ্রতিরোধ্য অবস্থান

নাগরিক আইনের বিরুদ্ধে মাসজুড়ে দিল্লির শাহিনবাগে ভারতীয় নারীদের অপ্রতিরোধ্য অবস্থান

আন্তর্জাতিক ডেস্ক:

বিগত এক মাস ধরে হাজার হাজার বিক্ষোভকারী–যাদের নেতৃত্বে আছেন মূলত হিজাব ও বোরকাপরা মুসলিম নারীরা, যাদের অনেকেই গৃহিনী–তারা ভারতের রাজধানী দিল্লির শাহিনবাগের কাছে প্রধান সড়কের একটা অংশ দখল করে অবস্থান কর্মসূচিতে বসেছেন। এই শাহিনবাগ শ্রমজীবি শ্রেণীর মুসলিমদের এলাকা, যেটার মাধ্যমে রাজধানী শহরের সাথে স্যাটেলাইট শহর নোইদা যুক্ত হয়েছে।

তারা দেশটির সংশোধিত নাগরিকত্ব আইন, যেটা স্পষ্টতই মুসলিম-বিরোধী এবং বৈষম্যমূলক, এর বিরুদ্ধে বিক্ষোভ করছে। আইনটি গত মাসে ভারতীয় পার্লামেন্টে পাশ হয়েছে। এই আইনে প্রতিবেশী তিন দেশ থেকে আসা অমুসলিমদের দ্রুত ভারতের নাগরিকত্ব দেয়ার বিধান রাখা হয়েছে।

এই আইনে বাংলাদেশ, আফগানিস্তান ও পাকিস্তান থেকে আসা ‘নির্যাতিত’ সংখ্যালঘু হিন্দু, শিখ, বৌদ্ধ, জৈন, পার্সি ও খ্রিস্টানদেরকে ভারতের নাগরিকত্ব দেয়ার বিধান রাখা হলেও মুসলিমদেরকে এই তালিকা থেকে বাদ রাখা হয়েছে।

অনেক উদারপন্থী ভারতীয় একাত্মতা জানিয়ে সিএএ-বিরোধী বিক্ষোভে যোগ দিয়েছেন। তারা বলছেন যে, প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির হিন্দু জাতীয়তাবাদী সরকার বিশ্বাসের ভিত্তিতে নাগরিকত্ব দেয়ার আইন করে ভারতকে বিভক্ত করতে চায়।

৮২ বছর বয়সী বিলকিস মঙ্গলবার আল জাজিরাকে বললেন, এখানে আমি ২৯ দিন ধরে আছি। আমি এখানে খাই, এখানেই নামাজ পড়ি আবার এখানেই ঘুমাই। শুধুমাত্র গোসল করতে আর কাপড় বদলানোর সময় আমি বাসায় যাই।

১৯৪৭ সালে ভারতের স্বাধীনতা লাভের আগ দিয়ে বিলকিসের জন্ম। এর আগে আর কখনও কোন বিক্ষোভে অংশ নেননি তিনি। কিন্তু এবারের বিষয় আলাদা বলে জানালেন তিনি।

নারীরা সারি বেঁধে বসে আছেন, পুরুষেরা দড়ি বরাবর দাঁড়িয়ে আছেন। একসাথে সবাই শ্লোগান দিচ্ছেন : “হাল্লা বোল, সিএএ পে হাল্লা বোল”, “হাম কিয়া চাহতে? আজাদি – ভেদভাব সে আজাদি”।

দিল্লীর কঠিন শীত তাদের জন্য এখানে বাধা হতে পারেনি।

শাহিনবাগ বিক্ষোভের সূচনা কিভাবে?

শাহিনবাগে শান্তিপূর্ণ অবস্থান কর্মসূচি শুরু হয়েছে ১৬ ডিসেম্বর। নিকটস্থ জামিয়া মিল্লিয়া ইসলামিয়া বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসে পুলিশের ভাংচুর চালানো এবং শিক্ষার্থীদের উপর হামলা করার পর এই কর্মসূচি শুরু হয়। শিক্ষার্থীরা ক্যাম্পাসে সিএএ বিরোধী বিক্ষোভে নেমেছিল।

বিক্ষোভ সহিংসতায় রূপ নেয়ার পর, পুলিশ বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসে প্রবেশ করে, টিয়ার গ্যাস শেল নিক্ষেপ করে এবং নিরস্ত্র শিক্ষার্থীদের উপর হামলা করে। সোশাল মিডিয়ায় পুলিশের বর্বরতার ভিডিও ছড়িয়ে পড়লে ব্যাপক জনরোষের সৃষ্টি হয়।

নতুন আইনের সাথে সারা দেশে যে এনআরসি তৈরির প্রস্তাব করা হয়েছে, সেটির কারণে ভারতের প্রায় ২০০ মিলিয়ন মুসলিম চরম উদ্বেগের মধ্যে বাস করছে।

পুরো ভারতের বিভিন্ন জায়গায় বিগত এক মাস ধরে ব্যাপক বিক্ষোভ হচ্ছে। পুলিশি অভিযানে অন্তত ২৮ জন নিহত হয়েছে, যাদের অধিকাংশই মুসলিম। ভারতের সবচেয়ে জনবহুল উত্তরাঞ্চলীয় রাজ্য উত্তর প্রদেশ – যেখানে সরকার চালাচ্ছে মোদির ক্ষমতাসীন বিজেপি – সেখানে সবচেয়ে বেশি মানুষ নিহত হয়েছে।

শাহিনবাগের বিক্ষোভ শুরু হয়েছিল নারী ও পুরুষের ছোট্ট একটা গ্রুপের দ্বারা, কিন্তু দিল্লীর অন্যান্য জায়গা থেকে একাত্মতা জানিয়ে আরও বহু মানুষ এতে যোগ দেয়ার পর শিগগিরই এটা বেড়ে বিশাল হয়ে ওঠে। শাহীন বাগ বিক্ষোভকে জন্তর মন্তরের সাথে তুলনা করা হচ্ছে, যে জায়গাটা ভারতের পার্লামেন্টের কাছাকাছি অবস্থিত এবং সারা বছরেই যেখানে বিক্ষোভ হয়ে থাকে।

একাত্মতার বিক্ষোভ

প্রতিদিন বিভিন্ন বিশ্বাসের শত শত মানুষ এসে বিক্ষোভকারীদের সাথে যোগ দিচ্ছে এবং এই আন্দোলনকে তারা বলছেন দেশ ও সংবিধান রক্ষার আন্দোলন।

নারীদের জন্য নির্ধারিত জায়গার পেছনে তরুণ পুরুষ ও শিশুরা বিভিন্ন গ্রুপে গ্রুপে ভাগ হয়ে সিএএ এবং সরকারের বিরুদ্ধে শ্লোগান দিচ্ছে। অনেকেই ইন্ডিয়া গেটের মডেলের সামনে সেলফি তুলছেন। আসল ইন্ডিয়া গেট হলো দিল্লীর বিখ্যাত যুদ্ধ স্মৃতিস্তম্ভ। বিগত এক মাসে যারা নিহত হয়েছে, তাদের নাম লিখে রাখা হয়েছে এই রেপ্লিকা ইন্ডিয়া গেটে।

কাছেই রাস্তার একটা অংশে নকশা করে রঙিন গ্রাফিতি আঁকা হয়েছে আর সিএএ-বিরোধী শ্লোগান লিখে রাখা হয়েছে, যেমন “সিএএ প্রত্যাখ্যান করো, এনআরবি প্রত্যাখ্যান করো” এবং ঐক্যের ডাক দেয়া হয়েছে। “ঐক্যের মধ্যে শক্তি, বিশ্বাসের মাধ্যমে ঐক্য” – এ ধরনের শ্লোগান লেখা গ্রাফিতির মধ্যে।

বিক্ষোভকারীরা প্রায়ই শ্লোগান দিচ্ছেন, “হিন্দু, মুসলিম, শিখ, ইসাই – আপাস মে হ্যায় ভাই ভাই”।

বিভিন্ন ধর্মের প্রতীকগুলো সেখানে প্রদর্শনী করা হচ্ছে এবং রোববার সেখানে আন্তধর্মীয় অনুষ্ঠানও হয়েছে।

বিক্ষোভকারীরা একই সাথে ভারতীয় সংবিধান থেকে পড়ে শোনাচ্ছেন এবং সংবিধানের ‘সমাজবাদী, সেক্যুলার’ মূল্যবোধ সংরক্ষণের শপথ নিচ্ছেন।

২৪ বছর বয়সী শ্যামা খান বললেন, “এই বিক্ষোভ শুধু মুসলিমদের নয়, বরং যারা ভারতের সংবিধানে বিশ্বাস করে এবং সেটাকে রক্ষা করতে চায়, তাদের সকলের”।

একই ধরনের বিক্ষোভ

শাহিনবাগ বিক্ষোভ জাতীয় মিডিয়ার খবরে আসার পর সেটা পুরো ভারতের বিভিন্ন শহরে একই ধরনের বিক্ষোভের অনুপ্রেরণা সৃষ্টি করেছে।

৭৫ বছর বয়সী সারোয়ারি বললেন, “আমরা সবাই খুশি যে আমাদের বিক্ষোভ সারা দেশের মানুষকে উদ্বুদ্ধ করেছে”।

তিনি বলেন, “সরকার বলেছে যে তারা এই আইনের ব্যাপারে এক ইঞ্চিও পিছু হটবে না কিন্তু তাদেরকে সরতে হবে। বিজেপি ধর্মীয় পরিচয় দিয়ে আমাদের আলাদা করতে চেয়েছে কিন্তু এটা আমাদেরকে একত্র করে দিয়েছে”।

মিডিয়ার রিপোর্টে বলা হয়েছে যে, পুলিশ শাহীন বাগের বিক্ষোভকারীদেরকে বোঝানোর চেষ্টা করবে যাতে তারা তাদের অবস্থান কর্মসূচি প্রত্যাহার করে নেয়, যেটার কারণে গত এক মাস ধরে যানবাহনগুলোকে ভিন্ন পথ দিয়ে যেতে হচ্ছে।

এ ব্যাপারে মন্তব্যের জন্য বারবার চেষ্টা করেও দিল্লী পুলিশ কর্মকর্তাদের সাথে যোগাযোগ করা সম্ভব হয়নি।

তবে, বিজেপি মুখপাত্র জিভিএল নরসিংহ রাও বলেছেন, “সিএএ’র ব্যাপারে বিরোধীদের সমালোচনা একটা মিথ্যা প্রচারণা এবং রাজনৈতিক বিবেচনা থেকে এটা করা হচ্ছে”।

রাও অবশ্য এ বিষয়ে মন্তব্য করতে রাজি হননি যে, সরকার দলীয় কর্মকর্তারা কেন শাহিনবাগের বিক্ষোভকারীদের কাছে গিয়ে তাদের সাথে কথা বলার চেষ্টা করেননি।

সূত্র : আল জাজিরা, সাউথ এশিয়ান মনিটর