ফররুখের নজরুল ভাবনা: তুলনা এবং প্রতিতুলনা

রাকিবুল হাসান:

তুলনা এবং প্রতিতুলনা আমাদের জাতীয় সমস্যা। এই সমস্যার শিকার ফররুখ আহমদ। কাজী নজরুল ইসলামের সঙ্গে ফররুখ আহমদকে কেউ তুলনা করেন, কেউ তুলনার ধার ধারেন না। যাঁরা তুলনার নিক্তিতে মাপতে চান, তাঁদের কেউ বলেন, ফররুখ নজরুলের উত্তরাধিকারী। কেউ বলেন, ফররুখ কবিতায় নজরুল ইসলামকে ছাড়িয়ে গেছেন। আর কারও কারও কাছে তুলনার কোনো সুযোগ নেই। দুজন দুই মেরুর বাসিন্দা। আসলেই কি তাই? ফররুখের ওপর নজরুলের কোনো প্রভাব নাই? নজরুলকে কি উপেক্ষা করতে পেরেছেন ফররুখ?

এক নিবন্ধে কবি আবদুল কাদির লিখেছিলেন, ‘ফররুখ আহমদের ওপর যদি কোনো আধুনিক কবির প্রভাব থাকে, তিনি নজরুল ইসলাম। যদিও দুজনের মধ্যে পার্থক্য বিস্তর এবং সে পার্থক্য মৌলিক। উভয় কবিই মুসলমানের পুনরুজ্জীবন কামনা করেন আর উভয়েই রোমান্টিক। নজরুল গণতান্ত্রিক কবি, আর ফররুখ ধর্মবাদী।’

ফররুখ পাকিস্তান আন্দোলনের কঠিন সমর্থক ছিলেন। লিখেছিলেন ‘কানমে বিড়ি মুহমে পান/লড়কে লেঙ্গে পাকিস্তান।’ এইজন্যই বোধহয় আবদুল কাদির তাঁকে ধর্মবাদী বলেছেন। কিন্তু আমাদের দেখার বিষয় হলো ফররুখের লেখায় নজরুলের প্রভাব। কাদিরের ঘনিষ্ঠ বন্ধু মুহম্মদ এনামুল হকও বলেছেন, ‘নজরুলই ফররুখের গুরু, ইংরেজিতে ‘মাস্টার’।’

ফররুখের কবিতায় আরবি, ফার্সি এবং উর্দুর ব্যবহার লক্ষ্য করা যায়। কিন্তু ফররুখ উর্দু পারলেও, আরবি-ফার্সি জানতেন না। এজন্যই ইকবালের কবিতা তিনি ইংরেজি মাধ্যম থেকে অনুবাদ করেছেন। কিন্তু নজরুল আরবি-ফার্সি জানতেন। মূল থেকে অনুবাদ করেছেন হাফিজ, ওমর খৈয়াম, আমপারা। ফররুখ যতটুকু আরবি-ফার্সি ব্যবহার করতেন, তা পড়ে পড়ে, একটু-আধটু শিখেছেন নজরুল ইসলামের কবিতা থেকেও।

মোহাম্মদ মাহফুজুল্লাহ লিখেছেন, ‘তাঁর কবিতায় আরবি-ফার্সি শব্দের ব্যাপক ব্যবহার দেখে অনেকের ধারণা ফররুখ আহমদ বুঝি আরবি-ফার্সি খুব ভালো করে জানতেন। কিন্তু আমি ফররুখের নিজের মুখে শুনেছি, তিনি এসব আহরণ করেছেন প্রধানত পুঁথি থেকে, প্যারীচাঁদ মিত্রের আলালের ঘরের দুলাল, নজরুল ইসলামের কবিতা, প্রমথ চৌধুরীর গদ্য এবং অন্যান্য রচনাবলী পাঠ করে।’ (মাহফুজুল্লাহ ১৯৭৮ : ১৮২)

এর থেকে প্রতীয়মান হয়, ফররুখের জাগরণী কবি-সত্তার বেড়ে ওঠায় নজরুলের একটা প্রভাব আছে। সেটা আমরা অস্বীকার করি কিংবা স্বয়ং ফররুখ।

ফররুখের নজরুল ভাবনা

১৯৫৯ সালে আবদুল কাদির সম্পাদিত ‘নজরুল পরিচিতি’ গ্রন্থে ফররুখ আহমদের ‘নজরুল সাহিত্যের পটভূমি’ শিরোনামে একটা নিবন্ধ প্রকাশিত হয়। এই নিবন্ধে ফররুখ নজরুলকে দেখেছেন আশা-জাগানিয়া এবং ঐতিহ্যের পরিচয়দানকারী হিসেবে। তিনি লিখেছেন, ‘খিলাফত আন্দোলনকালে কাজী নজরুল ইসলামের আবির্ভাব একাধিক কারণে স্মরণীয়। আত্মবিস্মৃত জাতি বহুদিন পর শুনল তার আশা-আকাঙ্ক্ষার কথা। নতুন করে পেলো তার ঐতিহ্যের পরিচয়।’

কিন্তু এই অশান্ত সময়ে, দৃশ্যপটের দ্রুতলয়ের পরিবর্তনে নজরুলের মানস খানিকটা যে উথাল-পাতাল হয়ে উঠেছিলো, তা-ও স্বীকার করেছেন ফররুখ। বলেছেন, ‘বঙ্গভঙ্গ, খেলাফত, অসহযোগ ও সন্ত্রাসবাদের পটভূমিতে যে কবি-মানস ঘটিত হয়েছিল, তার অশান্ত মনের প্রতিচ্ছবি দেখেছি আমরা তাঁর রচনায়। বাংলা সাহিত্যের একটা বিশেষ অধ্যায়ে রয়ে গেছে তাঁর দ্বন্দ্বমুখর মনের ছাপ।’

ফররুখ আহমদও নজরুলকে জাগরণের প্রতীক মনে করতেন। এবং তিনি যে জনগণের আাশাকে জাগিয়ে তুলতে পেরেছিলেন, তা-ও স্বীকার করছেন। মূলধারার বাইরে গিয়ে নজরুলকে অস্বীকার করে বসেননি এবং তিনি নজরুলকে ছাড়িয়ে গেছেন, এ কথাও কখনো বলেননি। তবে নজরুলের দুইটা দুর্বলতার কথা তিনি তুলে ধরেছেন ‘নজরুল প্রসঙ্গ’ নিবন্ধে।

প্রথম দুর্বলতা হলো—নজরুলের অদম্য ভাবাবেগ। এই দুর্বলতা শুধু ফররুখ নয়, কাজী আবদুল ওদুদ, বুদ্ধদেব বসু কিংবা সৈয়দ আলী আহসানও উল্লেখ করেছেন। ফররুখ লিখেছেন, ‘অদম্য ভাবাবেগের কারণে তাঁর অধিকাংশ কবিতাই নিখুঁতভাবে জমাট বাঁধতে পারেনি। শব্দ চয়নের দিক দিয়েও তাঁর দুর্বলতা আছে যথেষ্ট।’

দ্বিতীয় দুর্বলতা হলো, ‘অগভীর জীবনবোধ এবং দার্শনিক দৃষ্টিশক্তির অভাব তাঁর সবচাইতে বড় ত্রুটি। শুধু এই একটি কারণেই তিনি সর্বকালের কবি হতে পারেননি। নজরুল নিজেও তা বুঝতেন এবং সেকথা স্বীকার করে গেছেন।’

নজরুল-ফররুখ দুই সময়ের দুই পরিবেশে বেড়ে ওঠার কারণে তাঁদের দৃষ্টিভঙ্গিতেও পার্থক্য গড়ে উঠেছে। নজরুলের দ্বিতীয় দুর্বলতার কথা বলতে গিয়ে যদিও ফররুখ কোনো উদাহরণ টানেননি, উদাহরণ টানলে দেখা যেত নজরুলের দার্শনিক কোন দৃষ্টিভঙ্গির কোন অভাবটির কথা বলেছেন। এটা ফররুখের নিজস্ব পর্যবেক্ষণ। একজন কবি আরেকজন কবিকে এতটুকু পর্যবেক্ষণ করতেই পারেন। তাই বলে এটাকে উন্নাসিকতা কিংবা উপেক্ষা বলা যায় না। ইকবালের প্রতি দারুণ আসক্ত ছিলেন ফররুখ, দারুণ প্রভাবিতও। শুধু এইজন্য ফররুখকে নজরুল-বিদ্বেষী বানিয়ে দেয়া মোটেও ঠিক নয়।

আগের সংবাদমাদরাসাশিক্ষার্থীদের অনুভবে কাজী নজরুল ইসলাম
পরবর্তি সংবাদবাংলা ইসলামি গান ও জাতীয় কবির অবদান