
জহুরুল ইসলাম:
‘ফিকহুত তা’আম’ বলতে খাদ্য সংক্রান্ত ইসলামের বিধিবিধানকে বোঝায়। খাদ্য জীবনের অন্যতম মৌলিক প্রয়োজনীয় বস্তু এবং ইহজীবনে এর গুরুত্ব এতটাই— পাঁচটি মৌলিক নাগরিক অধিকারের মধ্যে খাবারকে সর্বাগ্রে রাখা হয়েছে।
খাবারের ক্ষেত্রে ইসলামের নীতি অনেক উদার। গুটিকয়েক জিনিস বাদ দিয়ে সমস্ত খাবারকে মানুষের জন্য হালাল করা হয়েছে। আর অল্পস্বল্প যা হারাম, তার পেছনেও কোন না কোনভাবে যুক্ত রয়েছে মানুষের কল্যাণ। তাই সামান্য কিছু নিষিদ্ধ খাবারের তালিকা একটু জেনে নিলেই পৃথিবীব্যাপী হালাল ও বৈধ খাবারের চিত্র আমাদের সামনে অনেকটাই পরিষ্কার হয়ে উঠবে।
ইসলামী মূলনীতির আলোকে খাবার হারাম হওয়ার কারণ তিনটি :
১. সরাসরি খাবারটা নিষিদ্ধ ঘোষণা হওয়া।
২. খাদ্য তৈরীর পন্থা নিষিদ্ধ হওয়া।
৩. খাবারের নেতিবাচক প্রভাব।
এই তিন প্রকার নিষিদ্ধতার উৎস কোরআন, সুন্নাহ ও আইম্মায়ে কেরামের ইজতেহাদ।
কোরআনে বর্ণিত হারামসমূহ
১. নিষিদ্ধ খাবারের অনেক প্রকারের আলোচনাই চলে এসেছে সুরা মায়িদার তিন নং আয়াতে— “তোমাদের জন্য হারাম করা হয়েছে মৃত জন্তু, রক্ত, শুকরের গোশত, আল্লাহ ব্যতীত অপরের নামে জবাইকৃত পশু, ‘মুনখানিকাহ’, ‘মাউকুযাহ’, ‘মুতারাদ্দিয়াহ’, ‘নাতিহাহ’, হিংস্র পশুতে খাওয়া জন্তু— তবে যা তোমরা জবাই করতে পেরেছ, তা ব্যতীত; আর যা মূর্তি পূজার বেদীর উপর বলি দেওয়া হয়, তা। (সুরা মায়িদাহ : ৩)
এই আয়াতের নিষিদ্ধ বিষয়গুলোর সংক্ষিপ্ত ব্যাখ্যা ইবনে কাসির রহমাতুল্লাহ আলাইহি করেছেন এভাবে—
ক. মৃত জন্তু : এর দ্বারা উদ্দেশ্য হলো, যে প্রাণী জবাই বা শিকার করা ছাড়া অন্য কোনভাবে মারা গেছে। এসব প্রাণী খাওয়া সম্পূর্ণ হারাম। তবে মাছ ও পঙ্গপাল এই হুকুমের অন্তর্ভুক্ত নয়। হযরত আবু হুরায়রা রাযিয়াল্লাহু আনহু থেকে বর্ণিত হাদিস— রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে একবার সাগরের পানি ও মাছ সম্পর্কে প্রশ্ন করা হলে তিনি বলেন, “তার পানি পবিত্র এবং সেখানের মৃত (মাছ) হালাল।” আরেক হাদিসে নবীজি বলেন, “দুটি মৃত প্রাণী ও দুই ধরনের রক্ত আমাদের জন্য হালাল। মৃত প্রাণী দুটি হলো, মাছ ও পঙ্গপাল। আর রক্ত হলো কলিজা ও প্লীহা।”
খ. রক্ত : এখানে মূলত প্রবাহিত রক্তের কথা বলা হয়েছে। এ ব্যাপারটি স্পষ্ট বর্ণিত হয়েছে আরেক আয়াতে— “বলুন, আমার প্রতি যে ওহি নাযিল হয়েছে, তাতে লোকে যা আহার করে, তার মধ্যে আমি কিছুই হারাম পাই না— মৃত, প্রবাহিত রক্ত ও শুকরের মাংস ছাড়া। (সুরা আনআম : ১৪৫)
এজন্য কলিজা ও প্লীহা ভক্ষণে কোন নিষেধাজ্ঞা নেই। কারণ তা রক্তের জমাটবদ্ধ রূপ। হযরত ইকরিমা রা. থেকে বর্ণিত, ইবনে আব্বাস রাদিয়াল্লাহু আনহুকে প্লীহার ব্যাপারে প্রশ্ন করা হলো। তিনি বললেন, “তোমরা তা খেতে পারো। এটা নিষেধ নয়। নিষেধ হচ্ছে প্রবাহিত রক্ত পান করা।”
গ. শুকরের মাংস
ঘ. গাইরুল্লাহর নামে জবাইকৃত প্রাণী : আল্লাহ ছাড়া অন্য কারো নামে জবাই করা প্রাণী খাওয়া হারাম। তবে ইচ্ছাকৃত বা ভুলবশত আল্লাহর নামও যদি নেয়া না হয়, তা হালাল হওয়ার ব্যাপারে আলেমদের মধ্যে মতপার্থক্য রয়েছে।
ঙ. মুনখানিকাহ : এর অর্থ শ্বাসরোধে মারা যাওয়া প্রাণী। তা আকস্মিকভাবে হোক বা জোরপূর্বক মারা হোক।
চ. মাউকুযাহ : আঘাতে আঘাতে হত্যা করা প্রাণী। জাহিলি যুগে এভাবে প্রাণী হত্যা করে তা খাওয়ার প্রচলন ছিল। ইসলাম এসে তা নিষিদ্ধ ঘোষণা করেছে।
ছ. মুতারাদ্দিয়াহ : কোন উঁচু স্থান থেকে পতিত হয়ে মৃত্যুবরণ করা প্রাণী।
জ. নাতিহাহ : অন্য প্রাণীর শিঙের আঘাতে মৃত্যুবরণ করা প্রাণী।
ঝ. হিংস্র প্রাণী কর্তৃক ভক্ষিত : কোন হিংস্র প্রাণীর আক্রমণে মারা পড়েছে এবং কিছু অংশ ভক্ষিত হয়েছে, এমন প্রাণী খাওয়া বৈধ নয়।
ঞ. নুসুবের সামনে জবাই করা প্রাণী : ‘নুসুব’ বলা হয় এমন পাথর, প্রাচীনকালে যা কাবার আশপাশে রাখা হতো। লোকেরা এগুলোর সামনে প্রাণী জবাই করত এবং গোশত তার ওপর রাখত। এই প্রকার জবাইয়ের প্রাণী খাওয়া হারাম, জবাইয়ের সময় আল্লাহর নাম নেয়া হলেও।
২. সত্ত্বাগতভাবে যে বস্তু নাপাক, তা খাওয়া হারাম। কুরআনে এসেছে, “বলুন, আমার প্রতি যে ওহি নাযিল হয়েছে তাতে, লোকে যা আহার করে, তার মধ্যে আমি কিছুই হারাম পাই না— মৃত, প্রবাহিত রক্ত ও শুকরের মাংস ছাড়া। কেননা এগুলো অবশ্যই অপবিত্র।” (সুরা আনআম : ১৪৫)
৩. মস্তিষ্ককে নিষ্ক্রিয়কারী জিনিস খাওয়া হারাম। কোরআনে এসেছে, “হে মুমিনগণ! মদ, জুয়া, মূর্তিপূজার বেদী ও ভাগ্য নির্ণয়ক শর ঘৃণ্য বস্তু, শয়তানের কাজ। সুতরাং তোমরা তা বর্জন করো, যাতে তোমরা সফলকাম হতে পারো।” (সুরা মায়িদাহ : ৯০)
হাদিসে বর্ণিত নিষিদ্ধ খাবারসমূহ
১. বিষ ও অন্যান্য ক্ষতিকারক বস্তু খাওয়া নিষেধ। হাদিসে এসেছে— “নিজের ক্ষতি এবং অপরের ক্ষতি করা যাবে না।” (ইবনে মাজাহ, দারাকুতনি) হাদিসটি ক্ষতিকারক বস্তু হারামের ব্যাপারে একটি মূলনীতিও বটে।
২. ধারালো দাঁত বিশিষ্ট পশু খাওয়া হারাম। এ ব্যাপারে আলেমরা একমত। ধারালো দাঁতের বলতে সকল প্রকার হিংস্র প্রাণী উদ্দেশ্য। যেমন, বাঘ, সিংহ, হায়না, কুকুর ইত্যাদি।
৩. নখর বিশিষ্ট পাখি। যেমন, বাজপাখি, ঈগল, শকুনসহ যেসব পাখি নখ দিয়ে শিকার করে। তবে নখ ব্যবহার করে যেগুলো মাটিতে গর্ত করে, সেসব পাখি এর অন্তর্ভুক্ত নয়। যেমন, মুরগি, কবুতর, চড়ুই ইত্যাদি।
৪. যেসব প্রাণী হত্যার আদেশ দেয়া হয়েছে। যেমন, সাপ, বিচ্ছু, ইঁদুর ইত্যাদি।
৫. যেসব প্রাণী হত্যা করতে নিষেধ করা হয়েছে। যেমন, ইবনে আব্বাস রাদিয়াল্লাহু আনহু থেকে বর্ণিত হাদিস— নবীজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম চারটি প্রাণী হত্যা করতে নিষেধ করেছেন— পিঁপড়া, মৌমাছি, হুদহুদ পাখি ও সুরাদ পাখি (চড়ুইয়ের চেয়ে আকারে বড় এক জাতীয় পাখি।)
হত্যার নিষেধাজ্ঞা এগুলো খাওয়া নিষিদ্ধ হওয়ার প্রমাণ বহন করে।
৬. বাদুড় খাওয়া নিষেধ। তবে এ-নিয়ে মতভেদ আছে। শাফেয়ি ও হাম্বলি মাযহাবে তা খাওয়া হারাম। মালেকি মাযহাবে মাকরুহ। হানাফি মাযহাবে বাদুর নিয়ে হারাম-হালাল উভয় মতই আছে।
৭. স্বর্ণ-রুপার পাত্রে পানাহার নিষেধ। নবীজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন, “তোমরা রেশমী কাপড় পরিধান করো না এবং সোনা-রূপার পাত্রে পানাহার করো না। কারণ, এগুলো দুনিয়ায় তাদের (অমুসলিমদের) সম্পদ এবং আখেরাতে আমাদের।”
সূত্র
*উইকিপিডিয়া : فقه الطعام
*হুজ্জাতুল্লাহিল বালিগাহ : শাহ ওয়ালিউল্লাহ মুহাদ্দিসে দেহলবি রহ.
