ফিলিস্তিন ও আল-কুদস নিয়ে ইজরাইলের দাবী অবৈধ

ইফতেখারুল হক হাসনাইন:

প্রথম বিশ্বযুদ্ধ পর্যন্ত আন্তর্জাতিক আইনের আলোকে কোন ভূখণ্ডে কারো কর্তৃত্ব স্বীকার করার যে বৈধ নিয়ম ছিলো, তা ছিল বিজয়(Conquest)। তবে বিজেতা রাষ্ট্র সেই বিজিত ভূখণ্ডকে একিভূত (Annexation) করে নেয়া লাগবে। সেই নিয়ম অনুসারে ১৮৫৭ খ্রিস্টাব্দের পরে থেকে ভারতবর্ষকে ব্রিটিশ রাজত্বের অংশ বলে গণ্য করা হয়। এবং তাকে ব্রিটিশ ইন্ডিয়া বলা হতে লাগল। বৃটিশ রাণী ভারতবর্ষেরও রাণী হয়ে গেলো। এই নীতি প্রথম বিশ্বযুদ্ধ পর্যন্ত আন্তর্জাতিক আইনে স্বীকৃত ছিলো। তা-সত্ত্বেও ১৯৮২ ইংরেজিতে আমেরিকা এবং ফ্রান্স এক যৌথ চুক্তিতে এ-সিদ্ধান্ত গ্রহণ করলো যে—যুদ্ধ থ্রো অঞ্চল ও ভূখণ্ড বিজয় করা অবৈধ ও অগ্রহণযোগ্য। অল্প সময়েই অন্যান্য রাষ্ট্রও সেই চুক্তি ও তাদের সিদ্ধান্ত মেনে নিলো।

ফলে ১৯৮০ খ্রিস্টাব্দের প্যারিস চুক্তির পর থেকে বিজয়ের মাধ্যমে কোন অঞ্চলের Annexation কে আন্তর্জাতিক আইন হিসেবে বাদ দিয়ে দেয়া হল। এখন বিজেতা রাষ্ট্রকে দখলদার শক্তি (Occupying Power) ও বিজিত রাষ্ট্রকে দখলকৃত অঞ্চল (Occupied Territory) বলা হয়ে থাকে। এবং একটি নীতি নির্ধারণ হলো যে, যতক্ষণ দখল শেষ হবেনা ততক্ষণ যুদ্ধ অবস্থা বাকি থাকবে। এ কারণে এই নীতিও স্বীকৃত হলো—দখলদার শক্তির দখলকৃত এলাকার বসতি স্থাপন ও ভৌগোলিক স্বতন্ত্র ও সুদূর প্রসারী কোন পরিবর্তন আনতে সাধন করতে পারবে না। কেননা, শিগগির বা দেরীতে হলেও দখলদার শক্তির দখলকৃত অঞ্চল ছেড়ে চলে যেতে হবে।

ঐতিহাসিকভাবে স্বীকৃত সত্য হলো, ইহুদীদেরকে রোমানরা খ্রিষ্টিয় প্রথম শতাব্দীতে ফিলিস্তিন থেকে বিতাড়িত করে দিয়েছিল। সেসময়ে আন্তর্জাতিক আইন ও প্রচলন অনুযায়ী বিজেতা শক্তি রোমান সম্রাজ্যের শাসন ও কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠিত হয়ে গিয়েছিলো। ইংরেজি সপ্তম শতাব্দীতে ইসলামের খলিফা ওমর রাযি.-এর যুগে তার কর্তৃত্ব মুসলিমদের হাতে এসে গেলো। এই কর্তৃত্ব বিংশ শতাব্দীর শুরু পর্যন্ত স্থায়ী ছিলো। প্রথম বিশ্বযুদ্ধে অটোম্যানরা পরাজিত হলে ফিলিস্তিন ব্রিটিশদের অধিকারভুক্ত হয়। ১৯২২ সালে জাতিপুঞ্জ (League of nations)ব্রিটেনকে ফিলিস্তিনের দখলদার হিসেবে স্বীকার করে এবং জাতিপুঞ্জের পক্ষ হয়ে সাময়িকভাবে ফিলিস্তিন প্রশাসন পরিচালনার জন্য ব্রিটিশ সরকারকে সাময়িক ম্যান্ডেট প্রদান করে। উল্লেখ্য, প্রথম ও দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত কিছু বিশেষ মর্যাদাসম্পন্ন ভূখণ্ড বা অঞ্চলের সাক্ষাৎ পাওয়া যায় যেগুলো পুরোপুরি স্বাধীন ও সার্বভৌম রাষ্ট্র না হলেও তারা পরাধীন বা উপনিবেশ ছিল না। এগুলো হচ্ছে জাতিপুঞ্জের অধীন ম্যান্ডেটকৃত অঞ্চল ও জাতিসংঘের অধীন ট্রাস্টকৃত অঞ্চল।

১৯৪৮ সাল পর্যন্ত এ-অঞ্চল ব্রিটিশদের হাতে ‘আমানত’ হিশেবেই ছিলো। ব্রিটিশরা তাদের হাতে দেওয়া ‘আমানত’ শুধু রক্ষাই না করলেন না; ভরপুর ‘খেয়ানত’ও করলেন।

এদিকে অভিশপ্ত ইহুদিরা ব্রিটিশ গভর্নমেন্টের ওপর চাপ সৃষ্টি করে একটি ইহুদি রাষ্ট্র (তাদের ভাষায় Jewish National Home)গঠনের জন্য। ব্রিটিশরা ১৯১৭ সালে বেলফোর ডিক্লারেশন (ব্রিটিশ পররাষ্ট্রমন্ত্রীর নাম অনুসারে)-এর মাধ্যমে ফিলিস্তিনে ইহুদিদের জন্য ‘ইজরাইল’ রাষ্ট্র গঠন করার অঙ্গীকার করে। রাষ্ট্র গঠনের জন্য পর্যাপ্ত পরিমাণ ইহুদি ফিলিস্তিনে না থাকায় ব্রিটিশরা সারা বিশ্বে ছড়িয়ে ছিটিয়ে থাকা ইহুদিদের ফিলিস্তিনে নিয়ে আসে এবং ফিলিস্তিনিদের বিতাড়ন করতে থাকে।অন্যদিকে ব্রিটিশ বাহিনীর সহযোগিতায় ইহুদিরা ফিলিস্তিনদের বিতাড়িত করে নিজেদের অবস্থান সুদৃঢ় করতে চেষ্টা করতে থাকে। ফিলিস্তিনিদের জমিজমা ইহুদিরা দখল করে নেয়। ১৯২২ সালে ইজরাইলে ইহুদি ছিল মাত্র ১২ শতাংশ, ১৯৩১ সালে তা হয় ২৩ শতাংশ, আর ১৯৪৭-এ তা বেড়ে দাঁড়ায় ৩২ শতাংশে।

ফিলিস্তিনে ইজরাইল রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা ও ইহুদিদের ফিলিস্তিনে অভিবাসনকে কেন্দ্র করে ইহুদি ও আরবদের মধ্যে সংঘর্ষ শুরু হলে ব্রিটিশ সরকার ১৯৪৭ সালের নবগঠিত জাতিসংঘকে একটি চিঠি দেয় পরবর্তী সাধারণ পরিষদের অধিবেশনে ফিলিস্তিন ইস্যুকে এজেন্ডাভুক্ত করে ফিলিস্তিনের ভবিষ্যৎ নির্ধারণের জন্য সুপারিশ গ্রহণ করতে।২৯ নভেম্বর ১৮১ নং সিদ্ধান্তে সাদারণ পরিষদ ফিলিস্তিন ভাগ করে আরব ও ইহুদি রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার সিদ্ধান্ত গ্রহণ করে (প্রস্তাবের পক্ষে ৩৩ ভোট, বিপক্ষে ১৩ ভোট আর ১০টি রাষ্ট্র ভোট দানে বিরত থাকে)। ১৮১ নং সিদ্ধান্তে ব্রিটেনসহ সকল সদস্য রাষ্ট্রকে সাধারণ পরিষদের সিদ্ধান্ত মেনে নেওয়ার ও বাস্তবায়নের আহ্বান জানানো হয়, আর নিরাপত্তা পরিষদকে সিদ্ধান্ত বাস্তবায়নে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণের জন্য অনুরোধ জানানো হয়।

মূলতঃ সাধারণ পরিষদের এই অধিকার ছিলো না।

জাতিসংঘ কোনও বৈশ্বিক সরকার নয় যে—কোন রাষ্ট্রের জনগণের সম্মতি ব্যতিরেকে ওই রাষ্ট্রকে ভাগ করার,বিধি-বিধান তৈরি করার, কোনও চুক্তি চাপিয়ে দেওয়ার এখতিয়ার জাতিসংঘের নেই। ফিলিস্তিন বিভাজনের সিদ্ধান্ত জাতিসংঘের লক্ষ্য ও উদ্দেশ্যের পরিপন্থী। জাতিসংঘ সনদের কোথাও সাধারণ পরিষদকে কোনও রাষ্ট্র বিভাজন করে নতুন রাষ্ট্র সৃষ্টির ক্ষমতা প্রদান করা হয়নি। ফলে সাধারণ পরিষদের সিদ্ধান্ত আইন ও ক্ষমতাবহির্ভূত বিধায় বাতিল।

যদি এইসব বিবেচনায় না-ও নেয়া হয় তাহলেও দুটি সত্য অস্বীকারের কোন সুযোগ নেই। তা হলো: এক.১৯৪৭ সালের শেষর দিকে যে ভূখন্ডে ইসরায়েলের ক্ষমতা প্রতিষ্ঠিত হয়েছিলো তার অধীনে ‘আল-কুদস’ ছিলো না। দুই. আল-কুদস সহ যেসব অঞ্চলে ইসরায়েল ১৯৬৭ সালে যুদ্ধে থ্রো অধীনস্থ করে নেয় তা ইসরায়েলের অংশ নয়; বরং দখলকৃত। ১৯২৮ সালের প্যারিস চুক্তির পর থেকে আন্তর্জাতিক আইন দখলকৃত এলাকায় দখলদার শক্তির মালিকানা স্বীকার করে না।

সুতরাং দখলদার ইজরাইল আল-কুদস সহ অন্যান্য দখলকৃত এলাকায় কোন বড়ো পরিবর্তন আনবার আইনগত অধিকার নেই। না বসতি স্থাপনের অধিকার রাখে,না কোন বেড়া দাঁড় করাতে পারে যা সেই অঞ্চলকে আলাদা করে দিবে। ২০০৩ সালে ইন্টারন্যাশনাল কোর্ট অফ জাস্টিস এক রায়ে তা বিশদভাবে স্পষ্ট করে ছিলো। প্রমাণিত যে—আন্তর্জাতিক আইনের আলোকে ইজরাইল একটি অবৈধ ও দখলদার শক্তি।

লেখক:আলেম ও গবেষক

বিজ্ঞাপন
আগের সংবাদঅস্ট্রিয়ার সরকারের বিরুদ্ধে মামলা করবে মুসলিমরা
পরবর্তি সংবাদফিলিস্তিনে ইজরাইলি প্রোপাগান্ডার ফ্যাক্ট চেক