ফিলিস্তিন সংকট কেন সবসময় প্রাসঙ্গিক?

মুসান্না মেহবুব

আজ ১৫ মে। ফিলিস্তিনি মুসলমানেরা এ দিনটিকে আল-নাকবা দিবস বা বিপর্যয়ের দিবস হিসেবে পালন করে আসছেন বিগত ৭১ বছর ধরে। ১৯৪৮ সালের ১৪ মে ইহুদিরা সম্পূর্ণ অবৈধভাবে ফিলিস্তিনের ৫৩ ভাগ ভূখণ্ড ঘিরে ঘোষণা করে ইহুদি রাষ্ট্র ইসরায়েলের। তার পরের দিন ১৫ মে বঞ্চিত ও অধিকারহারা ফিলিস্তিনিরা গর্জে ওঠে অন্যায় এ ঘোষণার বিরুদ্ধে। পার্শ্ববর্তী আরব রাষ্ট্রগুলোও যোগ দেয় তাদের সঙ্গে। শুরু হয় যুদ্ধ। ইতিহাস যেটাকে প্রথম আরব-ইসরায়েল যুদ্ধ বলে অভিহিত করেছে।

যুদ্ধ শুরুর এ দিনটাকে স্মরণ করেন ফিলিস্তিনিরা বিপর্যয় বা নাকবা দিবস হিসেবে। বিগত ৭০ বছর ধরে নির্যাতন, উচ্ছেদ, গৃহবিতাড়ন—পাশবিকতা ও নৃশংসতার এমন কোনো কায়দা নেই, যা তাদের ওপর প্রয়োগ করেনি ইহুদিবাদী ইসরাইল। সেই সংকট আজও সমান মাত্রায় সমহারে চলমান।

ফিলিস্তিনিদের এ সংকট কেবল ফিলিস্তিনি মুসলমানদের সংকটই নয়, মুসলিম উম্মাহর প্রতিটা সদস্যের জন্য এ সংকট উদ্বেগের কারণ। নাকবা দিবস উপলক্ষে এ ব্যাপারে আজ আলাপে বসেছিলাম তরুণ আলেম ও ফাতেহ টোয়েন্টি ফোর ডটকমের সম্পাদক ইফতেখার জামিলের সঙ্গে।

ফিলিস্তিনের এ সংকট আমাদের বেলায়ও কেন ও কীভাবে প্রাসঙ্গিক, আলাপচারিতায় বিস্তারিত করে বলেছেন তিনি।

ইফতেখার জামিল বলেন, ‘প্রথমদিকে ব্রিটিশদের সহযোগিতায় ইসরাইল রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠিত হয়। ব্রিটিশরা ফিলিস্তিন দখলের পর সেখানে ইহুদিদের পুনর্বাসনের ব্যবস্থা করে। তাদের সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ডে সব রকমের সাহায্য প্রদান করে। সাম্প্রতিককালে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ইসরাইলকে নিঃশর্ত সাহায্য করে যাচ্ছে। পাশাপাশি এই দীর্ঘ সময়ে রাশিয়া বা চীনের সাথেও তাদের সরাসরি কোনো বিরোধ তৈরি হয়নি। অর্থাৎ বর্তমান বিশ্বব্যবস্থার ক্ষমতা কাঠামোর সাথে ইসরাইল সরাসরি জড়িত। বর্তমান বিশ্বব্যবস্থার জুলুমের সাথে তাদের প্রত্যক্ষ যোগাযোগ আছে। গত শতককে বিশ্বের অন্যতম প্রধান সহিংস শতক হিসেবে দেখা হয়। এই শতকে মুসলমানদের বিপর্যয়ের পরিমাণ ও পরিধিও কম নয়। ফলে এ সব কিছুর সাথেই ইসরাইলের সংযোগ আছে। ব্রিটিশ ও আমেরিকান সাহায্য এবং রশিয়া ও চীনের সাথে সমঝোতায় এটা স্পষ্টভাবেই বোঝা যায়।’

ইফতেখার জামিল আরও বলেন, ‘আঞ্চলিকভাবেও যদি দেখেন, উপমহাদেশে ভারতীয় আগ্রাসনের প্রত্যক্ষ মদদদাতা হচ্ছে ইসরাইল। উপমহাদেশে ভারত যতবার সামরিক হস্তক্ষেপে জড়িত হয়েছে, ততবার ইসরাইল তাদেরকে প্রত্যক্ষ সাহায্য করেছে। সর্বশেষ পাকিস্তানের সাথে সংঘর্ষের সময়েও ইসরাইল ভারতকে বিশেষভাবে সাহায্য করেছে। পাকিস্তান যদিও আলাদা রাষ্ট্র, কিন্তু মনে রাখতে হবে, চীনের সাথে ভারতের সংঘর্ষে ইসরাইল কিন্তু পাশে থাকে না। অর্থাৎ মুসলিম আইডেন্টিটিটা সাহায্যের ক্ষেত্রে এখানে মুখ্য হয়ে দাঁড়াচ্ছে। পাশাপাশি মিয়ানমারের রোহিঙ্গা গণহত্যাতেও তাদের স্পষ্ট অংশগ্রহণ আছে। আন্তর্জাতিক সংবাদ মাধ্যম আল-জাজিরা এক অনুসন্ধানে এই বিষয়ে বিস্তারিত তথ্য দিয়েছে। মধ্যপ্রাচ্য বিষয়ক বিশেষজ্ঞ রবার্ট ফিস্ক দি ইন্ডিপেন্ডেন্ট পত্রিকায় প্রকাশিত কলামেও এই বিষয়ে বেশ কিছু তথ্য দিয়েছেন। এভাবে ভাবলে দেখবেন, আঞ্চলিকভাবেও ইসরাইল আমাদের জন্য অনেক বড় হুমকি। উপমহাদেশে সাম্প্রদায়িক সংঘাত বাড়ছে। রোহিঙ্গা ইস্যু থেকে শুরু করে আসাম, কাশ্মীর ও শ্রীলংকা—ক্রমশ অস্থির হচ্ছে উপমহাদেশ। এই অস্থিরতায় ইসরাইলের স্পষ্ট সহযোগিতা আছে।

‘ফলে যেহেতু আন্তর্জাতিক ও আঞ্চলিক ক্ষমতা-কাঠামো এবং জুলুমের সাথে ইসরাইল জড়িত, তাই ফিলিস্তিনের সংকট কেবল ফিলিস্তিনের নয়, ফিলিস্তিনের সংকট আমার আপনার সবার। বাংলাদেশ থেকে আপনি ইসরাইলের মোকাবিলা না করলে আঞ্চলিকভাবে বিপদের মুখে পড়বেন। এমনিতেই রোহিঙ্গা সংকটে আমরা খাবি খাচ্ছি। পশ্চিম বাংলাতেও সাম্প্রদায়িক সহিংসতা বাড়ছে। ফলে সতর্কতার কোনো বিকল্প নেই।’

ইসরাইল যে সংকট তৈরি করেছে ফিলিস্তিনে, তা নিছক রাজনৈতিক কোনো সংকট নয়, ধর্মতাত্ত্বিক ব্যাপারটা রাজনীতির চেয়েও এখানে বেশি গুরুত্বপূর্ণ উল্লেখ করে ইফতেখার জামীল বলেন, ‘খ্রিষ্টানদের একটা বড় অংশের বিশ্বাস মতে একটা স্বতন্ত্র ইহুদি রাষ্ট্র গঠনের পরেই ঈসা আলায়হিস সালাম পুনরায় পৃথিবীতে আসবেন। ফলে ঈসা আলায়হিস সালামের আগমনের পথ পরিষ্কার করার জন্য তাদের মতে ইসরাইলের জুলুম ও দখলদারি বৈধ। অর্থাৎ ইহুদি ও খ্রিষ্টানদের ভ্রষ্ট ধর্মীয় চিন্তা এই জুলুমে বৈধতা যোগাচ্ছে। এতে বর্ণ ও বিশ্বাসগতভাবে মুসলিমবিদ্বেষ কাজ করে।’

ইহুদি ও খ্রিষ্টান ধর্মের স্বরূপ এবং ইসলামের সঙ্গে ধর্মদুটোর পার্থক্য ব্যাখাও করেন ইফতেখার জামিল। তিনি বলেন, ‘ইহুদি জাতীয়তাবাদী ধর্ম। অর্থাৎ তারা তাদের ধর্মকে তাদের জাতিগত সীমানায় সীমিত রাখতে চায়। তাদের জাতীয়তাকেই তারা শ্রেষ্ঠ ও প্রধান মনে করে। মনে রাখতে হবে, এখান থেকেই কিন্তু বর্ণবাদের জন্ম। আপনি যখন নিজেকে শ্রেষ্ঠ বলবেন, তখন অন্য সবার প্রতি এক রকমের ঘৃণা তৈরি হবে। এখানে উল্লেখ করা দরকার যে, ইসলাম জাতীয়তাবাদী ধর্ম না। ইসলাম বলে, তাকওয়া ব্যতীত কোনো অনারবের ওপর আরবের প্রাধান্য নাই। পাশাপাশি খ্রিষ্টান চিন্তায় সামগ্রিকতা বলে একটা ধারণা আছে, অর্থাৎ সবার জন্য খ্রিষ্টান ধর্ম মানা জরুরি। না মানলে জোর করে মানতে বাধ্য করা যাবে। খ্রিষ্টানরা মনে করে এই বাধ্যতা ব্যক্তির কল্যাণেই করা হচ্ছে। এ হিসেবেই কিন্তু স্পেনে মুসলমান ও ইহুদিদের জোর করে খ্রিষ্টান বানানো হয়েছে। দাস ব্যবসার বৈধতাও এখান থেকেই গৃহীত। বর্তমানে প্রচলিত আধুনিক জাতিরাষ্ট্র দাঁড়িয়ে আছে এই দুই চিন্তার ওপর, অর্থাৎ জাতীয়তাবাদ ও কেন্দ্রীয় রাষ্ট্র ধারণার ওপর। আধুনিক রাষ্ট্রের জুলুমের মূল ভিত্তি এখান থেকেই রচিত হয়েছে।’

৭০ বছর ধরে চলে আসা এ সংকট ও মুসলিম-নিষ্পেষণ আমাদের তথা বিশ্ব মুসলিম উম্মাহর জন্য কীভাবে প্রাসঙ্গিক, এর ব্যাখ্যায় ইফতেখার জামিলের মতামত—’মুসলমানরা বর্তমান বিশ্বব্যবস্থার জুলুম ও আধিপত্যবাদের বিরুদ্ধে প্রধান শক্তি। যদিও মানুষ এখন দুনিয়াবি জীবনে অনেক বেশি ব্যস্ত। সংস্কার ও মূল্যবোধের চেয়ে প্রাত্যহিক লিপ্ততা ও বিনোদনে অধিক চিন্তিত। মুসলিম বিশ্বের অনেক শাসক নিজেদের ক্ষমতা রক্ষার জন্য জুলুমের সাথে হাত মিলিয়েছেন। সাধারণ মানুষের মধ্যেও বস্তুবাদী চিন্তা বাড়ছে। ত্যাগ ও মূল্যবোধ কমে যাচ্ছে। ফলে এখন ফিলিস্তিনের লড়াই আরও প্রাসঙ্গিক হয়ে উঠছে। কেননা মানুষ এখন ঝুঁকি নিতে চায় না, প্রাত্যহিক নিরাপত্তায় কাটাতে চায় সময়। একজন বস্তুবাদী মানুষের পক্ষে কোনোভাবেই এই বিশ্বব্যবস্থার বিরুদ্ধে দাঁড়ানো সম্ভব নয়। এই বিশ্বব্যবস্থা তো বিশাল ও বিপুল। ফলে এই লড়াইয়ের আধ্যাত্মিক গুরুত্বও অনেক। ইসরাইল ও পশ্চিমা বিশ্ব ফিলিস্তিনিদের অনেক রকম অর্থনৈতিক লোভ দেখাচ্ছে। জীবন্ত কারাগারে আটকে রাখছে। তবুও তাঁরা অর্থনৈতিক স্বার্থকে প্রাধান্য না দিয়ে লড়াই করে যাচ্ছেন। এদিক দিয়ে ভাবলে দেখবেন, ফিলিস্তিনের যুদ্ধ আমাদের সময়ের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ও প্রাসঙ্গিক যুদ্ধ।’