বাংলাদেশের কিংবদন্তি মুহাদ্দিস মাওলানা হেদায়াতুল্লাহ

কাজী মাহবুবুর রহমান

বাংলাদেশের ইলমে হাদিসের আকাশে এক উজ্জ্বল নক্ষত্র ছিলেন মাওলানা হেদায়াতুল্লাহ। সকলের কাছে তিনি ‘মুহাদ্দিস সাহেব হুজুর’ নামে পরিচিত ছিলেন। ইলমে হাদিসের যেসকল একনিষ্ঠ খাদেম রাসুলে আরাবি সাল্লাল্লাহু আলায়হি ওয়া সাল্লামের মিরাসের এই দায়িত্ব পালন করতে গিয়ে পার্থিব ভোগ-বিলাস হাসিমুখে ত্যাগ করেছেন, আমাদের উপমহাদেশে তাঁদের মধ্যে অন্যতম হলেন মাওলানা হেদায়াতুল্লাহ রহ.।

জন্ম ও বংশ
আনুমানিক ১৯০৮ সালে তৎকালীন কুমিল্লা জেলার চাঁদপুর মহকুমার মুমিনপুর নামক গ্রামের এক সম্ভ্রান্ত মুসলিম দীনদার পরিবারে জন্মগ্রহণ করেন হজরত মুহাদ্দিস সাহেব হুজুর৷ তাঁর পিতার নাম জনাব মুবারক উল্লাহ। তিনি ছিলেন একজন আল্লাহভীরু আলেম। আর মায়ের নাম মুহতারামা হাসনা বানু৷ হজরত মুহাদ্দিস সাহেব রহ.-এর ছিল আরও চার ভাই ও তিন বোন। তাঁরা পাঁচ ভাইয়ের সকলেই আল্লাহর অসীম রহমতে আলেম ছিলেন।

শিক্ষাজীবন
পারিবারিক ঐতিহ্যের ফলে শৈশব থেকেই হজরত মুহাদ্দিস সাহেব হুজুর ছিলেন সম্পূর্ণ দীনদার ও সুন্নতের অনুসারী। পরিবারের অন্যান্য সদস্যদের দীনি জীবন যাপন তাঁর জীবনে বিরাট প্রভাব ফেলে। এবং শিক্ষার হাতেখড়িও নিজগৃহে বড় ভাইদের হাতেই হয়৷ স্বীয় পরিবারের শিক্ষা সমাপ্ত করে তৎকালীন প্রখ্যাত বিদ্যাপীঠ ব্রাহ্মণবাড়িয়ার জামিয়া ইউনুসিয়াতে চলে যান। সেখানে থেকেই দীর্ঘদিন পর্যন্ত পর্যায়ক্রমে উর্দু, ফারসি, আরবি ভাষা এবং ফিকহ, তাফসির, মানতেক, বালাগাত, ফালসাফাহ ইত্যাদি শাস্ত্রে ব্যুৎপত্তি অর্জন করেন। অতঃপর ইলমে হাদিসের উপর উচ্চশিক্ষা লাভের অদম্য বাসনা নিয়ে পাড়ি জমান উপমহাদেশের ইসলামি শিক্ষার প্রাণকেন্দ্র দারুল উলুম দেওবন্দের পথে।

দারুল উলুম দেওবন্দের ভর্তিপরীক্ষায় তিনি সর্বোচ্চ নম্বর লাভ করেন৷ এতে করে পরীক্ষকগণ বিস্মিত হয়ে জানতে চান, আপনি কার নিকটে হাদিস পড়েছেন?

হেদায়াতুল্লাহ সাহেব উত্তরে বলেন, মাওলানা শামসুল হক ফরিদপুরীর কাছে।

তাঁর উত্তর শুনে পরীক্ষকগণ ভীষণ সন্তুষ্ট হন এবং বলেন, এ কথা যদি আপনি আমাদেরকে আগে অবহিত করতেন তাহলে আপনার ভর্তিপরীক্ষা দেয়ারই কোনো প্রয়োজন ছিল না৷

সেদিনের পর থেকে একটানা ছয় বছর দারুল উলুম দেওবন্দে ইলম অর্জনে ডুবে থাকেন তিনি৷ এই সময়ে শায়খুল আরব ওয়াল আজম মাওলানা হুসাইন আহমদ মাদানি রহ.-এর হাদিসের দরসে অংশগ্রহণ করেন।

মারেফতের শিক্ষা
ইলমে দীনের শিক্ষার পাশাপাশি তিনি নিরত ছিলেন আধ্যাত্মিক শিক্ষায়ও। দারুল উলুম দেওবন্দে শিক্ষা চলাকালীন অবস্থাতেই তিনি উপমহাদেশের কিংবদন্তি আলেম মাওলানা আশরাফ আলি থানভি রহ.-এর সঙ্গে আধ্যাত্মিক সম্পর্ক স্থাপন করেন৷ প্রতি সপ্তাহের শুক্রবারে তিনি মাওলানা থানভির সাহচর্যে থেকে মারেফতের সবক হাসিল করতেন৷

পারিবারিক জীবন
দেওবন্দের পাঠপর্ব শেষ করে দেশে ফিরে তিনি সংসার জীবনে প্রবেশ করেন। নোয়াখালী জেলার রায়পুরে এক সম্ভ্রান্ত আলেম পরিবারে তিনি বিবাহ করেন। দেশের অন্যতম বিশিষ্ট আলেমে দীন, আমিরে শরিয়ত মাওলানা হাফেজ্জী হুজুর রহ. ছিলেন তাঁর স্ত্রী মুহতারামার বৈমাত্রেয় ভাই। মুহাদ্দিস সাহেবের ঔরসে ৩ পুত্র ও দুই কন্যা সন্তানের জন্ম হয়।

কর্মজীবন
দেশে ফিরে এসে তিনি প্রথমেই মাওলানা হাফেজ্জী হুজুর রহ.-এর প্রতিষ্ঠিত বড় কাটারা মাদরাসায় হাদিসের অধ্যাপনা শুরু করেন৷ সেখানে এক যুগেরও বেশি সময় অতিবাহিত করে চলে আসেন ঐতিহ্যবাহী জামিয়া কুরআনিয়া লালবাগ মাদরাসায়। এখানে একটানা ৩৪ বছর হাদিসের পাঠদান অব্যাহত রাখেন। এবং ১৩৮৮ হিজররিতে লালবাগ জামিয়ার প্রতিষ্ঠাতা মুজাহিদে আজম মাওলানা শামসুল হক ফরিদপুরী রহ. তাঁকে লালবাগ জামিয়ার প্রিন্সিপাল নিযুক্ত করেন। ১৪০৪ হিজরি সাল পর্যন্ত দীর্ঘ ১৬ বছর অত্যন্ত নিষ্ঠার সঙ্গে তিনি এই দায়িত্ব পালন করেন। এরপর ১৯৮৬ সনে তিনি জামিয়া মাদানিয়া যাত্রাবাড়িতে হাদিস অধ্যাপনায় নিয়োজিত হন৷ এবং আমৃত্যু সেখানেই ইলমের খেদমতে লেগে ছিলেন৷

স্বভাব-প্রকৃতি
ব্যক্তিগত জীবনে হজরত মুহাদ্দিস সাহেব হুজুর রহ. সাহাবায়ে কেরামের আদলে গড়া একজন নম্র-ভদ্র, কোমল স্বভাবের মানুষ ছিলেন। অত্যন্ত লাজুক ও স্বল্পভাষী ছিলেন। এবং খুবই অনাড়ম্বর জীবন যাপন করতেন। রাগ করতেন খুবই কম৷ তবে দীনি বিষয়ে কোনো অবহেলা বা আদবের ঘাটতি সহ্য করতে পারতেন না। নিজের কাপড় নিজে পরিস্কার করতেন। এবং নিজের বাজার নিজেই করতেন। এ ছাড়াও অন্যান্য ব্যক্তিগত কাজে অন্য কারো হস্তক্ষেপ বিশেষ পছন্দ করতেন না। মোটা ও একেবারে সাধারণ কাপড়ের পোশাক পরিধান করতেন৷ কাঁধে সর্বদা একটা গামছা থাকত। এসবই ছিল তাঁর নিরহংকার ও সরল চরিত্রের উদাহরণ।

ইন্তেকাল
হাদিসে নববির মহান সেবক, দীনের এই নিঃস্বার্থ আলেম শেষ জীবনে এসে লিভারের রোগে আক্রান্ত হন। এবং ২২শে মার্চ ১৯৯৬ সালে ৮৮ বছর বয়সে শুক্রবার বাদ ফজর ইন্তেকাল করেন। ইন্নালিল্লাহি ওয়া ইন্না ইলাইহি রাজিউন। তাঁর জানাজার নামাজের ইমামতি করেন তাঁর সুযোগ্য পুত্র মাওলানা হিফজুর রহমান। অতঃপর তাঁকে তাঁর শেষ কর্মস্থল জামিয়া মাদানিয়া যাত্রাবাড়িতে সমাহিত করা হয়।