বাংলা সাহিত্যের তরুণ মন

সালাহ উদ্দীন আলভী:

একটি ভাষা, যার উৎস নিয়ে ঔৎসুক্যের শেষ নেই। নানা বিশেষণে, ব্যতিক্রম আঙ্গিকে, নানাবিধ কল্পে তার বহুরূপী চেহারা ফুটে ওঠে। কেউ তার কথ্যভাষার মন্ত্রে বশীভূত, কেউ আবার আঞ্চলিকতার বর্গে পুলকিত, কেউ বা শব্দের মধুর মায়ায় আন্দোলিত।

তাকে যখন পল্লীবালার মুখে শুনি, মনে হয় তার এই রূপই সবচেয়ে সুন্দর। যখন সদ্য মুখ ফোটা শিশু ‘আম্মা’ বলে ডাকে, মনে হয় এরচেয়ে সুন্দর কথার কোনো আবেদন নেই। আবার যখন সে গান/কবিতার পটে সুরের কিত্তি লুটায়, মনে হয় যুবতী এক মাতৃভাষা বুকের হিজল গহীন বনে মনের সুখে নৃত্য করছে।

বাংলা ভাষার কতোগুলো রূপ আছে, তার বিবরণ দিতে গেলে পর্বতপ্রমাণ হয়ে যাবে । আমরা বরং এর সাহিত্যের কথা বলি। হয়তো কিছু উদ্ধার করা যেতে পারে। হয়তো এমন কিছু উঠে আসতে পারে, যা পর্বতপ্রমাণ নয়, তবে নতুন। হয়তো চেনা কথা, অথচ দুর্বোধ্য।

কোনো মজলিসে একশোজন লেখক থাকলে, তাঁদের পঞ্চাশজনই বলতে পারেন না সাহিত্য কী। এটা কাউকে আঘাত করতে গিয়ে বলা, এমন নয়। বাস্তবে এর উদাহরণ পাওয়া যায় চোখ মেললেই। অসংখ্য লেখক তব্দা মেরে গেছেন অসংখ্যবার। প্রশ্ন করলেই মিনমিন করেন। ভাবখানা এমন, যেন লেখক হওয়ার জন্য তাঁরা এতোই ব্যস্ত হয়ে গিয়েছিলেন যে, সাহিত্য শব্দটির পেছনে সুপ্ত বিদ্যা অর্জন করতে পারেননি। কেউ হয়তো শব্দের অর্থ বলতে পারেন, মর্ম, পরিভাষা বুঝিয়ে দিতে পারেন না। আফসোস হয়, তারা নিজেদের পরিচয় দেন লেখক। অথচ, সাহিত্য না জানা একজন মানুষ লেখক হয় কী করে, ভেবে অবাক লাগে।

সাহিত্য জানা মানে একটি ভাষার আগাগোড়া রপ্ত করা। ভাষার উপলব্ধি, তার স্বরূপ, ব্যাকরণ, কথ্যবিধান, বানানরীতি, শব্দবিদ্যা, বাক্যবিজ্ঞান—সব। সাহিত্যের মূলপাঠ হচ্ছে, একটি দৃশ্য যেমন, যেভাবে দেখতে পাওয়া যায় তার ঠিক ঠিক অবয়বে লেখার মাধ্যমে উপস্থাপন করা। পাঠক যেন দেখতে পাচ্ছেন কী ঘটেছে, কী হয়েছে। এখন যদি শব্দের দিকে মনোযোগ দিই, দেখতে পাবো তার অর্থ বলছে ‘সহিতের মিলন’। সহিতের মিলন মানে যার ভেতর সবকিছুর সহযোগ আছে। কথার। ভাষার। বিবরণের। দৃশ্যের। যদি সবকিছু খাপে খাপ হয়, তবেই বলা যাবে ‘লেখায় সাহিত্য আছে’।

তরুণদের লেখালেখির হিড়িক দেখলে মনে প্রশান্তি আসে। সাথে লেখার দুরবস্থা দেখে আহত হতে হয়। যারা লিখছেন, তাদের কেউই সাহিত্যের প্রতি উৎসাহ বোধ করছেন না। কেউ কেউ লেখক পরিচয় দিয়ে এতো উপরে উঠে যাচ্ছেন যে, বই পর্যন্ত বেরিয়ে গেছে। প্রকাশক মহোদয়গণ কাভারে গোটা গোটা অক্ষরে লিখে দিচ্ছেন ‘বিশিষ্ট কথাসাহিত্যিক’। এসব দেখে এতো বেশি হতাশা ঘিরে বসে যে, বইয়ের ভেতরটা খুলে দেখতে ইচ্ছে করে না। তারা না হয় ব্যবসায়ের জন্য এমন করছেন। কিন্তু লেখক তো শিক্ষিত মানুষ। কিছুটা হলেও পড়েছেন। পড়েছেন বলে লিখতে নেমেছেন। তিনি কি জানেন না যে, তাঁর এখনও পড়ার বাকি? সাহিত্য শব্দের সাথে যার পরিচয় নেই, সে এক লাফে কথাসাহিত্যিক হতে পারে না?

প্রসঙ্গ যেহেতু এসেছে, কথাসাহিত্যের সামান্য পরিচয় দিতে হয়। অনেকে মনে করেন, কথাসাহিত্য মানে সুন্দর কথামালা, বাক্যের বিন্যাস। কিঞ্চিৎ সত্য হলেও এর মূল নির্যাস মোটেও তা নয়। কথাসাহিত্য হচ্ছে একটি লেখার স্থান, সময়, ব্যক্তির উপস্থিতি, অঙ্গভঙ্গি, আচারব্যবহার একটি কথার মাধ্যমে হুবহু উঠে আসা। যদি এই দুঃসাধ্য সাধন করে কেউ দেখিয়ে দিতে পারেন, কিংবা পাঠকের কল্পনাকে সঞ্জীবিত করতে পারেন, তবেই তিনি কথাসাহিত্যিক।

উদাহরণ দিলে বুঝে আসবে। কোনো আসরে যখন গল্প বলা হয়, দেখা যায় অনেকাংশেই গল্প অস্পষ্ট হয়ে আছে। যিনি গল্প বলছেন, ঠিকঠাক বোঝাতে পারছেন না। ফলে শ্রোতা বারবার কৌতূহলী হচ্ছেন। প্রশ্নের পর প্রশ্ন তুলছেন। বক্তা গল্প রেখে জবাব দিতেই ক্লান্ত। আবার এমনও দেখা যায়, কেউ গল্প বলতে গিয়ে গল্পকে এতোই রসময় করে তোলেন যে, প্রতিটি কথা নিশ্ছিদ্র হয়ে উঠে। মুহূর্তে আসর জমিয়ে তোলেন। শ্রোতা কৌতূহল দেখাতে তো পারেনই না, উল্টো এমন এক ভাবনার রাজ্যে চলে যান, যেখানে বক্তার কল্পনা দিয়ে সাজানো থাকে এক ভিন্ন ভাবনালোক। প্রকৃতপক্ষে গল্পের এই মানুষরা জানেন কথার গল্পভাষ্য। কোন জায়গা থেকে গল্পকে মজাদার করতে হয়। কোনখানে গিয়ে কল্পনাকে জাগিয়ে দিতে হয়। ফলে শ্রোতা সহজেই গল্প বুঝতে সমর্থ হোন। গল্পের এই ধরণ অবলম্বনে যারা লেখেন, তারা কথাসাহিত্যিক। যারা গল্পের মাধ্যমে পাঠকের প্রশ্নকে নিষ্কাশিত করতে ব্যর্থ হন, তারা ঘুর্ণাক্ষরেও কথাসাহিত্যিক নন।

আরেকটু পরিষ্কার করি। একবার এক লেখক (প্রকৃত লেখক) একজন প্রকাশকের সাথে গল্প করছিলেন। তাঁরা যেখানে দাঁড়ানো, সেখানটা হাইওয়ে রোড। টিপটিপ বৃষ্টি হচ্ছে, পাশ দিয়ে হুসহাস করে গাড়ি চলে যাচ্ছে। প্রকাশকের হাতে ছাতা। দুজনে এক ছাতার নিচে দাঁড়িয়ে বৃষ্টিকে প্রতিহত করার চেষ্টা করছেন। সাথে চলছে গল্প।
প্রকাশকের প্রশ্ন, আচ্ছা বলুন তো, কথাসাহিত্য জিনিসটা কী? (জেনেশুনেই প্রশ্ন করেছেন। ভাব দেখে মনে হচ্ছে, পরীক্ষা নিচ্ছেন)
লেখক লোকটি উত্তর ভালো করেই জানেন বলে মনে হলো। উত্তর শুনে আরও নিশ্চিত হওয়া গেলো। এভাবে না বলে বলতে হয়, উত্তর শুনে প্রশান্তি পাওয়া গেলো।
লেখকের উত্তর, এই যে আমরা হাইওয়ের কিনারে দাঁড়ানো, বৃষ্টি হচ্ছে, আপনি ছাতা ধরে আছেন, আমি একটা প্যাকেট হাতে দাঁড়িয়ে আছি, মাঝেমধ্যে হুসহাস আওয়াজ করে ভেজা রাস্তায় জল ছিটিয়ে গাড়ি চলে যাচ্ছে, এটা একটা দৃশ্য না? এই দৃশ্যকে লিখে পাঠকের ভাবনায় হুবহু তুলে দিতে পারাটাই কথাসাহিত্য। ধরুন, এই দৃশ্যের সাক্ষী আমরা দুজন। আর কেউ দেখেনি। যদি আর একজন কেউ দেখতো এবং লিখতো, আর আমরা সেই লেখা পড়ে ধরে নিতাম এই দৃশ্য তো আমাদের দেখা। তাহলে নিশ্চিত যিনি লিখেছেন তিনি কথাসাহিত্যিক। কারণ, প্রতিটি কথাকে তিনি ধারণ করেছেন এবং আমাদেরকে তা হুবহু দেখাতে পেরেছেন। গল্পে বিষয়টা যতো সহজ, লেখায় ততোটাই স্পষ্ট। কথার সাথে সাহিত্য, সাহিত্যের সাথে কথার স্পষ্ট যোগসাজশ। ব্যস, কথাসাহিত্য।

কথা বাড়ানো হচ্ছে। তবু কিছু কথার সারসংক্ষেপ বলি। তরুণ খুন মানে উদ্দীপনা, ভাবনার নতুন প্রশাখা। তাই তরুণ চিন্তায় লেখালেখির আগে সাহিত্য উঠে আসা জরুরি। একজন লেখক যদি সাহিত্যিক হন, তিনি অযথা কথার দ্বারা পাঠকের সময় নষ্ট করবেন কম। বিষয়বস্তুর দিকে নজর থাকবে বেশি। তাই ঘুরিয়ে-ফিরিয়ে তিনি যাই বলবেন বিষয়বস্তুর দিকে নজর রেখেই বলবেন। সাথে সাহিত্যের প্রতি থাকবে কঠোর দৃষ্টিপাত। অপরদিকে যিনি শুধুই লেখক, তিনি বিষয়বস্তুর কথা ভাববেন কম, লেখার ভেতরের শব্দাবলিকে ছড়িয়ে-ছিটিয়ে দিবেন বেশি। যাকে ‘গুরুচণ্ডালী দোষ’ বলে। এর দ্বারা পাঠক সহজে বিরক্ত হয়ে উঠবেন এবং লেখককে পরিহার করবেন। অথচ, একজন লেখক পরিত্যাজ্য হতে আসেন না। আসেন স্থায়িত্বের সাথে আধিপত্য করতে। মধ্যযুগের লেখকদের কথাই ধরি। তাঁরা হাজারে হাজারে বই লিখেননি, লক্ষ লক্ষ গল্প সৃষ্টি করেননি। কিন্তু যা দিয়ে গেছেন, তা মহত্তম। আধিপত্য করছে যুগ থেকে যুগান্তরে। কেন করছে? কারণ, তারা ছুঁয়ে দিতে পেরেছিলেন পাঠকের মনের সেই স্পর্শকাতর জায়গাটা, যা ধারণ করতে পারে সৃষ্টির সৃষ্টিশীল মহিমা। একটি গান, অমর গান হয়ে গেছে। একটি কবিতা অমর কবিতা হয়ে গেছে। একটি সনেট, হাজার বছরের ব্যবধানে আধুনিক। একজন রাখাল কবি, স্মৃতিতে চির ভাস্বর। কেন? জবাব একটাই—অনুভূতির অনুভবে তাঁরা মুহূর্তে দখল নিতে পেরেছিলেন। লিখেছিলেন কম। লেখার পেছনে চিন্তা, চিন্তার পেছনে সাধনা, সাধনার পেছনে সাহিত্যযোগ দিয়েছিলেন আমূল। তাই তারা এতোটুকু থেকে উঠে এসে আধিপত্য বিস্তার করেছিলেন বিশ্বময়। এক রবীন্দ্রনাথের কথা ই যদি বলি, শেষ হবার নয়। বাংলা ভাষার আধুনিককালেরও আগে একজন মানুষ লিখেছেন নিজের মতো করে, ঘরোয়া পরিসরে, বিশ্বকে যিনি দেখেননি তেমন, বাংলা ভাষার বেশি বিশ্বভাষার ওপর যার পড়াশোনা খুব বেশি নয়, তিনি হয়ে উঠলেন বিশ্বকবি! কীভাবে? প্রশ্ন করেছি কখনও, নিজেকে? এসব প্রশ্নের জটিল উত্তর অনেকরকম হতে পারে। কিন্তু সরল উত্তর যে নেই, তা নয়। তাদের অধ্যবসায় ছিলো সেরকমই। ঘরে বসে বিশ্বকে শ্রোতামঞ্চ বানাতে পেরেছিরেন সে অধ্যবসায়ের শক্তিতে। বিশ্বের বিভিন্ন ভাষায় অনুদিত হয় তাঁদের লেখা, আমাদের লেখা হাতেগোনা দেশীয় কয়েকজন পাঠকও পড়ে না। ব্যবধানটান চিন্তা করেছি কখনও? পার্থক্য এতো কেন, ভেবেছি একবারও? আমরা তো খালি লিখছি। লেখক হচ্ছি। লেখালেখিকে গ্রহণযোগ্যতা দিতে পারছি কতোটা?

হুমায়ূন আহমেদ বলে একজন লেখককে আমরা চিনি। বাঙালি যাঁর সাহিত্যকে সস্তা বলে উপহাস করে। উপহাস করতে পারে বলেই করে। কারণ, তারা উপহাসই পারে, হুমায়ূন আহমেদের মতো লিখতে পারে না। উপরে কথাসাহিত্য নিয়ে যতোগুলো কথা লিখা হয়েছে, এর প্রতিটি যৌক্তিক পরিভাষা ধারণ করেন হুমায়ুন আহমেদ। জীবদ্দশায় দীর্ঘ তিন তিনটি যুগ যাঁর সাহিত্য পৃথিবীর কাছে সমাদৃত হয়েছে। সময় সময় জনপ্রিয়তা কেবল বেড়েছেই। কেন? তাঁর লেখা সস্তা বলে? না, তার সাহিত্য উপযুক্ত বলে। একজন সমালোচক ঘণ্টার পর ঘণ্টা সমালোচনা করতে পারবেন, কিন্তু ঘণ্টার পর ঘণ্টা চেষ্টা করেও হুমায়ূন আহমেদের মতো দৃশ্য-সাহিত্যে গল্পের বিবরণ দিতে পারবেন না। একজন লেখকের লেখায় কতোটা গদ্যময় ভাব থাকলে তাঁর কল্পনাকে নিজের নিজের কল্পনা মনে হয়, বলতে পারেন? হুমায়ূন আহমেদ তা পেরেছিলেন। তাই মানুষ হিমুকে কল্পনা থেকে বাস্তবে নিয়ে এসেছে। শহরের রাস্তায় নীল শাড়ি পরে রূপারা ঘুরে বেড়ায়। একজন লেখকের সাহিত্য কতো বেশি সার্থক হলে বাস্তবে এতো বেশি পূর্ণতা পায়, বলুন তো!

অনেকবেশি বলেছি। এখন কলম তুলতে চাই। শেষান্তে একটা কথাই বলি—লেখালেখি করুন, আপনারা যদি না লিখেন, কে লিখবে? কিন্তু সাহিত্যের মনের কথা পড়ুন। সাহিত্যের প্রাণের কথাকে পাঠ করুন। এতে করে মানুষ বাংলাভাষাকে পড়বে, ধারণ করবে। বিস্বাদ ভেবে ছেড়ে দিবে না। এমনভাবে লিখুন, যেন আপনি অমর হন। আপনার সাহিত্য স্থায়ী হয়। লেখা হয় আজন্ম সুন্দরের স্বাক্ষর। আমাদের সমস্যা হলো, আমরা নজরুল-ফররুখ হতে চাই। কিন্তু তাদের অনুকরণকে পাশ কেটে যেতে স্বচ্ছন্দ বোধ করি। আমাদের তো উচিত ছিলো, তাঁদের চেয়ে বেশি শ্রম দিই। তাঁদের সৃষ্টির তুলনায় বেশি আগে যাওয়ার কথা ভাবি। কারণ, তাঁরা যা দিয়েছেন, সেটা একটা পর্যায়ে সীমাবদ্ধ। এই প্রর্যায়টুকু মানুষ জেনে গেছে। আমরা যাবো নতুন এক পর্যায়ে। তাঁরা যে পর্যায়কে ছুঁয়ে দেখতে পারেননি এবং মানুষকে দেখাতে পারেননি। আধুনিক প্রযুক্তির বিজ্ঞানপ্রকল্পের মতো। আমাদের উচিত ছিলো সাহিত্যবিজ্ঞানের জগতকে জয় করে আনা। মানুষকে দেখানো, সাহিত্য এক নৃত্যময় বিজ্ঞান। যে বিজ্ঞানের আবিষ্কারক আমরা..

বিজ্ঞাপন
আগের সংবাদনাইজেরিয়ায় ১২ বছরের সহিংসতায় নিহত প্রায় সাড়ে তিন লাখ মানুষ
পরবর্তি সংবাদসোমবার থেকে সারাদেশে কঠোর লকডাউন