বাবা এবং জোছনার আলো

তাহিয়া বুশরা তারান্নুম:

বিষন্ন মনে চুপচাপ বসে আছি নদীর পাড়ে। এলোমেলো ভাবনা মাথায় এসে ভীড় করছে। হঠাৎ দেখি আমার পাশে এসে বসল এক দম্পতি। তাদের সাথে একটা কন্যা সন্তান। ছোট্ট মেয়েটার বয়স চার বছর হবে সম্ভবত। মেয়েটি তার বাবার কোলে বসে আছে আর বাবাকে প্রশ্ন করছে। বাবা, এতো পানি কোথা থেকে আসে? বাবা উত্তর দেয়। মেয়েটা প্রশ্নের পর প্রশ্ন করে আর তার বাবা হাসতে হাসতে তার উত্তর দিয়ে চলে।

আমার কেনো যেনো এমন সুন্দর দৃশ্যটা দেখতে ইচ্ছে করছিল না। আমার চোখ দিয়ে বিরতিহীন পানি পড়ছিল। এ যেনো আষাঢ়ের ঝুম বৃষ্টি। থামার নামগন্ধ নেই।

আমি মনে মনে ভাবলাম আমি এতো হিংসুটে হয়ে যাচ্ছি কেনো! একজন বাবা তার মেয়েকে আদর করছে, তার প্রশ্নের উত্তর দিচ্ছে। তাতে আমার খারাপ লাগছে কেনো? দীর্ঘশ্বাস বেড়িয়ে এলো! আরে আমি যে বাবার ভালোবাসা পেতে চাওয়া এক অভাগিনী।

খুব ছোট বেলায় আমার বাবা মারা যায়। বাবার স্মৃতি আমার কিছুটা মনে আছে। মায়ের কাছ থেকে শৈশবে আমায় নিয়ে বাবার অতি আহ্লাদের গল্প আমি শুনেছি। মা বলতো, আমার জন্মের পর মায়ের আগে বাবা কোলে নিয়েছিল সর্বপ্রথম। আমার গাল চুমু দিয়ে ভরিয়ে দিয়েছে। বাবা বলছিল, আরে মাইয়া তো আমার বহুত সুন্দর হইছে। আমি যে প্রথমে কোলে নিছি, যদি মেয়ে কালো হইয়া যায়। মা বাবার কথা শুনে হাসতে হাসতে গড়িয়ে পড়ার অবস্থা।

বাবা চোখে আমি জোছনার মতো আলোকিত ছিলাম। তাই বাবা আমার নাম রাখলো জোছনা। আমি একটু একটু করে বড় হতে লাগলাম। বাবার আঙ্গুল ধরে আমি হাঁটতে শুরু করেছি। মা সবসময় বলতো বাচ্চারা ঘুম থেকে কান্না নিয়ে উঠে সবার আগে মাকে খুঁজে। তোরা ভাইবোনগুলো খুঁজিস বাবারে। তোদের খাবার খাওয়ায় কে শুনি? তোদের পড়ায় কে? তোর বাবা?

আমি এতো কিছু জানতাম না। শুধু জানতাম বাবা এক মুহূর্ত চোখের আড়ালে চলে গেলে আমার মন সুতা ছেঁড়া ঘুড়ির মতো ছটফট করত। যে বাবার কাছে তার গাত্রবর্ণের মেয়েকে জোছনার মতো অলৌকিক সুন্দর লাগে, সে বাবার মায়াকে উপেক্ষা করার কোনো ধৃষ্টতা কি আমার থাকতে পারে?

মিডল ক্লাস বলতে যা বোঝায় আমরা হয়ত তার চেয়েও দুর্বল ছিলাম। কিন্তু বাবা আমার সামনে একজন হাতেম তায়ির চরিত্রে রূপান্তরিত হতেন। যা চাই তাই পাবি জোছনা!

যদিও শৈশবের বায়না ধরার বয়স পার করে যখন কিশোরী বয়সে কিছুটা বুঝতে শুরু করি তখন বাবার আর্থিক সঙ্গতির কথাও চিন্তা হতো। কখনো কোনো খাবারের হোটেলে খেতে বসে বাবার পকেটের চিন্তাও বাদ যেতো না এতে।

আমি এখনো রাতে ঠিক করে ঘুমাতে পারিনা, বাবার স্মৃতি আমাকে ঠিক করে ঘুমাতে দেয় না। আমার বালিশটা আঁকড়ে ধরে কাঁদতে থাকি। আমি কেবল ভাবি আমি যদি আমার বাবাকে জড়িয়ে ধরে আরেকবার কাঁদতে পারতাম, তাহলে মনে হয় আমার জমে থাকা কষ্ট বাষ্প হয়ে উড়ে যেতো।

এক বিকেলে আমার শিক্ষক বাবা চলে গেলেন না ফেরার দেশে। আর তিনি ফিরবেন না! আর কারো কাছে লাল ফ্রকের জন্য বায়না ধরতে পারবো না। এ না পারার আক্ষেপ কি আজন্মই থাকে মানুষের?

আমার বাবা চাইতেন আমি যেনো বড় হয়ে মানুষের জন্য কিছু করি। যেনো বাবার মুখ উজ্জ্বল করি। একজীবনের প্রাপ্তি কিংবা অপ্রাপ্তির কমতি নেই আমার। কিন্তু অপ্রাপ্তিতে দুঃখ পেয়ে অথবা প্রাপ্তিতে খুশি হয়ে বাবাকে জড়িয়ে ধরার মুহূর্ত তো আর নেই আমার কাছে। এ দোদুল্যমান জীবনে সঙ্গী সাথির তো অভাব নেই। কিন্তু নির্ভরতার সেই আলো! যে আলো আমাকে ডাকতেন আসমানের জোছনা। সে আলো আমি কোথায় পাবো।

নীলিমার সাথে হাসপাতালের করিডরে এতক্ষণ ধরে বাবার গল্প বলতে বলতে খেয়াল হলো এখন রাত একটা বেজে ত্রিশ মিনিট। নীলিমা একটা ছোট্টো দীর্ঘশ্বাস ফেলে হাতের উল্টো পিঠ দিয়ে চোখ মুছলো। হয়ত তার হারিয়ে যাওয়া বাবার কথা মনে পড়েছে।

বাবারা সব সন্তানের কাছে একটা আকাশ। আর আমি সেই আকাশের জোছনা। জোছনার সেই বিশাল আকাশটা নেই। তাহলে জোছনার কি আলো থাকতে পারে!

বিজ্ঞাপন
আগের সংবাদকর্মব্যস্ত ঈদ আনন্দ
পরবর্তি সংবাদএকজন অভ্র এবং বখতিয়ারের জ্বিন