বাড়ছে তালাক : কীভাবে দেখছেন ধর্মীয় ব্যক্তিত্বরা

মুসান্না মেহবুব

ঘরের বাইরের জীবন যতটা অস্থির, তারচেয়ে বেশি অস্থির হয়ে উঠছে ঘরের ভেতরের জীবন। চার দেয়ালে ঘেরা ঘর শুধু ঘর-ই নয়, শান্তি-সুখের একমাত্র ঠিকানা। আঁতকে ওঠার মতো খবর হলো সুখের ঠিকানা এখন আর সুখকর নয় মানুষের কাছে। তাই হন্য হয়ে ঘর ছাড়ার, সংসার ভাঙার মিছিলে যোগ দিয়েছে সবাই। এ মিছিলের শীর্ষে আছে রাজধানীর মানুষ। লক্ষণীয় ব্যাপার হচ্ছে, তালাক বা বিচ্ছেদের এই আবেদন পুরুষের চেয়ে নারীরা করছেন বেশি। এই বেশির মাত্রা ঢাকার কোনো কোনো এলাকায় দ্বিগুণ-তিন গুণ পর্যন্ত ছাড়িয়ে গেছে। শুধু রাজধানী ঢাকার দুই অংশের গত ৬ মাসের হিসাব বলছে, প্রতি ৫০ মিনিটে একটি সংসার ভাঙার আদেন জমা পড়েছে।

ঢাকা উত্তর ও দক্ষিণ সিটি কর্পোরেশনের এক-দুটো অঞ্চল ছাড়া বাকি অঞ্চলগুলোর তালাকের সংখ্যা শুনলে চোখ কপালে উঠতে পারে যে কারোরই। সিটি কর্পোরেশনের আঞ্চলিক নির্বাহী কর্মকর্তাদের থেকে পাওয়া তথ্য অনুযায়ী এ বছরের জানুয়ারি থেকে জুন পর্যন্ত তালাকের আবেদন জমা পড়েছে মোট ৪৫৫৭টি। সে হিসেবে গড়ে দেখা গেছে প্রতি ৫৫ মিনিটে একটি করে ঘর ভাঙার আবেদন জমা পড়ছে কেবল ঢাকা শহরেই। পর্যবেক্ষকরা বলছেন, সিটি কর্পোরেশনে আনুষ্ঠানিক আবেদন জমা দেওয়া ছাড়াও ঘর ভাঙার ঘটনার সংখ্যা কম নয়। বিভিন্ন মাদরাসার ফতোয়া বিভাগে আগত আবেদন ও জিজ্ঞাসার নথি সমন্বয় করলে এ সংখ্যা দ্বিগুণের চেয়েও বেশি দাঁড়াতে পারে।

তালাকের এই প্রবণতা এবং ঘরভাঙার পরিসংখ্যান দেখে ধর্মীয় অঙ্গন হতবাক। তাঁরা বলছেন, তালাকের এই প্রবণতা পারিবারিক বন্ধনের জন্য বড় ধরনের হুমকি।

সম্মিলিত কওমি মাদরাসা শিক্ষাবোর্ড আল হাইয়াতুল উলইয়া লিল জামিয়াতিল কওমিয়ার কো চেয়ারম্যান মাওলানা আশরাফ আলি বলেন, তালাকের এই পরিসংখ্যান রীতিমতো উদ্বেগের বিষয়। এটা আমাদেন সমাজের জন্য একটা অশনি সংকেত। ইসলাম-বহির্ভূত জীবনাচারের কারণেই মূলত স্বামী-স্ত্রীর মধ্যে মনোমালিন্যের সৃষ্টি হচ্ছে এবং তা তালাক পর্যন্ত গিয়ে পতিত হচ্ছে।

আল্লামা আশরাফ আলির এ কথার সঙ্গে একমত পোষণ করে চট্টগ্রামের বিশিষ্ট ইসলামি চিন্তাবিদ ও লেখক ড. আ ফ ম খালিদ হোসেন ফাতেহ টোয়েন্টি ফোরকে বলেন, আকাশসংস্কৃতি, ইন্টারনেট, সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ও মোবাইল ফোনের অবাধ ব্যবহার সংসারভাঙার এই ব্যাপক প্রবণতার জন্য দায়ী। তাছাড়া স্বামী-স্ত্রী পরস্পরের অধিকার আদায়ের ব্যাপারে সচেতন না থাকা, দুজনের মধ্যে বোঝাপড়ার অভাবের কারণেও তালাক পর্যন্ত গড়াচ্ছে দাম্পত্য সম্পর্কগুলো।

ড. আ ফ ম খালিদ বলেন, এই সমস্যাগুলো ছাড়া আরও একটা সমস্যা আছে এখানে। সেটা হচ্ছে স্বামী স্ত্রীদের অনেকে তার সঙ্গী বা সঙ্গিনীর শারীরিক কিংবা মানসিক তৃপ্তিটা অনেক সময় দিতে পারে না৷ কীভাবে নিজের সঙ্গীকে তৃপ্ত ও আনন্দিত রাখতে হয়, সে ব্যাপারে প্রাথমিক জ্ঞানটুকুও নেই এ দেশের অধিকাংশ দম্পতির।

ড. আ ফ ম খালিদ হোসেন বলেন, এই সমস্যাগুলো দূর করার জন্য আসলে ব্যাপকভাবে সবাইকে সচেতন হওয়া ছাড়া উপায় নেই। আমরা যে সমাজে বসবাস করছি, সমাজটাই এখন পঁচে গেছে, যার ফলে মানুষ অনৈতিকতার দিকে ধাবিত হচ্ছে ব্যাপকহারে, দাম্পত্য জীবনে তৈরি হচ্ছে কলহ, ভাঙছে সংসার।

ড. আ ফ ম খালিদ বলেন, রাষ্ট্র থেকে নিয়ে সমাজের প্রতিটা মানুষ, সবাইকে আমাদের দায়িত্বশীল ও সচেতন হতে হবে৷ অনৈতিকতা ও পাপাচার থেকে প্রথমে নিজেকে মুক্ত রেখে নিজের আয়ত্তের ভেতরে থাকা লোকজনকেও তা থেকে বাঁচিয়ে রাখার চেষ্টা করতে হবে। তাহলেই কেবল সম্ভব সামাজিক এ অবক্ষয় থেকে উঠে আসা।