বিদেশি

রাকিবুল হাসান

বিকেলটা সন্ধ্যে ছুঁই ছুঁই। একটা নিরুত্তাপ বিকেল সূর্যের হলুদ আভা ছড়িয়ে, মায়া বাড়িয়ে ডুবে যাচ্ছে কপিলি নদীর নিস্তরঙ্গ পানিতে। কেউ দেখছে, কেউ দেখছে না। দলবেঁধে উড়ে যাওয়া পাখিগুলো বিকেলের মায়া বুঝে না। ওরা বুঝে বিকেল হলেই ঘরে ফিরতে হয়। সূর্যের হলুদ আভা তাদের ডানা স্পর্শ করল কি না, তা তাদের দেখার বিষয় না। তবে নদীর পাড়ে বসে একটি বাচ্চা খুব মনোযোগ দিয়ে ডুবে যাওয়া সূর্যটিকে দেখছে। তার কাছে মনে হচ্ছে কপিলি নদীতেই অন্তর্লীন হয়ে যাচ্ছে পৃথিবীর সবচেয়ে সুন্দর দৃশ্যটি।

আবদুল হক তাড়া দিলেন, আহমদ চল বাড়ি যাই।

আহমদ ডাক উপেক্ষা করে বলল, আরেকটু থাকি!

এমন অবেলায় বাইরে থাকা ভালো না। একটু পর আজান দিবে। নামাজ পড়তে হবে না?

আহমদ মাথা দোলায়। বসা থেকে উঠতে উঠতে পেন্ট ঝাড়ে। আমিও যাবো মসজিদে।

আচ্ছা।

আবদুল হক কপিলি নদীর ঢাল বেয়ে নামেন অজু করার জন্য। নদীটির পানি যেমন ঠাণ্ডা তেমনি আরামদায়ক। মুখে পানির ঝটকা দিলে সব অবসাদ দূর হয়ে যায়। কিন্তু আজ ব্যতিক্রম ঘটল। পানির ঝাপটা মুখে দিতেই স্মৃতি যেন টনটন করে উঠল। চোখটা জ্বালা করে উঠল পুরাতন কিছু দৃশ্যের চমকে ওঠা হাওয়ায়। যার মুখোমুখি হতে চায় না মানুষ, অবচেতন মন তার সামনে নিয়েই দাঁড় করায়। পুরাতন দগদগে ঘা তাজা করে বড় আনন্দ পায় স্মৃতি। আবদুল হকের পুরাতন ঘা-টা কপিলি নদীর পানির স্পর্শে আবারও তাজা হয়ে উঠল।

১৯৮৩ সালের ১৮ ফেব্রুয়ারি। উনুনে রুটি সেঁকছেন শাহিদা। পাশে বসে রুটি খাচ্ছেন আবদুল হক। জোয়াল কাঁধে একটুৃপর বের হবেন চাষ দিতে। শাহিদা রুটির একটা টুকরা আবদুল হকের মুখে তুলে দিতে দিতে বললেন, সোজা ক্ষেতে যাইবা। আসু’র ( অল আসাম স্টুডেন্টস ইউনিয়ন) লোকেরা চারদিকে নাকি ওঁৎ পেতে আছে। মিটিং মিছিলে যাইবা না।

আবদুল হক নীরবে রুটির টুকরাটা শেষ করে বললেন, গতকাল পুলিশের কাছে গিয়েছিল নেতারা। পুলিশ নিরাপত্তা দিবে আমাদের। আমরাও এদেশে জন্মগ্রহণ করেছি। ওদের আন্দোলনেই কি আমরা বিদেশি হয়ে যাবো? এদেশ থেকে আমাদের বের করে দিবে?

গলাটা নীচু করে শাহিদা বললেন, শুনতাসি আজ নাকি ওরা কিছু একটা করবে। আমার ভয় লাগতাসে।

আবদুল হক শাহিদার কপালে আলতো করে চুমু খেয়ে বললেন, কিছু হবে না। এই চুমুটা হলো তোমার রক্ষাকবচ। ভয় কিসের।

আবদুল হক জোয়াল কাঁধে বেরিয়ে যান। তার মুখে লেগে থাকে শাহিদার রুটি এবং চুমুর বেহেশতি স্বাদ।

আবদুল হক ক্ষেতে গিয়ে জোয়ালটা মাত্র নামিয়েছেন কাঁধ থেকে, শুনতে পেলেন চারদিকে চিৎকার-চেচামেচি। তিনি দেখতে পেলেন দাউদাউ করে জ্বলতে শুরু করেছে ঘরবাড়ি। লোকজন দৌড়াচ্ছে। আসু’র লোকেরা দৌড়ে পালানো লোকদের গুলি করছে। রামদা দিয়ে কোপ মারছে। এ যেন এক কেয়ামতের বিভিষিকা। শাহেদা কী করছে? হক দৌড় শুরু করলেন বাড়ির দিকে। পারলেন না আসু’র লোকদের রামদা, গুলি, বর্শার সামনে দিয়ে এগিয়ে যেতে। বরং নিজের প্রাণ বাঁচাতে তার তখন ছুটতে হল। ভুলতে হল পেছনের সব মায়াটান। তখন নাভিশ্বাসে ছুটতে ছুটতে এলেন এই কপিলি নদীর তীরে।

আসু’র লোকেরা বরবরি, বসোনতরি, বুকডোবা হাবি, নেলি এলাকাগুলো তো ঘিরে রেখেছেই, সঙ্গে কপিলি নদীটাও পাহারা দিয়ে রেখেছে, কেউ যেন সাঁতার কেটে পালিয়ে যেতে না পারে। প্রথমে ঘরবাড়িতে লাগিয়েছে আগুন। লোকজন ঘর ছেড়ে বেরিয়ে এলে তাদের উপর চালিয়েছে গুলি, বর্শা, রামদা। চারদিক আটকে এভাবেই দীর্ঘ ছয়ঘণ্টা চালানো হয় গণহত্যা। নদীর পাহারা উপেক্ষা করে অনেকে ঝাপিয়ে পড়ে নদীতে। আবদুল হক মরতে মরতে বেঁচে যান। নদী পাড়ি দিয়ে ওঠেন শরনার্থী শিবিরে। ইতিহাস এই হত্যাকাণ্ডকেই নেলি গণহত্যা নামে নামকরণ করেছে।

সম্বিত ফিরলো আহমদের ডাকে। দাদা এতক্ষণ লাগে অজু করতে?

আবদুল হক তাড়াতাড়ি অজু করে পাড়ে উঠে আসেন। অজুর পানির সাথে চোখের জল এক হয়ে যায়। এসব বুঝবার মতো বয়স আহমদের না। হক আহমদকে জড়িয়ে ধরেন। বুকের উথাল পাতাল ঝড়ে খানিকটা সাহারা পেতে চেষ্টা করেন। সেদিন আহমদের বাবা আজাদ যদি আসামে থাকতো, তিনি আজ কাকে নিয়ে বেঁচে থাকতেন। কে তার কোলে তুলে দিতো এত সুন্দর একটি নাতি। বৃদ্ধ হলে মানুষ একাকী হয়ে যায়। বৃদ্ধ বয়সের একাকিত্ব পূরণ করতে পারে কেবল নাতি নাতনিরাই।

পুলিশ প্রধান দিলিপের সামনে বসে আছেন কবি সরওয়ার হোসেন। তাকে কী কারণে ডাকা হয়েছে তিনি কিছুই জানেন না। তবে তিনি পুলিশের মুখে মেঘ টের পেয়েছেন। মনে মনে প্রস্তুতি নিয়ে রেখেছেন মেঘের পর বৃষ্টিতে ভিজে যাবার।

কেমন কবিতা লিখছেন?

ভালো। আলহামদুলিল্লাহ।

আসামের নাগরিক তালিকা থেকে ৪০ লাখ অধিবাসী বাদ পড়েছে। তাদের অধিকাংশই মুসলিম। আজকাল আপনার কবিতায় তাদের কথা বেশী দেখা যায়।

কবি সারওয়ার মৃদু হাসলেন, জ্বি।

আসামে আপনারা হলেন বিদেশি। বাহির থেকে এসে এখানের মাটি দখল করেছেন। আসামের নাম কেমন করে উঁচু করা যায় ,সেই চেষ্টা করতে হবে। কিসব আজেবাজে লেখেন।

যা সত্যি তাই তো লেখি। মুসলিমরা এদেশে উড়ে এসে জুড়ে বসা নয়। এরা এদেশের মাটিকে সোনা বানিয়েছে। প্রতিদানে তাদের বিদেশি আখ্যা দিয়ে তাড়িয়ে দিচ্ছেন?

দিলিপ আড়মোড়া ভাঙতে ভাঙতে বললেন, কবিতায় এসব কথা মানায়, থানায় না।

কেন? অপরাধের বিরুদ্ধে থানায় কথা না বললে আর কোথায় বলব।

দিলিপ উত্তর না দিয়ে একটা কাগজ এগিয়ে দিলেন । কবি সরওয়ার কাগজটি হাতে নিয়ে দেখলেন এটা একটা মামলার কপি। এই মামলা করা হয়েছে আসামের ১০জন কবির বিরুদ্ধে। যাদের কবিতায় আসামের ভাগ্যবিড়ম্বিত মুসলমানের দুঃখ দুর্দশার কথা উঠে আসছে প্রতিনিয়ত। কবি রেহানা সুলতানা, আবুল কালাম আজাদের নামের সঙ্গে তার নামটিও আছে। মামলার অভিযোগে বলা হয়েছে, ‘তাদের কবিতায় আসামের মানুষকে ছোট করে দেখানোর চেষ্টা করা হয়েছে। একটি রাজ্যের আর্থসামাজিক পটভূমিতে রীতিমতো আঘাত করা হয়েছে। কবিতার মূল ভাববস্তু আসলে রাজ্যের মানুষকে সরকারের বিরুদ্ধে উসকে দেওয়া।’

মামলার কপি থেকে চোখ তুলে তাকালেন কবি সারওয়ার। দিলিপ বললেন, আমার মেয়ে আপনার কবিতা পছন্দ করে। আপনার কবিতার সবগুলো বই আমার ঘরে আছে। জানেন সে কি বলে?

কী বলে?

মুসলমানদের এসব কথিত নির্যাতনের কথা না লিখে প্রেমের কবিতা লিখলে আপনাকে নাকি আরও বেশী মানায়। তবে মেয়েটা আপনার দৃষ্টিভঙ্গি খুব পছন্দ করে।

তাকে আমার ভালোবাসা জানাবেন । আর বলবেন, নির্যাতনগুলো কথিত না, বাস্তবে সংঘটিত।

কিন্তু মেয়ে যদি শুনে আইপিসি ১২০বি, ১৫৩ এ, ২৯৫ এ এবং ১৮০ ধারায় মামলা করা হয়েছে আপনার বিরুদ্ধে, কষ্ট পাবে। মামলাটা করা হয়েছে সাবধান করার জন্য। নট ফর গ্রেফতার। তবে সাবধান না হলে আমাদের কিছু করার থাকবে না।

দৈনিক পত্রিকা খুলে সবার আগে কবি সরওয়ারের লেখাটা পড়েন আবদুল হক। কোনদিন কবিতা , কোনদিন প্রবন্ধ। কিন্তু আজ পত্রিকা খুলে কবির কোন লেখা পেলেন না। কবির কলামের জায়গায় ছোট একটি বিজ্ঞপ্তি : সাময়িকের জন্য কবির ব্যক্তিগত সমস্যার কারণে কলামটি বন্ধ করা হলো।

আসাম রাজ্যে ভোটগ্রহণ শুরু হয়েছে সকাল নয়টায়। আবদুল হক ঠিক করতে পারছেন না কাকে ভোট দেবেন। দীর্ঘ ৩৫ বছর হলো ভোট দিয়ে আসছেন, আসামের এই এলাকাগুলোর দিকে কেউ ফিরেও তাকায়নি। নেলি গণহত্যার পর ১৯৮৫ সালে ‘অল আসাম স্টুডেন্টস ইউনিয়ন’ কংগ্রেসের হাত থেকে একটা চুক্তি সই করিয়ে নেয়। চুক্তিতে বলা হয়, ‘১৯৭১ সালের ২৪ মার্চের পর যারা এসেছে আসামে, তারা বিদেশী। কেউ যদি নিজেকে আসামের নাগরিক প্রমাণ করতে চায়, তাকে ১৯৭১ এর আগের ডকুমেন্ট দেখাতে হবে।’ এরপর আসাম জাতিয়তাবাদ এবং বিদেশি তাড়ানোর শক্তিকে উদ্যম করে নতুন রাজনৈতিক দল গঠন করে ‘অল আসাম স্টুডেন্টস ইউনিয়ন’। নতুন দলের নাম হয় ‘আসাম গণপরিষদ’ সংক্ষেপে আগপ। এদেরকে কোনদিন ভোট দেয়নি আবদুল হক। যে দলের উদ্ভবের সঙেগ লেগে আছে হাজার মানুষের রক্তের দাগ, সে দল মানুষের কী উপকার করবে। কংগ্রেসকে দিয়েছে। কিন্তু কংগ্রেসও ফিরে তাকায়নি। এবার কাকে ভোট দেবেন? সবাই তো মানুষের আবেগকে পুঁজি করে রাজনীতি করে। শুরুতে আসামের ভোটার তালিকায় বিদেশিদের অন্তর্ভুক্তিকরণের অপবাদ তো এই কংগ্রেসের ওপর দিয়েছিল ‘অল আসাম স্টুডেন্টস ইউনিয়ন’। কিন্তু তারপর তাদের সঙ্গে কেমন ঢগঢগ করে মিশে গেল।

আবদুল হক আইডি কার্ড বের করার জন্য আলমারি খোলেন। আলমারির ড্রয়ারে আইডি কার্ডের সঙ্গে শাহিদার একটা ছবি রাখা আছে। সাদা কালো। ছবিটা ক্ষয়ে এসেছে। মাঝেমধ্যেই ছবিটা দেখেন আবদুল হক। বিশেষ করে যখন খুব নিঃসঙ্গ লাগে। ওপারের শাহিদার সঙ্গে যোগাযোগের মাধ্যম কেবল এই ছবিটি। তিনি তো জানেন না কোথায় শাহিদার কবর । নেলি হত্যাকাণ্ডের ১৬ দিন পর যখন বাড়ি ফিরে এলেন, অনেক গণকবর দেখেছেন। শাহিদা শুয়ে আছে কোনটায়, ঠাহর করতে পারেননি। আবদুল হকের দীর্ঘশ্বাস ভারী হয় এসব ভাবলেই। শাহিদা নিশ্চয় অপেক্ষা করেছিলো তার জন্য। মৃত্যুর একটু আগেও হয়তো কল্পনা করেছিলো আমি আসছি। তার কপালে চুমু খেয়ে বলছি, কিছু হবে না।

ভোটকেন্দ্রে গিয়ে সিরিয়ালে দাঁড়ান আবদুল হক। প্রখর রোদে দাঁড়িয়ে থেকে অপেক্ষা করেন। একজন দুজন করে ভোট দেবার পালা আসে তার। আইডি কার্ড যখন বাড়িয়ে দিলেন, একজন এজেন্ট বললো, আপনি ভোট দিতে পারবেন না।

কেন?

ভোটার তালিকায় আপনার নামের পাশে ইংরেজিতে ডি লেখা আছে। আপনি ‘ডি ভোটার’।

‘ডি ভোটার’ কবে হইলাম। এর মানে কী? আইডির মেয়াদ কি শেষ?

এজেন্ট বললো, না। ডি ভোটার মানে ডাউটফুল ভোটার। সন্দেহজনক ভোটার। আসামের নাগরিক তালিকা থেকে আপনি বাদ পড়ছেন।

মানে?

আপনি আর ভোট দিতে পারবেন না। দেশের নাগরিকরাই কেবল ভোট দিতে পারে। আপনি এদেশের নাগরিক না।

আবদুল হক বলেন, ৩৫ বছর ভোট দিয়া আসতেসি। এখন বলেন আমি এদেশের নাগরিক না!

এজেন্ট এবার ক্ষেপে গেলো, ব্রিটিশরা দুইশ বছর দেশ শাসন করেছে। তাই বলে কি দেশটা তাদের হয়ে গেছে?

আবদুল হক আর কিছু বলতে পারেন না। তার কিছু বলবার থাকে না আসলে। যে লোক কয়েকপুরুষ ধরে বাস করছে আসামে, ভোট দিয়ে আসছে ৪০ বছর ধরে, কী হিসেবে তাকে নাগরিকত্ব থেকে বাদ দিলো? মুসলিম বলে? কয়েকজন লোক তাকে টেনে ভোটকেন্দ্র থেকে বের করে দেয়। সঙ্গে স্লোগান তুলে-‘পিন্দ লুঙ্গি চোরের বেশ, চলো মিয়া বাংলাদেশ।’

আবদুল হকের আর হাঁটতে ইচ্ছে করছে না। বয়সের ভারে ন্যুব্জ দেহ। দগদগে স্মৃতির আঘাতে ক্ষত-বিক্ষত মন। যে মাটিতে তিনি দাঁড়িয়ে আছেন, আজ থেকে তিনি তার নাগরিক না। বিদেশী, অনাহূত। নেলির গণহত্যা কেড়ে নিলো তার ভালোবাসা। সরকার কেড়ে নিলো তার নাগরিকত্ব। দয়া করে এবার তার প্রাণটা কেউ নিয়ে গেলেই হয়। জীবনের এই পড়ন্ত বেলায় এত ভার আর বইতে পারছেন না। ভেঙে পড়ছে সবকিছু।

বরবরির গণকবরের সামনে দাঁড়িয়ে আছেন আবদুল হক। তার কেন যেন মনে হচ্ছে এখানেই শুয়ে আছে শাহিদা। একটা গোপন ইচ্ছায় এই ছত্রিশ বছর খুঁজেই গেলেন প্রিয়তমার কবর । তিনি চান শাহিদার পাশে হোক তার জায়গা। জীবনের শেষ শয্যা। গতকাল রাতে এই গণকবরটাই স্বপ্নে দেখেছেন তিনি। শাহিদা আর তিনি এই কবরের পাশ দিয়ে হেঁটে যাাচ্ছেন। শাহিদা ক্লান্ত। তিনি বললেন, একটু জিরিয়ে নাও। শাহিদা বললো , হুম। এখানেই জিরিয়ে নেই। স্বপ্নটা দেখার পর থেকে তার কেবল মনে হচ্ছে এখানেই শাহিদার কবর। এখানেই শাহিদা তার জন্য অপেক্ষা করছে।

১৯৮৩’র নেলি গণহত্যায় প্রায় পাঁচ হাজার মুসলমান নিহত হয় মাত্র ছয় ঘণ্টায়। গণহত্যার পর গণকবর হলো। বেঁচে যাওয়া মানুষগুলো শরণার্থী শিবির থেকে ফিরে এসে পেলো শূন্য ঘর, পোড়া বাড়ি। আবদুল হক কিছুই পাননি। ঘর পুড়ে ছাই হয়ে গিয়েছিলো। কেবল একটা ট্রাঙ্কে বেঁচে গিয়েছিলো শাহিদার কিছু স্মৃতি। সেই স্মৃতিগুলো আকড়ে ধরে তিনি কাটিয়ে দিলেন এতগুলো বছর। আজ মাটি-ভূমির অধিকার হারিয়ে তিনি এসে দাঁড়িয়েছেন শাহিদার কবরের পাশে। একেবারে নিঃস্ব হয়ে। জীবন ও জগতের প্রতি বিরক্ত হয়ে। বিড়বিড় করে তিনি বলতে লাগলেন, আর কত পালিয়ে বেড়াব শাহিদা। এবার একটু জায়গা দাও তোমার পাশে। ঘুমুবো। বড্ড ক্লান্তি ছুঁয়েছে আজ।

বাড়ি ফিরে আবদুল হক বমি করলেন, রক্তবমি। তার চোখ মুখ লাল হয়ে গেলো। আজাদ ভাবলো ভোট দিতে গিয়ে রোদে ছিলেন অনেক্ষণ। তাই এমন হয়েছে। কিন্তু কেউ জানলো না স্মৃতির দগদগে ঘা সইতে সইতে তিনি কতটা ক্ষয়ে গেছেন। ভেতরে ভেতরে কতটা মরে গেছেন। নিভু নিভু গলায় আবদুল হক ডাকলেন, আজাদ!

আজাদ বাবার কাছে এসে বসলো।

আবদুল হক বললেন, ড্রয়ারে তোর মায়ের একটা ছবি আছে। ছবিটা সঙ্গে রাখিস।

তুমি থাকতে আমার কিসের চিন্তা।

আবদুল হক ছেলের হাত চেপে ধরে বললেন, বরবরি গণকবরের কাছে আমাকে কবর দিস। ওখানে তোর মায়ের কবর।

আজাদের কানে একটা বজ্রপাত হলো মনে হয়। মুহূর্তে সব অন্ধকার হয়ে গেলো। সেই অন্ধকারে আজাদ শুনতে পেলো মায়ের কণ্ঠ, আজাদ, তোর বাবাকে একটু আমার কাছে আসতে দিবি?