বিশের ধর্মীয় অঙ্গন: গুরুত্বপূর্ণ ৫ দাবি

মুনশী নাঈম:

ঘটনা বহুল ২০২০ বিদায় নিচ্ছে, শুরু হচ্ছে নতুন বছর। ২০২০ খ্রিষ্টাব্দের পুরো সময়টাতেই করোনার কারণে রাজনৈতিক এবং সামাজিক স্থবিরতা বিরাজমান ছিল। তবে করোনার কারণে জনজীবনে স্থবিরতা নেমে এলেও বছরের শুরু থেকে নানা সময়ে নানাভাবে এ দেশের ইসলামি মূল্যবোধ ও মুসলিম সমাজের স্বার্থ সংশ্লিষ্ট বিষয়ে আঘাত এসেছে। আঘাতের মুকাবেলায় শান্তিপূর্ণ প্রতিবাদ, মিছিল ও বিক্ষোভও প্রদর্শিত হয়েছে। আঘাতগুলো এসেছে ইসলাম-বিদ্বেষী পক্ষগুলোর তরফ থেকে। এইসব আঘাতের যথাযথ প্রতিক্রিয়াও এসেছে আলেম নেতৃত্বের পক্ষ থেকে। এসেছে নানা দাবি-দাওয়াও। এগুলোর মধ্য থেকে গুরুত্বপূর্ণ ৫ টি দাবি আমরা দেখে নেবো এক নজরে।

১. তারাবির জন্য মসজিদ উন্মুক্ত করে দেয়ার দাবি

করোনাভাইরাস সংক্রমণ ঠেকাতে বাংলাদেশ সরকার ওয়াজ মাহফিল এবং তীর্থযাত্রা সহ সব ধরণের ধর্মীয়, রাজনৈতিক, সামাজিক ও সাংস্কৃতিক জমায়েত বন্ধ রাখার নির্দেশ দিয়েছিল ১৯শে মার্চ। তবে তখন মসজিদে নামাজ পড়া স্থগিত রাখার বিষয়ে কোনো সিদ্ধান্ত জানানো হয়নি। ঐ ঘটনার সপ্তাহদুয়েক পর মসজিদে নামাজ পড়ার ওপর বিধিনিষেধ আরোপ করে সরকার। সেসময় মুসল্লিদের ঘরে নামাজ পড়ার বিজ্ঞপ্তি দিয়ে জানানো হয় যে, দৈনিক জামাতে সর্বোচ্চ পাঁচ জন এবং জুমার নামাজে সর্বোচ্চ ১০ জন মুসল্লি অংশ নিতে পারবেন।

এর কিছুদিন পর রমজান মাস শুরু হওয়ার আগে ধর্ম মন্ত্রণালয়ের পক্ষ থেকে মসজিদে তারাবির নামাজ আদায় করার ওপরও বিধি নিষেধ আরোপ করা হয়। তারাবির নামাজে সর্বোচ্চ ১২ জন অংশ নিতে পারবেন বলে জারি করা হয় নির্দেশনা। কোনো কোনো দেশে মসজিদে গিয়ে সামাজ নিষিদ্ধ করার সিদ্ধান্তে মানুষের মধ্যে ক্ষোভও তৈরি হয়। বাংলাদেশেও মসজিদে গিয়ে নামাজ বন্ধ করার সিদ্ধান্ত দেয়ার পর বেশ ক্ষোভ তৈরি হয় মানুষের মধ্যে।

কওমী মাদ্রাসাগুলোর একটি বোর্ড এবং একটি সংগঠন হেফাজতে ইসলাম স্বাস্থ্য নিরাপত্তা নিশ্চিত করাসহ ১৪টি শর্তে মসজিদে তারাবির নামাজ সাধারণ মানুষের জন্য উন্মুক্ত করে দেয়ার দাবি জানিয়েছিল এপ্রিলের মাঝামাঝি সময়ে। সেসময় সরকার তাদের ঐ দাবি নাকচ করেছিল। মসজিদ খুলে দেয়ার আহ্বান জানিয়ে ৫ই মে বাংলাদেশের আলেমদের অনেকে একটি বিবৃতি প্রকাশ করেছিল।

এরই প্রেক্ষিতে স্বাস্থ্যবিধি মেনে এবং সামাজিক দূরত্ব মেনে চলার শর্তসাপেক্ষে ৭মে বৃহস্পতিবার জোহরের নামাজ থেকে বাংলাদেশে মসজিদে গিয়ে পাঁচ ওয়াক্ত নামাজ, জুম্মা এবং তারাবির নামাজসহ সব ধরণের নামাজের জন্য পড়ার অনুমতি দেয়া হয়। বুধবার (৬ মে) দুপুরে এ তথ্য নিশ্চিত করেন প্রয়াত ধর্ম প্রতিমন্ত্রী শেখ মোহাম্মদ আব্দুল্লাহ।

২. মাদরাসা খুলে দেয়ার দাবি

করোনা মহামারীর কারণে দেশের প্রায় ২২ হাজার কওমি মাদ্রাসার ২৫ লক্ষাধিক শিক্ষার্থী গত শিক্ষাবর্ষের বার্ষিক পরীক্ষা দিতে পারেনি। ঈদুল ফিতরের পর কওমি মাদ্রাসাগুলোর নতুন শিক্ষাবর্ষ শুরু হলেও করোনার কারণে তা স্থগিত রাখা হয়। করোনাভাইরাস মহামারীর কারণে দেশের সব শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের মতো হাফিজিয়া মাদ্রাসা ও হিফজখানার কার্যক্রমও বন্ধ হয়ে যায়। এসব মাদ্রাসার নিরবচ্ছিন্ন অধ্যবসায়ের আবশ্যকতার কথা উল্লেখ করে কার্যক্রম চালুর বিষয়ে দেশের আলেমরা আবেদন করেন। সেই আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে ১২ জুলাই থেকে দেশের সব হাফিজিয়া মাদ্রাসা ও হিফজখানা খোলার অনুমোদন দেয়া হয়। ৮ জুলাই ধর্মবিষয়ক মন্ত্রণালয় এ সংক্রান্ত বিজ্ঞপ্তি জারি করে। সেখানে বলা হয়, এসব মাদ্রাসাকে স্বাস্থ্য অধিদফতরের স্বাস্থ্যবিধি অনুসরণ করতে হবে।

এরও আগে ১ জুন দেশের কওমি মাদ্রাসায় ছাত্রছাত্রী ভর্তির কার্যক্রম পরিচালনার লক্ষ্যে স্বাস্থ্যবিধি ও সামাজিক দূরত্ব নিশ্চিত করে অফিস খোলার অনুমতি দেয়া হয়।

সোমবার (১৭ আগস্ট) সচিবালয়ে জাতীয় দ্বীনি মাদ্রাসা শিক্ষা বোর্ডের সহ-সভাপতি ড. মাওলানা মুশতাক আহমদ ও মাওলানা ইয়াহইয়া মাহমুদ এবং বোর্ডের মহাসচিব মুফতি মোহাম্মদ আলীসহ কওমি আলেমদের একটি প্রতিনিধি দলের সঙ্গে বৈঠক করেন মন্ত্রিপরিষদ বিভাগের সচিব খন্দকার আনোয়ারুল ইসলাম। বৈঠকে কিতাব বিভাগের কার্যক্রম চালু ও পরীক্ষা নেয়ার সুযোগ করে দিতে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার কাছে আবেদন জানায় কওমি মাদরাসাগুলো। এরই প্রেক্ষিতে অন্যান্য শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান খোলার ঘোষণা না দিলেও কওমি মাদ্রাসা খোলার অনুমতি দেয় সরকার। সোমবার (২৪ আগস্ট) শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের কারিগরি ও মাদ্রাসা শিক্ষা বিভাগ এ সংক্রান্ত আদেশ জারি করে।

মন্ত্রণালয়ের সহকারী সচিব সৈয়দ আসগর আলী স্বাক্ষরিত আদেশে বলা হয়, কওমি মাদ্রাসাগুলোর কিতাব বিভাগের শিক্ষা কার্যক্রম শুরু ও পরীক্ষা গ্রহণের অনুমতি প্রদান করা হলো। তবে ৬টি শর্ত পালন করতে হবে মাদ্রাসাগুলোকে। শর্তগুলো হলো: ১. প্রত্যেক শিক্ষার্থীকে মাস্ক, হ্যান্ড গ্লাভস, মাথায় নিরাপত্তা টুপি পরা আবশ্যক। ২. মাদ্রাসায় প্রবেশের পূর্বে গেটে স্যানিটাইজিং করতে হবে। ৩. শিক্ষার্থীরা নিজ নিজ কক্ষে অবস্থান করবে, বিক্ষিপ্তভাবে চলাফেরা করবে না। ৪. একজন শিক্ষার্থী অন্য শিক্ষার্থী থেকে কমপক্ষে ৩ ফিট দূরত্বে অবস্থান করবে। ৫. করোনার কারণে কোলাকুলি ও হাত মেলানো যাবে না। ৬. শিক্ষক ও কর্মচারীরাও একইভাবে সরকারের স্বাস্থ্যবিধি অনুসরণ করে ক্লাস করাবেন।

৩. ধর্ষকদের মৃত্যুদণ্ডের দাবি

২ সেপ্টেম্বর রাতে বেগমগঞ্জে এক নারীকে (৩৭) বিবস্ত্র করে নির্যাতন করা হয়। ঘটনার ৩২ দিন পর ৪ অক্টোবর দুপুরে নির্যাতনের ভিডিও ফেসবুকে ভাইরাল হয়। এ ঘটনায় ওই দিন রাতেই দুটি মামলা হয়। এ বিষয়ে বিভিন্ন মাধ্যমে সংবাদ প্রকাশিত হয়। এসব প্রতিবেদন হাইকোর্টের নজরে আনেন সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী জেড আই খান পান্না ও আব্দুল্লাহ আল মামুন।

ভিডিও ভাইরাল হবার দিন রাতেই প্রেসক্লাবে বিক্ষোভ করে অপরাধীদের শাস্তি এবং ধর্ষণের শাস্তি মৃত্যুদণ্ড চায় ইসলামি শাসনতন্ত্র ছাত্র আন্দোলন। এর পরদিন ৫ অক্টোবর সারাদেশে ধর্ষণের শাস্তি মৃত্যুদণ্ড চেয়ে বিক্ষোভ করে ইসলামি দলগুলো। প্রতিবাদ অব্যহত থাকে।

১৬ অক্টোবর শুক্রবার জুমার নামাজের পর সমমনা ছয়টি ইসলামি দল বায়তুল মোকাররম জাতীয় মসজিদ থেকে মিছিল নিয়ে বিজয়নগরে বিক্ষোভ সমাবেশ করে। ‘সারা দেশে ধর্ষণ, জেনা ব্যভিচারের’ বিরুদ্ধে এই কর্মসূচি পালন করা হয়। সমাবেশে ধর্ষণ ও জেনা-ব্যভিচার প্রতিরোধে সমমনা ইসলামি দলগুলোর পক্ষ থেকে ৬ দফা দাবি তুলে ধরা হয়। এর মধ্যে রয়েছে জেনা, ব্যভিচার ও ধর্ষণ প্রতিরোধে জনসমক্ষে সর্বোচ্চ শাস্তি নিশ্চিত করা। পর্নোগ্রাফির বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা গ্রহণ। মাদকদ্রব্যের অবাধ প্রাপ্তি ও ব্যবহার কঠোরভাবে নিয়ন্ত্রণ করা। নারীদের অশ্লীলভাবে উপস্থাপনা ও পণ্য হিসেবে ব্যবহার বন্ধ করা। আইনের নিরপেক্ষ প্রয়োগ, বিচারকাজকে রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক হস্তক্ষেপমুক্ত রাখা এবং নারীর মর্যাদা এবং অধিকার সংরক্ষণে কোরআন-হাদিসের শিক্ষা জাতীয় শিক্ষা কারিকুলামে অন্তর্ভুক্ত করা।

বিক্ষোভ সমাবেশে সভাপতির বক্তব্যে হেফাজতে ইসলামের প্রয়াত নায়েবে আমির ও জমিয়তে উলামায়ে ইসলামের মহাসচিব নূর হোসাইন কাসেমী বলেন, একদিকে করোনাভাইরাসে দেশ হাবুডুবু খাচ্ছে, অপর দিকে মা-বোনদের ইজ্জত-আবরু লুণ্ঠন হচ্ছে, তাঁদের হত্যা করা হচ্ছে। তিনি বলেন, ‘পশ্চিমা সংস্কৃতির কারণে সমাজ থেকে লজ্জা–শরম উঠে গেছে। আজ আমরা লজ্জা-শরম ধ্বংস করে দিয়েছি বলেই সমাজে এ অবস্থার সৃষ্টি হয়েছে। এভাবে সমাজ চলতে পারে না।’

এদিকে চরমোনাইয়ের পীরের দল ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশ বাদ জুমা বায়তুল মোকাররমের উত্তর গেটে ধর্ষণ-নিপীড়নের বিরুদ্ধে বিক্ষোভ সমাবেশ করে। এতে প্রধান অতিথি ছিলেন দলের নায়েবে আমির মুফতি ফয়জুল করিম।

এরই প্রেক্ষিতে ধর্ষণের সর্বোচ্চ শাস্তি মৃত্যুদণ্ডের বিধান রেখে জাতীয় সংসদে ‘নারী ও শিশু নির্যাতন দমন (সংশোধন) বিল-২০২০’ পাস হয়। ১৭ নভেম্বর, মঙ্গলবার রাতে স্পিকার ড. শিরীন শারমিন চৌধুরীর সভাপতিত্বে সংসদ অধিবেশনে বিলটি পাসের প্রস্তাব উত্থাপন করেন মহিলা ও শিশু বিষয়ক প্রতিমন্ত্রী বেগম ফজিলাতুন নেসা। পরে তা কণ্ঠভোটে পাস হয়। এর আগে গত ৮ নভেম্বর বিলটি সংসদে উত্থাপন করেন প্রতিমন্ত্রী। এরপর বিলটি পরীক্ষা-নিরীক্ষা শেষে এক সপ্তাহের মধ্যে সংসদে প্রতিবেদন জমা দেয়ার জন্য মহিলা ও শিশু বিষয়ক মন্ত্রণালয় সম্পর্কিত সংসদীয় স্থায়ী কমিটিতে পাঠানো হয়। সংসদীয় কমিটি বিলটি চূড়ান্ত করে ১৬ নভেম্বর সংসদে উত্থাপন করে।

গত ৮ নভেম্বর বিলটি সংসদে উত্থাপনের আগে আইনমন্ত্রী আনিসুল হক ‘নারী ও শিশু নির্যাতন দমন (সংশোধন) অধ্যাদেশ-২০২০’ সংসদে উত্থাপন করেন। ওই অধ্যাদেশের আলোকে সংসদে সংশোধনী বিলটি আনা হয়। চলতি অধিবেশনেই বিলটি পাসের সাংবিধানিক বাধ্যবাধকতা ছিল।

২০০০ সালের ৮নং আইন (নারী ও শিশু নির্যাতন দমন) সংশোধনে জারি করা অধ্যাদেশের আলোকে সংসদে উত্থাপিত বিলে বলা হয়, ‘যাবজ্জীবন সশ্রম কারাদণ্ডে’ শব্দগুলোর পরিবর্তে ‘মৃত্যুদণ্ডে বা যাবজ্জীবন সশ্রম কারাদণ্ডে’ শব্দগুলো প্রতিস্থাপিত হবে। পূর্বের নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইন অনুযায়ী, ধর্ষণের সর্বোচ্চ শাস্তি ছিল যাবজ্জীবন কারাদণ্ড।

এর আগে ১৩ অক্টোবর রাষ্ট্রপতি সংশোধিত নারী ও শিশু নির্যাতন দমন (সংশোধন) অধ্যাদেশ জারি করেন। ১২ অক্টোবর অধ্যাদেশটি মন্ত্রিসভায় অনুমোদন হয়।

৪. ফ্রান্সের সঙ্গে কূটনৈতিক সম্পর্ক ছিন্নের দাবি

ফ্রান্সের রাজধানী প্যারিসের একটি স্কুলে স্যামুয়েল প্যাটি নামের ইতিহাস ও ভূগোলের ওই শিক্ষক ক্লাসে মহানবী সা.-এর ব্যঙ্গচিত্র প্রদর্শন করেছিলেন। ফ্রান্সে বিতর্কিত সাময়িকী শার্লি এবদো মোহাম্মদ সা.-এর যেসব ব্যঙ্গচিত্র প্রকাশ করে বিশ্বজুড়ে বিতর্ক সৃষ্টি করে, সেই ব্যঙ্গচিত্রগুলোর কয়েকটি ক্লাসে মতপ্রকাশের স্বাধীনতা নামে প্রদর্শন করেন স্যামুয়েল। ওই ঘটনার পর কয়েকজন মুসলিম অভিভাবক স্কুল কর্তৃপক্ষের কাছে লিখিত অভিযোগও করেন। পরে ১৬ অক্টোবর শুক্রবার প্যারিসের উত্তর-পশ্চিমের শহরতলী এলাকার রাস্তায় স্যামুয়েলকে ছুরি দিয়ে গলা কেটে হত্যা করা হয়। হামলাকারীও সঙ্গে সঙ্গে পুলিশের গুলিতে নিহত হয়।

ঐ শিক্ষককে সম্মান জানাতে আয়োজিত একটি অনুষ্ঠানে যোগ দিয়ে ফ্রান্সের প্রেসিডেন্ট এমানুয়েল ম্যাক্রোঁ বলেছেন যে, ফ্রান্স কার্টুন প্রদর্শন বন্ধ রাখবে না। ফ্রান্সের ওসিটনেই এলাকার সভাপতি ক্যারোল ডেলগা ট্যুইটারে কার্টুন দেখানোর ঘোষণা করেন। তিনি বলেন, শিক্ষক স্যামুয়েলকে শ্রদ্ধাঞ্জলি দেওয়ার জন্য পয়গম্বর মোহম্মদের বিতর্কিত কার্টুন দেখানো হবে। এরপর রাষ্ট্রীয় মদদে দেশটির সরকারি ভবনের বিভিন্ন দেয়ালে দেখানো হয়েছে শার্লি হেবদোর সেই ধৃষ্টতাপূর্ণ ইসলামবিদ্বেষী কার্টুন।

ফ্রান্সে নবি অবমাননার বিরুদ্ধে ফুঁসে উঠে মুসলিম বিশ্ব। প্রতিবাদে ফেটে পড়ে বাংলাদেশের ধর্মপ্রাণ মুসলমান এবং আলেম সমাজও।

সংসদ অধিবেশন ডেকে ফ্রান্স সরকারের বিরুদ্ধে আনুষ্ঠানিক নিন্দা জানানো এবং ফ্রান্সের সঙ্গে সব রকম কূটনৈতিক সম্পর্ক ছিন্ন করার দাবি জানায় ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশ। একইসঙ্গে ফ্রান্সের রাষ্ট্রদূতকে ডেকে নিন্দা জানানোর দাবি করেন তারা। মঙ্গলবার (২৭ অক্টোবর) বেলা সাড়ে ১১টায় রাজধানীর বায়তুল মোকাররম জামে মসজিদের সামনে বিক্ষোভ সমাবেশে থেকে দলটির নেতারা এসব দাবি জানান। এর আগে সকাল ১০টা থেকে ফ্রান্সের রাষ্ট্রীয় পৃষ্ঠপোষকতায় হজরত মুহাম্মদ স.-কে নিয়ে কার্টুন প্রকাশের প্রতিবাদে ফ্রান্স দূতাবাস ঘেরাও কর্মসূচি পালনের জন্য ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশ নেতাকর্মীরা মসজিদের সামনে জড়ো হতে থাকে। বেলা ১২টার দিকে বায়তুল মোকাররমের সামনে থেকে মিছিল নিয়ে ফ্রান্স দূতাবাস ঘেরাও উদ্দেশে যাত্রা শুরু করলে পুলিশের বাধায় শান্তিনগর মোড়ে তাদের কর্মসূচি শেষ হয়। মিছিলে কয়েক হাজার নেতাকর্মী অংশ নেয়। এ সময় তারা ‘প্রয়োজনে জীবন দেবো, হজরত মুহাম্মদ সা.-এর মান সম্মান নষ্ট হতে দেবো না’ স্লোগান দেন। তারা ফ্রান্সের পণ্য বর্জনের আহ্বান জানান।

২ নভেম্বর ফ্রান্স দূতাবাস ঘেরাও কর্মসূচী পালন করে হেফাজতে ইসলাম। বায়তুল মোকাররম জাতীয় মসজিদ থেকে বেলা সোয়া ১২টার দিকে মিছিল নিয়ে গুলশানে ফ্রান্স দূতাবাসের উদ্দেশে রওনা হন হেফাজতকর্মীরা।মিছিলটি পল্টন, নাইটিঙ্গেল মোড়, কাকরাইল হয়ে বেলা পৌনে ১টার দিকে শান্তিনগর মোড়ে আসলে পুলিশের ব্যারিকেডে আটকে যায়। সেখানে সংক্ষিপ্ত সমাবেশ করে ফ্রান্সের সঙ্গে কূটনৈতিক সম্পর্ক ছিন্ন, ঢাকায় ফ্রান্সের দূতাবাস বন্ধ, ফরাসি পণ্য বর্জন এবং সংসদে নিন্দা প্রস্তাব পাস করার দাবি জানান হেফাজত ইসলামের মহাসচিব জুনাইদ বাবুনগরী। কর্মসূচিতে বিপুল জনসমাগমের কারণে বায়তুল মোকাররম, গুলিস্তান, পল্টন, প্রেসক্লাব, কাকরাইল ও শান্তিনগর হয়ে যান চলাচল বন্ধ হয়ে যায়।

ফ্রান্সের সঙ্গে কূটনৈতিক সম্পর্ক ছিন্ন করার দাবিতে ১৬ নভেম্বর প্রধানমন্ত্রী বরাবর স্মারকলিপি প্রদান কর্মসূচি পালন করে সম্মিলিত ইসলামী দলসমূহ।

এছাড়াও সারাদেশে বিক্ষোভে ফেটে পড়ে ধর্মপ্রাণ মুসলমানগণ। এরই প্রেক্ষিতে বাংলাদেশের পক্ষ থেকে ধর্মীয় ইস্যুতে সহনশীলতার বার্তা দিয়ে ফ্রান্সে চিঠি পাঠায় পররারষ্ট্র মন্ত্রণালয়।

৫. ভাস্কর্য অপসারণ দাবি

ঢাকার দক্ষিণে ধোলাইপাড় এলাকায় বাংলাদেশের প্রতিষ্ঠাতা রাষ্ট্রপতি শেখ মুজিবুর রহমানের নির্মাণাধীন ভাস্কর্য অপসারণের দাবি জানিয়েছে ইসলামি মহল। ১৩ নভেম্বর শুক্রবার ভাস্কর্য অপসারণের দাবি জানিয়ে সমাবেশ করেছে চরমোনাই’র পীর ও ইসলামী আন্দোলন-এর সিনিয়র নায়েবে আমির মুফতি সৈয়দ মোহাম্মদ ফয়জুল করীম৷ তিনি ভাস্কর্য নির্মাণের স্থল ঢাকার ধোলাইপাড় এলাকায় এক সমাবেশে বলেছেন, ‘ভাস্কর্যের নামে মূর্তি স্থাপনের চক্রান্ত তৌহিদি জনতা রুখে দেবে৷ রাষ্ট্রের টাকা খরচ করে মূর্তি স্থাপনের অপরিণামদর্শী সিদ্ধান্ত থেকে সরকারকে ফিরে আসতে হবে৷ র্তি স্থাপনের সিদ্ধান্ত বাতিল না হওয়া পর্যন্ত তৌহিদি জনতার আন্দোলন চলবে৷ সরকার যদি ভাস্কর্যের নামে মূর্তি স্থাপন থেকে সরে না আসে, তাহলে কঠোর কর্মসূচি দিতে বাধ্য হব৷’

একই দিনে, বাংলাদেশ খেলাফত মজলিসের ভারপ্রাপ্ত মহাসচিব ও হেফাজতে ইসলামের নেতা মাওলানা মামুনুল হক ঢাকার বিএমএ মিলনায়তনে খেলাফত যুব মজলিস ঢাকা মহানগরীর এক অনুষ্ঠানে বলেন, ‘বঙ্গবন্ধুর মূর্তি স্থাপন বঙ্গবন্ধুর আত্মার সঙ্গে গাদ্দারি করার শামিল৷ যারা বঙ্গবন্ধুর ভাস্কর্যের নামে মূর্তি স্থাপন করে তারা বঙ্গবন্ধুর সু-সন্তান হতে পারে না৷ বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান একজন মুসলিম হিসেবে পৃথিবী থেকে বিদায় নিয়েছেন৷ তাঁর মূর্তি তৈরি করে রাস্তার মোড়ে মোড়ে স্থাপন করা হলে তা হবে বঙ্গবন্ধুর আত্মার সঙ্গে বেইমানি৷’

কোরআন এবং হাদিসের আলোকে মূর্তি বা ভাস্কর্য নির্মাণ হারাম বলে ফতোয়া দিয়েছেন দেশের শীর্ষ আলেম ও মুফতিরা। একইসঙ্গে তারা বলেছেন, এসব মূর্তি-ভাস্কর্য ভাঙার দায়িত্ব সরকারের। বৃহস্পতিবার (৩ ডিসেম্বর) বিকেলে ঢাকা রিপোর্টার্স ইউনিটি মিলনায়তনে মূর্তি-ভাস্কর্য স্থাপনে জনমনে বিভ্রান্তি নিরসনে দেশের শীর্ষ আলেম ও মুফতিদের ফতোয়া প্রকাশ উপলক্ষে সংবাদ সম্মেলন এ কথা বলা হয়।

ভাস্কর্য ইস্যু নিয়ে সরগরম হয়ে উঠে পুরো দেশ। ভাস্কর্য নির্মাণ নিয়ে সৃষ্ট অস্থিরতা নিরসনে শনিবার (৫ ডিসেম্বর) রাজধানীর যাত্রাবাড়ী মাদ্রাসায় শীর্ষ আলেমদের বৈঠকে হয়। এতে সভাপতিত্ব করেন কওমি মাদ্রাসার সম্মিলিত শিক্ষা বোর্ড- আল হাইয়াতুল উলিয়া লিল জামিয়াতিল কওমিয়া বাংলাদেশের চেয়ারম্যান আল্লামা মাহমুদুল হাসান। বৈঠকে দেশের প্রতিনিধিত্বশীল শীর্ষ আলেমরা বিভিন্ন প্রস্তাব পেশ করেন। পরে সবার সম্মতিতে ৫ দফা প্রস্তাব পাস হয়। এতে ভাস্কর্য নির্মাণ, ওয়াজ মাহফিলে মাইকের সীমিত ব্যবহার, আলেম-ওলামাদের বিরুদ্ধে কটূক্তিসহ বিভিন্ন বিষয়ে আপত্তি করা হয়।

গৃহীত প্রস্তাবাবলীর মধ্যে বলা হয়- মানবমূর্তি ও ভাস্কর্য যে কোনো উদ্দেশ্যে তৈরি করা ইসলামে কঠোরভাবে নিষিদ্ধ। কোনো মহৎ ব্যক্তি ও নেতাকে মূর্তি বা ভাস্কর্য স্থাপন করে শ্রদ্ধা জানানো শরিয়তসম্মত নয়। এতে মুসলিম মৃত ব্যক্তির আত্মার কষ্ট হয়। কারো প্রতি শ্রদ্ধা প্রদর্শন ও তার স্মৃতিকে জাগ্রত রাখতে মূর্তি বা ভাস্কর্য নির্মাণ না করে, শতকরা ৯২ ভাগ মানুষের বিশ্বাস ও চেতনার আলোকে কোরআন-সুন্নাহ সমর্থিত কোনো উত্তম বিকল্প সন্ধান করাই যুক্তিযুক্ত।

বৈঠকে বলা হয়, প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে বৈঠক করতে চান দেশের শীর্ষ আলেমরা। একইসঙ্গে আলেমদের বক্তব্য তুলে ধরে প্রধানমন্ত্রী বরাবর বিশেষ চিঠিও দেয়া হবে।

এরই প্রেক্ষিতে সোমবার (১৪ ডিসেম্বর) রাত সাড়ে ৯টার দিকে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খাঁন কামালের বাসায় কওমি আলেম ও হেফাজতে ইসলামের নেতাদের সঙ্গে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর বৈঠক অনুুষ্ঠিত হয়। কওমি মাদ্রাসার সম্মিলিত শিক্ষা বোর্ড- হাইয়াতুল উলইয়ার চেয়ারম্যান মাহমুদুল হাসানের নেতৃত্বে এতে আলেমদের একটি প্রতিনিধি দল অংশ নেন। বৈঠকে আল্লামা ফরীদ উদ্দীন মাসঊদ, মাওলানা আতাউল্লাহ হাফেজ্জী, মাওলানা নূরুল ইসলাম জিহাদী, মাওলানা মাহফুজুল হক, মাওলানা মুসলেহ উদ্দিন গওহরপুরী প্রমুখ অংশ নেন।

পরদিন সংবাদ সম্মেলনে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামন খান কামাল বলেন, বৈঠকে আলেমদের পক্ষ থেকে যে পাঁচটি প্রস্তাব দেওয়া হয়েছে, তা যাচাই বাছাই চলছে। আশা করছি আমরা তাদের সঙ্গে ঐক্যমতে পৌঁছতে পারবো। তিনি আরও বলেন, ভাস্কর্য নিয়ে ধর্মীয় অনুভূতিতে আঘাত দেওয়া হবে না। পাশাপাশি সংবিধানের বাইরেও কিছু করা হবে না। এ নিয়ে আলেমদের সঙ্গে আলোচনা শুরু হয়েছে। এ আলোচনা চলবে।

বিজ্ঞাপন