ভোটের রাজনীতি: ইসলামপন্থীরা কেন বিএনপির বিকল্প হতে পারছে না?

ভোটের রাজনীতি: ইসলামপন্থীরা কেন বিএনপির বিকল্প হতে পারছে না?

রাগিব রব্বানি :

বাংলাদেশে ভোটের রাজনীতিতে গত তিন দশক ধরে প্রধান দুটি প্রতিপক্ষ আওয়ামী লীগ ও বিএনপি। চলতি দশক বাদ দিলে নব্বই ও শূন্যের দশকে পালাক্রমে এ দুটো দলই ক্ষমতায় এসেছে। এবং ভোটের হিসাব নিকাশ আবর্তিত হয়েছে এ দুটো দলকে কেন্দ্র করেই। যদিও উভয় দলের অধীনে দুটো জোট ছিল, কিন্তু ভোটের সময় জনগণের কাছে নৌকা এবং ধানের শীষই ছিল মূল বিবেচ্য।

২০০৮ সালের সংসদ নির্বাচনে জয়ী হয়ে আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় আসার পর টানা তিন টার্ম ধরে তারা ক্ষমতায় আছে। প্রায় একযুগ সময়কালের এই শাসনে বিএনপিকে তারা চূড়ান্তভাবে কোনঠাসা করে রেখেছে। ফলে আওয়ামী লীগের প্রধান প্রতিদ্বন্দ্বী হিসেবে সহজেই তারা আর কোমরসোজা করে দাঁড়াতে পারছে না। বিএনপির এই জায়গাটায় বিকল্প শক্তি হিসেবে ইসলামপন্থী দলগুলো দাঁড়ানোর একটা সুযোগ আছে এবং ছিল, তারপরও তাঁরা কেন বিকল্প শক্তি হিসেবে দাঁড়াতে পারছে না? প্রশ্নটি সামনে রেখে কথা বলেছিলাম আলেম কবি ও বিশ্লেষক মাওলানা মুসা আল হাফিজের সঙ্গে।

মুসা আল হাফিজ বলছেন, রাজনীতিতে প্রভাব বিস্তার করতে হলে জনগণের মৌলিক চাহিদা পূরণের যে দাবি আছে, সেগুলো নিয়ে ধারাবাহিক এবং আন্তরিকভাবে সোচ্চার থাকতে হয়। পাশাপাশি মানুষের মৌলিক সংকটগুলোর বিষয়েও সচেতন থাকতে হয়। আমাদের ইসলামপন্থী দলগুলো এই জায়গাটায় বেশ দুর্বল, ফলে সুযোগ থাকা সত্ত্বেও তাঁরা বিকল্প শক্তি হিসেবে দাঁড়াতে পারছে না।

তিনি বলেন, ইসলাম-বিরোধী কার্যকলাপ বা ইসলামের স্বার্থ সংশ্লিষ্ট ইস্যুগুলোতেই কেবল ইসলামপন্থী দলগুলো সরব ভূমিকা পালন করে। এটা অবশ্যই দরকারি এবং প্রশংসনীয়। কিন্তু ভোটের রাজনীতিতে জনগণ পর্যন্ত পৌঁছতে গেলে এসবের বাইরে সাধারণ মানুষের নৈমিত্তিক যে সমস্যাবলি আছে, যে সংকট আছে, যে দাবি-দাওয়া আছে—সেগুলোর ব্যাপারেও সোচ্চার হওয়া অপরিহার্য। কিন্তু ইসলামপন্থীরা এসব ব্যাপারে বরাবরই উদাসীন থেকেছেন। যার ফলে ভোটের রাজনীতিতে তাঁরা জনগণের কণ্ঠস্বর হয়ে উঠতে পারছেন না।

মুসা আল হাফিজ আরও বলেন, জনগণের আকাঙ্ক্ষা পূরণ করতে পারলে, তাদের নৈমিত্তিক সংকট নিয়ে সোচ্চার ভূমিকা পালন করতে পারলে, বিএনপি তার আপন মহিমা নিয়ে ভাস্বর থাকলেও ইসলামপন্থীরা নতুন এক শক্তি হিসেবে আভির্ভূত হতে পারতেন। বিএনপি-আওয়ামী লীগের বিকল্প শক্তি না হয়ে তখন তাঁরা মূল শক্তি হিসেবে দাঁড়াতে পারতেন। কারণ আমি বিশ্বাস করি, এ দেশের মানুষ পরিবর্তনকামী। তারা আদর্শিক দেউলিয়াত্ব থেকে বেরিয়ে আসতে চায়, রাজনৈতিক দুর্বৃত্তায়ন তারা চায় না, ইসলাম একটি আদর্শ জীবনব্যবস্থা, এটা মোটামুটি সবারই জানা। আজকে যদি গণভোট দেওয়া হয়, যে আওয়ামী লীগ, বিএনপি, নাকি ইসলামকে চায় তারা, অবশ্যই ইসলামকে বেছে নেবে। কিন্তু বর্তমান ইসলামি কোনো দলকে যদি এনে দাঁড় করানো হয় এই জায়গায়, তারা সহজে চাইবে না। কারণ, ইসলামি দলগুলো জনগণ পর্যন্ত পৌঁছুতে পারেনি।

তিনি বলেন, তাই আমি মনে করি ইসলামি দলগুলোকে স্বতন্ত্র শক্তি হিসেবে দাঁড়াতে হলে দেশের জনগণ পর্যন্ত পৌঁছুতে হবে। তাদের দাবি ও আকাঙ্ক্ষাগুলোর সঙ্গে কণ্ঠ মেলাতে হবে। জনগণকে এখানে বিভাজন করা যাবে না, কে হিন্দু কে মুসলিম, কে বাতিল ফেরকার, কে সহি আকিদার, এই বিভাজনে না গিয়ে সবার কাছাকাছি যেতে হবে। সবাইকে এ কথা বোঝাতে হবে যে আমরা আদর্শ একটা শাসনব্যবস্থা কায়েম করতে সক্ষম। তাহলেই কেবল নতুন শক্তি হিসেবে ইসলামপন্থীরা আবির্ভূত হতে পারবেন বলে আমার মনে হয়।

মাওলানা মুসা আল হাফিজ বলেন, এখানে প্রশ্ন জাগতে পারে যে ইসলামপন্থী যে দলগুলো আছে, সেগুলোর এখনকার কাজ কি গুরুত্বপূর্ণ নয়? এর জবাব আমি প্রথমেই দিয়েছি যে, ইসলাম সংশ্লিষ্ট বিষয়ে তাঁরা যে সোচ্চার ভূমিকা রাখছেন তা অবশ্যই প্রশংসনীয়। জরুরি এবং আবশ্যকএ। তবে ভোটের রাজনীতিতে এটা মুখ্য নয়। এটার মাধ্যমে ইসলাম-বিরোধী কার্যকলাপ থামিয়ে রাখা যায়, জনগণ পর্যন্ত যাওয়া যায় না। বরং এর পাশাপাশি জনগণের নৈমিত্তিক সংকট ও দাবিগুলো নিয়ে সোচ্চার হলেই কেবল ভোট দিতে গিয়ে আপনার কথা তারা বিবেচনায় রাখবে।

তিনি আরও বলেন, আমাদের রাজনৈতিক দলগুলো এখন কেবল প্রেশার-সংগঠন হিসেবে কাজ করছে। এটা আদতে আসলে রাজনীতি না। এই বৃত্ত থেকে বেরিয়ে আমাদের দলগুলোকে গণমুখী হওয়া জরুরি।