মাওলানা উবাইদুল্লাহ সিন্ধীর চিন্তাধারার ভূমিকা

সাইয়েদ সোলায়মান নদবী

ইউরোপের বস্তুগত উত্থান ও মুসলিম জগতের জাগতিক অবনতি আধুনিক কালে, দীর্ঘ সময় ধরে মুসলিম চিন্তাবিদদেরকে অস্থিরচিত্ত করে রেখেছে। এর সমাধানে মুসলিম চিন্তকদের মধ্য হতে সৈয়দ জামালুদ্দিন আফগানী সামগ্রিক ইসলামী ঐক্যকে নির্ধারণ করেছেন। সকল মুসলমান, রাষ্ট্র ও জাতি নির্বিশেষে ইউরোপের মোকাবেলায় অবতীর্ণ হবে, এরই আহ্বান জানিয়েছিলেন তিনি বিশ্বব্যাপি। তার এই চিন্তাই হলো, প্যান ইসলামিজম নামে প্রসিদ্ধ। এই মহান পরিকল্পনা বাস্তবায়নের স্বপ্নে তিনি চষে বেড়িয়েছেন ভারত, ইরান, মিসর, ফ্রান্স। তার সম্পাদিত বিখ্যাত আরবি ম্যাগাজিন ‘আল উরওয়াতুল উসকা’র মাধ্যমে মুসলিম জাতি গোষ্ঠীর মাঝে এই চিন্তাধারা ছড়িয়ে দেবার প্রয়াস চালান।এভাবেই এই আন্দোলনটি প্রাণবন্ত হয়ে উঠে।

অন্যদিকে ছিলেন হিন্দুস্তানের স্যার সৈয়দ আহমদ খান। তিনি মুসলমানদের অবনতির কারণ নির্ধারণ করতে গিয়ে দায়ি করেন, ইউরোপের আধুনিক জ্ঞান-বিজ্ঞান, তথ্য-প্রযুক্তি, সভ্যতা-সংস্কৃতি সম্পর্কে মুসলমানদের অজ্ঞতাকে। এই সমস্যার সমাধানকল্পেই তিনি আলিগড় বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠা করেন। যার মাধ্যমে মুসলমানদের জন্য ইউরোপীয় সভ্যতা, আচার, জ্ঞান-বিজ্ঞান, চিন্তাধারা গ্রহণ করার পথ সুগম হবে। তার আন্দোলনের মূল কথা ছিল, একমাত্র ধর্ম ব্যতিত জীবনের সকল ক্ষেত্রে ইংরেজ হয়ে যাও।

এ সময়েই ইউরোপের জাতীয়তাবাদী মানসিকতা মুসলিমবিশ্বে প্রভাব বিস্তার করে। ফলে মিসর, তুরস্ক ও ইরানে ইসলামী আন্দোলনের পরিবর্তে জাতীয়তাবাদী আন্দোলনের সূচনা হয়। যার মূলকথা ছিল, ইসলামী ঐক্যের পরিবর্তে রাষ্ট্র ও জাতিকেন্দ্রিক একটি ঐক্যের গোড়াপত্তন করতে হবে। এবং তাদের এই জাতীয়তাবাদী আন্দোলনের আহ্বান জীবনের সর্বস্তরের মানুষের কাছেই অত্যন্ত গ্রহণযোগ্যতা অর্জন করে। মিসরে মুস্তফা কামিল, ইরানে মুফতীযাদাহ এবং তুরস্কের মুক্তচিন্তার আধুনিক তরুণদের মাধ্যমেই জাতীয়তাবাদের বিপ্লব বিকাশ লাভ করে।

পরবর্তীকালে পর পর দুটি বিশ্বযুদ্ধের মধ্য দিয়ে রুশ বিপ্লবের সফলতা ও কার্যকারিতা সামনে আসে। স্যোসালিজম ও কম্যুনিজম ইত্যাদি আন্দোলনগুলো ইউরোপের বিভিন্ন রাষ্ট্রে গৃহিত হয়। এটি প্রত্যক্ষ করে বিভিন্ন মুসলিম চিন্তাবিদগনও ইসলামের রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক ও সামাজিক কাঠামোকে এসব দর্শনের আলোকে পরিবর্তন করার প্রয়াস শুরু করে দিয়েছিলেন। অপরদিকে জার্মানি ও ইটালিতে উপরোক্ত মতবাদগুলোর বিপরীতে গড়ে উঠছিলো নাৎসীবাদ ও ফ্যাসিবাদ। কিছু কিছু ধর্মদরদী মুসলিম তরুণও এরূপ রাজতান্ত্রিক মতবাদে ইসলামের পুণরুত্থানের দিবাস্বপ্ন দেখতে থাকে। এমনিভাবে আমরা প্রত্যক্ষ করি যে, মুসলিম তরুণরা বিশ্বযুদ্ধের পর ব্যাপকভাবে হয়তো স্যোসালিজম অথবা নাৎসিবাদের শিকারে পরিণত হয়।

প্রথমোক্ত মতাদর্শটি দিল্লীতে ‘খায়রী ব্রাদার্স’ এর জামায়াতে ইসলামী ও অমৃতসরে ‘মাশরেকী’ সাহেবের ‘খাকসার’ আন্দোলনের আকারে প্রকাশিত হয়। খায়রী ভাইদের আন্দোলনের পরিধি ঘরের চারদেয়ালের মাঝেই সীমাবদ্ধ ছিলো। তাদের শুধুমাত্র চেষ্টা ছিল একক নেতৃত্বের উপর মুসলমানদেরকে নিয়ে আসা।এছাড়া ধর্মিয়, মৌলিক ও আনুসাঙ্গিক বিষয়ে নিজেদের পক্ষ থেকে কোন সংস্কার অথবা নতুন ব্যাখ্যার মোটেই কোন ইচ্ছে তাদের ছিল না। কিন্তু এর বিপরীতে, মাশরেকী আন্দোলন একক নেতৃত্বের পাশাপাশি সেনাবাহিনী গঠন করারও প্রয়াস চালিয়ে যাচ্ছিল। তারা চাচ্ছিল,পুরো ইসলাম ধর্মকে দুটি মূলনীতির উপর স্থাপিত করতে। এবং তাদের ধারণা ছিলো যে, মুসলমানদের অবনতির সবচেয়ে বড় কারণ হল পরলৌকিক জীবনের ব্যাপারে তাদের অতিরিক্ত আগ্রহ ও একেই জীবনের সারোৎসার হিশেবে দেখা। এজন্য তারা প্রচার করে বেড়াতো যে, জান্নাত ও জাহান্নাম ইহলোকেই অবস্থিত। ইউরোপীয় জীবনের মালঞ্চ পৃথিবীর স্বর্গ। আর মুসলমানদের অধঃপতন ও পরাজয় হলো তাদের নরকপ্রাপ্তি। সুতরাং তাদের মতে আজকের ইউরোপ হল প্রকৃত মুসলমান। আর মুসলমানরা প্রকৃতপ্রস্তাবে কাফের।

হিন্দুস্তানে মুসলমানদের অধঃপতনের সূচনাতেই শাহ ওয়ালিউল্লাহ দেহলবী রহ, এর আবির্ভাব ছিলো মহান আল্লাহর পক্ষ হতে এক বিশেষ করুণা। যিনি সংস্কার ও দাওয়াতের এক নতুন পদ্ধতি বাতলে দিয়েছেন। আর তা হল মুসলমানদের গৌরবময় ঐতিহ্যের দিকে প্রত্যাবর্তন এবং পূর্ববর্তীদের পথ গ্রহণ। এই চিন্তাধারা হিন্দুস্তানে গ্রহণযোগ্যতা লাভ করে এবং জীবনের বিস্তৃত পরিসরে প্রচারিত হতে থাকে। যদিও রাজনৈতিক ভাবে একসময় তা ভঙ্গুর হয়ে পড়ে; কিন্তু বুদ্ধিবৃত্তি, ধর্ম ও বাস্তবতার নিরিখে তার শেকড় ছিল অত্যন্ত গভীরে প্রোথিত। যদ্দরুণ বৃহত্তর ভারতের রাজনৈতিক বিপ্লবের ঝড় ঝাপটাও তাকে হেলাতে পারেনি। উপনিবেশীয় রাজনীতির সূচনার ক্ষণ হতেই শাহ ওয়ালিউল্লাহর আন্দোলনের বিভিন্ন সদস্যগন বহির্বিশ্বে – বিশেষত হেজাযে পাড়ি জমাতে লাগলেন।

এরপরও এই আন্দোলনের সদস্যদের উল্লেখযোগ্য একটা অংশ দেশের মাটিতেই থেকে যান। তারা আন্দোলনের স্রোতধারা অন্য দিকে প্রবাহিত করেন। নিছক ধর্মিয় ও তাত্ত্বিক দিক থেকে হলেও আন্দোলনকে টিকিয়ে রাখার মানসে তারা ওয়ালিউল্লাহ দর্শনের বিভিন্ন শিক্ষালয় স্থাপন করেন। দেওবন্দ, সাহারানপুর এ উদ্দেশ্যেই প্রতিষ্ঠিত হয়। এসব বিদ্যানিকেতনের মাধ্যমে তার চিন্তাধারা ছড়িয়ে পড়তে থাকে আফগান থেকে হেজাযে। এই আন্দোলনের পরিবর্তিত ক্ষেত্রে মৌলিক উদ্দেশ্যের একটি ছিল, ইসলামকে সকল প্রকার লৌকিক আচারানুষ্ঠান ও কুসংস্কারের জঞ্জাল হতে পূত-পবিত্র করা। চিন্তা ও কর্মে, বিশ্বাস ও আচরণে, মহান পূর্ববর্তীদের মতাদর্শ অনুকরণ করা। ফিকহী মাসআলায় ঐ সকল মনীষীদের পন্থা নির্বাচন, যারা ছিলেন ফিকহবিশেষজ্ঞ হওয়ার পাশাপাশি হাদিসশাস্ত্রেরও প্রাজ্ঞ ও বরিত ব্যক্তিত্ব।

( টীকা: কিছু কিছু লোক এটাকেও বিরোধপূর্ণ বিষয়ে পরিণত করেছে যে শাহ ওয়ালিউল্লাহ দেহলবী ফিকহের ক্ষেত্রে কোন ধারার অনুসারী ছিলেন। অথচ এটা তিনি নিজেই তার আত্মজীবনীমূলক গ্রন্থ ‘আল জুযবুল লতিফে’ স্পষ্ট করে তুলে ধরেছেন। তিনি বলেছেন, মাজহাব চতুষ্ঠয়, ফিকহের মূলনীতিমালা ও হাদীসের গ্রন্থাবলি দেখার পর মহান আল্লাহর সাহায্যে আমার সামনে ফোকাহায়ে মুহাদ্দিসীনের পথ আলোকিত হয়ে উঠে।)

ঠিক একই সময়ে ইয়ামেন ও নজদে এরকমই একটি আন্দোলনের সূচনা হয়। হিজরী সপ্তম শতকের শেষভাগে এবং অষ্টম শতকের শুরুতে আল্লামা ইবনে তাইমিয়া ও তার শিষ্য ইবনুল কাইয়ুম মিসর ও শামে যার গোড়াপত্তন করেছিলেন।যেটার মৌলিক উদ্দেশ্য ছিল, মুসলমানদেরকে ইমাম চতুষ্ঠয়ের অন্ধ অনুকরণ ও প্রমাণবিহীন অনুসরণ হতে মুক্তি দিয়ে কর্মে ও বিশ্বাসে সরাসরি কোরান-সুন্নাহর নির্দেশনা গ্রহণ করার প্রতি উদ্বুদ্ধ করা। মাওলানা ইসমাইল শহিদ রহ, এর সময়ে এই আন্দোলনের জোয়ার হিন্দুস্তানে পৌঁছে যায়। এবং শাহ ওয়ালিউল্লাহর আন্দোলনের সাথে একীভূত হয়ে যায়। এরই নাম হয় পরবর্তীকালে আহলে হাদিস আন্দোলন।

শাহ ওয়ালিউল্লাহ আন্দোলনের এই দুই ধারার মাঝে, তাকলিদতত্ত্বে মতবিরোধ থাকলেও, মূলনীতিতে তারা এক ও অভিন্ন ছিল। কিন্তু দুঃখজনক বিষয় হল, তারা ফিকহি আনুসাঙ্গিক বিষয়াবলিকে পরবর্তীকালে প্রাপ্যের অধিক গুরুত্ব দিতে শুরু করে। এরই ফলশ্রুতিতে দুই দলের ভেতর ফাটল সৃষ্টি হয়।এমনকি বছরকে বছর ধরে চলতে থাকে পারস্পরিক কোন্দল। এহেন পরিস্থিতিকে সামনে রেখে পরবর্তীকালে নাদওয়াতুল উলামার গোড়াপত্তন হয়। ফিকহি আনুসাঙ্গিক বিষয়াবলিতে যে উদারতা ও সমঝোতার নীতি অবলম্বন করে। তাছাড়া শিক্ষাসংস্কারের বিষয়টাও সে অত্যন্ত গুরুত্ব সহকারে বিবেচনা করে থাকে। কেননা, গতানুগতিক শিক্ষাধারায় এমন আলেম সৃষ্টি হওয়া প্রায় অসম্ভব, যারা যুগজিজ্ঞাসাকে অনুধাবন করতে পারেন, আধুনিক কালের বিচারে যারা যোগ্য ও প্রয়োজনীয় বলে বিবেচিত হবেন। তাদের এই শিক্ষাসংস্কারের ক্ষেত্রে দুটি বিষয় সামনে রাখা হয়েছিল।

১. সকল ফেরকা ও উপদলগুলোর মাঝে পারস্পরিক শত্রুতা ও সহিংসতাকে নিঃশেষ করে সম্প্রীতি তৈরি করার চেষ্টা করা। এবং সকলকে এক প্লাটফ্রমে একত্রিত করে সম্মিলিতভাবে প্রকৃত সংকট ও শত্রুদের মোকাবেলা করা। ২. প্রাচীন ইউনানী মানতেক, হেকমতসমূহ ছেটে ফেলা, আমাদের পূর্ববর্তীরা যেগুলোকে কোনরূপ প্রয়োজন ছাড়াই নির্বাচন করেছিলেন। এর পরিবর্তে আধুনিক জ্ঞান-বিজ্ঞানকে সিলেবাসভূক্ত করা; যেগুলোর উপর আজকের বুদ্ধিবৃত্তিক জগতের ভিত্তি স্থাপিত।

হিন্দুস্তানের মুসলমানগন ইসলামী খেলাফতের মূলকেন্দ্র তুর্কিস্তানের সহিত সর্বদাই একটা হৃদ্রিক সম্পর্ক অনুভব করতেন। এজন্যই বিশ্বযুদ্ধের পর তুর্কি সাম্রাজ্যের অধঃপতন ও ইসলামী রাষ্ট্রগুলোর বিভক্তি তাদের উপর গভীরভাবে প্রভাব ফেলে। এই প্রভাবেই খেলাফত আন্দোলন নামে এক উদ্দীপনাপূর্ণ বিরাট আন্দোলনের সূচনা হয়। যার বিস্তৃতি ছিলো এতদূর যে, ইউরোপ, আফ্রিকা ও এশিয়া মহাদেশের সকল মুসলিম জাতিই এই আন্দোলনে অংশগ্রহণ করে। এবং এটাই ছিলো প্রকৃতপক্ষে ঐক্য আন্দোলনের সর্বশেষ প্রয়াস। ধারণা করা হয় যে, এই মহাশক্তি মুসলমানদের জন্য এক নয়া জিন্দেগীর পয়গাম নিয়ে আসতে পারতো।

তিনটি মৌলিক কথার উপর এই আন্দোলনের ভিত্তি স্থাপিত হয়। ১. মুসলমানরাই আল্লাহর মহান খেলাফতের ধারক। ২. মুসলমানদের ভৌগোলিক মূলকেন্দ্র হলো হেজায। ৩. আর রাজনৈতিক মারকাজ হলো তুর্কি খেলাফত। কিন্তু যখন এই খেলাফত আন্দোলন ভরা যৌবনে ঠিক তখনই তুর্কিস্তানে মুস্তফা কামাল পাশা খেলাফতব্যবস্থা উচ্ছেদের ঘোষণা দেন। তুর্কি জাতিকে ইসলামী রাষ্ট্রগুলোর প্রতিনিধিত্ব থেকে সরিয়ে এনে তুর্কি জাতীয়তাবাদের ভিত্তি স্থাপন করেন। ইসলামের সহিত সকল সম্পর্ক ত্যাগ করে পুরো ইউরোপীয় সংস্কৃতিকে তুর্কি জাতীয়তার রঙে উজ্জ্বল করে তোলেন। বলাবাহুল্য যে, মুস্তফা কামালের এই খেলাফতবিলুপ্তি হিন্দুস্তানের খেলাফত আন্দোলনের শক্তিকে পুরোপুরিই নিঃশেষিত করে দেয়।

কালের আবর্তন ও ছলনা দেখতে দেখতে বেড়ে উঠে শিখ পরিবারের এক বালক, পাঞ্জাবের অন্তর্গত সিয়াল গ্রামে। ষোল বছর বয়সে সে ইসলামের ছত্রছায়ায় আশ্রয়গ্রহণ করে। এবং কতক আলেমের নিকট আরবি শিক্ষা অর্জন করে। উচ্চশিক্ষার উদ্দেশ্যে একসময় সে ভর্তি হয় দেওবন্দ মাদ্রাসাতে। অংশগ্রহণ করে শাইখুল হিন্দ মাহমুদুল হাসান দেওবন্দির ক্লাসে। পরবর্তীকালে এই বালকই উবাইদুল্লাহ সিন্ধী নামে প্রসিদ্ধ হয়ে উঠেন। জ্ঞানস্পৃহার পাশাপাশি তার মাঝে ছিল জিহাদ ও জিহাদি মানসিকতার সাথে গভীর সখ্যতা; পূর্ববর্তীদের মধ্যে সৈয়দ আহমদ শহীদ ও মওলানা ইসমাইল শহীদের হৃদয়ে যেটা তরঙ্গায়িত ছিল। তাছাড়া মওলানা আবুল কালাম আজাদ ঠিক সেই সময়েই আল হেলাল পত্রিকার মাধ্যমে নতুন কোনো জিহাদি বিপ্লবের আগুন ছড়িয়ে দিতে চাইছিলেন। এছাড়াও দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে তুরস্ক ও জার্মানির মধ্যকার মিত্রতাশক্তিও কতক রাজনৈতিক ও ধর্মীয় চিন্তাবিদকে পূর্ব পরিকল্পনাকৃত সিদ্ধান্তগুলো নতুন করে বাস্তবায়নে উদ্বুদ্ধ করে। তাদের কাছে এই মিত্রশক্তিকে অত্যন্ত সুবর্ণ সুযোগ বলে মনে হতে থাকে। কিন্তু দুঃখজনক বিষয় হলো জীবনের সীমাবদ্ধতা একে সামনে বেশিদূর পা ফেলবার সুযোগ দেয়নি। সূচনাতেই আন্দোলনের সসীল সমাধি ঘটে যায়। অবিন্যস্তভাবে পড়ে থাকে মহান পরিকল্পনাগুলো। শাইখুল হিন্দ তার কতক সাথী সঙ্গীসহ বাধ্য হন হেজাযে হিজরত করতে। এতেও তিনি রেহাই পাননি। বরং ইংরেজ সরকারকতৃক তাকে মালটা দ্বীপে বন্দিরূপে নির্বাসিত করা হয়। আর এদিকে মওলানা উবাইদুল্লাহ সিন্ধী তার কতক সঙ্গীকে নিয়ে আফগানিস্তানে আত্মগোপন করেন।

এরপর আর কি? কোনো একদিন সংবাদে প্রকাশিত হলো যে, রেশমী রুমাল আন্দোলনের মহান পুরুষ মওলানা উবাইদুল্লাহ সিন্ধী ইন্তেকাল করেছেন। এতদূর পৌঁছনোর পরই আমার কলম থেমে যাওয়ার কথা ছিল; যদি এটা নিছকই ব্যক্তিগত কোনো অনুসঙ্গ হতো। কিন্তু এটা তেমন কোনো বিষয় না। বরং তার ব্যক্তিগত আলোচনার সাথে উতপ্রোতভাবে জড়িত রয়েছে ধর্মীয় বিষয়াদি। তাকে বিশ্লেষণ করার মাধ্যমে আমরা প্রকৃতপক্ষে ধর্মীয় একটি দিকেরই বিশ্লেষণ করতে যাচ্ছি। তিনি যদিওবা বর্তমানে পৃথিবীকে বিদায় জানিয়ে চলে গেছেন, তথাপি তার ও তার সমর্থকদের লিখিত গ্রন্থাবলির অস্তিত্ব রয়েছে এবং সামনেও বাকি থাকবে। বেঁচে থাকবে তার চিন্তা ভাবনাগুলো কাগজের পাতায় পাতায়। এজন্যই তার প্রয়াণের পরও তার চিন্তাধারা নিয়ে আলোচনা অত্যন্ত গুরুত্ববহ। আগেই বলে রাখি, ইসলামের প্রতি তার অত্যন্ত শ্রদ্ধা সমর্পণ ও ভালোবাসা ছিলো। ইসলামকে জাগতিক দিক থেকে এগিয়ে নেয়ার প্রয়াস ও প্রাণোন্মদনা ছিল।

আফগানিস্তানে যাওয়ার পর থেকে তার জীবনের ধারাক্রম এখানে তুলে ধরছি । ১৯১৫ সালে বিশ্বযুদ্ধের সময় তিনি আফগানিস্তানে পালিয়ে যাওয়ার পর সেখানে সাত বছর অবস্থান করেন।সেখানের রাজনৈতিক আবহের সহিত জড়িয়ে পরেন। কিন্তু ক্রমাগত সেখানে পরিস্থিতির পট পরিবর্তিত হয়। সেখান থেকে তিনি ১৯২২ সালে রাশিয়ায় চলে যান, যখন সেখানে পুরোদমে বলশেভিক আন্দোলনের জোয়ার বইছিলো। বলতে পারি, এখান থেকে তিনি পুরোপুরিভাবেই বলশেভিক আন্দোলনের দ্বারা প্রভাবিত হন। ১৯২৩ সালের দিকে তিনি রাশিয়া থেকে চলে যান কামাল আতাতুর্কের নব্যগঠিত তুরস্কে। সেখানে প্রায় চার বছরের মতো অবস্থান করে তারপর ইতালিতে। সেখান থেকে সুইজারল্যাণ্ডে। সর্বশেষ সুলতান ইবনে সঊদের আমলে তিনি হেজাযে গিয়ে স্থিত হন।

সংক্ষিপ্তাকারে তার জীবনবৃত্তান্ত তুলে ধরলাম। এটি তার চিন্তাধারা অনুধাবনে আমাদের সহায়ক হবে। তার দৃষ্টান্ত ঐ ব্যক্তির মতো যে স্রোতের এক ধাক্কায় সীমাবদ্ধ পুষ্কুরিণী হতে আছরে পড়েছে সমুদ্রের বিপুল জলরাশিতে। প্রারম্ভকালে তার সম্পর্ক ও উঠাবসা এমন এক দলের সহিত ছিল, আধুনিক ইউরোপীয় রাজনৈতিক ধারার সাথে যাদের মোটেও সম্পৃক্তি ছিল না। কিন্তু পরবর্তীকালে তিনি বিশ্ব রাজনীতির সাথে উতপ্রোতভাবে জড়িয়ে পরেন। এসময় বিশ্বের গুরুত্বপূর্ণ আন্দোলনগুলোর সাথে তার সাক্ষাত ঘটে। অবিশ্বাসী ও পাশ্চাত্য ধারার বিপ্লবী ও রাজনৈতিক ব্যক্তিত্বের সাথে উঠাবসা হয়। সুযোগ মিলে ইউরোপীয় বিভিন্ন রাজনৈতিক সামাজিক ও অর্থনৈতিক মতবাদকে নিজ চোখে দেখার। যেসব দেশে তিনি গিয়েছেন সেসব দেশের ভাষা তার আয়ত্ব ছিল কিনা তা অবশ্য আমার জানা নেই। মোটকথা, ইউরোপীয় রাজনৈতিক মতাদর্শ ও বিপ্লবী আন্দোলনগুলো তাকে বিস্মিত করে এবং তার চিন্তায় প্রভাব ফেলে। এরই ফলশ্রুতিতে তার ভেতরে এই চিন্তা ঘুরপাক খেতে থাকে যে, কিভাবে ইসলামের সহিত ঐ আধুনিক আন্দোলনের সামঞ্জয্য তৈরি করা যাবে। রাশিয়া থেকে তিনি বিপ্লবের সবক আয়ত্ব করেছেন। আর তুরস্ক থেকে শিখেছেন সংস্কারের শিল্প। এই নব্য তুর্কিদের থেকে জাতীয়তাবাদকে গ্রহণ করেছেন। আর ইউরোপ থেকে গ্রহণ করেছেন বস্তুগত বোধ। এরপর নব্যগঠিত রুশ ও তুরস্কের আদর্শের সাথে প্রাচীন জ্ঞান-বিজ্ঞানের সংমিশ্রণ ঘটিয়ে এক নতুন মতাদর্শের উদ্ভব ঘটিয়েছেন। এরপর তিনি ফিরে আসেন হিন্দুস্তানে। এবং এই মতাদর্শকে উপস্থিত করেন ‘হিকমতে শাহ ওয়ালিউল্লাহ’ নামে।

কিন্তু তার সামনে সবচেয়ে সমস্যা এটি ছিল যে, ইসলাম ও ভারত জাতীয়তাবাদের মাঝে কিভাবে তিনি সংমিশ্রণ ঘটাবেন? তিনি এর সমাধান পেয়েছিলেন ঐ সকল মুসলিম রাষ্ট্র হতে, যেগুলো গড়ে উঠছে জাতীয়তাবাদের উপর ভিত্তি করে। যেগুলোতে ইসলাম ধর্ম হতে দৃষ্টি ফিরিয়ে শুধুমাত্র জাতীয়তাবাদের মূলনীতির আলোকে বিভিন্ন ধর্ম ও শ্রেণি ঐক্যবদ্ধ হবার প্রয়াস পেয়েছে।আরব জাতীয়তাবাদের আহ্বায়কগন দাবি করেছেন, আমরা আল্লাহর রাসূল সা,এর আগমনের পূর্বে যেমন আরব ছিলাম এখনও সেই আরবই আছি। দীর্ঘকালব্যাপী আমরা – মুসলিম হই কি খ্রিস্টান – আরব নামটি আমাদের সাথে যুক্ত হয়ে আছেই। মিসরের চিন্তাবিদগন বললেন, আমরা আরব, তুর্কি, কিবতি, কুর্দি যাই হইনা কেন – ঘুরে ফিরে আমাদের সম্মিলিত একক পরিচয় একটাই। আমরা মিসরী। ফেরাউনগন আমাদের গৌরব ও ঐতিহ্যের স্মারক। আমাদের ভিত্তি সেই প্রাচীনকালে গড়ে উঠা পিরামিডসভ্যতা। তেমনিভাবে আধুনিক ইরানও জাতীয়তাবাদকে নিজের জীবনে স্বাগত জানালো। প্রাচীন পারসিক সভ্যতার উপর জাতিগত ভিত্তি স্থাপন করলো। বলল, আমি ইসলাম ধর্মের হই কি জরথ্রুস্ট ধর্মের, একত্ববাদী হই কি অগ্নিপূজারী, আমার প্রকৃত পরিচয় একটাই। আমি ইরানী। তুর্কিরাও নিজেদের জাতীয়তাবাদী অবস্থান স্পষ্ট করলো। গৌরবের প্রতীকচিহ্ন বানালো চেঙ্গিস ও হালাকু খাঁকে; সুলতান অটোমান, বায়েজিদ কিংবা সুলায়মানকে নয়।

মওলানা উবাইদুল্লাহ সিন্ধী এসব পর্যবেক্ষণের পর ধর্ম ও জাতীয়তার মাঝে সাযুজ্য তৈরি করার প্রয়াস চালালেন। এজন্য তিনি ইসলামী বিষয়াবলির ব্যাখ্যা বিশ্লেষণ করতে লাগলেন আপন দর্শনের আলোকে। কিছু কিছু ব্যাখ্যা তো অবশ্যই সঠিক ছিল, সন্দেহ নেই; কিন্তু সেগুলোর উপস্থাপন পদ্ধতি ছিলো এমন যে, তাতে সেগুলোর চির পরিচিত চেহারা অস্পষ্ট হয়ে গিয়েছিল। যেমন তিনি ‘মানবসমতা’র দর্শনকে প্রমাণ করতে চান ‘ওহদাতুল উজুদ’ (অদ্বৈতবাদ) – এর মতো জটিল কণ্টকাকীর্ণ পথে। অথচ কোরান হাদিসে উল্লেখিত ‘মুসাওয়াতে বনী আদম’ তথা মানবজাতির সমতাতত্ত্ব দ্বারা সোজা সাপ্টাভাবেই তিনি বিষয়টি সাব্যস্ত করতে পারতেন। তার যেহেতু প্রয়াস ছিল, ধর্ম ও জাতীয়তার সংমিশ্রণ ঘটানোর তাই তিনি আরবীয় ইসলামকে ভারতীয় ইসলামে রূপান্তরিত করার ইচ্ছা করেন; যাতে করে তা জাতীয়তার খুব কাছাকাছি চলে আসে। এতে করে আর্য আর হিন্দুদের কাছে ইসলাম আর অপরিচিত ও দুর্বোধ্য থাকবে না, যেমনটি পূর্বে ছিল। তাছাড়া এর মাধ্যমে মুসলমানরা ধর্মহীন উগ্রপন্থী জাতীয়তাবাদের কবল হতে রক্ষা পাবে।

তিনি হানাফি মাজহাবকে গ্রহণ করেছেন; এজন্য না যে তা দলিল-প্রমাণের বিচারে শক্তিশালী। বরং এজন্য যে ইমাম আবু হানিফা রহ, বংশগতভাবে অনারব। তার বংশলতিকা প্রসারিত হয়েছে হিন্দুস্তানের সিন্ধের মাটি হতে। এজন্য তার মতে হানাফী মাজহাবে ভারতীয় জাতীয়তাবাদের একটা রঙ আছে। তিনি ‘ওহদাতুল উজুদ’ (মতবাদে) বিশ্বাসী, এজন্য না যে, এটি তার মতে কোরান হাদিসসমর্থিত, এবং খুব সহজেই এর মাধ্যমে ‘জগতের নিত্য ও অনিত্যে’র সম্মিলনের মতো জটিল দার্শনিক বিষয় পানি হয়ে যায়। বরং এজন্য যে, হিন্দুদের বেদান্ত মতবাদে এমনই একটা বিশ্বাসের দেখা পাওয়া যায়। এবং তার মতে, এই বিশ্বাস, হিন্দু ও মুসলমানের মাঝে ঐক্যের প্রয়াসকে দৃঢ় করে তুলতে ভূমিকা পালন করবে। শুধু তাই নয়, এর মাধ্যমে সকল মানবকেই এক প্লাটফ্রমে সম্মিলিত করা সম্ভব হবে। তাসাউফকে হিন্দুদের ‘যোগবাদে’র সাথে এক করে দেখাও তার উক্ত মূলনীতি হতে উন্মীলিত একটা শাখা।

শাহ ওলিউল্লাহ দেহলবী ও তার বংশধরদের প্রতি উবাইদুল্লাহ সিন্ধীর যে দুর্বলতা, অনুরাগ ও অন্তরঙ্গতা– তা এজন্য নয় যে তাদের মাধ্যমে বড় বড় দীনি কাজ সম্পাদিত হয়েছে; বরং এজন্য যে তারা হিন্দুস্তানী সম্ভ্রান্ত কুলিন ও প্রসিদ্ধ পরিবার। তারা যেসব লেখাঝোকা করে গিয়েছেন, যেসব বাণী উচ্চারণ করেছেন, যেপথ তারা নির্দেশ করে গিয়েছেন তার মাধ্যমে ‘আরবীয়’ ইসলামকে ‘হিন্দুস্তানী’ ইসলামে রূপান্তরিত করা সহজতর হবে। এই ধারাবাহিকতায় তিনি শাহ ওলিউল্লাহ দেহলবীকে তিনি বানিয়ে ফেলেন আকবরের ধর্মনিরপেক্ষ ‘দীনে ইলাহির’ একনিষ্ঠ আহ্বায়ক, দাওয়াতদাতা। বোধ হয়, ইসলামের জন্য এরচে’ অধিক মারাত্মক কথা আর হতে পারে না। যেই শাহ ওলিউল্লাহকে তিনি আকবরের অসম্পন্ন কর্মের সম্পূরক হিশেবে আবিস্কার করেন, দেখা যাক, সেই আকবর সম্পর্কে খোদ শাহ ওলিউল্লাহ কি ফতোয়া দেন। ‘আনফাসুল আরেফীন’ গ্রন্থের নিম্মোক্ত বাক্যটি দেখুন—

“জালালুদ্দীন আকবরকে একসময় মহান বাদশাহ জ্ঞান করতাম। কিন্তু পরবর্তীকালে যখন ইলহাদ ও ধর্মবিরোধীতার শিকার হলেন, তারপর থেকে আমি তার সকল সম্পর্ক ছিন্ন করে বারাআত ঘোষণা করছি।” (১৬০ পৃষ্ঠা)

একদিকে তো ছিল জাতীয়তাবাদের ধারাবাহিকতা, অন্যদিকে মুস্তফা কামাল আতাতুর্কের মত প্রাচীনের বিরোধিতা ও সমাজ, শিক্ষা, সংস্কৃতি, এমনকি পোশাক, ভাষার অক্ষরমালা ইত্যাদির ক্ষেত্রেও ইউরোপকে অনুকরণের ভাবনা জাগে। এই আধুনিকতা তার জাতীয়তাবাদী চেতনার সাথে মিলে মিশে একাকার হয়ে গেছে। এজন্যই তিনি আরবী ফারসী অক্ষর বাদ দিয়ে উর্দু ভাষার জন্য ল্যাতিন অক্ষর গ্রহণ করার আহ্বান জানান। আলেমদের মশোয়ারা দেন কোট পাতলুন আর হ্যাট পরিধান করার। অন্যদিকে আবার শাহ ওলিউল্লাহ দেহলবীর ‘বুদুরে বাযেগা’, ‘হুজ্জাতুল্লাহিল বালেগা’ ইত্যাদি গ্রন্থে উল্লেখিত কিছু সংক্ষিপ্ত ও অস্পষ্ট কথার উপর নির্ভর করে মার্কস দর্শনের বেশ কিছু নীতিমালা আপন বিপ্লবের অন্তর্ভুক্ত করেন। এই হলো গিয়ে উবাইদুল্লাহ সিন্ধীর চিন্তাধারার ভিত্তি – ইউরোপীয় দর্শনের চর্বিত অংশকে নিরেট ইসলামী ভাবধারা ও সমস্যাবলির সাথে গুলিয়ে ফেলা।

আশ্চর্য হতে হয় তার অভিনব ব্যাখ্যাপদ্ধতিতে। ‘খালকুল কুরআন’ ( কুরআন আল্লাহর গুণ না সৃষ্ট বিষয়ক বিতর্ক)- এর মতো ধর্মীয় মাসআলাকে তিনি আরব ও অনারবের লড়াই হিশেবে ব্যাখ্যা করেন। এটা যে কত বড় প্রমাদ, তা ব্যাখ্যা করার অবকাশ রাখে না। তিনি যদি এই মাসআলায় লড়াইরত ব্যক্তিবর্গের গোত্র, রাষ্ট্র ও ভাষাকে ঘেটে দেখতেন, তাহলে তো এ ধরণের একপেশে সিদ্ধান্ত, আশা করি দিতেন না। প্রকৃতপক্ষে এটা এমনই এক গুরুত্বপূর্ণ দীনি ও ইলমি মাসআলা, যা ইমাম বুখারিকে ‘খালকু আফআলিল ইবাদ’ ও ইমাম আহমাদ বিন হাম্বলকে ‘আর-রদ আলাল জাহমিয়া’, গ্রন্থদ্বয় রচনা করতে বাধ্য করেছে। এটা ছিল ইসলাম ও খ্রিস্টীয় ভাবধারার সংঘাত। এটাকে আরব ও অনারবের লড়াই হিশেবে দেখাকে পরিহাসই বলা চলে। এরপর তিনি এই বিরোধের যেই রূপ বর্ণনা করেছেন, সেটা মোতাযেলাদের মতবাদ না। সেটা হাম্বলিদের সাথে আশআরীদের সংঘাত, আল-মামুনের অনেক পরে যা অস্তিত্বে এসেছে।

মাওলানা সাহেব এটাও বলেন যে, “অনারব মনন ও মানসের জন্য আল্লাহ তায়ালার বৈশ্বিক শিক্ষা হিশেবে শুধুমাত্র আরবি কোরআন বোঝা অসম্ভব।” সুবিনয়ে আরজ করছি, যেই আর্যদের প্রতি তার এতটা দর‍দ, সেই আর্যদেরকে বলুন তো পারলে, বেদকে তারা যেন বৈশ্বিক গ্রন্থ না বলে। সংস্কৃতিকে তারা যেন ঐশি ভাষা জ্ঞান না করে। শুধুমাত্র অনারব নয়, হিন্দুদের মানসের জন্য এ অসম্ভব কি করে সম্ভব হলো। এই আলোচনায় তিনি আবশ্যিকভাবেই ‘কুরআনান আরাবিয়া’ আয়াতটির অভিনব ব্যাখ্যা প্রদান করতে বাধ্য হন। তিনি বলেন, ‘এখানে ‘আরবি’ গুণটি আরেজি তথা আপেক্ষিক, মৌলিক গুণ নয়।’ তাছাড়া তিনি ইসলামি তাসাউফকে ভারতের যোগ ও বেদান্ত থেকে গৃহিত বলে আখ্যায়িত করেন। এটা ইউরোপের চিৎকারেরই একটা প্রতিধ্বনি। আশা করি তিনি এটা তাসাউফশাস্ত্রের ইমামদের বই পুস্তক ঘেটে তার এই আজগুবি মত সাব্যস্ত করতে পারবেন না। যদিওবা ধরে নিয়ে বলি, যোগের এক-আধটি কায়দা তাসাউফশাস্ত্রে কেউ ফলো করলেই পুরো তাসাউফ যোগবাদে রূপান্তরিত হয়ে যায় না। যেমনিভাবে কোন চিকিৎসাবিদ যদি বৈদিক চিকিৎসাদর্শনের কিছু উদ্ধৃতি উঠিয়ে দেয় তাহলে তার পুরো গ্রন্থ বৈদিক চিকিৎসাপদ্ধতি হয়ে যায় না।

মাওলানা উবাইদুল্লাহ সিন্ধীর এসব নতুন নতুন চিন্তা ভাবনার উপর উদ্বিগ্ন হয়েই দেওবন্দের উলামায়ে কেরাম ১৯১২ সালে একটি কনফারেন্সে মিলিত হন, তখন তিনি মু’তামারুল আনসারের একজন সদস্য ছিলেন। পরে তিনি এখান থেকে পৃথক হয়ে ফতেহপুরী মসজিদে ‘নাজ্জারাতুল মাআরিফিল কুরআনিয়া’ প্রতিষ্ঠা করে সেখানে বসে যান। কতক মাদ্রাসাপড়ুয়া, কতক জেনারেলশিক্ষিত যুবকদেরকে কোরআনের শিক্ষা দিতে লাগলেন অভিনব পদ্ধতিতে। তার ক্লাসের পদ্ধতি ছিল, পুরো কোরানকে তিনি রাজনীতি ও জিহাদ বানিয়ে দিতেন। সকল বিধি বিধানের গায়ে যুদ্ধের রঙ লাগাতেন। এই ধারার ঝলক তার ছাত্রদের লেখাঝোকায়ও পাওয়া যায়। যেমন খাজা আবদুল হাই ফারুকী সাহেবের তাফসির ও মওলানা আহমদ আলি লাহোরীর কোরানের পাদটীকাতে এই ধারার ছাপ পুরোপুরিই পরিলক্ষিত হয়। আফগানিস্তানে পৌঁছার পর যখন তার ধর্মীয় চিন্তা-চেতনা ক্রমগত পরিবর্তিত হতে থাকে তখন থেকেই অনেকে সেগুলোর খণ্ডনে রত হন। এরপর যখন তিনি রাশিয়ায় পৌঁছলেন, তখন তার বিপ্লবী চিন্তাধারা পূর্ণতার চূড়াকে স্পর্শ করল। তিনি যখন হেজাযে অবস্থান করছিলেন, তখন তার সাথে অনেকেই হিন্দুস্তান হতে দেখা করতে যেতেন।

কিন্তু সমস্যা হলো, তার নতুন আর অপরিচিত চিন্তা ভাবনা শোনার পর, যেই শ্রদ্ধা ও ভক্তি নিয়ে সে তার কাছে যেত, তা নিয়ে ফিরতে পারত না। মওলানা সিন্ধী হিন্দুস্তানে ফেরার পর সবাই ধর্ম ও রাজনীতিতে একটা সুষ্ঠু নেতৃত্বের অপেক্ষা করছিল। কিন্তু দুঃখজনক বিষয় হলো, তিনি না ধর্ম, না রাজনীতি, কোথাও গ্রহণযোগ্যতা পেলেন না। আমি অধমও, তার রচনাবলি প্রকাশের পূর্বে, তার প্রতি অত্যন্ত ভক্তি রাখতাম; যেহেতু বুজুর্গদের সাথে তার ভাল সম্পর্ক ও উঠাবসা ছিল। মওলানাও আমার সাথে স্নেহের আচরণ করতেন। কিন্তু যখন থেকে আমাদের ‘মাআরিফ’ পত্রিকা তার খণ্ডনে অংশগ্রহণ করল, তখন থেকে সেই সম্পর্ক আর বাকি থাকলো না।মওলানা বর্তমানে ঐ জগতে পাড়ি জমিয়েছেন, যেখানে আমাদের প্রশংসা ও স্তুতিবর্ণনা তার কোনই উপকার করবে না। যেমন ক্ষতি করবে না আমাদের নিন্দা ও দোষারোপ। আল্লাহ তায়ালা তাকে ক্ষমা করুন ও তার মর্যাদা বুলন্দ করুন।

আজকালের বেশিরভাগ সংস্কার আন্দোলনের মূলকথা হলো, আহলে দীন, ধর্মীয় সমাজ হতে পৃথক হতে হবে। বাহ্যিক বিষয়াদি ও সমস্যাবলি, ভূসম্পত্তির মালিকানা ইত্যাদি তাদের নিকট বড় হয়ে দেখা দিয়েছে। এজন্য তাদের নিকট দীনি বিধি-বিধান, শিক্ষা-দীক্ষা সবকিছুই ধরা দিয়েছে সামাজিক ও রাজনৈতিক বিষয়াদি হিশেবে। এদের মূল খুঁজলে দেখা যায় যে প্রকৃতপক্ষে এরা কপটতায় আক্রান্ত, একসময় যাতে আক্রান্ত হয়েছিল বাতেনিয়া ইসমাঈলিয়া ও কারামেতা। শাইখুল ইসলাম ইবনে তাইমিয়া রহ, এই বিষয়টাই কতটা সূক্ষ্মতার সাথে বর্ণনা করেছেন, দেখুন –

তিনি বলেন, ” যারা অভ্যন্তরীণভাবে ধর্মহীন দার্শনিক, পয়গম্বগরদের অনুকরণ হতে বহির্ভূত। যারা ইসলামকে অনুসরণ করা আবশ্যক মনে করে না। অন্যান্য ধর্মকে অনুসরণ করা হারাম ভাবে না। তারা ধর্মের বিভেদকে নিছক মতবাদগত মাজহাবি ও রাজনৈতিক বিভেদ হিশেবে তুলে ধরে, যেখানে যেকোনো একটিকে অনুসরণ করা চলে। নবুয়ত তাদের নিকট একটা স্বাভাবিক প্রচলিত রাজনীতি, জনসাধারণের কল্যাণের জন্য পৃথিবীতে যার অস্তিত্ব হয়েছে। এই ধরণের লোকেরা দিনে দিনে বেড়ে চলেছে। তাদের পেছনে পেছনে তাই বেড়ে চলেছে নব্য জাহিলিয়াতের ধারা। তারা কখনোই নবুয়তকে অস্বীকার করে না সরাসরি।। নবুয়তের কিছু বিষয়ের উপর তাদের অতি আস্থা, যেমনিভাবে নবুয়তের কিছু বিষয় তারা মেনে নিতে পারে না। এজন্যই তাদের বিষয়টা তীব্র ধূম্রজালে ঢাকা পড়ে যায়। অস্পষ্ট হয়ে পড়ে তাদের বিষয়গুলো।”(মিনহাজুস সুন্নাহ : প্রথম খণ্ড : পৃষ্ঠা, ৩)ইবনে তাইমিয়ার এই উদ্ধৃতিটা সামনে রেখে মাসুদ আলম নদবির রচিত ‘মওলানা উবাইদুল্লাহ সিন্ধি আওর উনকি আফকার ওয়া খায়ালাত পর এক নজর’ গ্রন্থের প্রথম দুটি অধ্যায় পড়ে দেখার অনুরোধ রইল।

বর্তমানে ইউরোপীয় রাজনীতির উত্থান, বস্তুবাদী সভ্যতার ঔজ্জ্বল্য, সামাজিক স্বাধীনতা, রাষ্ট্রের নমনীয় অবস্থান বড় বড় বুজুর্গ ও ধার্মিক ব্যক্তিত্বের ভিত্তি কাঁপিয়ে দিচ্ছে। দুর্বল থরোথরো করে দিচ্ছে তাদের পা। অথচ কোরআন এটাকে ‘যাহিরাম মিনাল হায়াতিদ দুনয়া’ তথা দুনিয়াবি জীবনের বাহ্যিকতা বলে আখ্যায়িত করেছে। এর বিপরীতে মুসলমানদেরকে আহ্বান জানিয়েছে উন্নীত মর্যাদাপূর্ণ জীবনের পথে। কিন্তু কতনা দুঃখের বিষয় যে, এই মর্যাদাপূর্ণ জীবনের পথ ভুলে তারা চলেছে বস্তুবাদী জীবনের পথে। একেই গ্রহণ করেছে জীবনের মূল হিশেবে।

দীন মানে শুধুই এক আল্লাহর আনুগত্য। এজন্য সন্দেহ নেই, আল্লাহর কালিমাকে বুলন্দ করার জন্যে চেষ্টা সাধনা করা, জিহাদ করা পুরো মুসলিম জাতির জন্য আবশ্যকীয়। বরং যার মাঝে দীন প্রতিষ্ঠা ও ঐশী রাষ্ট্রব্যবস্থা প্রতিষ্ঠার জন্য জিহাদের তামান্না, আরজু কিম্বা ন্যূনতম ইচ্ছে থাকবে না, সে তো পূর্ণ ইমান হতে বঞ্চিত। সেটা হতে হবে শুধুমাত্রই পরকালিন কল্যাণচিন্তার মধ্য দিয়ে, পার্থিব সুখ-ঐশ্বর্য লাভের নিয়তে নয়। কিন্তু মওলানার শিক্ষা হলো, বতর্মান সময়ে অন্ধভাবে ভাবনাহীন ইউরোপীয় বস্তুতান্ত্রিক, সামাজিক নীতিমালাগুলো আমাদের জীবনে গ্রহণ করে নিতে হবে।’ আমার জানা নেই তিনি এই ইউরোপীয় নীতিমালা দ্বারা কি বোঝাতে চেয়েছেন। বিস্তারিত ব্যাখ্যার প্রয়োজন।

মওলানা স্বাভাবিকভাবেই বলতে পারেন যে, “বর্তমানে আর খেলাফাতে রাশেদা পৃথিবীতে ফিরে আসবে না।” সাথে সাথে এ কথাও সঠিক যে, স্বাভাবিক যে কোন রাষ্ট্রব্যবস্থাই ইসলামী হিশেবে স্বীকৃতি পাওয়ার উপযুক্ত নয়। বরং এক বিশেষ ধরণের সরকারি ব্যবস্থা হওয়া কাম্য। কেননা ইসলামে ‘ইসতিখলাফ ফিল আরদ’ (ভূমির মালিকানা অর্জন) এর জন্য শর্ত হল পূর্ণ ইমান ও নেক আমল। কারণ, এদুটি হল মূল। আর ভূমির মালিকানা অর্জন শুধুমাত্র উদ্দেশ্যের ক্ষেত্রে সহায়ক। এটাকে মৌলিক উদ্দেশ্য বানানো হল, পার্থিব জীবনের সুখসন্ধান, কোরআনের ভাষায় ‘মাতাউল হায়াতিত দুনয়া’। যেটাকে কোরআন তুচ্ছতাচ্ছিল্যের চোখে দেখেছে। ইমান ও আমলের দাওয়াতই হল প্রকৃত ইসলাম, প্রকৃত দীন। এজন্যই আল্লাহ বলেছেন, ‘ইন্নাদ দারাল আখিরাতা লাহিয়াল হায়াওয়ান’ ( নিঃসন্দেহে আখিরাতের জীবনই প্রকৃত জীবন। ) রাসুলুল্লাহ সা. বলেছেন, দুনিয়া তোমাদের জন্য সৃজন করা হয়েছে। আর তোমাদেরকে সৃষ্টি করা হয়েছে আখিরাতের জন্য। ‘

অনেক বড় দুঃখের বিষয় হলো, মওলানা সিন্ধীর মতো এত বড় জবরদস্ত আলেমও ইউরোপীয় বিপ্লব ও নব রাজনৈতিক চিন্তাধারা দ্বারা প্রভাবিত হয়েছিলেন। হেজাযের পথ ছেড়ে ধরেছিলেন তুর্কিস্তানের পথ। অসম্ভব ছিল না যে মওলানার ইন্তিকালের সাথে সাথেই তার চিন্তাধারাগুলোও লয়প্রাপ্ত হয়ে যাবে। কিন্তু দুঃখদায়ক কথা হল, তার ওফাতের পর, তার চিন্তা-ভাবনার বিস্তার, বিন্যস্তকরণের জন্য নতুন একটি সংঘ প্রতিষ্ঠিত হয়, ‘সিন্ধু সাগর আকাডেমী’ নামে। ফলে সিন্ধীর জীবনলীলা সাঙ্গ হবার পরও তার চিন্তাধারাগুলো জীবনের অস্তিত্ব জানান দিতে থাকে।

তারা পুরো ভারতে উবাইদুল্লাহ সিন্ধীর চিন্তাধারা প্রচার করে যাচ্ছে। একেরপর এক দাওয়াত জানিয়ে যাচ্ছে তার পথের দিকে। কিছু আলেমও এই প্রচার প্রসারের কাজে অংশগ্রহণ করছে। তার প্রথম বইয়ে তো শাহ ওয়ালিউল্লাহ দেহলবি থেকে নিয়ে মাহমুদ হাসান দেওবন্দী পর্যন্ত পুরো ধারাটাকে বতর্মান যুগের লেলিন, ট্রটস্কি, স্টালিন হিশেবে পেশ করা হয়েছে। সেই পূণ্যাত্মা খোদাপরস্ত মহান ব্যক্তিদেরকে বানিয়ে ফেলা হয়েছে দুনিয়াপূজারী রাজনীতির প্রতিনিধি। সেই বইয়ে তিনি ইউরোপীয় রাজনীতির মূলনীতি পেশ করে এর বিপরীত দল ও মতের উলামাদেরকে তিনি পৃথিবী হতে মুছে ফেলার সিদ্ধান্ত প্রদান করেছেন। ইন্নালিল্লাহ! (শাহ ওলিউল্লাহ আওর উনকা সিয়াসি মাসলাক: পৃষ্ঠা, ২০২)

এসব ঘটছে আমাদেরই এই হিন্দুস্তানে, যেখানে, আল্লাহর শোকর, উলামায়ে দীন ও সত্যের পথিক অনেক। কিন্তু শুধুমাত্র এ পর্যন্ত মওলানা মাসুদ আলম নদবীই কলম তুলে নিলেন। উবাইদুল্লাহ সিন্ধীর জীবদ্দশায়ই তিনি তার চিন্তাধারার খণ্ডনে বেশ কিছু জবরদস্ত প্রবন্ধ লিখেছেন। পুরোপুরি মৌলিকতা, গবেষণার গভীরতা ও ঋজুতার সাথে তিনি তার মতামতগুলোর সমালোচনা করেছেন। সেগুলোই একত্র করে তিনি গ্রন্থবদ্ধ করে প্রকাশ করার উদ্যোগ নিয়েছেন। আল্লাহ তায়ালা তার গ্রন্থটি কবুল করে নিন। এর দ্বারা মুসলমানদেরকে উপকৃত হবার তৌফিক প্রদান করুন। আমিন।

অনুবাদ : আবদুল্লাহিল বাকি