মাদরাসায় বাড়ছে সহিংসতা : যেভাবে নিয়ন্ত্রণ সম্ভব

বিশেষ প্রতিবেদক

সোনাগাজি আলিয়া মাদরাসার ছাত্রী নুসরাতকে নৃশংসভাবে আগুনে পুড়িয়ে হত্যার ঘটনায় মাদরাসা-শিক্ষাব্যবস্থা নিয়ে জোর গলায় সমালোচনা করছে বাংলাদেশে ইসলামি ধারার শিক্ষাবিরোধী চিরচেনা মহলটি। নুসরাত হত্যার সঙ্গে আরও কয়েকটি মাদরাসায় ঘটা অপ্রীতিকর ঘটনাও সামনে এসেছে। নুসরাতের মাদরাসা যদিও আলিয়াধারার মাদরাসা, সরকারের সার্বক্ষণিক নিয়ন্ত্রণে যেগুলো পরিচালিত হয়, কিন্তু সমালোচকরা একে কেন্দ্র করে একহাত নিচ্ছেন কওমি ঘরানার মাদরাসাগুলোর ওপরও। সেই সঙ্গে সম্প্রতি ও নিকট অতীতে দেশের বিভিন্ন জায়গায় অবস্থিত ছোট ছোট কয়েকটি মাদরাসায় ঘটে যাওয়া শিক্ষক কর্তৃক ছাত্র-নির্যাতনের ঘটনাও সামনে আনছেন তারা। এবং এগুলোকে ছুতো বানিয়ে বলতে চাইছেন, স্পষ্টভাবে বলছেনও, কওমি ধারার শিক্ষাব্যবস্থায় যেন সরকারি নজরদারি জোরদার করা হয়।

বিচ্ছিন্ন ঘটনা হলেও এবং মাদরাসা ছোটখাটো হলেও এসব মাদরাসায় শিক্ষক কর্তৃক ছাত্র নির্যাতন ও যৌন নিপীড়নের ঘটনাগুলো ধীরে ধীরে কিন্তু বাড়ছে। কওমি ধারার শিক্ষাব্যবস্থা এর দায় এড়াতে পারবে না। যদিও জেনারেল ধারার শিক্ষাব্যবস্থার তুলনায় এ ঘরানায় এমন ঘটনা খুবই কম, কিন্তু কম বলে তা এড়িয়ে যাওয়া কোনোভাবেই কাম্য নয়। এমনটাই মনে করছেন কওমি-পড়ুয়া সচেতন তরুণরা।

তাঁরা বলছেন, কওমি শিক্ষাব্যবস্থার সর্বোচ্চ অথরিটি এখনই এ ব্যাপারে না ভাবলে শিগগির সরকারি নজরদারি জারি হবার সমূহ সম্ভাবনা রয়েছে। যা কওমি ঘরানার কারোরই কাম্য নয়।

মাদরাসার আভ্যন্তরীণ এই সহিংসতা রোধে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে কওমি পড়ুয়া সচেতন আলেমগণ নানা ধরনের পরামর্শ দিচ্ছেন। তার মধ্যে সবচেয়ে বেশি যে কথাটি উচ্চারিত হচ্ছে, প্রতিটা মাদরাসায় যেন সিসি ক্যামেরার ব্যবস্থা করা হয়। মাদরাসার প্রতিটা কামরায় কামরায় সিসি ক্যামেরা থাকলে অনাকাঙ্ক্ষিত যে ঘটনাগুলো ঘটছে, তা অনেকাংশেই রোধ করা সম্ভব।

মাদরাসা ছোট হোক কিংবা বড়, মাদরাসার কোনো শিক্ষকের মধ্যে নৈতিকভাবে স্খলন পরিলক্ষিত হলে, তিনি যদি মাদরাসার মুহতামিমও হন, তার বিরুদ্ধে কওমি ধারার সর্বোচ্চ অথরিটি যেন দ্রুত ও কার্যকরী পদক্ষেপ গ্রহণ করেন এবং প্রয়োজনে আইনি সহায়তার দ্বারস্থ হন। এমন পরামর্শও আসছে অনেকের কাছ থেকে। পাশাপাশি তাঁরা বলছেন, এর আগে বাংলাদেশের প্রতিটা কওমি মাদরাসায় কওমি শিক্ষাধারার সর্বোচ্চ অথরিটির প্রভাব নিশ্চিত করতে হবে।

চলমান সমালোচনা ও তোপের মুখে কওমি মাদরাসাগুলোতে সরকার কোনো ধরনের নিয়ন্ত্রণ আরোপ বা নজরদারির সিদ্ধান্ত গ্রহণের আগে কওমি অথরিটি যদি আভ্যন্তরীণ সমস্যা রোধে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করেন এবং একটা রূপরেখা দাঁড় করান, তবে সেটা কওমি মাদরাসা শিক্ষাধারাকে আশু হুমকি থেকে রেহাই দিতে পারে বলে মনে করছেন অনেকে।

এ ব্যাপারে কথা বলেছিলাম চট্টগ্রামের ঐতিহ্যবাহী পটিয়া মাদরাসার মহাপরিচালক আল্লামা আবদুল হালিম বুখারির সঙ্গে। তিনি বলেন, মাদরাসার ভেতরে এ ধরনের ন্যক্কারজনক ঘটনা অতীতে কখনো ছিল না। এটা কওমি মাদরাসা শিক্ষাধারার ঐতিহ্যের সঙ্গে কোনোভাবেই যায় না। সম্প্রতি এ ধরনের ঘটনা কেন ঘটছে, কওমি শিক্ষাকে কলঙ্কিত করার জন্য এটা কোনো ষড়যন্ত্রের অংশ কি-না, তা খতিয়ে দেখা দরকার।

তবে ষড়যন্ত্র হোক আর যাই হোক, এই ধরনের ঘটনা আর যাতে না ঘটে সে ব্যাপারে আল্লামা শাহ আহমদ শফীর নেতৃত্বে এখনই কার্যকর ব্যবস্থা গ্রহণ অতি জরুরি বলে মনে করেন বর্ষীয়ান এই আলেম।

এদিকে কওমি শিক্ষাধারার সর্বোচ্চ অথরিটি থেকে এ ব্যাপারে কোনো পদক্ষেপ নেওয়া হচ্ছে কি-না জানতে চেয়ে কথা বলেছিলাম কওমি মাদরাসা শিক্ষাবোর্ড বেফাকের সিনিয়র সহসভাপতি ও প্রবীণ আলেম আল্লামা আশরাফ আলীর সঙ্গে।

তিনি জানিয়েছেন, কওমি শিক্ষাধারার সর্বোচ্চ নেতৃত্ব এ ব্যাপারটা নিয়ে ভাবছেন। আল্লামা শাহ আহমদ শফীর নেতৃত্বে কার্যকর পদক্ষেপ খুব দ্রুতই নেওয়া হবে।