মাহমুদ দারবিশ : তার কবিতা ও প্রতিরোধ সাহিত্য

মাহমুদ দারবিশ ছিলেন বিশ শতকের অন্যতম প্রধান কবি। ফিলিস্তিন সঙ্কট ও সংগ্রামের মধ্য দিয়ে উঠে আসা আদাবুল মুকাওয়ামাহ বা প্রতিরোধ সাহিত্যের অগ্রসেনানী। ফলে আমাদের সময়ে দারবিশের গুরুত্ব অনেক। নন্দনতত্ত্ব ও প্রতিরোধী রাজনীতির মধ্যে যে ব্যবধান সৃষ্টি হয়েছে, যে দূরত্বে বিরোধ সৃষ্টি হয়েছে কবিতা, ইসলাম প্রশ্ন ও রাজনীতির মধ্যে এবং যুক্তি, ধর্মতত্ত্ব ও আবেগের মধ্যে যে বিচ্ছিন্নতা তৈরি হয়েছে, সে ব্যবধান, দূরত্ব  ও বিচ্ছিন্নতা প্রশ্নের মোকাবেলায় মাহমুদ দারবিশ পাঠ অত্যন্ত প্রাসঙ্গিক হয়ে উঠতে পারে। আজ মাহমুদ দারবিশের জন্মদিন। উনিশ শো একচল্লিশের তেরোই মার্চ তিনি জন্মগ্রহণ করেন। দারবিশের কবিতা, চিন্তা ও অবস্থান বিষয়ে কথা বলতে আমরা দারবিশ গবেষক শাহাদাৎ তৈয়বের সাথে আলাপে বসি। আলাপ গ্রহণ করেছেন ইফতেখার জামিল। গ্রন্থনা করেছেন হামমাদ রাগিব।

সমকালীন অনেক কবির মধ্যে মাহমুদ দারবিশের বিষয়ে বিশেষভাবে কেন আগ্রহী হলেন?

এই প্রশ্নের জবাব দেয়া বেশ জটিল। তার আগে একটু ভূমিকা দিয়ে রাখা ভালো। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আরবি বিভাগে ভর্তির শুরুর আগে থেকেই টুকটাক আমি আরবি কবিতা পড়া শুরু করি। তখন মুহাম্মদ আল মাগুত, ইউসুফ আল খাল, নিজার ক্বাবানি ও সামিহ আল কাসিমের কবিতা পড়তে শুরু করি। মুহাম্মদ আল মাগুতের কবিতা অনুবাদও করেছিলাম। যাইহোক পড়তে পড়তেই দারবিশের সাথে পরিচয়। মাস্টার্সে থিসিসও করেছি দারবিশের কবিতা নিয়ে।

সমকালে দারবিশ সবার থেকে আলাদা ছিলেন। নানা কারণে। কবিতার ভাব এবং ভাষার মাধুর্য তাকে অন্যদের থেকে স্বাতন্ত্র্য দিয়েছে। দারবিশ খুব সহজ সাবলিল। কিন্তু গভীরতায় তার কবিতা যেন অতল অতিক্রমী। দারবিশকে সাধারণত রাজনৈতিক কারণে কিংবা জনপ্রিয়তাবাদী ধারার কারণে প্রভাবশালী বলা হয়। কিন্তু বোদ্ধামহলের কাছে কবিতায় দার্শনিক স্ফূর্তির জন্য অনেক বেশি গুরুপূর্ণ হয়ে ওঠেন দারবিশ। যে কারণে অনেকে তাকে বিশ্বমানের কবি হিসেবেও অভিষিক্ত করেন। একটা কবিতার শ্লোক তুলে না দিয়ে পারছি না। প্রথম দিকের একটা কবিতার কয়েকটা লাইন:

“আর তুমি আমার সমুখে
নামহীন পরিচয়হীন অসংখ্য সত্ত্বার বিপুল সারিতে
বিস্তারিত;
আমার কোনো দেশ নাই এই সব চক্ষু ছাড়া
যা পৃথিবীকে নির্ধারণ করে দেয় এক দেহে।”

শেষদিকে রচিত “জিদারিয়্যাহ” থেকে…

“ওখানে, না-স্থানে, না-সময়ে কিছু নেই
নেই কোনো অস্তিত্ব….”
“বলো, এখন কী, আগামী কী ?
সময় কী, স্থান কী?
পুরনো কী, নতুন কী ?”
“আমিই প্রথম
আমিই শেষ

আমার সংজ্ঞাই আমার সংজ্ঞার পাথেয়, কারণ।
আর আমার পর শব্দমালায় মৃগরা দৌড়ায়
আমার আগে কিছুই নেই, পরেও কিছুই নেই।”
“আমি সেই সত্ত্বা যে সব কিছু দেখতে পায়
আমিই দূর
আমিই দূর, অনন্ত।”

মূলত কবিতায় তার রাজনৈতিকতা এবং দার্শনিকতার যুথবদ্ধ কাব্যময়তা আমাকে বেশ আগ্রহী করে তোলে। অন্যদিক থেকে দারবিশ ছিলেন লিপ্তধারার একজন আন্তর্জাতিক পর্যায়ের প্রভাবশালী কবি। এটাও ছিল একটা বড় ব্যাপার।

দারবিশের কবিতার প্রধান প্রধান বিষয়বস্তু ঠিক কী ছিল?

ফিলিস্তিনের সাধারণ মানুষের প্রতিরোধ সংগ্রাম, জাতি হয়ে ওঠার পরম স্বপ্ন, দেশপ্রেম, প্রকৃতি, শহীদ, মৃত্যু, নাকবা-বিপর্যয়, মানবিক অনুষঙ্গ, নির্বাসন, আধ্যাত্মিকতা বা দার্শনিকতা–এসবই দারবিশের প্রধান উপজীব্য। তবে সবকিছু ছাপিয়ে তার কবিতায় প্রতিরোধ, মৃত্যু “গিয়াব” কিংবা দর্শন ও ভাবসমৃদ্ধ কবিতা তাকে মহিমান্বিত করে তোলে।

ইজরাইলি দখলদারীত্ব ও ফিলিস্তিনি প্রতিরোধ যুদ্ধ তার চিন্তা ও কবিতায় কীভাবে প্রভাব ফেলেলে?

প্রথমেই সরাসরি দারবিশের নিজের মুখের কয়েকটি কথা তুলে রাখি:

وأنا أكتب شعراً، أي: أموت الآن، فلتذهب أصول الشعر ليتضح الخنجر ولينكشف الرمز: الجماهير هي الطائر والأنظمة الآن تسمّى قتلة”….

“আমি কবিতা লিখছি অর্থাৎ আমি এখন মরছি আর যেনো কবিতার প্রথাবদ্ধ তত্ত্ব ও নীতি নিয়মরা বিদায় নিচ্ছে। যাতে খঞ্জর স্পষ্ট হয়ে ওঠছে। যেনো উন্মোচিত হচ্ছে প্রতীক: গণমানুষই সেই পাখি ও সুসংবদ্ধ নীতি ও ছন্দের নাম যাদের এখন নাম দেয়া হয় ‘হত্যাকারী।”

“আমার কাছে প্রতিরোধ লড়াইয়ের একমাত্র অস্ত্র ছিলো লেখা। আমি যখন প্রবলভাবে লিখতে থাকলাম, আমি দেখলাম অবরোধ দূরে সরে যাচ্ছে। আমি দেখেছি আমার কবিতা যেনো ইসরাইলী সৈন্যদের তাড়া করছে। কারণ আমার একমাত্র শক্তি ভাষা ….

“আমি জীবনের শক্তি, অমরতা, আর বস্তু ও প্রকৃতির সাথে তার চির সম্পর্ক নিয়ে লিখেছি। পাখিরা আকাশে ওড়ে কয়েক মুহূর্ত। কিন্তু কবুতর থাকবে চিরদিন। আমি অবরোধের বিরুদ্ধে লড়বার জন্য প্রকৃতির জীবনী শক্তিকে আঁকড়ে ধরে আছি। আমি বিশ্বাস করি এই অবরোধ দ্রুত নিঃশেষ হবে। কারণ প্রকৃতিতে ট্যাংক একটি বহিরাগত অস্তিত্ব। ট্যাংক কখনোই প্রকৃতির অংশ নয়।”

এই কয়েকটি কথা থেকে বুঝা যায়, ইজরাইলের দখলদারিত্ব এবং এর বিরুদ্ধে ফিলিস্তিনিদের প্রতিরোধ তার কবিতাকে কতেটা প্রভাবিত করেছে। একইসাথে তার রাজনৈতিক দৃষ্টিভঙ্গি এবং কবিতা সম্পর্কিত প্রচলিত ধারণার বিপরীতে গিয়ে তার দৃষ্টিভঙ্গি নতুনকরে কিভাবে গড়ে উঠলো তার একটা হদিস পাওয়া যায়।

সমকালীন বাংলা কবিদের সাথে তার সময় ও প্রকল্পের তুলনা ঠিক কীভাবে করা যায়?

তুলনা ব্যাপারটা সবসময় একটা জটিল বিষয়। আমি মনে করি, দারবিশের সাথে বাংলা কবিতার বা এখানকার কবিতার সাথে তুলনা করার কোনো প্রাসঙ্গিকতা দেখিনা। ভৌগলিক ও ভাষাগত অমিল থাকলেও সময়কাল, কিংবা বিষয় ও ভাবগত মিলের কারণে তুলনার ব্যাপারটা আসতে পারে। অপরদিকে সাম্রাজ্যবাদ বিরোধী কিংবা প্রতিরোধ কবিতা অথবা লিপ্ত ধারার যেকোনো ভাষার যেকোনো কবির সাথে দারবিশের তুলনামূলক আলোচনা হতে পারে। তবে তুলনা দিয়ে তেমন কিছু অর্জন হয় বলে আমি মনে করিনা। প্রত্যেকে তার নিজের জায়গায় সমহিয়ান কিংবা প্রত্যেককে তার নিজের ভাষা ও আপন সৃষ্টিকর্ম দিয়েই তার বিচার করা যেতে পারে।

দারবিশ ইসলাম ও রাজনৈতিক মুক্তির প্রশ্নকে কীভাবে দেখতেন?

ফিলিস্তিনে বৃটিশ উপনিবেশ বিরোধী আন্দোলন হয়েছিল ইসলামপন্থীদের মাধ্যমে। এবং পরবর্তীকালে ইসরাইল বিরোধী আন্দোলনের নিয়ন্ত্রণও মূলত ইসলামপন্থীদের হাতে চলে যায়। আরব-ইসরাইল যুদ্ধ-সংঘাতের মধ্যেই দারবিশের উত্থান। সেসময়কার আরব জাতীয়তাবাদের জনপ্রিয়তা দারবিশকেও আকর্ষণ করে। এই জাতীয়তাবাদ বরাবরই রুশপন্থী কমিউনিজম নির্ভর ছিল। দারবিশ মার্কস পড়ে কমুনিস্ট পা্র্টিতে যুগ দেন। একসময় জাতীয় মুক্তির প্রশ্নে ইয়াসির আরাফাতের সাথে এক হয়ে কাজ করেন। খোদ ইয়াসির আরাফাতই ইসলাম প্রশ্নকে যথাযথভাবে ডিল করতে পারে নাই। যেকারণে তার জীবদ্দশাতেই ফিলিস্তিনের ইন্তিফাদা হয়। যার মূল নিয়ামক শক্তি ছিল ইসলামপন্থীরা। ইন্তিফাদার রেশ ধরে উপনিবেশ বিরোধী আন্দোলেনের ভাবাদর্শে অনুপ্রাণিত হামাসের উত্থান ঘটে।

জাতীয় মুক্তির প্রশ্নে হামাসের উত্থানকে দারবিশ ভালোভাবে নিয়েছিল, কিন্তু তাদের সশস্ত্রতার সাথে এক হতে পারেনি দারবিশ। যদিও দারবিশ একসময় কমুনিস্ট পার্টি থেকে সরে দাঁড়ান এমনকি এক পর্যায়ে অসলো চুক্তির কারণে ইয়াসির আরাফাতকেও ত্যাগ করেন। দারবিশের কাছে রাজনৈতিক ইসলাম গ্রহণযোগ্য হয়ে ওঠেনি–কিন্তু যে প্রতিরোধ চিন্তা দারবিশ লালন করতেন, তার সাথে তিনি সশস্ত্রতা যোগ করতে পারেননি ঠিক যে কারণে হামাসকে মেনে নেয়া তার জন্য কঠিন হয়ে ওঠে। শেষপর্যন্ত দারবিশের কাছে ইসলাম প্রশ্ন কেমন করে তার ইহজাগতিকতা কিংবা ক্ল্যাসিক সেকুলার তৎপরতার মধ্য দিয়ে সাড়া ফেলছিল, সেটা হামাসের রাজনৈতিক ইসলাম কিংবা ইসলামপন্থী রাজনীতির প্রশ্ন দিয়ে বোঝা যায় না।

দারবিশ চেয়েছিল একটা অখণ্ড ফিলিস্তিন কিংবা আরব জাতি। এমন বিশেষ ধরনের একটা ইউনিভার্সালিজমের বোঝাপড়া তার শেষ জীবদ্দশায় সন্ধান করাটাই তার জন্য বিশেষ সাধনার ব্যাপার হয়ে ওঠে। যে কারণে দারবিশ ইসলাম প্রশ্নকে ডিল করেছেন কবিতা ও ভাব সাধনার মধ্য দিয়ে। শেষ জীবনের কাব্যগ্রন্থগুলো ছিল সে প্রশ্ন সন্ধানেরই পরম ক্ষেত্র। আরব-ইসলামের ভাব ও দর্শনগত ঐতিহ্যকে প্রচলিত কাব্যধারার বাইরে গিয়ে নতুন করে যেভাবে উপস্থাপন করেছেন দারবিশ তাতে সেটা আরো পরিষ্কার হয়ে ওঠে। এখানে দারবিশের প্রাসঙ্গিক একটা উদ্ধৃতি দিয়ে রাখি:

“আমি ব্যক্তিগতভাবে এ ধরনের প্রশ্নে গুরুত্বারোপ করি না। আমি আমাদের আধুনিক যুগেও বিশ্বাস করি না। এটি তো ওখানে একটি হৈচৈ আওয়াজ মাত্র। সূফীবাদী কবিতার ক্ষেত্র। আধুনিক সূফীবাদ (মেটাফিসিজম) এটি সমসাময়িক জীবনপ্রকৃতি, মানুষের স্বভাবজাত ইচ্ছা এবং ধর্ম ও স্পিরিচুয়াল প্রশ্ন থেকে মানুষকে দূরে সরে রাখার জন্য বিদ্রোহী ও অবাধ্য হওয়ার অন্যতম একটি রূপ। আমরা এরকম কবিতায় যা কিছু পড়ি কোনো কোনো সূফীবাদী পরিভাষার জন্য এটি একটি নান্দনিক রূপ মাত্র। যা এর প্রসঙ্গ ও পূর্ব পরম্পরার বাইরের বিষয়।”

শ্রেষ্ঠ কবিতা বলে কিছু নেই, তবে দারবিশের শ্রেষ্ঠ পাঁচটি কবিতা নির্বাচন করলে সেই তালিকায় কোন কোন কবিতা থাকবে?

“জিদারিয্যাহ” (দেয়ালচিত), সারিরাতুল গারিবাহ (নির্বাসিতের বিছানা), হিসারু লিমাদাইহিল বাহরি (সমুদ্রগাথায় অবরোধ), উরিদু মা উরিদু (আমি চাই যা চাই) , আহাদা আশারা কাউকাবা (এগারোটি নক্ষত্র), হিয়া আগনিয়া, হিয়া আগনিয়া (সেই গান সেই গীত), মাদীহুজ জিল্লিল আলী (উচ্চ ছায়ার প্রশস্তি) হালাতু হিচার (অবরোধ পরিস্থিতি) তার উল্লেখযোগ্য কাব্যগ্রন্থ।

আগামীতে দারবিশ বিষয়ে আপনি ঠিক কীভাবে কাজ করার আগ্রহ পোষণ করছেন?

দারবিশ এবং ফিলিস্তিন নিয়ে আমি পিএইচডি গবেষণার কাজ করছি। ইচ্ছা হলো, কাজটা ভালোভাবে শেষ করা।

আমাদেরকে সময় দেওয়ার জন্য আপনাকে ধন্যবাদ জানাচ্ছি

আপনাদেরকেও ধন্যবাদ জানাচ্ছি। ফাতেহ টুয়েন্টি ফোরের সফলতা কামনা করছি।