মুক্তিযুদ্ধে ইসলামপ্রশ্ন, পিনাকী ভট্টাচার্যের অনুসন্ধান

রাকিবুল হাসান :

‘মুক্তিযুদ্ধের চেতনা’ পরিভাষাটি আজকাল ‘ধর্মনিরপেক্ষতা’র একক দখলে। ধর্মনিরপেক্ষতাই যেন মুক্তিযুদ্ধের মূল এবং মৌলিক চেতনা। পাকিস্তানি শাসকদের শাসন থেকে মুক্তি ও স্বাধীনতার যে লড়াই, সে লড়াইকে ধর্ম বিশেষ করে ইসলাম যেন স্পর্শই করতে পারে না। ইসলাম এবং মুক্তিযুদ্ধ—দুটোকেই মুখোমুখি সংঘাতময় অবস্থানে দাঁড় করিয়ে দেয়া হয়েছে। তাই যেখানেই রাজাকারদের চিত্রায়ণ, সেখানেই ব্যবহার হয় ইসলাম ও মুসলমানদের প্রতীক দাড়ি, টুপি, পাঞ্জাবি, তাসবি, লাল রুমাল ইত্যাদি। পাঠ্যবইয়ে, পত্রিকার পাতায় এবং মুভিতে—রাজাকার মানেই দাড়ি-টুপি পরিহিত কেউ। জাফর ইকবালের লেখা উপন্যাস ‘আমার বন্ধু রাশেদ’ অবলম্বনে তৈরী সিনেমায় দেখানো হয়েছে একজন দাড়ি-টুপি পরিহিত রাজাকার কিশোর মুক্তিযোদ্ধাকে গুলি করছে। সৈয়দ শামসুল হকের লেখা ‘পায়ের আওয়াজ পাওয়া যায়’ মঞ্চনাটকে দেখানো হয়েছে টুপি-পাঞ্জাবি পরিহিত রাজাকার নিজের মেয়েকে পাঠাচ্ছে পাক-কমান্ডারের কাছে। শাহবাগে গণজাগরণ মঞ্চের নোংরা সময়ে প্রথম আলোতে শিশির ভট্টাচার্য রাজাকারের কার্টুন এঁকেছিল। যেখানে রাজাকারের মাথায় ছিল টুপি, গায়ে পাঞ্জাবি, মুখে মেসওয়াক।

মুক্তিযুদ্ধের নির্মাণ ও মুক্তিযুদ্ধকালীন সময়ে ধর্মনিরপেক্ষতাই ছিল মৌলিক আদর্শ নাকি ইসলামও তখন প্রাসঙ্গিক এবং গুরুত্বপূর্ণ আলোচনা হিসেবে হাজির ছিল—এই নিয়ে বিশ্লেষণ খুব বেশি হয়নি। স্বার্থবাদীদের স্বার্থান্বেষী প্রচারণার গড্ডালিকা প্রবাহে ভেসে যাচ্ছে সব সত্য। একটু একটু করে প্রজন্মের পর প্রজন্ম বিভ্রান্ত হচ্ছে। আসলেই সত্য কী? মুক্তিযুদ্ধের সময় ধর্মনিরপেক্ষতা আদর্শ ছিল? ধর্মনিরপেক্ষতা আদর্শ না হলে আদর্শ কী ছিল ? ইসলাম? তাহলে ধর্মনিরপেক্ষতার ধারণাটি সংবিধান ও মুক্তিযুদ্ধের আলোচনায় উঠে এলো কখন?

এই প্রশ্নগুলোর উত্তর বিশ্লেষণ করে তুলে এনেছেন পিনাকি ভট্টাচার্য। যে জিনসটা চোখের আড়ালে, তা-ই তুলে ধরতে চেয়েছেন তিনি। তার মতে, ধর্মনিরপেক্ষতা নয়, মুক্তিযুদ্ধের নির্মাণ ও মুক্তিযুদ্ধকালীন সময়ে ইসলামই ছিল সবচে বেশি প্রাসঙ্গিক এবং সবচে বেশি উদ্দীপক। আওয়ামীলীগের তখনকার গঠনতন্ত্র, ১৯৫৪ সালের নির্বাচন, যুক্তফ্রন্টের ২১ দফা, বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের ৬ দফা, ১৯৭০ সালের নির্বাচন, মুক্তিযুদ্ধ পরিচালনার ভাষা, কর্মসূচী, প্রচার-পুস্তিকা, মুক্তিযোদ্ধাদের চিঠিপত্র, মুক্তিযুদ্ধকালীন স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্র, মুক্তিযুদ্ধকালীন আওয়ামীলীগের একমাত্র মুখপত্র জয় বাংলা পত্রিকা—সবকিছুর ভাষা এবং বাণী একটি কথাই প্রমাণ করে, মুক্তিযুদ্ধের প্রস্তুতি ও পরিচালনায় ইসলামই ছিল মৌলিক আদর্শ ও স্লোগান। ৭ মার্চে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান বজ্রকণ্ঠে ঘোষণা দিয়েছিলেন, ‘রক্ত যখন দিয়েছি, রক্ত আরও দেব, এদেশের মানুষকে মুক্ত করে ছাড়ব ইনশাআল্লাহ।’ আবার ১৬ ডিসেম্বর বাংলাদেশের অস্থায়ী রাষ্ট্রপতি যে বেতার ভাষণ দিয়ে বিজয় ঘোষণা করেন, সেখানে তিনি তার বক্তৃতা শেষ করেন এই বলে—’আমি মুসলমান, হিন্দু, বৌদ্ধ, খৃস্টানসহ সব দেশবাসীকে আল্লাহর প্রতি শুকরিয়া জ্ঞাপনের জন্য ও একটি সুখী সমৃদ্ধশালী সমাজ গঠনে আল্লাহর সাহায্য ও নির্দেশ কামনা করার উদাত্ত আহ্বান জানাচ্ছি।’ পিনাকি ভট্টাচার্যের ভাষায়, ইনশাআল্লাহ বলে যে মুক্তিযুদ্ধের শুরু, আল্লাহর সাহায্য কামনা করে আনুষ্ঠানিকভাবে শেষ, সেই মুক্তিযুদ্ধকেই পরবর্তী সময়ে ইসলামের বিরুদ্ধে দাঁড় করানোর চেষ্টা করা হয়।

পিনাকি ভট্টাচার্য ‘মুক্তিযুদ্ধের বয়ানে ইসলাম’ বইতে সবকিছু বিশ্লেষণ করে, উদ্ধৃতি দিয়ে দেখিয়েছেন, মুক্তিযুদ্ধে নেতৃত্বদানকারী দল আওয়ামীলীগের সম্মেলন, নির্বাচনী ইশতেহার, যুক্তফ্রন্টের ২১ দফা, বঙ্গবন্ধুর ৬ দফা, সত্তরের নির্বাচনী ইশতেহার কোথাও ধর্মনিরপেক্ষতার কথা বলা নেই। বরং সব জায়গায় ইসলামকে অবলম্বন করে পাকিস্তানি শাসকদের বিরুদ্ধে লড়াই করে সৌম্য ও শান্তির সমাজ গঠনের কথা বলা হয়েছে। এমনকি মুক্তিযুদ্ধের ন্যয্যতাও খোঁজা হয়েছে ইসলামে। মুক্তিযুদ্ধ যে ইসলামের দৃষ্টিতে ন্যায়ের যুদ্ধ, সেটা প্রমাণের জন্য নানা কথিকা স্বাধীন বাংলা বেতার থেকে প্রচার করা হত। ১৯৭১ সালের জুলাইয়ে প্রচার করা এমনই একটি কথিকার নাম ‘আল্লাহর পথে জিহাদ’। অর্থাৎ মুক্তিযুদ্ধকে আল্লাহর পথে জিহাদ বলে অভিহিত করা হয়েছিল। কথিকাটি লিখেছিলেন সৈয়দ আলী আহসান।

কথিকাটির একটি অংশ প্রচারিত হয় একাত্তরের জুলাইয়ে। শিরোনাম—ইসলামের দৃষ্টিতে জেহাদ। মুক্তিযুদ্ধকে এখানে জেহাদ বলে অভিহিত করা হয়েছে। এরপর ৮ অক্টোবর প্রচারিত হয় দ্বিতীয় অংশ। এতে কোরআন-হাদীসের উদ্ধৃতি দিয়ে মুক্তিযুদ্ধের বৈধতা খোঁজা হয়েছিল। কথিকাটির তৃতীয় অংশে শোনানো হয়েছিল কোরআনের আশার বাণী—নাসরুম মিনাল্লাহি ওয়া ফাতহুন ক্বারীব। এমন আরও অনেক কথিকা প্রচার করা হত। পাকিস্তানিদের উল্লেখ করা হত বেঈমান হিসেবে।

সত্তরের নির্বাচনে আওয়ামীলীগ জয়লাভ করলে রাষ্ট্রীয় মূলনীতি হিসেবে একটি খসড়া সংবিধান তৈরী করে। এতে এই তিনটি বিষয় উল্লেখ করা হয়—১. কুরআন-সুন্নাহ বিরোধী আইন পাশ করা হবে না। ২. কুরআন ও ইসলামিয়্যাত শিক্ষা দেয়ার ব্যবস্থা থাকবে। ৩. মুসলমানদের মধ্যে ইসলামি নৈতিকতা উন্নয়নের পদক্ষেপ নেয়া হবে। সুতরাং এখানে স্পষ্ট, মুক্তিযুদ্ধের পূর্বে এবং মুক্তিযুদ্ধ পরিচালনায় কোথাও ধর্মনিরপেক্ষ রাষ্ট্র গঠনের প্রস্তাব কিংবা স্বপ্ন দেখানো হয়নি। বরং ইসলামের নাম করে পাকিস্তানিরা যে অন্যায় ও জুলুম করছে, তার বিপরীতে সঠিক ইসলাম তুলে ধরার এবং শিক্ষা দেয়ার স্বপ্ন সত্তরের নির্বাচনের পর খসড়া সংবিধানেই দেখানো হয়েছে। সুতরাং ইসলাম এবং মুক্তিযুদ্ধকে কোনোভাবেই সাংঘর্ষিক হিসেবে উপস্থাপন করা যায় না। পিনাকি ভট্টাচার্য তার পুরো বইয়ে এই লুকোনো সত্যটাই তুলে ধরতে চেয়েছেন।

এখানে একটি প্রশ্ন জাগতেই পারে, মুক্তিযুদ্ধে ইসলামই যদি প্রাসঙ্গিক হয়, তাহলে ধর্মনিরপেক্ষতার ধারণাটি কখন এলো মুক্তিযুদ্ধের আলোচনায়? পিনাকি ভট্টাচার্যের মতে মুক্তিযুদ্ধের সময় ভারতের সমর্থন পাওয়ার জন্য মূলত ধর্মনিরপেক্ষতার ধারণাটি রাষ্ট্রীয় মূলনীতিতে যুক্ত করতে বাধ্য হয় বাংলাদেশ প্রবাসী সরকার।

১৯৭১ সালের ১০ এপ্রিল প্রথম বাংলাদেশ প্রবাসী সরকার গঠন হয়। ১৭ এপ্রিল অনুষ্ঠিত হয় শপথগ্রহণ অনুষ্ঠান। ১১ এপ্রিল নবগঠিত বাংলাদেশ সরকারের প্রধানমন্ত্রী তাজউদ্দীন আহমেদ জনগণের উদ্দেশ্যে দেয়া বেতার-ভাষণে বলেন, ‘গণতান্ত্রিক সমাজব্যবস্থা, গণমানুষের কল্যানে সাম্য আর সুবিচারের ভিত্তিপ্রস্তরে লেখা হোক জয় বাংলা, জয় স্বাধীন বাংলাদেশ।’ এই ভাষণের ধর্মনিরপেক্ষতার কোনো কথা নেই।

১৯৭১ সালের ২৪ এপ্রিল প্রবাসী সরকারের পক্ষ থেকে ভারত সরকারের কাছে বাংলাদেশের আনুষ্ঠানিক স্বীকৃতি চেয়ে প্রথম চিঠি দেয়া হয়। চিঠিতে দেশের সরকার গঠন নিয়ে কথা থাকলেও রাষ্ট্রীয় মূলনীতিতে ধর্মনিরপেক্ষতা নিয়ে কোনো কথা ছিল না। ভারত আবেদনে সাড়া দেয়নি। এরপর ১৫ অক্টোবর আরেকটি চিঠি পাঠানো হয়। এই চিঠিতে সংখ্যালঘু হিন্দু নির্যাতনের প্রসঙ্গ তুলে স্বাধীনতার স্বীকৃতি চাওয়া হয়। ভারত এই চিঠির ডাকেও সাড়া দেয়নি। ভারতের স্বীকৃতি না পেয়ে বাংলাদেশ বিচলিত এবং চিন্তিত হয়ে পড়ে। তখন ২৩ নভেম্বর আরেকটি চিঠি পাঠায় বাংলাদেশ। তাতে রাষ্ট্রীয় মূলনীতি হিসেবে ধর্মনিরপেক্ষতা ও স্যাকুলারিজমের কথ উল্লেখ করা হয়। এটা করা হয় মূলত ভারতের সমর্থন আদায়ের লক্ষ্যে। কিন্তু আজ এই ‘ধর্মনিরপেক্ষতা’ জগদ্দল পাথর হয়ে ইতিহাসকেই অস্বীকার করে বসছে। এটাই হয়ে উঠেছে এখন মুক্তিযুদ্ধের প্রেরণা ও চেতনা।

তবে পর্যবেক্ষকদের মতে, মুক্তিযুদ্ধকে পুরোপুরি ইসলামিও বলা যাবে না। কারণ সব ধর্মের মানুষই তাদের বিশ্বাস ও সিম্বল নিয়ে মুক্তিযুদ্ধে অংশগ্রহণ করেছেন। এর প্রচারণায় কোরআন হাদীসের বাণী যেমন শুনানো হয়েছে, তেমনি সব ধর্মের স্বাধীনতার স্বপ্নও দেখানো হয়েছে। তাদের অধিকারের কথাও বলা হয়েছে। এটা ঠিক, এদেশের মানুষের ৯৫ ভাগ মুসলিম হওয়ায়, ইসলামের বাণীগুলো তখন বেশি আলোচিত হয়েছে।

ইসলামকে মুক্তিযুদ্ধের একদম বিপরীতে দাঁড় করানোর একটা প্রবণতা আমাদের সমাজের রন্ধ্রে রন্ধ্রে এখন বয়ে চলছে। মূলত এই প্রবণতাকে কাউন্টার দিতেই পিনাকি ভট্টাচার্য মুক্তিযুদ্ধের বয়ানে ইসলামের আলোচনাকে হাজির করেছেন। বলেছেন, মুক্তিযুদ্ধের নির্মাণ ও মুক্তিযুদ্ধকালীন সময়ে ইসলামই ছিল সবচে গুরুত্বপূর্ণ এবং উদ্দীপক ডিসকোর্স। ধর্মনিরপেক্ষতার কোনো ঘ্রাণও তখন ছিল না। এর মানে মুক্তিযুদ্ধকে পুরো ইসলামি বলে দাবি করা নয়, বরং অপপ্রচারের স্রোতে ইসলামকে যেন মুক্তিযুদ্ধের আলোচনা থেকে খারিজ করে দেয়া না যায়, তার প্রমাণ তুলে ধরা। এই হলো আসল উদ্যেশ্য।

 

আগের সংবাদ‘স্বাধীনতার সূচনা ইনশাআল্লাহ’র মাধ্যমে, সমাপ্তি আল্লাহর রহমত-এ’
পরবর্তি সংবাদজালেম বনাম মাজলুম, মুক্তিযুদ্ধ ব্যাখ্যায় তৃতীয় মত