মুখোমুখি সংঘাত : আলেম মুক্তিযোদ্ধার সন্ধানে

রাকিবুল হাসান :

মুক্তিযুদ্ধ শুরু হওয়ার কদিন পরেই ছুটি দিয়ে দেওয়া হয়েছে ঢাকার বড় বড় সবকটি মাদরাসা। লালবাগ মাদরাসা তাদের মধ্যে অন্যতম। ছাত্ররা কেউ বাড়ি যাচ্ছে, কেউ যাচ্ছে যুদ্ধের ট্রেনিংয়ে। লালবাগ মাদরাসার শিক্ষক শাইখুল হাদীস আল্লামা আজিজুল হক রহ.-এর কাছে থাকেন মাওলানা এমদাদুল হক আড়াইহাজারি। মাদরাসা বন্ধ হয়ে যাওয়ার খানিক দ্বিধায় আছেন তিনি। যুদ্ধের ট্রেনিং নিবেন নাকি বাড়ি চলে যাবেন? দ্বিধা-সংশয়ের দোলাচালে দুলতে দুলতে উপস্থিত হলেন হজরত মাওলানা মুহাম্মাদুল্লাহ হাফেজ্জি হুজুর রহ.-এর কাছে।

হাফেজ্জি হুজুর কপাল কুঞ্চিত করে বললেন, ‘বাড়ি যাবে মানে?’
‘তাহলে কী করব?’ আড়াইহাজারি বললেন।
‘ট্রেনিংয়ে যাবে?’
‘আপনি যা বলেন। সংশয়ে আছি।’
আড়াইহাজারির চোখের দিকে তাকিয়ে হাফেজ্জি হুজুর রহ. বললেন, ‘পাকিস্তানিরা বাঙালিদের ওপর অত্যাচার করছে। সুতরাং তারা জালেম, বাঙালিরা মজলুম। এই যুদ্ধ ইসলামের সঙ্গে কুফরের নয়, বরং এটা জালেমের বিরুদ্ধে মজলুমের প্রতিবাদ-প্রতিরোধ। সুতরাং বাঙালিদের পক্ষে কাজ করো।’

হাফেজ্জি হুজুরের কথা শুনে কল্পনায় নিজেকে একজন মুক্তিযোদ্ধা হিসেবে ভাবতে শুরু করেন মাওলানা আড়াইহাজারি। বড় ভাই আড়াইহাজার থানার মুক্তিযোদ্ধা কমান্ডার; এবার ছোট ভাই মাওলানা এমদাদুল হক নেমে গেলেন রণাঙ্গণে। তার কানে মুক্তিযুদ্ধের দীর্ঘ নয়টি মাস ধরে কেবল বাজতে থাকে হাফেজ্জি হুজুরের নির্দেশ—এই যুদ্ধ জালেমের বিরুদ্ধে মজলুমের প্রতিবাদ-প্রতিরোধ। সেই প্রতিবাদে তুমিও শামিল হও।

বাঙালিদের ওপর নিজেদের চালানো নৃশংসতার বৈধতা দিতে প্রাণপণ অপপ্রচার চালাচ্ছে পাকিস্তানি শাসকদল। তারা প্রচার করছে মিডিয়ায়—’ভারত তাদের জনগণ পূর্ব পাকিস্তানে পাঠিয়ে গোলযোগ সৃষ্টি করছে। পূর্ব পাকিস্তানের জনগণের কোন সংশ্লিষ্টতা নেই এই যুদ্ধে।’ ইতোমধ্যেই তাজউদ্দীন আহমাদকে প্রধানমন্ত্রী করে বাংলাদেশ প্রবাসী সরকার গঠন হয়ে গেছে। পাকিস্তানিদের অপপ্রচার মোকাবেলা এবং মুক্তিযুদ্ধের জোরদার প্রচার করার উদ্দেশ্যে তাজউদ্দীন আহমেদ একটি বেতার কেন্দ্র প্রতিষ্ঠা করেছেন। মাওলানা উবায়দুল্লাহ জালালাবাদীকে বেতারের ধর্মীয় অনুষ্ঠানের দায়িত্ব দিতে চাইছিলেন মনে মনে। ঠিক এই সময় উপস্থিত হলেন মাওলানা জালালাবাদী।

জালালাবাদী বললেন, ‘আমি রণাঙ্গণে যুদ্ধ করব না বেতার কেন্দ্রে?’
তাজউদ্দীন আহমেদ হাসলেন, ‘বেতারে ইসলামি অনুষ্ঠান প্রচারের জন্য আপনিই তো যোগ্য লোক।’
মুচকি হাসলেন জালালাবাদী। তাজউদ্দীন আহমেদ বললেন, ‘বেতারেই যুক্ত হয়ে যান। ধর্মীয় অনুষ্ঠানের মাধ্যমে মুক্তিযোদ্ধাদের অনুপ্রাণিত করুন।’
জালালাবাদী বললেন, ‘তা-ই করব ইনশাআল্লাহ!’

প্রথমে চট্টগ্রামের কালুরঘাটে স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্র স্থাপন করা হয়। পাক-সেনাদের আক্রমণে কলকাতায় স্থানান্তর করা হয় অফিস। স্টুডিও বলতে ছোট একটি রুম। সাউন্ডপ্রুফ নেই, তাই ঘরের বেড়ায় মোটা করে লাগানো হয়েছে চট। টেপ রেকর্ডারে চলে অনুষ্ঠান রেকর্ডিং।

কোরআন তেলাওয়াত, তরজমা এবং মুক্তিযোদ্ধাদের অনুপ্রাণিত করতে ইসলামি বিভিন্ন অনুষ্ঠান, বুলেটিন, কথিকা প্রচার করতেন মাওলানা জালালাবাদী। এ সময় তিনি টায়ফয়েডে আক্রান্ত হলে অনুষ্ঠান চালিয়ে নেন চট্টগ্রামের মাওলানা নুরুল ইসলাম জিহাদী। পরে যুক্ত হন ঝিনাইদহের মাওলানা খাইরুল ইসলাম যশোরী। রণাঙ্গণের যোদ্ধাদের উৎসাহ-উদ্দীপনা দিতেই এইসব আলেমগণ পরিচালনা করেন বিভিন্ন ইসলামি অনুষ্ঠান।

তখনও সেকশন কমান্ডার হয়ে উঠেননি মাওলানা শামসুল হুদা। ভুরুঙ্গমারী হাইস্কুল মাঠে ট্রেনিং নিচ্ছেন। ট্রেনিং নিতে নিতেই সীমান্তবর্তী ফুলকুমার নদীর তীরে কালমাটিতে তৈরী করেন ডিফেন্স। শুরু হয় দেশকে মুক্ত করার লড়াই। মাওলানার নতুন এই ডিফেন্স দেখে রাগে জ্বলে উঠেছে রাজাকার বাহিনী। রাজাকার আতাউল্লাহ ঘোষণা করল, একজন মুক্তিযোদ্ধাকে ধরে দিতে পারলে, পুরষ্কার দশ হাজার টাকা।

হন্য হয়ে যায় অর্থলোভী রাজাকাররা। পথের ধারে, নদীর তীরে, অন্ধকার গলিতে ওঁৎ পেতে থাকে মুক্তিযোদ্ধা শিকারের আশায়। মুক্তিযোদ্ধারাও সতর্ক, কেউ একা একা বের হন না। মাওলানা শামসুল হুদা হাতে গ্রেনেড নিয়ে ফুলকুমার নদী পার হয়ে ডিফেন্সে যাচ্ছিলেন। সঙ্গে ছোট একটা ছেলে। কয়েকজন রাজাকার পথরোধ করে দাঁড়ায়। তাদের মুখে উল্লাস। একজন বললো, ‘আরে, এতো শমসু, ট্রেনিং নিতে দেখছি। ডিফেন্সে যাচ্ছো?’ বলেই তারা হাত-পা বেঁধে ফেলে তার। যেই বাড়িতে তাকে রাখা হলো, বাড়ির মালিক-ই তার পাহারার দায়িত্বে পড়ল। রাজাকাররা বেরিয়ে গেল। তাদের মুখে কেবল একটাই উল্লাস—১০ হাজার টাকা পেয়েছি!

মাওলানা এদিকে হাত-পা বাঁধা অবস্থায় পড়ে আছেন রাজাকারের জেলে, অন্যদিকে ওই ছোট বাচ্চাটা দৌড়ের ছুটে গেল মুক্তিযোদ্ধা ক্যাম্পে। মুক্তিযোদ্ধারা এসে ঘেরাও করে ফেললো বাড়ি। রাজাকাররা কল্পনাও করতে পারেনি—এইভাবে আক্রমণ করবে মুক্তিযোদ্ধারা। জানলে এমন একা দুটো লোককে রেখে যেত না।

হাত-পায়ের বাঁধন খুলে দিলে গা ঝাড়া দিয়ে উঠলেন মাওলানা শামসুল হুদা। তুলে নিলেন রাইফেল। বাড়ির মালিকের কানে টানা ১৮টি গুলি করলেন। ঝাঁঝরা হয়ে গেল মালিকের মস্তিষ্ক। নিভে এল তার ১০ হাজার টাকার স্বপ্নের পৃথিবী। শেষ গুলিটা করে মাওলানা শামসুল হুদা একদলা থুথু ফেলে বললেন,’বাঙালিদের দমানো এত সোজা! জাহান্নামে পাঠিয়ে দেব এক্কেবারে!’

একাত্তরে ইসলামি দল ছিল তিনটি—জামাতে ইসলামি, জমিয়তে উলামায়ে ইসলাম এবং নেজামে ইসলাম পার্টি। জামাতে ইসলামী এবং নেজামে ইসলাম পার্টি সরাসরি মুক্তিযুদ্ধের বিরোধিতা করে। তবে বিরোধিতায়, পাকিস্তানিদের সহচর হিসেবে মাঠে-ময়দানে সক্রিয় থাকে জামাতে ইসলামী। নেজামে ইসলাম পার্টি ছিল নিতান্তই দুর্বল এবং নিষ্প্রভ। জমিয়ত ছিল স্বাধীনতার পক্ষে। জমিয়ত পশ্চিম পাকিস্তান এবং পূর্ব পাকিস্তান—দুই শাখাই ছিল মুক্তিযুদ্ধের পক্ষে। আলেমদের একশ ভাগের মাত্র দশ ভাগ ছিলেন ইসলামি দলের সঙ্গে জড়িয়ে। বাকি ৯০ ভাগের কেউ ছিলেন আলিয়া মাদরাসার শিক্ষক, কেউ কওমি মাদরাসার শিক্ষক, কেউ বিভিন্ন খানকা ও পীর-মুরিদির সঙ্গে যুক্ত, কেউ শুধুই ইমাম, মুয়াজ্জিন ও ব্যক্তি পর্যায়ের আলেম। এদের প্রায় সবাই মুক্তিযুদ্ধের পক্ষে অবস্থান নেন। যারা আদর্শগত কারণে মুক্তিযুদ্ধের পক্ষ নিতে পারেননি, তারা নীরবতা পালন করেন। কিন্তু স্বাধীনতা পরবর্তী সময়ে একটি কথিত ইসলামী দলের অপরাধকে চাপিয়ে দেয়া হয় বাকি ৯০ ভাগ আলেমের ওপর। রাজাকার মানেই এখন দাড়ি, টুপি, পাঞ্জাবি পরিহিত কেউ।

রাজাকারদের যে ছবি এবং ডকুমেন্টস আমরা দেখতে পাই, তা বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, অধিকাংশ রাজাকারের গায়ে ইসলামের এইসব চিহ্ন ছিল ন। চেহারা-সুরতে সাধারণ একজন মানুষ। এর অন্যতম কারণ—শুধু আদর্শগত দ্বন্দ্বের কারণেই সবাই রাজাকার বাহিনীতে যোগ দেয়নি। বরং অনেক এমন আছে, যারা দুর্ভিক্ষের নিদারুণ ক্ষুধা থেকে বাঁচতে রাজাকার বাহিনীতে যোগ দিয়েছিল। অনেকে যুদ্ধের কারণে ভয় পেয়ে আত্মরক্ষার জন্য নাম লিখিয়েছিল রাজাকারে। অনেকে আবার জোর করে সম্পত্তি দখল করা এবং পৈতৃক আমলের শত্রুতার প্রতিশোধ নেয়ার জন্য রাজাকার বাহিনীতে যোগ দিয়েছিল।

মুক্তিযুদ্ধে আলেম সমাজের ভূমিকা কোনো অংশেই কম নয়। গেরিলা কমান্ডার, সেক্টর কমান্ডার, রণাঙ্গণের সাধারণ সৈনিক, গোয়েন্দা, মুক্তিযোদ্ধাদের উৎসাহ দানকারী—মুক্তিযুদ্ধের এমন প্রতিটি অংশে আলেমদের ভূমিকা প্রত্যক্ষ। তবে বিংশ শতাব্দীতে এসে ইতিহাস রচনার একটা ধারা তৈরী হয়েছে। সেই ধারাটি হলো নিজের মত ও স্বার্থ অনুযায়ী ইতিহাস রচনা। এই স্বার্থবাদী ইতিহাস রচনার ভয়ংকার ফাঁদে পড়েছে আমাদের মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাসও। মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস বইয়ে আলেমদের এই অধ্যায়টি যেন আড়ালই থেকে যায় সবসময়।

বিজ্ঞাপন
আগের সংবাদইজরাইল-আমিরাতের মধ্যে সরাসরি বিমান চলাচল শুরু
পরবর্তি সংবাদআফগানে হত্যাকাণ্ডে জড়িত থাকার দায়ে ১০ অস্ট্রেলিয় সেনা বরখাস্ত