মুফতী দ্বীন মুহাম্মদ খান : পুরান ঢাকার অভিভাবক

কাজী মাহবুবুর রহমান

মুফতী দ্বীন মুহাম্মদ খান ছিলেন একজন নির্ভিক আলেম, প্রখ্যাত মুফাসসির, হাদিস বিশারদ ও বিশিষ্ট ইসলামি চিন্তাবিদ। ছিলেন সম্ভ্রান্ত মুসলিম পরিবারের সন্তান। তাঁর পিতার নাম নুরুল্লাহ খান। তাঁদের আদি বাস ছিল সীমান্ত প্রদেশের বাজুর এলাকায়৷ জনাব নুরুল্লাহ খান ব্রিটিশ সেনাবাহিনীর একজন ক্যাপ্টেন ছিলেন। ১৮৯১ খ্রিষ্টাব্দে ভারতের মনিপুরে এক রক্তক্ষয়ী যুদ্ধ হয়৷ ইংরেজরা এই যুদ্ধ দমন করার জন্য মনিপুরে সৈন্য প্রেরণ করেন। ক্যাপ্টেন নুরুল্লাহ এই ব্রিটিশ বাহিনীর সঙ্গে এদেশে আগমন করেন। এবং স্থায়ীভাবে এখানে বসবাস করতে শুরু করেন। এখানেই তিনি মোমেনশাহী জেলার এক সম্ভ্রান্ত মুসলিম পরিবারে বিয়ে করেন। তাঁর এই স্ত্রীর গর্ভে ১৯০০ সালের জানুয়ারি মাসে আজকের পুরান ঢাকায় মুফতী দ্বীন মুহাম্মদ খান জন্মগ্রহন করেন৷

শিক্ষা
মুফতী দ্বীন মুহাম্মদ রহ.-এর শিক্ষার হাতেখড়ি হয় ঢাকার চকবাজার শাহী মসজিদে৷ মাওলানা ইবরাহিম পেশওয়ারি নামক একজন প্রখ্যাত আলেম তখন চকবাজার শাহি মসজিদে দীনি তালিমের কাজে নিয়োজিত ছিলেন। মুফতী দ্বীন মুহাম্মদ খান মাদরাসার প্রাথমিক কিতাবাদি থেকে শুরু করে পাঠ্যসূচির অন্তর্ভুক্ত হাদিসের সমস্ত কিতাব মাওলানা ইবরাহিম পেশোয়ারির নিকট অধ্যয়ন করেন। অতঃপর হাদিস, তাফসির ও ফিকহ শাস্ত্রের উচ্চশিক্ষা লাভের জন্য তিনি দারুল উলুম দেওবন্দে গমন করেন। সেখানে পাঁচ বছর অবস্থান করেন। এবং উক্ত বিষয় সমূহে বিশেষ পাণ্ডিত্য লাভ করেন। উল্লেখ্য, বিশ্ববিখ্যাত মুহাদ্দিস আল্লামা আনওয়ার শাহ কাশ্মীরি রহ. তাঁর হাদিসের উস্তাদ ছিলেন।

এ ছাড়াও দিল্লির আমিনিয়া মাদরাসার বিখ্যাত মুহাদ্দিস মুফতী কিফায়াতুল্লাহ সাহেব রহ.-এর নিকট থেকেও তিনি হাদিসের সনদ লাভ করেন। হিন্দুস্তানে লেখাপড়া শেষ করে তিনি ১৯২০ সালে দেশে ফিরে আসেন৷

কর্মজীবন
মুফতী দ্বীন মুহাম্মদ খান আরবি, ফার্সি এবং উর্দু ভাষায় সুপণ্ডিত ছিলেন৷ তিনি ১৯২০ সাল থেকে ৩০ সাল পর্যন্ত ঢাকার হাম্মাদিয়া মাদরাসাসহ বিভিন্ন ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানে দীনি তালিম প্রদান করেন। এই সময়ে বিখ্যাত মুবাল্লিগ আবদুল করিম মাদানির সঙ্গে তাঁর পরিচয় ঘটে। মুফতী দ্বীন মুহাম্মদের ব্যক্তিত্ব ও বহুবিধ প্রতিভায় আবদুল করিম মাদান অত্যন্ত মুগ্ধ হন৷ এবং এই সূত্র ধরেই হজরত মাদানি ১৯৩০ সালে রেঙ্গুন সফরকালে মুফতী সাহেবকে সঙ্গে করে নিয়ে যান। সেখানে গিয়ে তিনি বাঙালি-সুন্নি জামে মসজিদে ইমাম ও মুফতী পদে নিয়োজিত হন।

ইমাম নিয়োজিত হয়ে সেখানে সাপ্তাহিক তাফসিরের আয়োজন করেন। এবং ক্রমাগত ত্রিশ পারা কোরআন শরিফের তাফসির সম্পন্ন করেন। এই তাফসির মাহফিল রেঙ্গুনে তাঁকে একজন বাগ্মী মুফাসসির হিসেবে বিশাল খ্যাতি এনে দেয়। এরপর ১৯৪১ সালে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ শুরু হলে তিনি ঢাকায় প্রত্যাবর্তনের ইচ্ছা করেন। রেঙ্গুনবাসী তখন তাঁকে অজস্র উপঢৌকন ও হৃদয় নিংড়ানো ভালবাসার মধ্য দিয়ে বিদায় জানায়।

১৯৪১ সালে ঢাকায় প্রত্যাবর্তন করে চকবাজার জামে মসজিদে কুরআনের তাফসির শুরু করেন। চকবাজার জামে মসজিদে থাকাকালীনই ১৯৪৬ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ও পরবর্তী সময়ে ঢাকা আলিয়ায় অধ্যাপনা করেন।

১৯৫০ সালে মুজাহিদে আজম মাওলানা শামসুল হক ফরিদপুরী রহ. যেসকল আলেমদের সঙ্গে নিয়ে ঐতিহ্যবাহী লালবাগ মাদরাসা প্রতিষ্ঠা করেন, মুফতী দ্বীন মুহাম্মদ ছিলেন তাঁদের অন্যতম।

রাজনৈতিক সক্রিয়তা
মুফতী দ্বীন মুহাম্মদ অত্যন্ত বিচক্ষণ ও দূরদর্শিতাসম্পন্ন একজন আলেম ছিলেন। এবং অত্যন্ত ব্যক্তিত্ব সচেতনও ছিলেন। রাজনীতিতে সার্বক্ষণিক বিচরণ না থাকলেও উপমহাদেশের রাজনীতির ঐতিহাসিক কিছু সময়ের সঙ্গে সক্রিয়ভাবে জড়িত ছিলেন। পৃথক মুসলিম পাকিস্তান রাষ্ট্রের জন্য সংগ্রাম করেছেন। এমনকি খেলাফত আন্দোলনে অংশগ্রহণ করায় আসামের কারাগারে দীর্ঘদিন কারারুদ্ধ হয়েও থাকতে হয়েছে তাঁকে। বাংলাদেশ উলামায়ে ইসলামের সাধারণ সম্পাদক ছিলেন তিনি। ঢাকায় ‘সিরাতুন্নবি কমিটি’ গঠনের পুরোধা ব্যক্তিত্ব হিসেবে মুফতী দ্বীন মুহাম্মদ রহ.-এর নাম বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য।

ব্যক্তিগতজীবনের বিবিধ দিক
মুফতী দ্বীন মুহাম্মদ ব্যক্তিগতভাবে খুবই সৎস্বভাব ও সাংস্কৃতিমনা একজন আলেম ছিলেন। সাবেক পুর্বপাকিস্তান রেডিওতে ‘কুরআনে হাকিম ও আমাদের জিন্দেগি’ শীর্ষক একটি অনুষ্ঠানের তিনি নিয়মিত আলোচক ছিলেন। তাঁর রচিত সুরা ইউসুফের তাফসির এবং দোয়া-দুরুদ ও তাসাউফ সম্পর্কিত দুইখানি গ্রন্থ প্রকাশিত হয়েছে।

মুফতী দ্বীন মুহাম্মদ অত্যন্ত উদারমনা ব্যক্তি ছিলেন। পাশাপাশি আল্লাহর রহমতে তিনি বেশ সম্পদের অধিকারী ছিলেন৷ মৌলভীবাজারের তাঁর বিশাল ব্যবসা এবং এসরার ম্যানশন নামের একটি বড় বাড়ি ছিল। সেই বাড়িতে তিনি প্রায়ই দেশের বরেণ্য আলেম ও বন্ধুস্থানীয় ব্যক্তিদের দাওয়াত করে এনে মেহমানদারি করতেন বলে খ্যাতি আছে। এবং এ কাজ তিনি অত্যন্ত আনন্দ সহকারেই করতেন।

পারিবারিক জীবনে মুফতী সাহেব নিঃসন্তান ছিলেন। ফলে তাঁর স্ত্রী তাঁর বোনের একটি ছেলেকে এনে নিজেদের ছেলের মতো লালন-পালন করেন। সেই ছেলেটির নাম ছিল এসরার আহমদ। তাঁর নামেই মুফতী সাহেবের মৌলভীবাজারের বাড়ির নামকরণ হয়েছিল এসরার ম্যানশন।

ইন্তেকাল
এই ক্ষণজন্মা মহামনীষী ১৯৭৪ সনের ২ ডিসেম্বর সোমবার রাত ১২টা ৩৫ মিনিটে ইন্তেকাল করেন। পরদিন লালবাগ কিল্লার মোড় মাঠে তাঁর জানাজা অনুষ্ঠিত হয়। তাঁর জানাজায় প্রায় লক্ষাধিক মানুষ অংশগ্রহণ করেন। তাঁকে লালবাগ শাহী মসজিদ প্রাঙ্গণে সমাহিত করা হয়।