মুহররম ও আশুরা : ফযীলতের অপূর্ব সময়

উবায়দুল্লাহ তাসনিম

কুরআনে বর্ণিত ‘আরবাআতে হুরুম’ তথা ‘সম্মানিত চার মাসে’র একটি হচ্ছে মুহররম। কুরআন মাজিদের ইরশাদ, ‘প্রকৃতপক্ষে আল্লাহর কাছে আল্লাহর কিতাবে (অর্থাৎ লাওহে মাহফুজে)মাসের সংখ্যা বারোটি, সেই দিন থেকে, যে দিন থেকে আল্লাহ আকাশমণ্ডলী ও পৃথিবী সৃষ্টি করেছিলেন। এর মধ্যে চারটি মাস মর্যাদাপূর্ণ।(সূরা তাওবা:আয়াত নং৩৬)

প্রিয় নবিজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বিদায় হজের ঐতিহাসিক ভাষণে মাস চারটির নামও উল্লেখ করেছেন। তন্মধ্যে তিনটি ধারাবাহিক মাস তথা জিলকদ,জিলহজ,মুহররম। আরেকটি হল রজব। (বুখারি:হাদিস নং ৫৫৫০)

মুহররম এটা ক্রমানুসারে তৃতীয় মাস। তবে তা অত্যন্ত মর্যাদা ও ফযীলতপূর্ণ ।বিভিন্ন হাদিসে এ মাসের অনেক ফযীলতের কথা বলা হয়েছে। এ মাসে অধিক পরিমাণে তাওবা ইস্তেগফারের কথাও এসেছে।

আবু হুরায়রা রা.থেকে বর্ণিত,রাসূল সা. বলেছেন, ‘রমযানের পর সর্বশ্রেষ্ঠ রোযা হল আল্লাহর মাস মহররমের রোযা।(মুসলিম:হাদিস নং ১১৬৩)

হাদিসটিতে লক্ষ্য রাখার বিষয়, মুহররম মাসকে ‘শাহরুল্লাহ’ বা ‘আল্লাহর মাস’ বলে অভিহিত করা হয়েছে। প্রত্যেক মাসই তো আল্লাহর মাস। তবুও আলাদা করে ‘আল্লাহর মাস’ বলে তার বাড়তি ফযীলতের প্রতি ইঙ্গিত করা হয়েছে।

এ মাসের অনন্য আরেকটা বৈশিষ্ট্য হল, তার সংগে তাওবা কবুলের ইতিহাস জুড়ে আছে। এক হাদিসে আছে, ‘…এ মাসে এমন একটি দিন আছে, যে দিনে আল্লাহ একটি জাতির তাওবা কবুল করেছেন এবং ভবিষ্যতেও অন্যান্য জাতির তাওবা কবুল করবেন। (তিরমিযি:হাদিস নং ৭৪১)

মনে রাখা ভালো, ইস্তিগফারের উত্তম পদ্ধতি হল, কুরআন-সুন্নাহে বর্ণিত ইস্তিগফার বিষয়ক দুআগুলো মুখস্থ করে তা দিয়ে ইস্তেগফার করা। তবে নিজের ভাষায় ইস্তেগফার পাঠ করলেও সমস্যা নেই।

আশুরার ফযীলত

মুহররমের দশ তারিখের দিনকে ‘ইয়াওমে আশুরা’ বা ‘আশুরা দিবস’ বলা হয়। এ দিনে রোযা রাখা মুস্তাহাব। নবীজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম মক্কায় থাকাকালেও এ দিনে রোযা রাখতেন। এরপর মদীনায় গিয়ে দেখতে পেলেন, ইহুদিরা এ দিনে রোযা রাখছে। এরপর থেকে নিজে এ দিনে রোযা রাখার সাথে সাথে সাহাবায়ে কেরামকে রোযা রাখার নির্দেশ দেন।

আব্দুল্লাহ ইবনে আব্বাস রা.থেকে বর্ণিত, রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম মদিনায় এসে দেখলেন ইহুদিরা আশুরার দিন রোযা রাখে। তিনি জিজ্ঞাসা করলেন, ‘কী ব্যাপার, তোমরা এ দিন রোযা রাখছো যে!’ তারা বলল, এটি একটি মর্যাদাপূর্ণ দিন। এ দিন আল্লাহ তায়ালা ফেরাউন ও তার কউমকে ডুবিয়ে মারেন এবং মূসা আ. ও তাঁর অনুসারিদের ফেরাউনের কবল থেকে রক্ষা করেন। তাই শোকর আদায় করার জন্য মুসা আ এ দিন রোযা রেখেছিলেন। আমরাও তাই এ দিন রোযা রাখি। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বললেন, ‘মূসা আ.এর বিষয়ে আমরা তোমাদের চেয়ে বেশি হকদার।’ এরপর তিনি রোযা রাখেন এবং অন্যদেরকেও রোযা রাখতে বলেন।(মুসলিম:হাদিস নং১১৩০)

রমযানের রোযা ফরজ হওয়ার আগে আশুরার রোযা ফরজ ছিল। তবে এখন তা মুস্তহাব। কিন্তু সাধারণ নফল রোযার চেয়ে এ রোযার ফযিলত একটু বেশি। হাদিসের ইরশাদ, ‘আবু কাতাদাহ রা. থেকে বর্ণিত রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন, আমি আশাবাদি আশুরার রোযার ওসিলায় আল্লাহ তায়ালা অতিতের এক বছরের গোনাহ মাফ করে দিবেন।(মুসলিম:হাদিস নং১১৬২)

মনে রাখার বিষয়, আশুরার রোযার সাথে নয় বা এগারো তারিখে আরেকটি অতিরিক্ত রোযা মিলিয়ে রাখা ভালো। হাদিসের ইরশাদ, ‘ইবনে আব্বাস রা.থেকে বর্ণিত, রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম আশুরার দিন রোযা রাখার কথা বললে সাহাবায়ে কেরাম আরয করেন, এ দিনটিকে তো ইহুদি খৃষ্টানরা সম্মান করে। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বললেন, আগামি বছর নয় তারিখও রোযা রাখবো। কিন্তুু আগামি বছর আসার আগেই তিনি ইন্তেকাল করেন। (মুসলিম:হাদিস নং ১১৩৪)

ইবনে আব্বাস থেকে বর্ণিত, রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন, ‘তোমরা আশুরার দিন রোযা রাখবে। কিন্তু রোযা রাখার ক্ষেত্রে ইহুদিদের বিপরীত করবে। আশুরার আগে একদিন বা পরে একদিন রোযা রাখবে’। (মুসনাদে আহমাদ :২১৫৪)

একটি ভ্রান্তির নিরসন :

আমাদের সমাজের অনেকেই মনে করেন আশুরা দিবসের মর্যাদা কারবলার মর্মান্তিক ঘটনার কারণে হয়েছে। কিন্তু আসলে এ ধারণা একেবারেই ঠিক নয়। নবিজি সা.এর কলিজার টুকরো নাতি হুসাইন রা. রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এর ইন্তেকালের প্রায় ৫০বছর পর ৬১হিজরীর ১০ মুহররম কারবালার ময়দানে নির্মমভাবে শহিদ হন। অথচ নবিজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম নিজের জীবদ্দশায়ই আশুরার ফযীলতের কথা বলে গেছেন। তাহলে কারবালার কারণে আশুরার ফযিলত হল কিভাবে? নীবিজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এর ইন্তেকালের আগেই দ্বীনে- ইসলাম পূৃর্ণাঙ্গতা পেয়েছে। তার ইন্তেকালের পর দ্বীনে- ইসলামে নতুন করে ফযিলত যুক্ত করার কোনও সুযোগ নেই।

হ্যাঁ! এটুকু বলা যেতে পারে যে, এই মহান দিবসে কারবালায় ঘটা হৃদয়বিদারক ঘটনা দিনটাকে আরেকটু মহিমান্বিত ও তাৎপর্যময় করে তুলেছে। এ জন্য প্রতিটি মুমিন হৃদয়ে সত্যিকার অর্থেই ব্যথিত হওয়া চাই। কিন্তু হৃদয়ের এই বেদনা কিছুতেই অনৈসলামিক কার্যকলাপে প্রকাশ করা যাবে না। অথচ দুঃখের বিষয়,আমাদের সমাজে এক শ্রেণির লোকেরা ( বিশেষ করে শিয়া সম্প্রদায়) আশুরা দিবসকে বিদআতি কর্মকাণ্ডে উদযাপন করে। দ্বীন ও শরীয়তে যার কোনো ভিত্তি নেই।

১০ মুহররম আসলেই দেখা যায়,রাজধানীসহ সারা দেশের অনেক স্থানেই এ দিনকে কেন্দ্র করে ( কারবালার শোকে) কান্নাকাটি, আহাজারি, বুক চাপড়ানো ইত্যাদির করুণ দৃশ্য! অথচ কুরআন সুন্নাহে এভাবে শোক প্রকাশের কোনও অনুমতি নেই। মৃত ব্যক্তির জন্য ইসলামি শরীয়তে তিন দিনের বেশি শোক প্রকাশ নাজায়েজ। শুধু স্বামীর মৃত্যুতে স্ত্রীকে ইদ্দত সমাপ্ত হওয়া পর্যন্ত শোক প্রকাশের অনুমতিটুকু দেওয়া হয়েছে। বরং হাদিসে এসবের ব্যাপারে কঠোর নিষেধ করা হয়েছে। এক হাদিসে আছে, ‘নিশ্চই চোখ অশ্রুসজল হয়।হৃদয় ব্যথিত হয়। তবে আমরা মুখে এমন কিছু উচ্চারণ করি না যা আমার রবের কাছে অপছন্দনীয়।’ অন্য আরেকটি হাদিসে আছে, ‘তাদের সংগে আমাদের কোন সম্পর্ক নেই, যারা মুখ চাপড়ায়, কাপড় ছিঁড়ে এবং জাহেলি যুগের কথাবার্তা বলে।’

আমাদের সমাজে এই যে অনৈসলামিক কার্যকলাপ হয়, এর ব্যাপারে হাদিসে কঠোর ধমকি দেওয়া হয়েছে। এবং এগুলো আল্লাহ এবং তাঁর রাসূলের নারাজির কারণ। এ দিনে আরেকটা বিষয় চোখে পড়ে। তা হল,তাজিয়া মিছিল। অথচ কুরআন-সুন্নায় এর কোন ভিত্তি নেই। বরং তা অনৈসলামিক কাজ। আসুন আমরা সকল ভ্রান্তকাজ বাদ দিয়ে এই সম্মানিত মাসটাকে কুরআন সুন্নাহর নির্দেশিত পন্থায় আমলের মাধ্যমে উদযাপন করি। আল্লাহ সবাইকে তাওফিক দিন।

শিক্ষার্থী, জামিয়াতূল উলূমিল ইসলামিয়া মুহাম্মদপুর,ঢাকা