যাইরা ওয়াসিম : নারীর এজেন্সি ও আজকের ভারত

মূল : হাফসা কাঞ্জওয়াল ।। ভাবানুবাদ : তুহিন খান

যাইরা ওয়াসিমের বলিউড-ত্যাগের ঘোষণার পর হাফসা কাঞ্জওয়ালের এই লেখাটি আল-জাজিরায় প্রথম প্রকাশিত হয়। হাফসা কাশ্মিরি-আমেরিকান লেখিকা, লাফায়েটে কলেজের দক্ষিণ এশিয়ান হিস্ট্রির প্রফেসর এবং সোশাল অ্যাক্টিভিস্ট। বহির্বিশ্বে কাশ্মির ও কাশ্মিরি জনগণের সংগ্রামকে যথাযথভাবে তুলে ধরতে হাফসার অন্তর্ভেদী লেখালেখি, ইতিহাসের নিখুঁত চিত্রায়ন এবং কাশ্মির-সংকটের আসল মর্ম যথাযথভাবে বিশ্লেষণ প্রশংসনীয়। ফাতেহ টোয়েন্টি ফোরের পাঠকদের জন্য লেখাটির ভাবানুবাদ করেছেন তুহিন খান।

গত ৩০ জুন, বলিউডের বিস্ময়বালিকা, ১৮ বছর বয়সী কাশ্মিরি অভিনেত্রী যাইরা ওয়াসিমের বলিউড-ত্যাগের ঘোষণায় পুরা ভারতজুড়ে তোলপাড় সৃষ্টি হয়। যাইরা তাঁর ফেসবুক, ইনস্টাগ্রাম ও টুইটার একাউন্টে লেখেন যে, গত ৫ বছর বলিউডে অজস্র ভালোবাসা, শুভকামনা আর সাবাশি পেলেও এই জীবন তাঁকে ‘অজ্ঞতার পথে’ নিয়ে গেছে, তিনি ঈমান ও ধর্মের পথ থেকে দূরে সরে গেছেন। তাঁর পোস্টে বিশেষ কোনো কারণের উল্লেখ না থাকলেও, কোরআনের বেশ কিছু আয়াত ও ইসলামি উপদেশবাণীর উল্লেখ আছে, যেগুলো পার্থিব জীবনের ভোগবিলাস ত্যাগ ও ‘মানুষ সৃষ্টির প্রকৃত উদ্দেশ্য’ স্মরণের কথা বলে।

মি. পারফেকশনিস্ট-খ্যাত বলিউড হার্টথ্রব আমির খানের অন্যতম ব্যবসাসফল ছবি ‘দঙ্গল’-এ কিশোরী রেসলারের ভূমিকায় অভিনয়ের মাধ্যমে লাইমলাইটে আসেন যাইরা। ‘দঙ্গল’-এ অভিনয়ের জন্য ২০১৭-তে জেতেন ন্যাশনাল ফিল্ম অ্যাওয়ার্ড। এরপর একে একে অভিনয় করেন ‘সিক্রেট সুপারস্টার’ ও ‘দ্য স্কাই ইজ পিঙ্ক’ ছবিতে। হয়ে ওঠেন বলিউডের অন্যতম উঠতি গ্ল্যামার গার্ল।

তবে শুরু থেকেই বলিউডে যাইরার অভিনয় নিয়ে বিতর্ক শুরু হয়। অনেক মুসলমানই যাইরার বলিউডযাত্রা ভালোভাবে নেন নাই। এমনকি তাঁর জন্মভূমি কাশ্মিরেও তাঁর অভিনয় নিয়ে বিশেষ কোনো উত্তেজনা ছিল না। বরং কাশ্মিরিরা ব্যাপারটাকে এভাবে দেখছিল যে, যাইরা এমন একটা ইন্ডাস্ট্রিতে কাজ করছে যেটি একাধারে ভারতের জাতীয় স্বার্থ রক্ষাকারী, ইসলামবিদ্বেষী এবং ভারতীয় শাসনের বিরুদ্ধে কাশ্মিরি জনগণের সংগ্রামকে ভুলভাবে তুলে ধরতে অভ্যস্ত। সেসময় বলিউড অ্যাক্টরদের অনেকেই যাইরার পাশে দাঁড়ান এবং তাঁকে কাশ্মিরি তরুণদের আইডল হিসেবে উল্লেখ করেন। উল্লেখ্য, যাইরা নিজেই এর প্রতিবাদ করেন এবং বলেন, ‘আমি চাই না কেউ আমাকে অনুসরণ করুক, আমি রোল মডেল নই।’

পাঁচ বছর পর যখন যাইরা বলিউড ছাড়ার সিদ্ধান্তের কথা জানালেন, তখন ভারতে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ও নিউজরুমগুলোতে অসংখ্য মন্তব্য-প্রতিমন্তব্যের ঝড় উঠল। কাশ্মিরের অসংখ্য মানুষ এই সিদ্ধান্তকে স্বাগত জানালো, অর্থ ও খ্যাতির মোহ ত্যাগের এই কঠিন পদক্ষেপকে সাধুবাদ জানালো। তবে ভারতের অনেক বিখ্যাত ব্যক্তিত্বই সোশাল মিডিয়ায় যাইরার কড়া সমালোচনা শুরু করলেন।

যাইরার এই সিদ্ধান্ত এবং তা ঘোষণার পেছনে কী এমন ঘটনা লুকিয়ে আছে, কোন অভিজ্ঞতা বা ট্রমা তাঁকে এই সিদ্ধান্ত নিতে বাধ্য করেছে–আমরা জানি না। হয়তো ভবিষ্যতে আবার তাঁকে বলিউডে দেখা যাবে। তবে এই ঘটনায়, যাইরা বলিউড ছাড়ার যে কারণ উল্লেখ করেছেন তাঁর সমালোচনায় লিবারেল ফেমিনিস্ট ও গোঁড়া হিন্দু জাতীয়তাবাদীদের একজোট হওয়াটা গুরুত্বপূর্ণ।

এদের সমালোচনার ভাষায় বোঝা যায়, যাইরার বলিউড-ত্যাগ আসলে কোনো অপরাধ না। বরং, এই সিদ্ধান্তের পেছনে ইসলাম ধর্ম পালনের কথা টেনে আনা এবং এত খোলামেলা ভাষায় সেটা বলাই তাঁর মূল ‘অপরাধ’। আজকের ভারতে ধর্মীয় সংখ্যালঘুদের, বিশেষত মুসলমানদের নিজ ধর্মবিশ্বাসের কথা খোলাখুলি বলা একরকম ‘অপরাধ’। অন্যদিকে, হিন্দু ধর্মবিশ্বাসের কথা পাবলকলি বলা খুবই প্রশংসার কাজ, বিশেষত বলিউড অ্যাক্টরদের ক্ষেত্রে এটা তো রীতিমতো পুরষ্কার পাওয়ার মতো কর্ম।

উগ্র হিন্দুরা যখন যাইরাকে ‘জিহাদি’ বা ‘তাঁকে বরং পাথর ছোঁড়া উচিত’ বলে ট্রোল করছে, তখন লিবারাল ফেমিনিস্টরা বলছেন, একজন তরুণ অভিনেত্রী গ্ল্যামার আর স্টারডমের হাতছানি উপেক্ষা করে এরকম জীবন বেছে নিচ্ছেন, আর তাও স্বেচ্ছায়–এ অসম্ভব।

রাভিনা ট্যানডনের কথাই ধরা যাক। বলিউডের একসময়ের জনপ্রিয় এই অভিনেত্রী যাইরার সিদ্ধান্তকে ‘অধঃপতন’ বলেছেন। অন্যদিকে বিখ্যাত সাংবাদিক ও স্বঘোষিত নারীবাদী বারখা দত্ত বলেছেন, ‘এই সিদ্ধান্তে যে ধর্মীয় গোঁড়ামির দিকটি আছে, সেটা বিরক্তিকর। তাই বলা যায়, ‘চয়েজ’ খুবই জটিল শব্দ, বিশেষত নারীর ক্ষেত্রে।’ ওয়াশিংটন পোস্টের সাবেক ভারত প্রতিবেদক রমা লক্ষীও এই সিদ্ধান্তের ধর্মীয় দিকটির সমালোচনা করেছেন।

‘চয়েজ’ অবশ্যই খুব জটিল শব্দ, তবে কেবল মুসলিম নারীর ক্ষেত্রেই। প্রয়াত নৃবিজ্ঞানী সাবা মাহমুদ তাঁর বিখ্যাত বই ‘পলিটিক্স অব পাইটি’-তে ঠিক এই কথাটিই বলেছেন, ‘মুসলিম নারীর চয়েজ বা কর্তাসত্তা লিবারালিজমে (এক্ষেত্রে হিন্দু জাতীয়তাবাদের কাছে) তখনই ‘চয়েজ’ হিসেবে গৃহীত হয়, যখন সেটা কোনো বিশেষ ধর্মীয় মূল্যবোধে আঘাত হানে; কিন্তু যদি সেটা কোনো ধর্মীয় মূল্যবোধের পক্ষে যায়, তখন আর তা ‘চয়েজ’ হিসেবে গৃহীত হয় না।’

চয়েজ শব্দটা তখন আর ‘জটিল’ হয় না যখন একজন নারীকে একটা বিশেষ ইন্ডাস্ট্রির বিশেষ নিয়ম ও চাহিদার কাছে আত্মসমর্পণ করতে হয়। যখন সেই ইন্ডাস্ট্রির কাছে তাঁর শিখতে হয় যে, কী পরা উচিত, দেখতে কেমন লাগা উচিত, কীভাবে লোকের সামনে নিজেকে উপস্থাপন করা উচিত। বরং একে নারীর পূর্ণ স্বাধীনতা ও প্রগতি হিসেবেই দেখা হয়। সেক্যু-লিবারাল মডার্নিটির এইসব মূল্যবোধ ও প্রাক্টিসকে যে নারী অস্বীকার করবে, ‘চয়েজ’ বা ‘কর্তাসত্তা’ তার জন্য নয়, এমনকি সে এই সিস্টেমের দ্বারা চরম নির্যাতিত হলেও। সেক্যু-লিবারালদের কাছে, সেই নারী বরং ‘জঙ্গি’।

বলিউড কোনো তুলসিপাতায় ধোয়া ইন্ডাস্ট্রি না। নেপোটিজম, যৌন হয়রানি, ড্রাগ এবিউজ বলিউডের নিত্যদিনের ঘটনা। যদি নারীর ক্ষমতায়নের কথা বলি, সেক্ষেত্রে বলিউড খুব একটা সুবিধার জায়গা না। নায়িকাদেরকে এখানে জেনারেলি ‘আইটেম গার্ল’ হিসেবেই দেখা হয়। তাদের শরীর কেমন হবে, সেটাও ঠিক করে দেয়া হয়। দর্শকপ্রিয় থাকতে বানাতে হবে ‘জিরো ফিগার’, এ তো সবাই জানে। কোনো নায়িকার ওজন বাড়লেই এ নিয়ে শুরু হয় তুমুল রসিকতা। আর বিয়ে তো নায়িকাদের জন্য মৃত্যুতুল্য। অনেক বলিউড অভিনেত্রী, যাঁদের মধ্যে আছেন দীপিকা পাড়ুকোন, এমনকি যাইরা নিজেও ২০১৮ সালে, ইন্ডাস্ট্রিতে আসার পর নিজেদের ডিপ্রেশন আর উদ্বেগ নিয়ে মুখ খুলেছেন।

এসব মাথায় থাকলে, কেন যাইরার সিদ্ধান্তকে মানুষ স্বাভাবিক বলে মেনে নিতে পারছে না? কেন তাঁর এই সিদ্ধান্তকে ‘অধঃপতন’ মনে হচ্ছে, আর ওই সেক্সিস্ট, পুরুষতান্ত্রিক ইন্ডাস্ট্রিকে খুব সাধু মনে হচ্ছে? ১৮ বছরের একটি মেয়েকে যাঁরা ক্রিটিসাইজ করছেন তাঁরা কেন ওইসব বলিউড অ্যাক্টরদের নিয়ে কথা বলছেন না, যারা গোঁড়া হিন্দুত্ববাদী মুসলিম-নির্যাতনকারী বিজেপি সরকারের সাথে সখ্য গড়ে তুলেছে? ভারতের জনগণ যে দিনদিন চরম গোঁড়া হয়ে উঠছে, কিছু ব্যতিক্রম বাদে, সেসবের সমালোচনা কয়জন করেছেন? রমা বা দত্তের মতো লোক যদি যাইরার সিদ্ধান্ত নিয়ে এসব কথা বলতে পারেন, তো সাধারণ মানুষের অবস্থা বোঝাই যায় বটে।

এমন নয় যে, বলিউড ছাড়ার ঘটনা এটিই প্রথম। অভিনেত্রী তনুশ্রী দত্ত যখন যৌন নির্যাতনের অভিজ্ঞতার কথা প্রকাশ্যে বলে বেরিয়ে এসেছিলেন, তখন সবাই তাঁকে বাহবা দিয়েছে। তনুশ্রী সেই অল্পকিছু মানুষের একজন, যাঁরা যাইরার সিদ্ধান্তে সমর্থন জানিয়েছেন।

ইয়োগার কথাই ধরা যাক। মোদ সরকারের আমলে ইয়োগা খুবই জনপ্রিয়, জাতীয় পর্যায়ে উদযাপিত। বলিউডের অসংখ্য অভিনেতা-অভিনেত্রী ২১ জুন ইয়োগা দিবস পালন করেন, পোস্ট দেন সামাজিক মাধ্যমে। অথচ হিন্দু ধর্মের সাথে এর যোগাযোগ তো প্রত্যক্ষ। বলা হয়, পার্থিব ভোগের দুনিয়া ছেড়ে আধ্যাত্মিক জগতের সাথে সম্পর্ক তৈরির জন্যেই ইয়োগা। তো যাইরাও তো তাই করতে চাইছেন। তাঁর বেলায় কেন বাধা? তাঁর মানসিক প্রশান্তি অর্জনের পন্থাটি ‘ইসলামিক’, তাই?

যাইরার ঘটনায় আবারও প্রমাণিত হলো যে, সেক্যু-লিবারাল বা হিন্দু জাতীয়তাবাদীদের কাছে গৃহীত ও প্রশংসিত হতে হলে যেকোনো ধরনের ‘মুসলমানগিরি’ ছাড়া লাগবে। এই হিন্দু ফ্যাসিজমই বর্তমান ভারতের আসল চেহারা।