রমজান : সচেতনতার মাস

মাওলানা ওহিদুদ্দিন খান:

কুরআনের সুরা বাকারায় বলা হয়েছে: হে ইমানদারগণ! রমযানের রোজা তোমাদের উপর ফরজ করা হয়েছে যেমন তোমাদের পূর্ববর্তী জাতির জন্য ফরজ ছিল, যাতে তোমরা ন্যায়নিষ্ঠ হতে পারো (২ : ১৮৩)।

তাকওয়া হলো ধর্মীয় সংবেদনশীলতার আরেক নাম। এই অর্থে, রোজার উদ্দেশ্য হলো একজন ব্যক্তির মধ্যে ধর্মীয় অনুভূতি জাগ্রত করা। অসংবেদনশীল ব্যক্তির পরিবর্তে তাকে সংবেদনশীল ব্যক্তি বানানো। প্রতিটি মানুষের প্রকৃতিতে আল্লাহর আদেশ মান্য করার প্রবণতা রয়েছে। রোজা একজন ব্যক্তির ভিতরে লুকিয়ে থাকা আল্লাহর আদেশ মান্য করার প্রবণতাকে জাগ্রত করে।

বিভিন্ন হাদিসের কিতাবে একটি হাদিস বর্ণিত হয়েছে, আবু হুরায়রা (রা) কর্তৃক বর্ণিত আছে যে, রসুলুল্লাহ সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন: রামজান মাস এলে জান্নাতের দরজা খোলা হয় এবং জাহান্নামের দরজা বন্ধ হয়ে যায় এবং শয়তানরা থাকে আবদ্ধ (সহিহ বুখারি, হাদিস নং ১৮৯৯, সহিহ মুসলিম, হাদিস নং ১০৭৯)। তিরমিজি ও ইবনে মাজায় একই কথা বলা হয়েছে যে, রমজান মাসের প্রথম রাত এলে শয়তানদের বন্দি করা হয় এবং জাহান্নামের দরজা বন্ধ করে দেওয়া হয়, সুতরাং কোনো দরজা খোলা থাকে না। আর জান্নাতের দরজা খুলে দেওয়া হয়, তার মধ্যে একটি দরজাও বন্ধ থাকে না এবং আহ্বানকারী চিৎকার করে বলেন, ওহে যারা ভালোত্বকে ভালোবাসো, এগিয়ে এসো, এবং যারা মন্দকে ভালোবাসো, থাম। আল্লাহ মানুষকে আগুন থেকে রক্ষা করেন এবং প্রতি রাতে এমনটি ঘটে (সুনানে তিরমিজি, হাদিস নং ৬৮২, সুনানে ইবনে মাজাহ, হাদীস নং ১৬৪২)।

শয়তান ব্যক্তিগতভাবে আবদ্ধ, সাধারণভাবে সমস্ত লোকের কাছে নয়। এর অর্থ এই নয় যে, বিশ্বের সমস্ত শয়তান পুরোপুরি এক মাসের জন্য আবদ্ধ; বরং এর অর্থ হলো রমজান মাসে শয়তানরা সেই ব্যক্তির জন্য আবদ্ধ হয় যে সত্যিকারের রোজা রাখে। যিনি সমস্ত আচরণ ও শর্তাদি সহকারে রোজা পালন করেন। রমজান মাসে এমন রোজাদারের বিরুদ্ধে শয়তান অকার্যকর হয়ে পড়ে।

এই হাদিসটি স্পষ্টতই “উপবাস” (রোজা) সম্পর্কে বলেছে, তবে বাস্তবে এটি রোজাদারের অর্থাৎ যে রোজায় আছে তার কথা বলছে। এতে এমন এক ব্যক্তির কথা উল্লেখ করা হয়েছে যে উপবাসের মাধ্যমে ধর্মীয় চেতনার সুযোগ নিতে চেষ্টা করে। হাদিসের কথায়, যে রোজাকে তার জন্য ঢাল বানায়ে নেয়।

যখন রমজান মাস আসে এবং এক ঈমানদার ব্যক্তি আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্য উপবাস করে, তখন সে তাকওয়া অনুভব করে। এই প্রক্রিয়া চলাকালীন, তার মধ্যে একটি উচ্চ স্তরের আল্লাহর আদেশ মান্য করার প্রবণতা জাগে যা তাকে হাদিসে বর্ণিত সুবিধা লাভের জন্য যোগ্য করে তোলে।

রোজা, রমজান মাসে রোজার অভিজ্ঞতার মধ্য দিয়ে আল্লাহর সাথে সম্পর্কের অন্তর্নিহিত অবস্থাকে পুনরুদ্ধার করার জন্য প্রতি বছর আসে। যখন একজন মুমিন বান্দা তার পালনকর্তাকে স্মরণ করে এবং বলে ওঠে: হে আল্লাহ! আপনি শয়তানকে বিরত রাখুন যাতে সে আমাকে পথভ্রষ্ট করতে না পারে। হে আল্লাহ! আমার জন্য জান্নাতের দরজা খুলে দিন এবং এর কোনও দরজা আমার জন্য বন্ধ রাখবেন না এবং আমার জন্য জাহান্নামের দরজা বন্ধ করে দিন এবং এর কোনো দরজা আমার জন্য উন্মুক্ত রাখবেন না। যার রোজা এই আহ্বানে পড়ে, সে সেই ব্যক্তি যার জন্য উপরোক্ত হাদিসের কথাটি প্রযোজ্য।

রোজা বাৎসরিক অনুষ্ঠানের মতো হয় যখন কোনো ব্যক্তি শয়তানকে বেঁধে নিজের কাছ থেকে দূরে রাখতে পারে। হাদিসে স্পষ্টতই এই শব্দগুলি রয়েছে যে , রোজার মাসে শয়তানকে বন্দি করা হয়। তবে এর অর্থ হলো যদি কোনো ব্যক্তির রোজা তাকে শয়তানকে প্রভাবিত করতে বাধা দেওয়ার জন্য আল্লাহর কাছে আকুল হয়ে থাকে, তবে আল্লাহ তাকে যা চান তাই দেবেন যা তার মানসিকতায় চাহিদা প্রকাশ পেয়েছিল।

একইভাবে হাদিসটি স্পষ্টতই বলেছে যে রোজার মাসে জান্নাতের দরজা খোলা হয় এবং জাহান্নামের দরজা বন্ধ হয়ে যায়। তবে এর অর্থ হলো যে ব্যক্তির রোজা তার মধ্যে এই অনুভূতি জাগ্রত করে যে সে চিৎকার করে ওঠে এবং বলে হে আল্লাহ! আমার জন্য আকাশের দরজা খুলে দিন এবং জাহান্নামের দরজা বন্ধ করে দিন, তখন আল্লাহ তাকে তাই দিয়ে পুরস্কৃত করেন যা সে আল্লাহর কাছে নিজের জন্য চেয়েছিল।

প্রতিটি আমল মানুষকে পুরষ্কারের দাবিদার বানায়। রোজার আমলটি একজন ব্যক্তিকে আল্লাহর বিশেষ প্রতিদানের যোগ্য করে তোলে, আল্লাহ তাকে সমস্ত রকমের ফেতনা থেকে রক্ষা করেন এবং তাকে অনন্ত নেয়ামতের ছায়ায় নিয়ে নেন।

অনুবাদ : মহিউদ্দিন মণ্ডল

আগের সংবাদহালাল সার্টিফিকেট প্রদান শুরু করলো বিএসটিআই
পরবর্তি সংবাদজাতীয় ঈদগাহে ঈদুল ফিতরের প্রধান জামাত সকাল সাড়ে ৮টায়