রোজা : চারিত্রিক অনুশাসন

সাহরি কী ও রোজা রাখার নিয়ত

মাওলানা ওহিদুদ্দিন খান:

রোজা একটি এবাদত, তার সাথে এটি একটি চারিত্রিক অনুশাসনের প্রশিক্ষণ। রোজা মানুষকে এমন সক্ষমতা দান করে যেন সে সর্বোত্তম নিয়মের সাথে লোকদের সাথে জীবনযাপন করতে পারে। লোকদের সাথে তার ব্যবহার দায়িত্বশীল হওয়া দরকার। রোজা এই সংবাদ দেয় যে, আপনি আপনার স্বাধীনতার লাগামহীন ব্যবহার না করে একে সংযতভাবে ব্যবহার করুন। রোজা আত্মসংযমের (self-restraint) শিক্ষা দেয়, এই আত্মসংযমের শিক্ষা সমস্ত রকম সংশোধনের চাবিকাঠি।

রোজা বাহ্যিক দিক দিয়ে খাদ্য ও পানীয় ত্যাগ করার নাম; কিন্তু তার সাথে পুরো জীবনের সম্পর্ক। রোজা যেভাবে মানুষকে বলে আপনি খাদ্য ও পানীয় ত্যাগ করুন, সেইভাবে তাকে এটাও বলে যে, যদি আপনি সঠিক রোজাদার হন আপনার উচিৎ খারাপ কথা উচ্চারণ না করা, হৈ চৈ না করা। যদিও কোনো ব্যক্তি আপনাকে গাল দেয় তবু আপনি তার উত্তরে গাল দেবেন না; বরং নিজের তরফ থেকে তাকে উপেক্ষা করবেন।

একটি হাদিসে রসুল (স) বলেছেন : রোজা হল ঢাল, সুতরাং আপনাদের মধ্য থেকে যদি কেউ রোজা অবস্থায় থাকেন তাহলে তিনি যেন খারাপ কথা না বলেন আর হৈ চৈ না করেন। কোন ব্যক্তি যদি তাকে গাল দেয় অথবা তার সাথে ঝগড়া করে, তিনি যেন বলে দেন যে, ‘আমি রোজা রেখেছি। ’ (সহি আল বুখারী, হাদিস নম্বর ১৯০৪, সহি মুসলিম, হাদিস নম্বর ১১৫১)।

এই হাদিস রোজার মর্মকথা বর্ণনা করে। এ থেকে বোঝা যায় রমযানে খাদ্য ও পানীয় ত্যাগ করা একটা প্রতীকী ত্যাগ। খাদ্য ও পানীয় অল্প সময়ের জন্য ত্যাগ এক স্থায়ী রোজার শিক্ষা দেয়। এটা দ্বীনি রোজার মাধ্যমে এক বিস্তৃত রোজার জন্য মানুষকে তৈরি করে।

ইসলামি জীবনধারা প্রকৃত পক্ষে এক রোজাওয়ালা জীবনযাপন। ইসলামের অর্থ মানুষ দুনিয়ায় কারাবাসে না থাকে, বরং সে হারাম এবং হালালের মধ্যে পার্থক্য করে, সে ভদ্রভাবে কথা বলে, অভদ্রতা না করে, সে লোকদের সাথে সঠিক বিচার করে এবং অবিচার থেকে নিজেকে দূরে রাখে, সে লোকেদের হক যেন আদায় করে এবং হক নষ্ট করা থেকে নিজেকে দূরে রাখে। রোজা প্রকৃতপক্ষে এক বাৎসরিক কোর্স যার দ্বারা মানুষকে সক্ষম বানানো হয়, যাতে সে সমাজে অন্যদের সাথে চারিত্রিক অনুশাসনের সাথে জীবনযাপন করতে পারে।

একজন ব্যক্তি আপনাকে শারীরিক কষ্ট দেয়, আপনি চান যে তাকে কষ্ট দিয়ে প্রতিশোধ নিতে, আর সেই সময় ক্ষুধার তাড়নায় দুর্বল শরীর আপনাকে স্মরণ করায় যে আপনি আল্লাহর জন্য রোজা রেখেছেন। তারপর আপনার উদ্যত হাত থেমে যায়, যে লোকটাকে আপনি মারতে যাচ্ছিলেন তার জন্য দোয়া করে সেখানেই ব্যপারটার নিষ্পত্তি করে দেন।

শয়তান আলাদা আলাদা সময়ে আপনাকে বিপথগামী করার চেষ্টা করে, সেই সময়ে রোজা আপনার সাহায্যকারী হয়ে যায়। রোজার প্রশিক্ষণ এবং রোজার এবাদতের জন্য আপনার অন্তরে যে কোমলতা এবং আত্মায় যে পরিচ্ছন্নতা তৈরি হয়, সেটা শয়তানের মোকাবেলায় আপনার জন্য ঢালের কাজ করে এবং আপনাকে শয়তানের ফেতনা থেকে বাঁচিয়ে রাখে।

চারিত্রিক অনুশাসনের জীবনযাপন এক তরফা ধৈর্য ধারণের প্রয়োজনীয়তার দিকে আহ্ববান করে, সেটা তখনই সম্ভব যখন আপনি অন্যের দিক থেকে খারাপ ব্যবহার পাওয়ার পরেও ক্ষুব্ধ হবেন না। অন্যের খারাপ ব্যবহারকে ভুলে আপনি তার সাথে সদ্ব্যবহার করতে পারবেন। এটা একটা কঠিন পরীক্ষা, এই জন্য মানুষকে রমজানে খাদ্য ও পানীয় এর মতো অনিবার্য প্রয়োজনীয় বস্তু থেকে দূরে থাকার অনুশীলন করানো হয়। কেননা, যে যতো বড় জিনিসকে সহ্য করে নেবে তার জন্য ছোটো জিনিসকে সহ্য করা সহজ হবে।

হাদিসে বলা হয়েছে মোমিন ও ঈমানের উদাহরণ এমন যেমন খুঁটির সাথে দড়ি দিয়ে বাঁধা ঘোড়া। সে ঘুরপাক খেয়ে আবার খুঁটির দিকে ফিরে আসে (মুসনাদে আহমাদ, হাদিস নম্বর : ১১৩৩৫)। রোজাও ঐ ধরনের এক বিরতি। আপনি রোজা অবস্থায় আছেন, এমন সময় এক ব্যক্তি আপনাকে কোনো খারাপ কথা বলে, আপনার রাগ হয়, কিন্তু তৎক্ষণাৎ পিপাসার কারণে শুকিয়ে যাওয়া কণ্ঠ আপনাকে স্মরণ করায় যে, আপনি রোজা আছেন। আপনি আপনার রাগকে হজম করে নেন, এবং কটূভাষী লোকটাকে মৃদুভাষায় উত্তর দিয়ে এগিয়ে যান। হজ হয়ে যাবে।

অনুবাদ : মহিউদ্দিন মণ্ডল

আগের সংবাদমসজিদুল আকসায় ইজরাইলি বাহিনীর হামলা, আহত ৬৭
পরবর্তি সংবাদপাকিস্তানের নতুন স্পিকার রাজা পারভেজ